ডিসেম্বরের ৮, কুমিল্লা শহরে ওড়ালাম বাংলাদেশের পতাকা

Comments

। শাহরিয়ার হুদা ।

১৯৭০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বেরিয়ে আমি বিলেতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, কারণ তখন আব্বা-আম্মুরা সবাই বিলেতে স্থায়ী হয়েছেন। তবে নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। থাকতাম পুরোনো ঢাকার ওয়ারীতে আমাদের যৌথ পরিবারের অভিভাবকদের তত্ত্বাবধানে। যদিও ‘ভাল ছাত্র’ হিসাবে তৎকালীন ‘মহসিন হলে’ আমার একটা একক কক্ষ ছিল। ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই সারা দেশে একটা অস্থির পরিস্থিতি চলছিল। গণতান্ত্রিকভাবে বিজয়ী রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার একটি পাঁয়তারা করছিল সামরিক সরকার এবং তার বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে গিয়েছিলাম রেসকোর্সের মাঠে। তখনই উপলব্ধি হয় যে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্বাধীন হয়ে যাওয়াই ভাল।

২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকায় ছিলাম এবং পাকবাহিনীর নৃশংসতা স্বচক্ষে দেখেছিলাম। পরে কার্ফুর মধ্যে কিছুটা এবং কার্ফু শিথিল হলে সারা শহর ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম গণহত্যার নমুনা। তখনই সিদ্ধান্ত নিই যে আর নিজেকে পাকিস্তানি নাগরিক মনে করব না এবং প্রয়োজন হলে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিব। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে প্রচারিত তৎকালীন মেজর জিয়ার ভাষণ শুনি একদিন এবং উৎসাহ পাই জেনে যে সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা, বিশেষ করে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলো, মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছে। আমরা সমমনোভাবাপন্ন বন্ধুরা শলা-পরামর্শ করতে থাকি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া যায় এবং ওদের সঙ্গে যোগ দিতে চাই। কলেজের সহপাঠি দিদার, মিজান, মুনির, মামুন, গালিব ও আমি প্রায়ই একত্রিত হতাম এই উদ্দেশ্যে। এভাবেই দেখতে দেখতে সময় পার হতে থাকে কিন্তু পথ দেখিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার মতো কোন গাইড না পাওয়ায় দেরি হতে থাকে। অবশেষে আমরা ২৩ মে ঢাকা থেকে ত্রিপুরার উদ্দেশে রওনা হই এবং ২৪ মে মতিনগরের মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটিতে পৌঁছাই।

নানা পন্থায় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছুতে পারি গন্তব্যে। মামুন ও গালিব পারিবারিক কারণে আমাদের সাথে আসতে পারেনি। আমরা, বাকি চারজন, বেবিট্যাক্সি নিয়ে (ঢাকা) নিউমার্কেট থেকে কুমিল্লার চান্দিনা বাজার পর্যন্ত যাই। সেখান থেকে পাকবাহিনীর তাড়া খেয়ে রিকসা নিয়ে গ্রামের পথে নেমে পড়ি এবং একটু পরেই মেঠো পথে দৌঁড়িয়ে, হেঁটে চলা শুরু করি। সাররাত হেঁটে সীমান্ত পার হয়ে ত্রিপুরার হাতিবান্ধা নামের গ্রামে পৌঁছাই। পরদিন সকালে যাই ওখানে অবস্থানরত বাংলাদেশের একজন জনপ্রতিনিধির কাছে। তিনি আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেন। ফিরতি পথে (তৎকালীন) ক্যাপ্টেন গাফফার আমাদের রাস্তায় পেয়ে উনার গাড়িতে করে পৌঁছে দেন মতিনগর ক্যাম্পে। সেখানে গিয়ে পাই আমাদের পরিচিত, বিশেষ করে ঢাকার, অনেক বন্ধুবান্ধবকে।

এক সপ্তাহ পরে নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্প স্থানান্তরিত করা হয় মেলাঘরে, যেখানে গড়ে উঠে বৃহত্তম গেরিলা অনুশীলন কেন্দ্র। ২নং সেক্টর অধিনায়ক (তৎকালীন) মেজর খালেদ মোশারফের সার্বিক তত্ত্বাবধানে, (তৎকালীন) ক্যাপ্টেন হায়দার পরিচালনা করতেন এই অনুশীলন কেন্দ্র। এখানে ট্রেনিং নেওয়ার পর জুন মাসের শেষের দিকে আমরা চার বন্ধুসহ সর্বমোট ৬১ জন যোগ দিই ‘ফাস্ট ওয়ার কোর্স-এসএস-১’-এ। অক্টোবরের ৯ তারিখে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে আমরা বিভিন্ন ইউনিটে এবং রণাঙ্গনে নিযুক্ত হই। আমি যোগ দিই কে-ফোর্স-এর ৯ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে, কসবার দেবীপুরে।

আমার ইউনিট, ৯ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠিত হয় অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে, আমি যোগদানের ২-৩ দিন আগে। ২২ অক্টোবর আমাদের একটা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে আমরা কসবা গ্রাম এবং বাজার থেকে পাকবাহিনী হটিয়ে মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলি। এর ক’দিন আগেই কসবা রেলওয়ে স্টেশন মুক্ত করা হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ব্রিগেড কমান্ডার খালেদ মোশাররফ এবং এলাকার এমপি ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলী এসেছিলেন যুদ্ধ পরিদর্শনে। দেবীপুর বিওপি’র পাহাড়ের ওপর থেকে উনারা যুদ্ধ দেখছিলেন। হঠাৎ পাক গোলান্দাজ বাহিনীর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু হয় এবং একটি গোলা উনাদের পরিখায় (ট্রেঞ্চে) এসে পড়ে। দুজনই মারাত্মকভাবে আহত হন। তখন কমান্ডিং অফিসার (তৎকালীন) ক্যাপ্টেন আইনুদ্দীন, এডজুটেন্ট (তৎকালীন) লে. হারুন, আমি এবং আমার সহকর্মী লে. আজিজ (শহিদ) উনাদের ধরাধরি করে পাহাড় থেকে নামিয়ে এনে পেছনে এম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিই। যুদ্ধের সরাসরি অভিজ্ঞতা আমার এটাই প্রথম। এই যুদ্ধের ফলে পুরা কসবা এলাকা, কসবা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রাস্তা পর্যন্ত মুক্ত হয়। পরের দিন থেকে আমি আমার দুই কোম্পানি সৈন্যসহ মুক্ত এলাকায় থাকা শুরু করি। আজিজও তার দুই কোম্পানি নিয়ে মুক্ত অঞ্চলে। ব্যাটালিয়ানের বাকি তিনজন অফিসার (সহঅধিনায়ক, আমার কলেজেরই ষষ্ঠ ব্যাচের ছাত্র আমার পাঁচ ব্যাচ সিনিয়র ক্যাপ্টেন আশরাফসহ) থাকতেন আমাদের সদর দপ্তরে, যা ছিল ভারতের মধ্যে।

নভেম্বরের ২২-২৩ তারিখে আমরা একটা ব্যাটালিয়ন পর্যায়ের আক্রমণ পরিচালনা করি যৌথবাহিনীর সহযোগিতায়। এটা ছিল কসবার উত্তরে অত্যামুড়া-চন্দ্রপুর গ্রামের টিলার উপর অবস্থিত শক্তিশালী ঘাঁটি থেকে পাকবাহিনীকে হটানো এবং এলাকা মুক্ত করা। এরপর থেকেই আমরা নিশ্চিত হই যে বিজয়ের আর বেশি দেরি নেই। ৩ ডিসেম্বর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয় এবং ৮ ডিসেম্বর আমাদের ব্যাটালিয়নের নেতৃত্বে কুমিল্লা শহর মুক্ত হয় এবং ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে পাকবাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৬ তারিখ সকালে আমাদের উপর দায়িত্ব ছিল ময়নামতির একটা পাহাড়ে (বর্তমান কুমিল্লা বাইপাস সড়ক) আক্রমণ চালিয়ে মুক্ত করার। কিন্তু আক্রমণের নির্ধারিত সময়ের আধাঘণ্টা আগে খবর আসে যে আক্রমণ করতে হবে না, পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছে। এরপরই আমরা সেনানিবাস মুক্ত করি। ৮ ডিসেম্বরই আমরা কুমিল্লা শহরে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। সেদিনটা ছিল এক মহা আনন্দের দিন। একটা নতুন কিছু শুরুর আনন্দ। স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার অর্জনের আনন্দ। ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না সেই সময়ের অনুভূতিটা। 

আমার কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা অবশ্যই আমার জীবনে একটা বিশাল প্রভাব রেখেছে। প্রথমত এই ব্যবস্থা আমাকে নীতিপরায়ণ হতে সাহায্য করেছে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে। দ্বিতীয়ত আমাকে স্বাবলম্বী, স্বনির্ভর এবং নিষ্ঠাবান হতে শিখিয়েছে। আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ আমাদের কলেজের শিক্ষকদের কাছে যারা আমাদের চরিত্রগঠনে অবদান রেখেছেন, দেশপ্রেমিক ও মানুষ হতে উৎসাহ দিয়েছেন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমার একটাই অনুরোধ। সৎ থাকবেন, নিষ্ঠার সাথে কাজ করবেন এবং নিজের বিবেক অনুযায়ী চলবেন।

লেখক:
Shahriar Huda
শাহরিয়ার হুদা
মুক্তিযোদ্ধা; অধ্যাপক, পরিসংখ্যান, কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়, কুয়েত

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট