জ্ঞান-বিজ্ঞানে মোহাবিষ্ট একজন জামাল নজরুল ইসলাম

Comments

২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবী অচিরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে- এ রকম একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের মতো পশ্চাত্পদ দেশে এই আতঙ্ক মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়ার আগেই আমাদের সব উদ্বেগকে প্রশমিত করেছিল যাঁর অভয়বাণী তিনি জামাল নজরুল ইসলাম (আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যিনি জে.এন. ইসলাম নামে পরিচিত)। কোনো দৈবজ্ঞান নয়, তিনি রীতিমতো গণিতের হিসাব কষে জানান যে, আমাদের সৌরজগতের অধিকাংশ গ্রহ প্রাকৃতিক নিয়মে একই সরলরেখা বরাবর এলেও এর প্রভাবে এই গ্রহে অস্বাভাবিক কিছু ঘটার আশঙ্কা নেই। জামাল নজরুল ইসলামের কথায় আমরা ভরসা পেয়েছিলাম। সেটি শুধু এ কারণে নয় যে, তিনি স্টিফেন হকিং কিংবা প্রফেসর আব্দুস সালামের মতো খ্যাতিমান বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি নিজেও একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, মহাবিশ্বের ভবিষ্যত্ নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ কেমব্রিজ, প্রিন্সটন, হার্ভার্ডয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। প্রচারবিমুখ দেশপ্রেমিক এই বিজ্ঞানী কেমব্রিজে অধ্যাপনা করতেন।

১৯৮৪ সালে কেমব্রিজের সোয়া লাখ টাকা বেতনের অধ্যাপনার চাকরীটি ছেড়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র হাজার তিনেক টাকা বেতনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শুধু নিজে নয়, তাঁর প্রিয় সবাইকেই তিনি পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশের আরেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও কল্পবিজ্ঞান লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফেরার আগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করামাত্র তিনি তাঁকেও দেশে ফেরার ব্যাপারে উত্সাহিত করেন।

Jamal Nazrul Islam02

বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম

ড. জামাল নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ঝিনাইদহ জেলায়। তাঁর বাবা সে সময়ে ওখানকার মুন্সেফ ছিলেন (বর্তমানের সহকারী জজ সমতুল্য)। তাঁর বয়স যখন এক বছর, সে সময় তাঁর বাবার বদলির সুবাদে কলকাতায় চলে যান তাঁরা। ফলে জন্মস্থানের স্মৃতি বিশেষ মনে নেই। তবে জন্মস্থান দেখার এক টুকরো স্মৃতি শুধু মনে আছে তাঁর। ১৯৪৮ সালে তাঁর বয়স যখন সাত-আট বছর তখন চুয়াডাঙ্গায় তাঁর ফুপাত ভাই সৈয়দ নাসির উল্লাহর ( সৈয়দ ওয়ালীউল্লার ছোট ভাই) বাসায় বেড়াতে যান তিনি। যাওয়ার সময় পথে পড়ে ঝিনাইদহ। যে বাড়িটায় তাঁর জন্ম তার পাশ দিয়ে গাড়ি যাওয়ার সময় তাঁর মেজ বোন তাঁকে দেখালেন বাড়িটি। বাড়িটি দেখে বুকের মধ্যে কেমন যেন করে উঠেছিল তাঁর। অদ্ভুত এক ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়েছিলেন তিনি অনেকক্ষণ।

তাঁর ঝলমলে শৈশবের অনেকখানি সময় কেটেছে কলকাতায়। প্রথমে কলকাতার একটা মডেল স্কুলে ভর্তি করানো হয় তাঁকে। এরপর ভর্তি হন শিশু বিদ্যাপীঠে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়লেন এখানে। তখন ঘোরাঘুরি করতে খুব ভালো লাগত তাঁর। পড়াশোনা একদমই করতে ইচ্ছা হতো না। স্কুলে যেতে চাইতেন না। শিশু বিদ্যাপীঠে তেমন একটা সুবিধা হলো না। আবার ফিরে গেলেন মডেল স্কুলে।

কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসে ভর্তি হলেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে। মেধা পরীক্ষায় তাঁর কৃতিত্ব দেখে কর্তৃপক্ষ ডাবল প্রমোশন দিয়ে তাঁকে সরাসরি ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করে নিলেন। এ কারণে তখনই অনেকের নজর কেড়েছিলেন তিনি। এখানে পড়লেন নাইন পর্যন্ত। এখানে পড়ার সময়ই গণিতটা ভালো লাগতে শুরু করে তাঁর। এ সময়ে তিনি নিজে নিজেই প্রচুর জ্যামিতি করতেন। নবম শ্রেণীতে উঠে চলে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তানের মারিতে, ভর্তি হলেন একটি বোর্ডিং স্কুলে, নাম লরেন্স কলেজ। ওখানে তাঁর মেজ ভাই থাকতেন। সে সময় ওখানে মেট্রিকুলেশন ছিল না। মেট্রিকুলেশনকে বলা হতো সিনিয়র কেমব্রিজ (এখনকার ও লেভেল)। ওটা পাস করলেন জামাল নজরুল ইসলাম। তারপর হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ (এখনকার এ লেভেল) পাস করলেন। সে সময়ে তিনি নিজে নিজে বই পড়ে ম্যাথ করেছেন। হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজে ম্যাথমেটিক্স পড়েছিলেন কেবল তিনি একাই। ওটা ছিল অ্যাডভান্স পর্যায়ের ম্যাথ। এরপর যখন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি.এসসি. অনার্স করে পড়তে গেলেন কেমব্রিজে ততদিনে গণিতের প্রতি তাঁর দুর্বলতা তৈরি হয়ে গেছে। কেমব্রিজে গিয়ে আবারও গ্রাজুয়েশন করলেন, ট্রিনিটি কলেজ থেকে। ওখানেই এম.এ. করলেন। কেমব্রিজ থেকেই ১৯৬৪ সালে প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা বিষয়ের ওপর পিএইচডি করলেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে এসসি.ডি. (ডক্টর অব সায়েন্স) ডিগ্রিও অর্জন করলেন।

কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ফাদার সোরে ছিলেন তাঁর প্রিয় শিক্ষক। বেলজিয়ামের প্রথম শ্রেণীর এই নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের কাছে গণিতের অনেক কিছুই শিখেছিলেন তিনি। অতি জটিল বিষয়গুলো তিনি খুব সহজে বুঝিয়ে দিতেন। জামাল নজরুল ইসলাম তাঁর প্রিয় ছাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর আচার-ব্যবহার জামাল নজরুলকে খুবই মুগ্ধ করত। জেভিয়ার্স থেকে চলে আসার পর বহুবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন তিনি। যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, তিনি আগ্রহ নিয়ে গণিতের কথা জানতে চাইতেন। তিনিও আগ্রহ নিয়ে বলতেন। তাঁর প্রিয় ছাত্র হওয়ার একটা কারণ অবশ্য নিজে নিজে বের করেছেন তিনি। গণিতকে এমনিতেই অনেকে ভয় পেত। কিন্তু এটির প্রতিই ছিল তাঁর অসীম আগ্রহ, ঝোঁক। এ কারণেই বোধহয় তিনি তাঁকে পছন্দ করতেন।

জামাল নজরুল ইসলাম যখন ইংল্যান্ডে পড়তে গেলেন, সেখানেও শিক্ষকদের অকুন্ঠ ভালোবাসা আর স্নেহ পেয়েছেন। তাঁর প্রতি স্নেহের টানে জন টেইলর নামের এক শিক্ষক তাঁর প্রিয় এই ছাত্রের বাসার পাশেই আবাস গেড়েছিলেন। কেমব্রিজের গণিতের ডাকসাইটে এই অধ্যাপক তাঁর পিএইচডির সুপারভাইজারও ছিলেন। খুবই গুণী শিক্ষক তিনি। জামাল নজরুল ইসলামের প্রতিবেশী হওয়ার কারণে গণিতের বিভিন্ন বিষয় শেয়ার করতে পারতেন তাঁরা। জামাল নজরুল ইসলাম কেমব্রিজ থেকে চলে এসেছেন কিন্তু জন টেইলর এখনো সেখানেই আছেন। এখনো দুজনের মধ্যে যোগাযোগ আছে। বাংলাদেশে একটা আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী পাকিস্তানের আবদুস সালামের সঙ্গে এসেছিলেন জন টেইলরও।

তাঁর প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন আবদুস সালাম, জোসেফসন, অমর্ত্য সেন এবং স্টিফেন হকিং। দেশ, জাতি বা বয়সের বিভেদ তাঁদের বন্ধুত্বের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। জ্ঞানচর্চার সূত্রে একই সমতলে নেমে এসেছেন তাঁরা। হকিং বয়সে তাঁর চেয়ে দুই বছরের ছোট। ১৯৬৭ সালে জামাল নজরুল ইসলাম কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অব থিওরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে কাজ শুরু করেন (১৯৬৭ থেকে ১৯৭১)। হকিং পরে এসে সেখানে যোগ দেন। তাঁরা দুজন দুজনের কাজ সম্পর্কে জানতেন। তবে তাঁরা একসঙ্গে কোনো পেপার লিখেননি। কথা হতো দুজনের মধ্যে। লন্ডনে থাকতে হকিং বহুবার তাঁর বাড়িতে এসেছেন। জামাল নজরুল ইসলামও সপরিবারে তাঁর বাড়িতে গিয়েছেন। দাওয়াত খেয়েছেন। দুজনের কাজের প্রতি পরস্পরের আগ্রহ ছিল। হয়তো দেখা গেল জামাল নজরুল ইসলাম কোথাও লেকচার দিচ্ছেন সেখানে হকিং গেছেন তাঁর লেকচার শুনতে বা হকিং কোথাও লেকচার দিচ্ছেন সেখানে জামাল নজরুল ইসলাম গিয়েছেন তাঁর লেকচার শুনতে।

বয়সে হকিং যেমন তাঁর কনিষ্ঠ তেমনি বয়োজ্যেষ্ঠ হলেন অমর্ত্য সেন। ১৯৫৭ সালে তিনি যখন কেমব্রিজ কলেজে পড়তে গেলেন তখন অমর্ত্য সেন ট্রিনিটি কলেজের ফেলো। সে সময়ে অবশ্য তিনি ওখানে ছিলেন না। ১৯৫৯ সালে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় ভারতের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমিয় বাগচীর মাধ্যমে। তারপর পরিচয়টা আস্তে আস্তে গাঢ় হলো। এভাবেই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব। এক সময় অমর্ত্য সেনের পরিবারের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হয়ে যায় তাঁর পরিবারের। ১৯৯০ সালে অমর্ত্য সেন যখন বাংলাদেশে এলেন তখন চট্টগ্রামে গিয়ে জামাল নজরুল ইসলামের বাড়িতেই ছিলেন। বিলেতে গেলে জামাল নজরুলও তার বাসায় ঢুঁ মারতে ভোলেন না। দুজনের ঘনিষ্ঠতা হওয়ার একটা কারণ হলো দুজনেরই গণিতের প্রতি আগ্রহ বেশি। অমর্ত্য সেনের গাণিতিক অর্থনীতির ওপর আগ্রহ বেশি। আর জামাল নজরুলের বিশুদ্ধ গণিতের প্রতি। অমর্ত্য সেন নোবেল পাওয়ার আগের রাতে তাঁরা দুজনই কেমব্রিজে ছিলেন। রাতে একসঙ্গে ডিনার করলেন। দুজনের মধ্যে অনেক কথা হলো দেশ-কাল-জাতি, অর্থনীতি, গণিত নিয়ে। ডিনার শেষে দুজনই ফিরে গেলেন যার যার ঘরে। ওই রাতেই অমর্ত্য সেন চলে যান আমেরিকা। পরদিন সকালে এল সেই সুসংবাদ : অমর্ত্য সেন নোবেল পেয়েছেন। জামাল নজরুল ইসলাম ফোন করলেন ওনাকে। বললেন, তুমি যে নোবেল পেলে কই একবার তো আমাকে বললে না। অমর্ত্য হেসে উত্তর দিলেন, আমিই কী ছাই জানতাম নাকি যে নোবেল পাচ্ছি। এই তো কিছুক্ষণ আগে ওরা আমাকে হোটেলে ফোন করে জানাল। ওনাকে অভিনন্দন জানালেন জামাল নজরুল ইসলাম।

পাকিস্তানের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালামও তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। জামাল নজরুল ইসলামের চেয়ে আবদুস সালামের বয়স অনেক বেশি হলেও (তিনি আমার চেয়ে ১৩ বছরের বড়) তাঁর আচরণে কখনো তা মনে হতো না। তিনি সবসময় তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ ব্যবহারই করতেন। কেমব্রিজের ট্রিনিটিতে পড়ার সময় আব্দুস সালামের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়। তিনি সেখানে একটি বিশেষ লেকচার দিতে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম আলাপ হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়। ১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রফেসর আব্দুস সালাম এক সরকারি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে এলেন। তাঁর হাত থেকে জামাল নজরুল ইসলাম একটি পদকও নেন।

এসব বন্ধুর বাইরে জামাল নজরুল ইসলামের প্রিয় বন্ধু হলো বই। তিনতলা বাড়ির দোতলার তিনটা এবং তিনতলার পাঁচ-ছয়টি কামরায় থরে থরে সাজানো রয়েছে অজস্র বই। টেবিলের উপরও বই-ম্যাগাজিন ঠাসাঠাসি করে রাখা। টেবিলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকারের টেবিল ল্যাম্প। এটি জ্বালিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন। চেয়ারের পেছনে দেয়ালে ব্ল্যাকবোর্ড রয়েছে। ছাত্ররা এলে তিনি এখানে বসেই তাদের অঙ্ক করে দেন এবং বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধান করেন।

রচিত গ্রন্থসমূহ:

১) দ্যা আলটিমেট ফেইট অব দ্যা ইউনিভার্স (১৯৮৪)
২) ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৪)
৩) রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৪)
৪) অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি(১৯৯২)
৫) স্কাই অ্যান টেলিস্কোপ
৬) দ্যা ফার ফিউচার অব দ্যা ইউনিভার্স (স্প্যনিশ ভাষায় অনূদিত)
৭) কৃষ্ণবিবর
৮) মাতৃভাষা ও বিজ্ঞানচর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ
৯) শিল্পসাহিত্য ও সমাজ

দিনের অনেকটা সময় কাটে তাঁর এসব বইয়ের সঙ্গে আর লেখালেখি করে। অনেক আগে থেকেই লেখালেখি করেন তিনি। তবে মহাবিশ্বের পরিণতি কী হতে পারে বা কী হবে, এই জটিল বিষয়টা নিয়ে লেখা তাঁর ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব দি ইউনিভার্স’ (মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি) বইটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে ১৯৮৩ সালে প্রকাশ হওয়ার পর বিজ্ঞানী মহলে বেশ হই চই পড়ে যায়। বইটি পরে জাপানি, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, পর্তুগিজ ও যুগোস্লাভ ভাষায় প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ সালে W B Bonnor-এর সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন ‘ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি’ এবং ১৯৮৫ সালে ‘রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস তাঁর তিনটি বই প্রকাশ করেছে। তিনটি বইই কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, প্রিন্সটন, হার্ভার্ডসহ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। তবে এসব বইয়ের তুলনায় তাঁর বাংলায় লেখা বইগুলোকে কোনো অংশে কম মনে করেন না তিনি। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণ বিবর’ (ব্ল্যাকহোল) এবং রাহাত-সিরাজ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ ও ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ নামক বইগুলি তাঁর লেখা অন্যান্য বইয়ের মধ্যে অন্যতম। শেষোক্ত বই দুটি মূলত সংকলন। এ ছাড়াও তাঁর দুটি জনপ্রিয় আর্টিকেল আছে। একটি হলো ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ’। পরে এটির স্প্যানিশ সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি হলো ‘দ্য ফার ফিউচার অব দ্য ইউনিভার্স, এনভেডর’। এই আর্টিকেলটি জার্মান, ডাচ ও ইতালিয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তাঁর লেখা গবেষণাপত্রের সংখ্যা প্রায় ৬০। নিজের গবেষণা প্রবণতা সম্পর্কে বললেন, ‘কোনো বিষয়ে গবেষণা করে ব্যর্থ হলে বা শেষ হলে সেটাকে একেবারে ছেড়ে দিইনি। আবার তাতে ফিরে এসেছি। আবার সেটা নিয়ে গবেষণা করেছি। এভাবে গবেষণা করতে আমার ভালো লাগে।’ তিনি মনে করেন একটা বিষয়ে বারবার চেষ্টা করলে বিষয়টি আস্তে আস্তে আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজকে তাঁর গবেষণার সূতিকাগার হিসেবে স্মরণ করেন এখনো। ড. নজরুলের তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত প্রায় দশজন পিএইচডি ও প্রায় আটজন শিক্ষার্থী এম.ফিল. ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এদের মধ্যে লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির এবং কেমব্রিজের শিক্ষার্থী রয়েছেন দুজন।

তিনি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব থিওরেটিক্যাল এস্ট্রোনমির স্টাফ মেম্বার ছিলেন। তিনি লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে আরম্ভ করে আমেরিকার প্রিন্সটন ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিসহ (Princton Institute for Advanced Study ) (যেখানে Einstin তাঁর শেষ বিশ বছর কাটিয়েছিলেন) অনেক খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাষক, ভিজিটিং অ্যাসোসিয়েট বা মেম্বার হিসেবে কাজ করেছেন।

Jamal Nazrul Islam03

ড. জামাল নজরুল ইসলাম

জামাল নজরুল ইসলাম গান শুনতে এবং ছবি আঁকতে খুব পছন্দ করেন। ছোটবেলা থেকেই গান শুনতেন এবং চেষ্টা করতে করতেই একদিন গান গাওয়া শুরু করেন তিনি।

একজন বিজ্ঞানীর রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা এবং ছবি আঁকার সংবাদে যদি কেউ বিস্মিত হন তো নিশ্চিত এই খবরে তিনি আরো অবাক হবেন যে, কম্পিউটার জিনিসটার প্রতি জামাল নজরুল ইসলামের কোনো আগ্রহ নেই। তাঁর বাড়িতে কোনো কম্পিউটার নেই। সুতরাং ইন্টারনেট সংযোগ থাকারও প্রশ্ন আসে না। জিনিস দুটিকে তিনি রীতিমতো অপছন্দই করেন। কারণ জানাতে গিয়ে বললেন, ‘কম্পিউটারে অনেক কাজ করা যায় বটে, তবে সব নয়। আর কম্পিউটারে করার দরকারই বা কী? আমার কাজের জন্য কম্পিউটার দরকার হয় না। আমি জীবনে কখনো ক্যালকুলেটর ব্যবহার করিনি। এই বিষয়ে আমি গর্বিত নই, লজ্জিতও নই। মাথা খাটিয়ে করলেই তো হয়। তাতে মস্তিষ্কের চর্চাও হয়, নিজে নিজে করাও হয়।’

জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৭১ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে পাক হানাদারদের আক্রমণ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছেন। সারাদিনের নানা রকম কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর মাথায় ঘুরে ফিরে আসে দেশের চিন্তা। তিনি কয়েকজন দরিদ্র শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার খরচ যোগান। তিনি মনে করেন, আমরা সবাই যদি দেশ নিয়ে ভাবি তাহলে হয়তো দেশের এই অবস্থা থাকবেনা।

১৯৬০ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি সুরাইয়া ইসলামের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর দুই মেয়ে। বড় মেয়ের নাম সাদাফ সাজ সিদ্দিকি আর ছোট মেয়ের নাম নার্গিস ইসলাম।

আমাদের দেশে যে ক’জন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আছেন তাঁদের মধ্যে জামাল নজরুল ইসলাম অন্যতম। তিনি শুধু দেশেই নয় বিদেশেও বিজ্ঞানী হিসেবে বেশ পরিচিত৷ তাঁর মধ্যে যে দেশপ্রেম দেখা যায় তার দৃষ্টান্ত বিরল। তিনি বিদেশের উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশে এসেছিলেন বলেই এদেশের ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর মতো বিজ্ঞানীর সান্নিধ্যে এসে শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছে। এদেশের প্রত্যেকটি জ্ঞানী-গুণী মানুষ যদি তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তবে এদেশ আরও এগিয়ে যাবে। এদেশের মানুষ তাঁর মতো বিজ্ঞানীকে পেয়ে গর্বিত।

তিনি ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ মারা যান।

সৌজন্য: গুণীজন

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.