ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে

Comments

সন্দীপ দে 

‘‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।
বাদলের ধারা ঝরে ঝরোঝরো, আউষের ক্ষেত জলে ভরোভরো,
কালিমাখা মেঘে পারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ্ চাহি রে।’’….

ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটি শুনলে মনটা সংগোপনেই নেচে উঠত। না, কবি রবীন্দ্রনাথের বর্ষার রূপ বর্ণনায় মুগ্ধ হয়ে কিন্তু একেবারেই নয়, মনে খুশির পরশ লাগত মুফতে একটা ছুটির দিন উপহার পাবার আনন্দের কথা ভেবে। কবিতাটির প্রতিটি শব্দেই যেন একটা ছুটির আমেজ খুঁজে পেতাম। বিশেষকরে স্কুলে না যাবার আনন্দটা যেন জাঁকিয়ে বসত। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বর্ষা। এই বর্ষা নিয়ে কবির ভাব-অনুভব,সৃষ্টির অন্ত নেই। বর্ষার প্রতি কি তাঁর একটু বেশিই পক্ষপাতিত্ব? তিনি জীবনস্মৃতির পাতায় তাঁর ছেলেবেলার বর্ষার স্মৃতি অপরূপভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন:

‘‘বাল্যকালের দিকে যখন তাকাইয়া দেখি তখন সকলের চেয়ে স্পষ্ট করিয়া মনে পড়ে তখনকার বর্ষার দিনগুলি। বাতাসের বেগে জলের ছাঁটে বারান্দা একেবারে ভাসিয়া যাইতেছে, সারি সারি ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ হইয়াছে, প্যারীবুড়ি কক্ষে একটা বড়ো ঝুড়িতে তরিতরকারি বাজার করিয়া ভিজিতে ভিজিতে জলকাদা ভাঙিয়া আসিতেছে, আমি বিনা কারণে দীর্ঘ বারান্দায় প্রবল আনন্দে ছুটিয়া বেড়াইতেছি। আর,মনে পড়ে, ইস্কুলে গিয়াছি; দরমায়ঘেরা দালানে আমাদের ক্লাস বসিয়াছে; অপরাহ্নে ঘনঘোর মেঘের স্তূপে স্তূপে আকাশ ছাইয়া গিয়াছে; দেখিতে দেখিতে নিবিড় ধারায় বৃষ্টি নামিয়া আসিল; থাকিয়া থাকিয়া দীর্ঘ একটানা মেঘডাকার শব্দ; আকাশটাকে যেন বিদ্যুতের নখ দিয়া এক প্রান্ত হইতে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত কোন পাগলি ছিঁড়িয়া ফাড়িয়া ফেলিতেছে; বাতাসের দমকায় দরমার বেড়া ভাঙিয়া পড়িতে চায়; অন্ধকারে ভালো করিয়া বইয়ের অক্ষর দেখা যায় না, পণ্ডিতমশায় পড়া বন্ধ করিয়া দিয়াছেন; বাহিরের ঝড়বাদলটার উপরেই ছুটাছুটিমাতামাতির বরাত দিয়া বন্ধ ছুটিতে বেঞ্চির উপর বসিয়া পা দুলাইতে দুলাইতে মনটাকে তেপান্তরের মাঠ পার করিয়া দৌড় করাইতেছি। আরও মনে পড়ে শ্রাবণের গভীর রাত্রি, ঘুমের ফাঁকের মধ্য দিয়া ঘনবৃষ্টির ঝম ঝম শব্দ মনের ভেতরে সুপ্তির চেয়েও নিবিড়তর একটা পুলক জমাইয়া তুলিতেছে; ’’

 এই অসাধারণ বর্ণনার পাশাপাশি আমরা লক্ষ করি তাঁর লেখনীতে নিঃসৃত হয়েছে অপরূপবাণীতে, অনুপম সুরে ও ছন্দে এবং বর্ষার অসাধারণ চিত্রকল্পে রচিত গান:

‘‘নীলঅঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় সম্বৃত অম্বর হে গম্ভীর!
বনলক্ষ্মীর কম্পিত কায়, চঞ্চল অন্তর
ঝঙ্কৃত তার ঝিল্লির মঞ্জীর হে গম্ভীর!
বর্ষণগীত হল মুখরিত মেঘমন্দ্রিত ছন্দে,
কদম্ববন গভীর মগন আনন্দঘন গন্ধে
নন্দিত তব উৎসবমন্দির হে গম্ভীর।’’

এটি আমারও একটি অন্যতম প্রিয় গান। তবে কবির সঙ্গে আমার কিঞ্চিৎ অমিলও রয়েছে। আমার কাছে রিম ঝিম রিম ঝিম বর্ষার ভালোলাগা দিক অনেক থাকলেও কিছু বিপরীত দিকও আছে। বর্ষণধারায় প্রকৃতি শান্ত শীতল হলেও গরমের দাপটটা কিন্তু পুরোপুরি যায়না। তাছাড়া জল কাদায় প্যাচপ্যাচে রাস্তায় যাতায়াতে অসুবিধে, বৃষ্টির মধ্যে জানালা বন্ধ লাইন বাসের মধ্যে ভ্যাপসা গরমে ঠাসাঠাসি ভিড়ে ভেজা ছাতা, ব্যাগ সামলে কাজে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কিন্তু মোটেও সুখকর নয়। এছাড়া রাস্তার নর্দমা বুজে গিয়ে যাবতীয় বর্জ্যপদার্থ মিশ্রিত পা বা কোথাও হাঁটুডোবা জল মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো এক চরম দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। এই সময় কেমন যেন একটা মনখারাপ করা পরিবেশ থাকে। বৃষ্টির প্রকোপে অনেক সময়ই বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে গৃহবন্দি রাখা ছাড়া আর উপায় থাকেনা। ভালো জামাকাপড়গুলো নষ্ট হবার ভয়ে বাক্সবন্দি হয়ে থাকে। এই সময়ে খাবারদাবারেও বৈচিত্র্য খুব একটা থাকেনা। সামাজিক আনন্দ অনুষ্ঠান সব তোলা থাকে পরবর্তী সব ঋতুর জন্য। আমার বর্ষার এই অসুখী অভিজ্ঞতা কিন্তু কলকাতা শহরের।

বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলেবেলার গান

আসামের ছোট্ট মফস্‌সল শহর বিলাসীপাড়ায় শৈশব-কৈশোর এবং যৌবনের সন্ধিক্ষণে বর্ষার অভিজ্ঞতা ছিল বিচিত্র। আজ স্মৃতির পাতা ওলটালে দেখা যায় কিছু খারাপ লাগা ছিল বটে, কিন্তু ভালোলাগার পাল্লাই ছিল বেশ ভারি। চারদিকে গ্রাম ও চরঅঞ্চল পরিবেষ্টিত শহর। শহরের বুকে যেমন ইতস্তত গাছের সারি, তেমনি সংলগ্ন অঞ্চল জুড়ে সর্বত্র গাছগাছালি, বিস্তীর্ণ ফসলের খেত, বড়ো বড়ো ডোবা, নালা, পুকুর। ঘনবর্ষার সময়টুকু বাদ দিলে সবুজ ধানের খেতে মৃদুমন্দ হাওয়ার দোলা, শীতে শিশির ভেজা সরষের খেতের গাঢ় হলুদ বর্ণচ্ছটা, শরৎকালে নদীর পাড়ে সাদা মেঘের মতো কাশবনের বাহার — সব মিলিয়ে এক অনাবিল মুগ্ধতার আবহ রচনা করত। বাড়তি সৌন্দর্য ছিল শহর ঘেঁষে বয়ে চলা গৌরাঙ নদী। ব্রহ্মপুত্রের এই শাখা নদীটি ছিল শহর ও সংলগ্ন অঞ্চলের যেন প্রাণস্পন্দন। ব্যবসা, যোগাযোগসহ  নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিনতা অনেকটাই নির্ভর করত এই নদীর ওপর।

বর্ষায় এই শান্ত নদীটির রূপ যেত পালটে। জলস্তর বেড়ে গিয়ে প্রায় রাস্তা ছুঁয়ে ফেলত, তখন ধীরে চলা নদীর চঞ্চলা স্রোত বইতে দেখা যেত প্রবল বেগে—কবির বাণীতে ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা। নদীর বুকে মাঝে মাঝে দেখা যেত ছোটো ছোটো শুশুকের আনন্দে ডিগবাজি খাওয়া, দুপারে মাছ ধরায় ব্যস্ত মাঝিরা। তখন মাটির হাড়ি, কলসি, মনিহারি সামগ্রী নিয়ে নানা প্রান্তে গাওয়াল করতে যাওয়া কিছু মানুষ (ওদের বলা হতো ছান্দার, যাঁরা নিম্নবিত্তের মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত) তাদের নৌকাগুলি পারে ভিড়িয়ে রাখত, কারণ তখন তো খদ্দের গ্রামবাসীরা এসব জিনিস কেনার অবস্থায় নেই, তারা জলের প্রকোপে বিপর্যস্ত। ভরা বর্ষার দিনে বৃষ্টি ধরে এলে কখনো কখনো বিকেলের দিকে পরিস্কার আকাশের গায়ে রামধনুর দেখা মিলত। কী অপূর্ব লাগত ! ওই সময়ে নদীর পারের সেইসব দৃশ্য মন কেড়ে নিত।

বেশ কিছুকাল পরে এই প্রিয় নদীটি আপন খেয়ালে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আমাদের দৃষ্টির সীমান্ত থেকে একেবারে বিলীন হয়ে গেল ! পড়ে রইলো তার শুকিয়ে যাওয়া গতিপথ ও শূন্য তটভূমি !  রিক্ত করে দিয়ে গেল শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সম্ভার, স্তব্ধ হয়ে গেল শহরের প্রাণ স্পন্দন !  মুছে গেল আমাদের কৈশোর- যৌবনের অগণ্য স্মৃতি এবং অপরূপ এক নৈসর্গিক ছবি ! মন হাহাকার করা সে এক ভিন্ন কাহিনি।

যাইহোক, প্রবল বৃষ্টিতে ও বর্ষায় নদীর জল বেড়ে গেলেই সংলগ্ন খাল, বিল, পুকুর সব ডুবে একাকার। তখন আলাদা করে আর খাল, বিল, ডোবা আর চেনা যেত না। সর্বত্র জল থই থই। মনে হতো নদীটাই বুঝি চলে এসেছে বাড়ির পাশে। আমাদের বাড়ির গা ঘেঁষা খালটি প্লাবিত হয়ে বিশাল জলাশয়ের আকার নিত। তার বুকে কচুরিপানার বয়ে যাওয়া স্রোত দেখে মনে হতো ছোটো বড়ো নানা আকারের সবুজ ভেলা যেন ছুটে চলেছে আপন বেগে। বর্ষার তোড়ে খালের জল উপচে প্রতিবছর বাড়ির উঠোনকে ছাপিয়ে যেত, বাড়ি ঢোকার রাস্তা ডুবুডুবু, এমনকী এই জল কখনো কখনো ঘরের মধ্যেও ছড়িয়ে যেত। ঘুম থেকে উঠে দেখতাম হাওয়াই চটি খাটের নিচে নেই, দূরে জলে ভাসছে, আর জলের কিছু পোকা ও ছোট্ট ছোট্ট মাছের পোনা নির্বিবাদে মেঝেতে কিলবিল করছে। ভাবতাম কী দুঃসাহসই না এদের! কীভাবে

ঘরের মেঝে জবরদখল করে মনের আনন্দে এরা জলে ভেসে বেড়াচ্ছে!

এই সময়ে আরেকটা জিনিস খুব আকর্ষণ  করতো , বেশ লাগত। তাহলো বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যেত ব্যাঙেদের সমস্বরে কলতান। দিনের বেলায় খুব একটা বোঝা যেত না,কিন্তু বিকেল হতে না হতেই ব্যাঙেদের গলা ছেড়ে গান শুরু হয়ে যেত। জানান দিত বর্ষার আগমন বার্তা। দেখা যেত হলুদ,হালকা সবুজ, ধূসর প্রভৃতি নানা রঙের লম্বা, চ্যাপ্টা, ছোটো, মাঝারি বিভিন্ন আকারের ব্যাঙ খাল বিলের পার জুড়ে যেন মেহফিল বসিয়েছে; ওদের খুশির সীমা নেই, হুটোপুটি করছে, দলবেঁধে বা একজন একজন করে লাফিয়ে পড়ছে জলে , কিছুক্ষণ জলকেলি করে আবার উঠে আসছে পারে। সে এক মজার দৃশ্য! যদি ওই সময়ে একটা ঢিল ছোঁড়া যেত ওখানে তবে পড়িমরি করে সব ক’টি ব্যাঙ প্রায় এক সঙ্গে জলে ঝাঁপ মারত। ওগুলোর কোনো কোনোটির আকার দেখলে চমকে যেতে হতো! এভাবেই একটা নির্দিষ্ট ছন্দে সুরে ওদের সমবেত সংগীত চলত রাত পর্যন্ত। ওই শব্দে রাতে বিছানায় শুয়ে গভীর ঘুমে ঢলে না পড়া পর্যন্ত কেমন যেন একটা আচ্ছন্নতার সুর অবিরাম কানে বেজে যেত।

এই বর্ষাকালেই যেদিন রাতের দিকে বৃষ্টি থেমে যেত, হঠাৎ কখনো ভেসে আসত বাঁশির সুর। সারাদিন সাইকেলে গ্রামগঞ্জ ঘুরে নানা মনিহারি জিনিসপত্র বিক্রির পর রাতে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের বাড়ি সংলগ্ন খালের ওপরে কাঠের সাঁকোয় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য বাঁশি বাজাতেন রবিয়ালদা। তখন আমার কিছুটা বড়োবেলা এবং এই বাঁশিবাদক যে সাঁকোর ওপারের বাসিন্দা রবিয়াল হোসেন তা জানা ছিল। এই সময়ে বোধহয় তাঁর শিল্পীসত্তা জেগে উঠত। তিনি নিশ্চিতভাবেই তখন প্রাণের আরাম এবং মনের আনন্দ অনুভব করতেন। তিনি ওই সময়ে বাঁশিবাজিয়ে হিসেবে স্থানীয় একটি লোকশিল্পী সংস্থার হয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকী বাংলাদেশেও পাড়ি দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে গণনাট্য সংঘের শিল্পী হিসেবে তাঁর  ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেয়েছি। যাইহোক,  নিঝুম রাতে রবিয়ালদার বাঁশির সুর যেন তখন এক মোহময়ী আবেশ সৃষ্টি করে আমাকে ঘুমের দেশে নিয়ে যেত।

বর্ষার এই বানভাসি অবস্থায় খুব মজা লাগত বাড়ি লাগোয়া খালের জলে নেমে হুল্লোড় করতে। এই জল যে কত নোংরা, দূষিত এসব তখন ভাবার অবকাশ থাকত না। বাড়ির বড়োদের চোখে পড়ে বকুনি না খাওয়া পর্যন্ত জল থেকে ওঠার নামও করতাম না। তবে বাড়ি ঢুকে স্নান করাটা বাধ্যতামূলক ছিল।

আমাদের যখন এই অবস্থা তখন নদী-তীরবর্তী চর অঞ্চলগুলো তো একেবারে জলের তলায়। সেইসব চরের মানুষদের দুর্ভোগের সীমা থাকত না। এরা সবাই মুসলমান সম্প্রদায়ের,সরাসরি নৌকো করেই চলে আসতেন শহরে বিকিকিনির জন্য। বর্ষায় তাদের ঘরবাড়ি জলমগ্ন হওয়ায় খেতের ধান,পাট ও অন্যান্য ফসল এবং হাঁস-মুরগি-গোরু-ছাগল ইত্যাদি রাখার জায়গা থাকত না। তাই তাঁরা সেসব নৌকো করেই নিয়ে আসতেন শহরের হাটে বিক্রির জন্য। জীবনধারণের প্রয়োজনে তখন এসব খুবই সস্তায় বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। সেই টাকায় তাঁরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যেতেন পরিবারের দিনগুজরানের জন্য। কিছু এলাকায় এমনই দুর্বিষহ অবস্থা হতো যে বাড়িঘরে জল ঢুকে যাওয়ায় উনোন ধরানোর জায়গাটুকুও থাকত না। তখন তাঁরা শুকনো মুড়ি চিড়ে বা কাঁঠাল খেয়ে দিন কাটাতেন। আমাদের বাড়িতে আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, কালোজাম, জলপাই, খেঁজুর, নারকেল, বেল, আতা ও নোনা ফল, কামরাঙা, আঁশ ফল, ডেউয়া, চালতা, বাতাবি লেবু ইত্যাদি নানা ফলমূলের প্রচুর গাছ ছিল। বিশাল বিশাল আকারের কাঁঠাল এত বেশি পরিমাণে হতো যে তার এক শতাংশও খেয়ে শেষ করা যেত না। তখন দেখতাম বাড়ির দুধওয়ালা ও তাঁদের পরশি কেউ কেউ আমাদের গাছের কাঁঠাল নৌকা বোঝাই করে নিয়ে যেতেন। যখন শুনতাম জলে ডোবা সময়কালে শুধু কাঁঠাল খেয়েই তাদের দিন যাপন হবে, খুব অবাক হতাম, কষ্টও হতো।

নৌকো যে যায় ভেসে

চরের সেই ছাপোষা মানুষদের নৌকাগুলো বাঁধা থাকত আমাদের বাড়ির ধার ঘেঁষে খালের জলে। মনে হতো যেন কোনো খেয়াঘাট। সেও এক মনোরম দৃশ্য! এই মানুষগুলো খুবই বিশ্বাস করে তাদের নৌকার লগি, বৈঠা সব রাখতেন আমাদের বাড়ির ভেতরে। আর এই মওকাতেই থাকতাম আমরা। ওরা লগি, বৈঠা সব বেঁধেছেদে বাজারে চলে যাবার পর শুরু হতো আমাদের নৌকা বাওয়ার অভিযান। পাশের বাড়ির অমল ছিল আমার আবাল্য ছায়াসঙ্গী। কাজেই অবধারিতভাবে সে ছিল এই অভিযানের মূল কাণ্ডারি। সু্যোগ বুঝে ছোট্ট মতো নৌকা বেছে নিয়ে দড়ি খুলে খালের জলে ভাসাতাম । নৌকো চালানোতে যে বিরাট দক্ষতার প্রয়োজন হয় তখন সেসব কথা আর কে ভাবে! নৌকার দড়ি খুলে তো নেমে পড়া গেল জলে,তারপর এক নাজেহাল অবস্থা! আমরা নৌকা যেদিকে নিয়ে যেতে চাই নৌকা চলে তার বিপরীত দিকে। তবু্ও আমাদের কসরত চলতেই থাকে। তখন আমাদের যেন একটা নেশায় পেয়ে বসেছে। এভাবেই এঁকেবেঁকে গোত্তা খেতে খেতে এগিয়ে চলে আমাদের নৌকা। এরপর আবার সেই কসরত করেই ফিরে আসা। তবুও আমাদের উৎসাহের শেষ নেই। প্রায় রোজই চলে আমাদের এই অভিযান। একবার তো এভাবে নৌকা নিয়ে গিয়ে পড়েছিলাম মহা বিপদে। অমলের হাতে লগি,আমার হাতে বৈঠা, এভাবে নৌকো নিয়ে অনেকটা দূর চলে গেছি। চলতে চলতে পড়ে গেছি একেবারে স্রোতের মাঝখানে। স্রোতের টানে নৌকো একবার এদিকে টাল খায় তো আরেকবার ওদিকে! সে এক বিপন্ন অবস্থা! অমল যদিও বা সাঁতার জানে, আমি কিছুই না। আর এখানে জলের গভীরতা অনেক, লগি থই পায় না। শেষ পর্যন্ত অমলের বুদ্ধি, ধৈর্য ও শারীরিক দক্ষতায় কোনোমতে সেদিন স্রোতের কেবল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম। আমরা যখন নৌকা সামলে ফিরছি তখন বাজার ফেরত নৌকার মালিক ফিরে এসে তাঁর নৌকাটি না দেখে হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছেন, দূর থেকে তা আমাদের কানেও পৌঁছাচ্ছে। তখন আমাদের একেবারে দিশাহীন অবস্থা! শেষ পর্যন্ত অমলের বুদ্ধিতে আমাদের বাড়ির পিছনে অন্য বাড়ির গায়ে নৌকোটা লাগিয়ে তাতে লগি, বৈঠা রেখে আমরা হাওয়া। সেদিন টের পেয়েছিলাম বিপদ কাকে বলে! তার জন্য অবশ্য আমাদের নৌকা-অভিযান কিন্তু বন্ধ হয়নি।

এই বর্ষাদিনেই গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে হঠাৎ করেই অবিশ্বাস্য কমদামে মিলে যেত ডিম, মুরগি অথবা কচি পাঁঠা। তখন আমাদের ছেলেছোকরাদের এক-দু’টাকা করে চাঁদা তুলে পিকনিক হতো আমাদেরই কারও বাড়ির উঁচু বারান্দায় অথবা সংলগ্ন পাঠশালায়। এই বর্ষার পিকনিকেও অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল অমল।

এই বর্ষাকালে বাড়ির গাছের আম গামলায় নিয়ে কাসুন্দি, কাঁচা লঙ্কা, লেবুপাতা দিয়ে খাওয়ার মজা এবং নিঃশব্দে লিচু গাছে উঠে মনের সুখে প্রায় পেট ভরে লিচু খাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ভোলার নয়।

আজও মনের আঙিনায় আনাগোনা করে বর্ষামুখর বিকেলে অমলের বদমেজাজি জেঠিমাকে এড়িয়ে তাঁর গাছের বাতাবিলেবু পেড়ে ফুটবল খেলার স্মৃতি। এমন এক বৃষ্টিভেজা দিনেই পাশের পাড়ার বন্ধুদের ফুটবল খেলায় হারিয়ে দিয়ে চার ইঞ্চি কাপ মাথায় নিয়ে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে হিপ হিপ হুর রে, হিপ হিপ হুর রে বলে চিৎকার করতে করতে রাস্তায় মিছিল করে ফিরেছিলাম, তখন যেন বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ মনের মধ্যে আন্দোলিত হচ্ছিল!

আর এই বর্ষার সময়ে আমায় একটা নেশায় পেয়ে বসত, তা হলো বরশি দিয়ে মাছ ধরা। বর্ষার প্লাবনের পর যখন জলে টান ধরত তখনই মাছেদের প্রাদুর্ভাব হতো। আমাদের বাড়ির চারপাশে বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে জল ঢুকে নিচু জায়গাগুলোতে অনেকদিন জমা থাকত। সেখানে পুঁটি, খলসে, চেলা, ট্যাংরা, কই, সিং, মাগুর ইত্যাদি নানা রকমের মাছ কিলবিল করত। বর্ষাশেষে যখন রোদ উঠত তখন বেশি বেশি করে এসব মাছ দেখা যেত। মোড়া বা ছোটো টুল নিয়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাছ ধরতাম। ভরা বর্ষায় বাড়ি সংলগ্ন জলমগ্ন খালের মাঝখানে মাঝিরা বিশাল বিশাল বাঁশ পুঁতে জাল বাঁধতেন। এগুলোকে বলা হতো খড়া। বাঁশে বাঁধা তিনকোনা জাল স্রোতের উলটো দিকে জলে ডোবানো থাকত কিছুক্ষণ। তারপর তোলা হতো, স্রোতের টানে মাছ এসে ধরা পড়ত জালে। সেও এক দেখার মতোই দৃশ্য,যা ছেলেবেলায় খুব আকর্ষণ করত।

বর্ষা-দিনের সন্ধ্যায় পড়ার সময় যখন মুষলধারায় বৃষ্টি নামত, তখন পড়ার কথা ভুলে অনাস্বাদিত আনন্দে মন চলে যেত এক অন্য জগতে। তেমনি ছেলেবেলার আরেকটি আনন্দ-মুহূর্তের স্মৃতি মাঝেমাঝে উঁকি দিয়ে যায় তা হলো, রাতে শুতে যাওয়ার পর যখন টিনের চালে ঝমঝম করে বৃষ্টি ঝরে পড়ত। রাতের নৈঃশব্দ্যকে খানখান করে একদিকে বিদ্যুৎ গর্জন, তার সাথে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার বিচিত্র ছন্দ, সবকিছু মিলে মেঘ-মল্লারে এক অপূর্ব সুরধ্বনির আবহে যেন নিদ্রাদেবীকে বরণ করত।  তখন মনে হতো এই বর্ষণমুখর রজনীর যেন অবসান না হয়। আমার ব্যাকুল হৃদয় তখন যেন বৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলতে চাইত–

তুমি যেয়ো না, তুমি যেয়ো না,
আমার বাদলের গান হয়নি সারা“…

মাতিয়া যখন উঠেছে পরাণ

বর্ষায় স্কুলের দিনগুলোও ছিল খুবই আনন্দের। ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির লম্বা স্কুল বাড়ি। সামনে স্কুলবাড়ির সমান লম্বা মাঠ। আমরা যখন নিচু ক্লাসে তখন ছিল টিনের চাল,দরমার বেড়া, মাটির ভিটে। স্কুলের অফিস, হেড মাস্টারের রুম, শিক্ষকদের বসার জায়গা ছিল পাকা বাড়িতে। পরে অবশ্য পুরোনো বাড়ি ভেঙে পাকা বাড়ি হয়েছে। সে যাইহোক, বৃষ্টি হলেই স্কুলের সামনের মাঠ জলে ডুবে যেত। সেই জল মাড়িয়ে স্কুলে ঢোকার সময় কেউ না কেউ সেই জলে আছাড় খেতই। দেখে হাসির রোল উঠত আমাদের। একই অবস্থা হতো মাটির বারান্দা ডিঙিয়ে ক্লাসরুমে ঢোকার সময়। তখন স্কুল ইউনিফর্মে জল কাদা লেপটে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। ছেলেরা যদিও বা এই বিপত্তি কোনোমতে সামলে নিতে পারত, মেয়েরা লজ্জা-সঙ্কোচে একেবারে মিইয়ে যেত। অবশ্য এই অবস্থা যাদের হতো,তাদের তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। মাস্টারমশাইরাও অনেক সময় একই দুর্ভোগের কবলে পড়তেন। এমন বাদল-ঝরা দিনে স্বাভাবিকভাবেই পড়ায় মন বসতো না, মন চাইত গল্পগুজব,মজা করে কাটিয়ে দিতে । কাছের বন্ধুদের কেউ যদি সেদিন না আসত তবে খুবই মন খারাপ হয়ে যেত। আমাদের জানাই থাকত এমন ঝরঝর ভরা বাদরে পুরো স্কুল কিছুতেই হবেনা। দুই পিরিয়ড বা চার পিরিয়ডের পর ছুটি অনিবার্য। তাই স্কুলে ঢোকা থেকেই মনটা খুশিতে ডগমগ থাকত। অনেক মাস্টারমশাইও আসতে পারতেন না। তাঁদের ফাঁকা পিরিয়ডে তখন আমাদের অবাধ স্বাধীনতা, গুলতানির যেন বন্যা বয়ে যেত। অবশেষে বেজে উঠত দু’বার ঘণ্টার ধ্বনি, তারমানেই আমাদের ঈপ্সিত ছুটির বার্তা,আহা,কী যে আনন্দ হতো তখন! এই আনন্দে অনেকেই বইখাতা কাছের বন্ধুর কাছে জমা রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ত স্কুল মাঠের জমা জলে। আনন্দ উদ্‌যাপনের এর চেয়ে চেয়ে বুঝি ভালো পন্থা আর কিছু ছিল না তখন!

হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়েছে

তখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে। বর্ষার আনন্দ-অনুভূতিতে কোনো ভাঁটা নেই, নেই কোনো খামতি । বরং তখন এই অনুভূতির সঙ্গে একটা বাড়তি মাত্রা সংযোজিত হয়েছে,একজনের প্রতি কিঞ্চিৎ আকর্ষণবোধ তৈরি হয়েছে। আস্তে আস্তে আকর্ষণের মধ্য দিয়ে একরকমের ভালোলাগা, সেই কিশোর বেলায় সেটা ঠিক প্রেম বলা যাবে না,ইংরেজিতে অনেকটা infatuation -এর মতো। ক্লাসে সবার মধ্যে থেকেও মনপাখিটা খাঁচা ছেড়ে মাঝে মাঝেই উড়াল দিত ওই দিকে। অনেকটা যেন রবি ঠাকুরের ভাষায়বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা। চাতক পাখির মতো আমার দৃষ্টি থাকত তার আসার অপেক্ষায়। বিশেষকরে এমন বাদল-দিনে যদি সে না আসত তবে আমার সে দিনটাই হতো মাটি। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার সেই গানের কথাগুলিই তখন যেন মনের গভীরে অনুরণিত হতো-  আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার,/ দিনের আকাশ মেঘে অন্ধকারহায় রে’’….

মনেপড়ে ঠিক ওই সময়েই স্কুলের লাইব্রেরি থেকে নেওয়া বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস রাধারাণী পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এটা ছিল নিতান্তই আকস্মিক ও কাকতালীয়। এটা পড়ে মনের মধ্যে বাসা বাঁধা সেই ‘ভালোলাগার’ অনুভূতিটা যেন আরও সজীব হয়ে উঠেছিল। সেই উপন্যাসের মধ্যেও ছিল আঁধার রাতের বৃষ্টি ধারার অনবদ্য বর্ণনা-

‘‘অন্ধকার পথ কর্দ্দমময়,পিচ্ছিল কিছুই দেখা যায় না। তাহাতে মুষলধারে শ্রাবণের ধারা বর্ষিতেছিল। মাতার অন্নাভাব মনে করিয়া তদপেক্ষাও রাধারাণীর চক্ষুঃ বারি বর্ষণ করিতেছিল। রাধারাণী কাঁদিতে কাঁদিতে আছাড় খাইতেছিলকাঁদিতে কাঁদিতে উঠিতেছিল। আবার কাঁদিতে কাঁদিতে আছাড় খাইতেছিল। দুই গণ্ডবিলম্বী ঘন কৃষ্ণ অলকাবলী বহিয়া,কবরী বহিয়া,বৃষ্টির জল পড়িয়া ভাসিয়া যাইতেছিল। তথাপি রাধারাণী সেই এক পয়সার বনফুলের মালা বুকে করিয়া রাখিয়াছিল ফেলে নাই।’’

প্রাচীনকাল থেকেই বর্ষা সাহিত্যের ভুবনে অন্যতম স্থান দখল করে আছে। যুগে যুগে লেখক-কবি- পদকর্তারা বর্ষাকে প্রেম-বিরহের ঋতু হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এর অন্যতম নিদর্শন মহাকবি কালিদাসের অনন্য সৃষ্টি ‘মেঘদূত’। সেখানে রয়েছে সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি —

 ‘‘তস্মিন্নদ্রৌ কতিচিদবলাবিপ্রযুক্তঃ কামী
 নীত্বা মাসান্ কনকবলয়ভ্রংশরিক্তপ্রকোষ্ঠঃ।
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং
বপ্রক্রীড়াপরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ং দদর্শ’’

এখানে কালিদাস বলছেন, আষাঢ়ের প্রথম দিবসেই মেঘের ঘনঘটায় যে আবহ সৃষ্টি হয়েছে,তাতে যক্ষের বিরহকাতর মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে তার দূরবর্তী প্রিয়ার কাছে যাবার জন্য। কর্তব্যে অবহেলার জন্য একবছরের জন্য নির্বাসিত যক্ষ তাই তার বন্ধু মেঘকে অনুরোধ করছে তার বার্তা প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দিতে। এখানে কবির কল্পনায় একখণ্ড মেঘ হয়ে উঠেছে বিরহীর বার্তাবাহক প্রাণবন্ত-জীবন্ত দূত।

মেঘদূত ছাড়াও বৈষ্ণব পদাবলিতেও বর্ষার সঙ্গে বিরহের একটি নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করেছেন পদকর্তারা। পদাবলি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস থেকে বিহারীলাল প্রমুখের কবিতায় ও গানে বর্ষা ও বিরহ একাকার হয়ে গেছে।

যাইহোক তখন বর্ষার সাথে আমার মনও যেন নানাভাবে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জুড়ে গিয়েছিল।

স্কুলবেলার আরেকটি স্মৃতিও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তখনও বর্ষার আগমন ঘটেনি,কিন্তু রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্‌যাপনের বেলায় কালবৈশাখী ঝড় ও প্রবল বৃষ্টি যেন অচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল। স্কুলের অন্যতম বার্ষিক অনুষ্ঠান ছিল চারদিন ধরে চলা রবীন্দ্রজয়ন্তী। প্রথমদিন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে শিক্ষক ও এলাকার বিশিষ্টদের আলোচনা, ছাত্রছাত্রীদের গান,আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা। দ্বিতীয় দিন এসবের সাথে যুক্ত হতো রবীন্দ্রনাথের হাস্যকৌতুক অভিনয়। তৃতীয় দিন গান,আবৃত্তি, নাচের সঙ্গে মেয়েদের অভিনীত নাটক ও শেষের দিন অন্যান্য কর্মসূচির সাথে ছেলেদের নাটক। স্কুলের লম্বা ঘরের মাঝের পার্টিশনগুলো খুলে দিয়ে প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হতো। স্কুলের ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা ক্লাস রুমে তৈরি করা ছিল স্থায়ী মঞ্চ। সেখানেই সাইড উইংস ও সামনে ড্রপসিন লাগিয়ে স্টেজ তৈরি হতো। এই অছিলায় বন্ধুদের সঙ্গে রাত জাগা, লুকিয়ে সিগারেট টানার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ও হাসি মশকরায় দুরন্ত প্রহর যাপনের স্মৃতি কখনো বিস্মৃত হবার নয়। স্টেজের সামনে একপাশে টেবিলের ওপর রবীন্দ্রনাথের মালা দেওয়া বড়ো প্রতিকৃতি রেখে দু’পাশে ফুলদানিতে রাখা হতো রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার গুচ্ছ । ভাড়া করা মাইক ও জেনারেটরের আলোয় হতো অনুষ্ঠান। বছরের পর বছর এই আয়োজনে কোনো রকমফের হতো না। সাধারণত উঁচু ক্লাসের কিছু সপ্রতিভ ছাত্রদের উপর থাকত আয়োজনের ভার। আর নাটকে যারা অংশ নিত তাদের বিশেষ অনুমতি থাকত টিফিন পিরিয়ডের পর প্রতিদিন রিহার্সালে অংশ নেবার। কিন্তু ট্র্যাজেডি হচ্ছে এটাই, প্রায় প্রতি বছর ঝড়বৃষ্টিতে কোনো না কোনো দিন অনুষ্ঠান পণ্ড হতোই। এমনও হয়েছে এক-দু’দিনের পর আর অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি।  এখনো স্মরণে আছে একবার মঞ্চে আমাদের বশীকরণ নাটক চলছে। এমন সময় ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। টিনের চালে মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ মাইকের শব্দকেও ছাপিয়ে গেল। অগত্যা আর কী করা! বন্ধ হয়ে গেল নাটক, ভেস্তে গেল অনুষ্ঠান। এভাবে বিপুল পরিশ্রমে দিনের পর দিন প্রস্তুতি নেবার পর অনুষ্ঠান বানচাল হবার যে কী মনোবেদনা তা তখন উপলব্ধি করেছি। তখন বৃষ্টি আমাদের কাছে উদয় হতো খলনায়কের ভূমিকায়।

দুখের বেশে

একেবারে শৈশবেই বর্ষা প্রথম এসেছিল অসীম দুঃখের বেশে। ছেলেবেলায় আমাদের ভাইবোনদের প্রধানতম অবলম্বন, সেই সময়ে আমাদের জীবনজুড়ে যাঁর ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি , প্রিয়তম ‘দাদু’ এক বর্ষাদিনেই চিরতরে চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম প্রিয়জনকে হারানোর ভয়ংকর মর্মবেদনা! আমাদের আদরের তিন বছরের ছোট্ট ভাই ‘ঝুনঝুনু’ও আমাদের হৃদয়কে চুরমার করে জীবন থেকে ছুটি নিয়ে চলে গিয়েছিল চিরতরে, সেটাও ছিল ঘনবর্ষায়। এভাবেই বর্ষার দিনে আরও এক ভাই ‘রূপক’, আমাদের ‘বড়োকাকু’,  ‘পিসিমণি’ সবাইকে হারানোর মর্মান্তিক বেদনা এসে আঘাত দিয়ে গেছে। তাই বর্ষার সেই দিনগুলি হয়ে উঠেছিল দুঃসহ! আর বড়োবেলায় এসে আমার প্রিয়তম বন্ধু, প্রাণের সঙ্গী অমলের আকস্মিকভাবে না ফেরার দেশে চলে যাবার মর্মান্তিক সংবাদও এসেছিল এক বর্ষাদিনেই। তাই এখন বাদল-দিনে মাঝেমাঝে স্মৃতিবেদনার মালা একেলা গাঁথি

আমার যে গান

আমার কাছে বর্ষা আর রবীন্দ্রনাথের গান যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। কবির বর্ষার অনেক গানের বাণীতে যে চিত্রকল্প সৃষ্টি হয়েছে, তা আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিপটে একাকার হয়ে আছে। যেমন বাদলদিনের প্রথম কদম ফুল‘...। ছেলেবেলায় দেখা আমাদের বাড়ির  বিশাল গাছের বৃষ্টি ধোয়া সবুজ পাতার ফাঁকে গুচ্ছ গুচ্ছ শ্বেতশুভ্র কদম ফুলের সমারোহ, চারপাশে ছড়িয়ে দিত মনোরম স্নিগ্ধতার আবেশ। কোন ছোটোবেলায় শোনা পঙ্কজ মল্লিকের কণ্ঠে ‘বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকারে‘... এবং আমার প্রিয়ার ছায়া আকাশে আজ ভাসে‘... বর্ষারই গান। বিশ্বকবির অনন্য সৃষ্টির সাথে গায়কের অনবদ্য উপস্থাপনা, যা আজও যেন প্রাণে বাজে। তেমনি শুনেছিলাম দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া আবার এসেছে আষাঢ় এবং আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার…আমার মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ বুঝি দেবব্রত’র জন্যই বর্ষার এই গান দু’টি রচনা করেছিলেন। আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে মন মোর মেঘের সঙ্গী‘... শুনে সেই ছেলেবেলাতেই মন উড়ে যেত হংসবলাকার পাখায় ভর করে কোন সুদূরে। আবার তাঁর কণ্ঠেই যখন শুনেছি   আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদলসাঁঝে… তখন কেন জানিনা এক অজানা বেদনার আবেশ মনে ছায়া ফেলেছে। এভাবেই রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি প্রবল আসক্তিতে শোনা হয়েছিল চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া যেতে দাও যেতে দাও গেল যারা‘... এবং সাগর সেনের কণ্ঠে ওই মালতিলতা দোলে‘... এই দুই শিল্পীর অনবদ্য কণ্ঠমাধুর্যে বর্ষার গান দু’টির রেশ সেই ছেলেবেলাতেই মনের মধ্যে অন্যান্য গানের সঙ্গে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিল। একদিন হঠাৎ করেই কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া শাঙনগগনে ঘোর ঘনঘটা, নিশীথযামিনী রে‘...কানে বেজেছিল। ভানুসিংহের পদাবলির অন্তর্গত এই গানটিতে শ্রাবণের আকাশে মেঘমন্দ্রিত বিদ্যুৎ চমকিত গাঢ় অন্ধকারাচ্ছন্ন দুর্যোগপূর্ণ রাতের ঘনঘোর বর্ষার ছবি যেমন চিত্রিত হয়েছে,তেমনি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের অনুষঙ্গ এসেছে অপরূপ আঙ্গিকে। কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সুললিত কণ্ঠে, অনুপম গায়কিতে যেভাবে গানের ভাব এবং চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন,তা হৃদয়ের অন্তঃস্থলকে যেন স্পর্শ করেছিল। একই সঙ্গে আমার হৃদয়কে যেন শ্রাবণ ধারায় সিক্ত করেছিল। এভাবে রবীন্দ্রসংগীতের টানেই শোনা হয়েছিল সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া মেঘের পরে মেঘ জমেছে‘... এবংএই শ্রাবণবেলা বাদলঝরা যুথীবনের গন্ধে ভরা‘..., এই গান দু’টিও আমার কিশোর মনকে মুগ্ধ করেছিল। সেই কবে রেডিয়ো অথবা রেকর্ড প্লেয়ারে শোনা এই গানগুলোর স্মৃতি আজও অনুরণিত হয় মনের গভীরে। শৈশব পেরিয়ে এসে একদিন হঠাৎ করেই শুনেছিলাম সনজিদা খাতুনের কণ্ঠে আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে…, আহা! সেই মুগ্ধতার স্মৃতি আজও অমলিন।

ছেলেবেলায় বন্ধুরা মিলে একটি গানের স্কুল গড়ে গান শেখার তোড়জোড় ছিল কিছুদিন। যদিও সেই প্রয়াস অত্যন্ত সফলতার সঙ্গেই ব্যর্থ হয়েছিল। তবুও সেখানে প্রসাদদা (প্রসাদ চক্রবর্তী) কিছুদিন শিখিয়ে ছিলেন আজি বরিষনমুখরিত শ্রাবণরাতি,… সেও বর্ষার গান। সেখানে প্রসাদদার কণ্ঠেই ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’... প্রথমদিন শুনে গানের কথা-সুরের সঙ্গে বর্ষার যে অপূর্ব দৃশ্যপট মনের মধ্যে রেখাপাত করেছিল,তা আজও ভুলতে পারিনি।

এক বাদল-দিনেই ফেলে আসা বর্ষা-দিনের এসব স্মৃতি কেন জানিনা হঠাৎ করেই মনে দোলা দিয়ে গেল, অনেক কিছু হারানোর বেদনায় আর্দ্র হলো মন, তখনই অনুভব করলাম মনের গহনে রবি ঠাকুরের এক বেদনা-সিঞ্চিত বর্ষার গানই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে —

‘‘আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে
 তারি ছায়া পড়েছে শ্রাবণগগনতলে’’…

লেখক:
Sandeep Dey
সন্দীপ দে, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।

  • বানানরীতি লেখকের নিজস্ব – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট