ডাক্তার: বাংলা মুলুকের খলনায়ক! । ডা. নাজমুল হাসান

Comments
এক

দেশের মোট জিডিপি’র ৪% স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ থাকতে হয়, আমাদের পলিসি মেকাররা এখানে বরাদ্দ রেখেছে ১% এরও কম, ০.৯৩%। জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য চারভাগের একভাগ বরাদ্দ আছে, বাকী তিন ভাগই নাই। জনগণ কী করে স্বাস্থ্যসেবা পাবে? আপনি কী করে ভালো থাকবেন? সেবা না পাবার জন্য আপনি কখনও এ বিষয়ে ভেবেছেন? কখনও প্রতিবাদী হয়েছেন? মৃদুস্বরে একটুখানি কথাও কী কখনও কোথাও বলেছেন? নিদেনপক্ষে নিজের মনে মনেও কী একবারও বিষয়টি ভেবেছেন? আপনি কী আসলে এ তথ্যটা জানেন? ডাক্তারের গুষ্টি উদ্ধারে আপনি কিন্তু উচ্চকিত!

মোটাদাগে একটা আলোকপাত করা যাক। স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী বাংলাদেশে ডাক্তার প্রয়োজন ১৬ লাখ। অথচ আমাদের দেশের সরকারী ডাক্তারের পদ আছে ২৪ হাজার, এর মধ্যে পদে লোকবল আছে ১৮ হাজার, বাকী ৬ হাজার পদ শূন্য। যেখানে ১৬ লাখ ডাক্তারের প্রয়োজন সেখানে ১৮ হাজার ডাক্তার কী করে সে প্রয়োজন মেটাবে? সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ডাক্তারের সংখ্যা ৮৬ হাজার। ৮৬ হাজার ডাক্তারই-বা কী করে ১৬ লাখ ডাক্তারের প্রয়োজন মেটাবে? এটা কখনও ভেবেছেন? জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য এতো বেশি ডাক্তারের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও কেন সরকারি ডাক্তারের পোস্ট মাত্র ২৪ হাজার? পাস করা ৮৬ জাহার ডাক্তারের সবাইকে কেন সরকার নিয়োগ দিচ্ছে না? আপনার নিজের স্বাস্থ্যের প্রয়োজনের কথা ভেবে নিজেকে কী এ প্রশ্ন কখনও করেছেন?

গড়ে প্রতি লক্ষ মানুষের জন্য বিশ্বের কয়েকটি দেশের আইসিইউ বেডের চিত্রটা এমন- আমেরিকায় ৩৮, জার্মানিতে ২৯, ইতালিতে ১২, ফ্রান্সে ১১, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১০, ভারতে ২, পাকিস্তানে ১.৫, শ্রীলঙ্কা ২.৩, নেপাল ২.৮, বাংলাদেশ ০.৭। সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে ৫০৮টি আইসিইউ বেড এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৭৩৭টি আইসিইউ বেড, মোট আইসিইউ বেডের সংখ্যা ১,২৪৫ টি। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই বেডগুলির ১টিতে করোনা রোগী রাখলে সেখানে আরেকজনকে রাখা বিপদজনক। করোনার জন্য নির্ধারিত আইসিইউ বেড মাত্র ২৯টি। মারাত্মক অসুস্থ হলে কোথায় বেড পাবেন? কে আপনাকে ভর্তি করার দায় নেবে? বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে যাদের আইসিইউ বেডের প্রয়োজন হতে পারে। কী করব আমরা?

গড়ে প্রতি ২ হাজার মানুষের জন্য ১টা হাসপাতাল বেড। এই সংখ্যা এমনই যে হাসপাতালে বেড পাওয়া এক মহা-ভাগ্যের বিষয়। হাসপাতালের বারান্দায় থাকতে পারাও ভাগ্যের ব্যাপার।

দুই

স্বাভাবিক সময়ে যে সমস্ত দেশের হাসপাতাল এবং স্বর্গের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকে না তেমন কয়েকটি করোনা আক্রান্ত দেশ করোনা আক্রান্তের পরে কী অবস্থায় আছে এবং কী করছে একটু দেখা যাক।

করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য চীন মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হুবেই প্রদেশের উহান শহরের কাছে একটি ফাঁকা ভবনকে ১০০০ বেডের ‘হুয়াঙগ্যাঙ সেন্ট্রাল হাসপাতাল’এ পরিণত করে। উহান শহরে ১০ দিনের মধ্যে ১০০০ বেডের ‘ফায়ার গড মাউন্টেইন’ হাসপাতাল নির্মাণ করে ১ হাজার ৪০০ সেনা চিকিৎসক নিয়োগ দেয়। জিয়াংঝিয়া জেলায় পরদিনই ‘থান্ডার গড মাউন্টেইন’ নামের ১ হাজার ৬শ’ শয্যার আরেকটি হাসপাতাল তৈরির কাজ শুরু করে এবং ১০ দিনে তা শেষ করে। এর পরপরই ১৩শ শয্যার আরও একটি হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা করে এবং সেটিও ১০ দিনে শেষ করে।

নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্ক ও বন্দর এলাকাকে জরুরিকালীন হাসপাতালে পরিণত করেছে প্রশাসন। সেন্ট্রাল পার্কের জরুরিকালীন হাসপাতালে রয়েছে ৬৮ শয্যা। আর বন্দর এলাকার হাসপাতালে তৈরি করা হয়েছে ১০০০ হাজার শয্যা। প্রধান প্রধান বেসরকারি হাসপাতালকে রাষ্ট্রের অধীন নিয়ে আসা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৫ হাজার বেড়ের হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। দেশের সকল গাড়ি তৈরির কোম্পানিগুলিকে সব কাজ বন্ধ রেখে আইসিইউ ভেন্টিলেটর বানানোর নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

করোনা-বিধ্বস্ত ইতালিতে হাসপাতালগুলিকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে এবং নতুন হাসপাতাল তৈরির জন্য অর্থ-তহবিল সংগ্রহে এগিয়ে এসেছেন নামীদামী সুপারস্টারসহ সাধারণ জনগণ। হাসপাতালের করিডোরে, রাস্তায় রোগী পড়ে মরে রয়েছে। দেশের হাসপাতালগুলোকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

স্পেনের সব বেসরকারি হাসপাতালকে রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তারপরেও হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে মেঝেতে, রাস্তায় মানুষ শুয়ে আছে। দুই/তিনদিন ধরে ডাক্তারের দেখা পাচ্ছে না। যত্রতত্র পড়ে আছে মানুষের লাশ।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে। দেশটির জনবহুল শহর গুয়াইকিলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে শুধু হাসপাতালে নয়, রাস্তায় রাস্তায় মানুষ মরে পড়ে আছে।

তিন

করোনা বিস্তার রোধে উন্নত বিশ্বের ডাক্তাররা প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ করেছে। ছোঁয়াচে রোগ এনডেমিক বা পেনডেমিক হলে তার বিস্তার রোধে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ করে সতর্ক থাকার নিয়ম। রোগীর ওয়েটিং স্পেস থেকে এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে সংক্রামক রোগ ছড়ায়। ফ্রন্টলাইন ডিফেন্স হিসেবে তাদের সুস্থ থাকা প্রয়োজন। এ সময়ে জরুরি প্রয়োজনে কিছু টেলিমেডিসিন দেওয়া হয় এবং সমস্ত রুটিন রোগীদের দেখা বন্ধ রাখা হয়। বাংলাদেশের ডাক্তাররা সেই কাজটিই করেছে। উহানে শতকরা ৪১ ভাগ করোনা বিস্তার হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মাধ্যমে।

Triage বলে মেডিকেল সাইন্সে একটা বিষয় আছে, সে অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীদের সিভিয়ারনেস অনুযায়ী চারভাগে ভাগকরে চার রঙের ট্যাগ দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। যার সিভিয়ারনেস কম তাকে দেরী করে চিকিৎসা দেওয়া হয় অথবা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। MCI (Mass Casualty Incidence) এর সময়ে হাসপাতাল ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে যে রোগীর মারা যাবার সম্ভাবনা বেশি থাকে সে রোগীকে দেখা হয় না, যাদের বাঁচার সম্ভাবনা আছে তাদেরকে দেখা হয়। START (Simple Triage and Rapid Treatment) এর ক্ষেত্রেও তাই। এ সময়ে কোনও রুটিন রোগী দেখা হয় না এবং খুব সিভিয়ার রোগী যাদের বাঁচার সম্ভাবনা কম তাদেরকে সময় দেওয়াকে সময় নষ্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ, তাকে সময় দিতে গেলে যে সমস্ত রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা আছে তাদের সময় কম দেওয়া হবে ফলে তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

সংক্রামক মহামারীকে মোকাবেলা করতে গেলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সুস্থ থাকা প্রয়োজন এবং এ কারণে তারা যেন রুটিন ও সাধারণ রোগী দেখতে গিয়ে তাদের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়ে কোনোক্রমেই অসুস্থ না পড়ে সে কারণেও প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ রাখা হয়। আমাদের পলিসি মেকাররা এক্সিকিউটিভ সার্কুলেশনের মাধ্যমে এই ট্রায়াজ পদ্ধতি বা এর কোনও বিকল্প পদ্ধতি প্রচলনের কোনও ঘোষণাও দেয়নি। একটা দেশের সেন্ট্রাল হেলথ সিস্টেম ঠিকমতো নির্দেশনা না দিলে জনগণকে তার ভূক্তভুগি হতেই হবে, সেই সাথে ভূক্তভুগি হবে এই ব্যবস্থার সাথে যুক্ত সকল পেশাজীবী।

স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের বলা হয়, সুপার স্প্রেডার। অজানা অবস্থায় এদের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি এবং দ্রুত ছোঁয়াচে রোগ ছড়ায়। ফলে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সুস্থতার জন্যও প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ রাখা হয়। বেসরকারি হাসপাতালে বা চেম্বারে মানুষ টাকা দিয়ে দেখাতে আসে ফলে সেখানে সবাই স্বাধীনতা ভোগ করে, একারণে সেখানে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সোশ্যাল ডিসটেন্সিং মেইনটেইন করা সম্ভব নয়। এ কারণেই উন্নত বিশ্বে সরকার সমস্ত হাসপাতালকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। আমাদের দেশে নেওয়া হয়নি বলে সতর্কতার জন্য ডাক্তাররা সকলকে সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে যেতে বলছে।

হাসপাতাল তৈরি করা তো দূরের কথা, আমাদের দেশের পলিসি-মেকাররা অনেকটা সময় হাতে পেয়েও দেশের ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সুরক্ষিত করে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পিপিই পর্যন্ত যোগাড় করতে পারিনি। আমাদের জনগণ সে জন্য পলিসি লেভেলকে দোষ না দিয়ে ডাক্তাররা কেন পিপিই ছাড়া রোগী দেখছে না সে বিতর্কে জড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে খালি হাতে যুদ্ধ করতে পারলে এখন কেন ডাক্তাররা পিপিই ছাড়া চিকিৎসা দিতে পারবে না সেরকম অসম উদাহরণকে শিক্ষিত মানুষ পর্যন্ত টেনে এনেছে। একবারও বিবেচনা করে দেখেনি তখন মানুষকে বাঁচানোর জন্য খালিহাতে যুদ্ধে যাবার প্রয়োজন ছিল, আর এখন মানুষকে বাঁচানোর জন্যই পিপিই নিয়ে যুদ্ধে নামতে হবে। পিপিই না পরা শুধু ডাক্তারের জন্যই ঝুঁকি নয়, তার কাছে আসা প্রতিটি মানুষের জন্য ঝুঁকির, পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকির। এটা সাহসের ব্যাপার না, দায়িত্বের ব্যাপার, সচেতনতার ব্যাপার। একজন স্বাস্ব্যকর্মী নিজেকে আনপ্রোটেকটেড রেখে ফুলের মতো শত শত বাচ্চাকে টিকা দেয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধে এলিট টেকনিক্যাল পেশা হিসেবে সবচে বেশি প্রাণ দিয়েছে ডাক্তার।

ডাক্তাররা কেন নিজের টাকায় পিপিই কিনছে না সে অদ্ভুত উদাহরণ আমরা হাজির করেছি। অথচ একবারও ভাবিনি- যে সঙ্কট সরকার মোকাবেলা করতে পারছে না সে সঙ্কট ব্যক্তি পর্যায়ে কী করে মোকাবেলা করা সম্ভব! আজও আমার বড়ভাই খুলনা থেকে ফোন করেছে। আমার ভাতিজা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নি করছে তাদের পর্যাপ্ত পিপিই নাই। কোথাও যোগাড় করতে পারছে না। আমি ওখানকার বড় বড় ডাক্তার নেতাদের সাথে কথা বলেছি, ওখানে পর্যাপ্ত পিপিই নাই।

আমরা কী জানি যে এই দেশে একজন এমবিবিএস ডাক্তারকে মাত্র বারো হাজার টাকা বেতনেও চাকুরী করতে হয়। বিশ হাজার টাকার কম আয় করে এমন ডাক্তারের সংখ্যা কয়েক হাজার। উন্নত বিশ্বের একজন সাধারণ জিপি (জেনারেল প্রাকটিশনার) এক ঘণ্টায় এর চেয়ে বেশি আয় করে। পৃথিবীর কোথাও ডাক্তারদের অবস্থা বাংলাদেশের মতো এতো করুণ নয়। যে ডাক্তারদের দেখে আমরা ডাক্তারদের সম্পর্কে ধারণা করি তাদের সংখ্যা শতকরা দুই ভাগেরও কম। অথচ এই দেশ যারা পরিচালনা করে তাদের মধ্যে যদি বিন্দুমাত্র দেশপ্রেম কাজ করতো তবে মানুষের কথা ভেবে স্বাস্থ্যখাতের মতো প্রয়োজনীয় একটি খাতকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতো। প্রয়োজনের তুলনায় দেশের ডাক্তার সংখ্যা কম বলে পাস করার সাথে সাথে সরকার বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদেরকে সরকারি কাজে নিয়োগ দিতো।

এই করোনার মতো বিপদের মধ্যেও খবরে দেখতে হয় পদ্মা-সেতুর কতো নম্বর স্প্যান বসছে! এটা দেখানো দরকার, কারণ এতে মানুষকে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র থেকে দূরে সরিয়ে রেখে তাদের বাহবা নেওয়া যায়। বোঝানো যায় আমরা কতো উন্নত। অথচ পদ্মা-সেতু আমাদের এভাবে করার মতো অবস্থা নাই। যেখানে আমাদের বিনিয়োগ করা দরকার আমরা সেখানে বিনিয়োগ করছি না। মানুষের জীবনের জন্য আমরা আসলেই কিছু করছি না। যেটুকুতে নিজেদের বাহবা মেলে সেটুকুই করছি। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে জনগণ ও ডাক্তারদের মুখোমুখি লাগিয়ে দিয়ে নিজেরা মহানন্দে সময় কাটাচ্ছি। মাঝে মাঝে সে গোলমালকে উসকে দিচ্ছি যেন মানুষ ওসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেখানে হাসপাতাল বানাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের পরিচালকরা মানুষকে বাঁচানোর জন্য কেন তিন মাস ধরে এই সামান্য পিপিই যোগাড় করতে পারলো না সে প্রশ্ন আমরা তাদের না করে আমরা ডাক্তারদের গুষ্ঠি উদ্ধারে নেমে পড়েছি। সারা বিশ্বের স্লোগান এখন “সেভ ডাক্তার” যে যেভাবে পারছে সেভাবে ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের বাঁচাচ্ছে, তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। আমরা সেটা না করে নিজেদের অতি-বুদ্ধিমান হিসেবে জ্ঞান করে তাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিচ্ছি, তাদের মন-মানসিকতাকে গুড়িয়ে দিচ্ছি। এই আমরা বিপ্লবীরা আর কোথাও কিছু করতে পারি না। আর পারি না বলেই এই দেশের সকল যায়গায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে অজনবান্ধব ও অনাকাঙিক্ষত অবস্থা বিদ্যমান।

এই স্বল্পসংখ্যক ডাক্তার এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে কীভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে তা আমরা জানি না। কী করে টীকাদান কর্মসূচিতে, মাতৃস্বাস্থ্যসেবায় সাউথ সাউথ এওয়ার্ড পেয়েছি তা আমরা জানি না। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী আর কোন কোন স্কেক্টরে কাজের স্বীকুতি হিসেবে বিশ্বমানের পুরস্কার হাতে নিতে পেরেছেন তাও আমরা জানি না।

চার

যে সমস্ত ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদারকারী করোনা ইউনিটে কাজ করছে তারা বাসা থেকে বিচ্ছিন্ন আছে। তাদের মনের দুশ্চিন্তার কথা বাদই দিলাম, তাদের পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন প্রচন্ড মানসিক দুশ্চিন্তায় আছে। তাদের ভাগ্যে কী আছে কেউ জানে না। তারা পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে কাজে গেছে, জানে না জীবিত ফিরতে পারবে কীনা।

আড়াইশো ডাক্তার কোয়ারেন্টাইনে আছে। অনেক হাসপাতালের অধিকাংশ স্টাফ কোয়ারেন্টাইনে, বন্ধ হয়ে গেছে হাসপাতালের সেবা। যেসব ডাক্তার স্বাভাবিক হাসপাতালে কাজ করছে তারা জানে না কখন তারা সংক্রমিত হবে। তারা পরিবার থেকে আলাদা থাকছে, পরিবারের থেকে বিদায় নিয়ে কান্নাভেজা চোখে কাজে যাচ্ছে।

সিলেট মেডিকেল কলেজের করোনা ইউনিটে কাজ করা করোনা আক্রান্ত ডাক্তারের তার নিজের হাসপাতালে আইসিইউ বেড জোটেনি। ঢাকায় আসার জন্য কোনো অ্যামবুলেন্স সহযোগিতা পায়নি, নিজের টাকায় অ্যামবুলেন্স ভাড়া করে ঢাকায় আসতে হয়েছে। ডাক্তারদের মাধ্যমে করোনা ছড়াবে এই ভয়ে অনেক বাড়িওয়ালা এবং প্রতিবেশীরা ডাক্তারদেরকে বাড়ি ছেড়ে দিতে চাপ দিচ্ছে।

করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার জাতীয় কমিটিতে ৪২ জন সদস্য আছেন, প্রথমজন মন্ত্রী, তারপর ২ থেকে ২৫ নম্বর পর্যন্ত সব সচিব, ২৬ নম্বরে আছে ডিজি হেলথ। পলিসি লেভেলে ডাক্তারদের কতটুক কী করার আছে?

এগুলি আমাদের দেখার বিষয় না। এগুলো দেখার মতো বিবেক আমাদের নাই, এগুলো বিবেচনায় আনলে এ সমাজে তা নিজের অবস্থান খাটো করে দেয়, বিপ্লবীত্ব কম বলে সৌর্যবান সাজা যায় না। প্রতিবাদী হিসেবে নিজেকে জাহির করা যায় না কারণ, এ সমাজে প্রতিবাদী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার এই একটাই যায়গা।

পাঁচ

কোনও পেশায় থাকা একজন ব্যক্তি যখন অনাকাঙিক্ষত আচরণ করে তখন সেটি সেই ব্যক্তির নিজস্ব দায় কিন্তু যখন পুরো সিস্টেমটাই অনাকাঙিক্ষত আচরণ করে তখন সেই দায় সেই পেশাজীবীদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ভাবার কোনও অবকাশ থাকে না। দেশের মানুষের সেবা প্রাপ্তির বিষয়কে বিবেচনা করে সেটিকে দেশের দায় হিসেবে দেখতে হয়। আমরা দায় হিসেবে দেখছি না।

ডাক্তারি পেশাকে ক্যাডার নামক এক জঘন্য সিস্টেমের মধ্যে পুরে রেখে সরকারি সিস্টেমে যারা ডাক্তার হিসেবে চাকুরী করছে তাদের গলা টিপে ধরে রেখেছি, শ্বাস নেবার অবকাশ নাই। বেসরকারি পর্যায়ে যারা কাজ করছে তাদের মানুষ হিসেবেই দেখছি না। টাকার বিনিময়ে কাজের লোক যে ব্যবহারটুকু পায় ক্ষেত্রবিশেষে সেই ব্যবহারটুকুও করছি না। এই দেশের একজন ভিক্ষুকের থেকেও অনেক ক্ষেত্রে একজন ডাক্তারের বেতন ও আয় কম, একজন স্বাস্থ্যকর্মীর আয় কম। একজন রিকশাওয়ালার চেয়েও কম। এটা বাস্তবতা। পৃথিবীর কোথাও এমন নাই।

আমাদের দেশের এই ডাক্তারেরাই উন্নত বিশ্বের বহু দেশে সাফল্যের চরম শিখরে উঠে গেছে। সেখানে মেধার মূল্যায়ন হয়, মেধা বিকাশের সুযোগ আছে। এখানে আছে দায় আর দোষারোপ। আসুন বুদ্ধি খরচ করি, যদি সত্যিই বুদ্ধিমান হই তাহলে খুব সহজেই চিনবে পারবো কারা দেশের খলনায়ক।

লেখক:
Nazmul Hassan
ডা. নাজমুল হাসান, লেখক, গল্পকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

*এই লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.