ডি এল রায়: ‘সত্য সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ!’

Comments

১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে কবি, নাট্যকার, গীতিকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, ডিএল রায়, জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কার্তিকেয়চন্দ্র রায় কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের দেওয়ান এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নামকরা গায়ক, লেখক। মা প্রসন্নময়ী অদ্বৈত আচার্যের বংশধর। দাদা-বৌদিরাও সাহিত্যব্রতী। তাঁদের পরিবার বিদ্যাসাগর, রামতনু লাহিড়ী, দীনবন্ধু মিত্রের মতো মানুষের আনাগোনা ছিল প্রায়শই। দীনবন্ধু ‘সুরধনী’ কাব্যে দ্বিজেন্দ্রলালের বাবাকে ‘অমাত্য-প্রধান’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলালের ঠাকুরদা মদনগোপাল রায়ের নাম পাওয়া যায় ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে, যেখানে রায়গুণাকর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার বর্ণনা দিচ্ছেন ‘রায় বকসী মদনগোপাল মহামতি’। এই মদনগোপাল রায় ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সেনাপতি। অর্থাৎ দ্বিজেন্দ্রলালের পরিবার ছিল অভিজাত পরিবার। আর তাঁর পূর্বসূরিরা বৈষ্ণবরস এবং রাজসিক রসে জারিত ছিলেন। হয়তো সেই কারণেই দ্বিজেন্দ্রলালের একই সঙ্গে কীর্তন শুনলে নাচতে-কাঁদতে ইচ্ছে করত এবং তরবারি-ঝঙ্কৃত ঐতিহাসিক নাট্যরচনার দিকেও টেনে নিয়ে যেত।

ডি এল রায় নামে খ্যাত এই কবি, নাট্যকার, গীতিকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় হুগলি কলেজ থেকে বিএ এবং  প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ (১৮৮৪) পাস করেন। পরে কিছুদিন চাকরি করে তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে পরিবারের বাধাকে পরোয়া না করে কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য লন্ডন যান এবং সেখানে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। লন্ডনের সিসিটার কলেজ থেকে তিনি কৃষিবিদ্যায় এফ.আর.এ.এস ডিগ্রি এবং রয়েল এগ্রিকালচারাল কলেজ ও এগ্রিকালচারাল সোসাইটির এম.আর.এ.সি ও এম.আর.এস.এ উপাধি লাভ করেন। লন্ডন থেকে ফিরে তিনি মধ্যপ্রদেশে জরিপ ও রাজস্ব নিরূপণ ট্রেনিং নেন এবং সরকারি ডেপুটির চাকরি পান; পরে তিনি দিনাজপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বাধীনচেতা মানসিকতা কর্মক্ষেত্রে তাঁকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। তবুও ১৮৯০ সালে বর্ধমান এস্টেটের সুজামুটা পরগনায় সেটেলমেন্ট অফিসারের দায়িত্ব পালনকালে প্রজাদের স্বার্থে ছোটলাটের বিরোধিতা করতেও কুণ্ঠিত হননি তিনি। বিলেত যাবার কারণে সামাজিক ভাবেও তাঁকে অনেক বিড়ম্বনা সইতে হয়।

দ্বিজেন্দ্রলালের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে হাতেখড়ি নেন সুকণ্ঠ গায়ক পিতার কাছে। নিজের সম্পর্কে সে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলছেন, ‘আমার পিতা একজন সুবিখ্যাত গায়ক ছিলেন। প্রতুষ্যে উঠিয়া তিনি যখন ভৈরবী, আশোয়ারি ইত্যাদির সুর ভাঁজতেন, আমি অন্তরালে থাকিয়া শুনিতাম।’ ছ’-সাত বছর বয়সে নিজের চেষ্টায় হারমোনিয়াম শিখে যাওয়া এবং ‘১২ বৎসর বয়ঃক্রম হইতে আমি গান রচনা করিতাম’। সুধীর চক্রবর্তীর গবেষণায় এটিও পাওয়া যায় যে, দাদার ফরমায়েশে ন’বছর বয়সেই তাঁর মৌলিক গান রচনায় হাতেখড়ি। এই গানগুলি তাঁর ‘আর্য্যগাথা’র প্রথম ভাগে প্রকাশিত হয়েছিল পরে।

বিলেতে থাকাকালে তিনি পাশ্চাত্য  সঙ্গীত শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গীতপ্রতিভাকে শাণিত করেন। উনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের প্রথমদিকে বাংলা গানের আধুনিকীকরণে যে পঞ্চ গীতিকবি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন, দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁদের অন্যতম। রবীন্দ্রযুগে বাংলা কাব্যসঙ্গীতে বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ ও  আধুনিক গান রচনায় তিনি ছিলেন একজন সার্থক রূপকার। নাটক রচনা ও পরিচালনায় তাঁর অসামান্য অবদান থাকলেও তিনি সঙ্গীতকার হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি প্রায় পাঁচশত গান রচনা করেন। প্রথমদিকে তাঁর গান ‘দ্বিজুবাবুর গান’ নামে পরিচিতি ছিল; পরবর্তীকালে তা ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’ নামে পরিচিত হয়।

দ্বিজেন্দ্রলালের বিলেত যাওয়ার আগে মাত্র সতেরো বছর বয়সের মধ্যে লেখা একশো আটটি গান নিয়ে তাঁর প্রথম গীতসংকলন আর্য্যগাথা (প্রথম ভাগ) ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ সালে  বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে যে গণজাগরণমূলক গান রচনার প্রচলন শুরু হয়, তাতে দ্বিজেন্দ্রলালের অবদান ছিল অসামান্য। এ সময় তিনি অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন যা দেশবাসীকে প্রচন্ডভাবে উদ্দীপিত করে। পরবর্তীকালে দেশাত্মবোধক গান রচনাতেই তাঁর সঙ্গীতপ্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। দ্বিজেন্দ্রলাল রচিত জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলির মধ্যে ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’, ‘ধনধান্যপুষ্পভরা’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রথম প্রথম বিলিতি সঙ্গীত তাঁকে স্পর্শ না করলেও পরে তা চর্চা করতে শুরু করলেন। পাশাপাশি তাঁর আগ্রহ তৈরি হল স্কট-আইরিশ গানেও। সে সব গান অনুবাদ করলেন মাতৃভাষায়। এক অদ্ভুত মিশ্রধারা সৃষ্টি হল, যা রবীন্দ্রনাথেও ঘটেছিল। দু’জনেই সংস্কৃতজ্ঞ, দু’জনেই ভারতীয় সঙ্গীতের মায়ায় আবদ্ধ। দু’জনেরই টান মায়ের ভাষায়। আর দু’জনেই বিদেশী গানের প্রতি অনুরক্ত হয়ে হয় অনুবাদ, নয়তো প্রভাবিত গান রচনায় মেতে উঠলেন। ফলে যে নতুন ধারার আগমন ঘটল, সেটাই পরবর্তী বাংলা কাব্যগীতির কাঠামোকে বদলে দিল।

১৮৮৬-৮৭ সাল দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ নানা কারণে। ১৮৮৬তে চাকরিজীবনে প্রবেশ আর পরের বছর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের মেয়ে সুরবালা দেবীকে বিয়ে করা। সে বিয়েতে যদিও কুলীনেরা যোগ দেননি দ্বিজেন্দ্রলালের সেই বিলেত গমনের কারণে। কিন্তু সুরবালার সাথে দাম্পত্য দ্বিজেন্দ্রলালের কবি এবং সাঙ্গীতিক জীবনে নতুন দরজা খুলে দিল। পত্নীপ্রেম তাঁকে গানের প্রেমিক করে তুলেছে সর্বার্থে। এরই মধ্যে তাঁর সখ্য তৈরি হয় আত্মীয় সুরেন্দ্রনাথ মজুমদারের সঙ্গে। ডাকসাইটে গায়ক সুরেন্দ্রনাথ খেয়ালে লাগাতেন টপ্পার দানা। সেই টপখেয়াল মনে ধরল দ্বিজেন্দ্রলালের। তবে এ সবই রসায়নাগারের উপকরণ মাত্র। যেমন হয় রসায়নাগারে, তেমনই হল। উপকরণ মিলেমিশে তৈরি করল নতুন বস্তু, যা সে সময়ে ‘দ্বিজুবাবু’র গান, পরবর্তী সময়ের ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’।

সরকারি চাকরি তাঁকে বহু বদলির সম্মুখীন করেছে। গোটা বাংলা চষে বেড়িয়েছেন। নতুন নতুন জায়গার প্রকৃতি এসে ধরা দিয়েছে তাঁর গানে। অন্য দিকে, সামাজিক প্রতিরোধ তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে প্রহসনে, হাসির গানে। ষোলো বছরের দাম্পত্যে খুব বেশি গান যে লিখলেন প্রেমের, তা নয়। কিন্তু যা রচনা করলেন, তাতে গানের বিধাতা যেন নিজের হাতে স্বাক্ষর রেখে গেলেন। বাইশ-তেইশ বছরের সেটলমেন্ট কর্তা কাজে বেরোন আর তাঁর স্ত্রী বাড়িতে অপেক্ষায় মালা গেঁথে রাখেন প্রিয়তমের জন্য। আসামাত্র পরিয়ে দেন তাঁর গলায়। এমনই একদিন। দ্বিজেন্দ্রলাল লিখলেন— ‘আমি সারা সকালটি বসে বসে/ এই সাধের মালাটি গেঁথেছি/ আমি পরাব বলিয়ে তোমারই গলায়/ মালাটি আমার গেঁথেছি’। কিন্তু মালা তো গাঁথলেন সুরবালা। আর কম্পোজ়ার বৈষ্ণব রসেরই উদ্রেকে সম্ভবত সেখানে ‘আমি’ শব্দটি বসিয়ে দিচ্ছেন অবলীলায়! একই সঙ্গে এ গানের শেষের দিকে রয়েছে— ‘বঁধু, মালাটি আমার গাঁথা নহে শুধু/ বকুল কুসুম কুড়ায়ে/ আছে প্রভাতের প্রীতি, সমীরণ-গীতি/ কুসুমে কুসুমে জড়ায়ে’। এই গান প্রকৃতিকে প্রকৃতিতে মিলিয়ে দেয় যেন। নারীত্ব এখানে ফুল্লকুসুমিত দ্রুমদলশোভিত!

ছাত্রজীবনে তাঁর আর্য্যগাথা (১ম ভাগ, ১৮৮২) এবং বিলেতে থাকাকালে Lyrics of Ind (১৮৮৬) কাব্য প্রকাশিত হয়। তিনি প্রহসন, কাব্যনাট্য, ব্যঙ্গ ও হাস্যরসাত্মক কবিতা লিখেছেন। জীবনের শেষ দশ বছর তিনি প্রধানত নাটক রচনা করেন। পৌরাণিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক সব ধরনের নাটক রচনায়ই তিনি অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন।

দ্বিজেন্দ্রলালের উলে­খযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো কাব্য আর্য্যগাথা (২য় ভাগ, ১৮৯৩), মন্দ্র (১৯০২), আলেখ্য (১৯০৭), ত্রিবেণী (১৯১২); নকশা-প্রহসন একঘরে (১৮৮৯), সমাজ-বিভ্রাট ও কল্কি অবতার (১৮৯৫), ত্র্যহস্পর্শ (১৯০০), প্রায়শ্চিত্ত (১৯০২), পুনর্জন্ম (১৯১১); পৌরাণিক নাটক পাষাণী (১৯০০), সীতা (১৯০৮), ভীষ্ম (১৯১৪); সামাজিক নাটক পরপারে (১৯১২), বঙ্গনারী (১৯১৬); ঐতিহাসিক নাটক তারাবাই (১৯০৩), রানা প্রতাপসিংহ (১৯০৫), মেবার-পতন (১৯০৮), নূরজাহান (১৯০৮), সাজাহান (১৯০৯), চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১) প্রভৃতি।

দ্বিজেন্দ্রলালের অনুপস্থিতিতে সন্তানসম্ভবা সুরবালা রক্তক্ষরণে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। একাধিক সন্তানের মধ্যে বেঁচেছিলেন দুই ছেলেমেয়ে দিলীপকুমার আর মায়া। তাঁদের জড়িয়ে বাঁচতে চাইলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। ১৯০৩ সালে দাম্পত্য নিভে যাওয়ায় অন্য মানুষ হয়ে উঠলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। একই সঙ্গে চলছে কর্মক্ষেত্রে বিরুদ্ধতা। পানাসক্ত হয়ে পড়লেন দ্বিজুবাবু। আড্ডায় ভাসিয়ে দিলেন নিজেকে।

দ্বিজেন্দ্রলাল ১৯০৫ সালে কলকাতায় ‘পূর্ণিমা মিলন’ নামে একটি সাহিত্যিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এটি তখনকার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিসেবী বাঙালীদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়। এ সময় তিনি ‘ইভনিং ক্লাব’ নামে অপর একটি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি প্রথম অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন।

প্রেমের গানের বদলে নাটক তাঁর হাত ধরল শক্ত করে। এরই মধ্যে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন। একদিকে রবীন্দ্রনাথ পথে নামছেন, স্বদেশি গান বাঁধছেন। অন্যদিকে, দ্বিজেন্দ্রলালের স্বদেশি নাটকে জাগ্রত দেশাত্মবোধ। ১৯০৫ সালে যার শুরু ‘প্রতাপ’ দিয়ে। তাঁর নাটকে একের পর এক সংযোজিত হতে থাকল স্বদেশি গান। তিনিই একটি নাটকে লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত সংলাপ, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের নাম বাঙালি ভুলে গেলেও মনে রেখেছে প্রবচনে পরিণত হয়ে যাওয়া সংলাপটিকে, রচয়িতার নাম না মনে রেখেই— ‘সত্য সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ!’

‘মেবার পাহাড়’ শুনে জগদীশচন্দ্র বসু অনুরোধ করলেন বাঙালীর আবেগ নিয়ে গান লিখতে। দ্বিজেন্দ্রলাল কিছু দিনের মধ্যেই সৃষ্টি করলেন ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’। তাঁর জীবনীকার দেবকুমারের ভাষায়, ‘তীব্র হতাশার জীবনেও তিনি… হাততালি দিতে-দিতে, সারাটা ঘরময় ঘুরিয়া ঘুরিয়া, নাচিয়া-নাচিয়া… গাহিতে লাগিলেন— কীসের দুঃখ কীসের দৈন্য কীসের লজ্জা কীসের ক্লেশ’।দ্বিজেন্দ্রলাল লিখছেন, ‘ও গানটা গাইতে গেলে আমার কেন জানি না, ভয়ানক মাথা গরম হয়ে উঠে।’  গান গাইতে গিয়ে উচ্চ রক্তচাপে বহু বার অসুস্থও হয়েছেন তিনি।

ভারতীয় রাগসঙ্গীতের কাঠামোয় পাশ্চাত্য সঙ্গীতের চালের সমন্বয়ে দ্বিজেন্দ্রলালের উদার ও ওজস্বী সুরে দেশাত্মবোধক গান রচনা বাংলা গানে এক অভিনব ধারার সূচনা করে। তাঁর গানে রয়েছে সুরের সাবলীলতা। একটি নির্দিষ্ট রাগকে অবলম্বন করেও রাগের সরাসরি প্রভাবকে ছাপিয়ে কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয়ে সঙ্গীতে ভাব ফুটিয়ে তোলা রবীন্দ্রনাথের পরে একমাত্র দ্বিজেন্দ্রলালেই সম্ভব হয়েছে। তাঁর ‘ধনধান্যপুষ্পভরা’ গানটিতে ‘কেদার’ রাগের কাঠামোয় অন্তর উজার করা দেশাত্মবোধের শব্দাবলী সাজানো হয়েছে। এখানে ‘সে যে আমার জন্মভূমি’ অংশটিতে ইংরেজি গানের ঢঙে তিন রকম সুরের উত্থান-পতনের গতিতে সুর রচনা দ্বিজেন্দ্রলালের এক অসামান্য সৃষ্টি।

তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন তাঁর হাসির গানে। তাঁর শেষজীবনে গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁর গাওয়া গান রেকর্ড করেছিল। প্রবাসী বাঙালী সম্মেলনে দিলীপকুমার গানটি গেয়ে প্রশংসা কুড়োলেন। আর রবীন্দ্রনাথ বললেন— ‘দিলীপ, গাইলে বটে, হাততালিও পেলে। কিন্তু তোমার পিতৃদেবের মতো হল না। তিনি যখন এ-গানটি গাইতেন, লোকে হেসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত।’ তাই বোধ হয়, সাড়াজাগানো তাঁর হাসির গানের সঙ্গে বাঙালীর সখ্য স্রষ্টার প্রয়াণের কিছু দিনের মধ্যেই ছিন্ন হয়ে গেল।

কেউ খেয়াল করননি, কবি নিজে তো ননই। পুত্র দিলীপের স্মৃতিতে যেটুকু ছিল, পরে সেটুকুই ভরসা হয়ে উঠেছে। তাঁর সঙ্কলিত গ্রন্থটি তাই বাঙালীর পরম এক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা দ্বিজেন্দ্রলালের সুর সমসময়ে সংরক্ষিত হয়নি, স্বরলিপি তৈরির প্রয়োজন বোধ করেননি স্রষ্টাও। তাঁর পুত্র নিজেও কিংবদন্তি সঙ্গীতপ্রতিভা। তিনি যখন বাবার গান গেয়েছেন, অল্পবিস্তর নিজের ভাবনারও অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেখানে। তাই দ্বিজেন্দ্রগীতির শুদ্ধ কাঠামো পাওয়া কঠিনই।

অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের সঙ্গে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর স্বপ্নের পত্রিকাটিকে চোখে দেখে যেতে পারেননি। প্রথম ফর্মার প্রুফ দেখতে দেখতেই প্রয়াত হন। মতান্তরে, ক্ষীরোদপ্রসাদের নাটক দেখতে যাওয়ার আগে নিজের ‘সিংহল বিজয়’-এর পাণ্ডুলিপি দেখার সময়ে অচৈতন্য হয়ে যান। চার ঘণ্টা পরে প্রয়াণ।

‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার আখ্যাপত্রে ছাপা হয়েছিল ‘দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রতিষ্ঠিত’। প্রথম সংখ্যার ‘সূচনা’ আগেই লিখে গিয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। লিখেছিলেন— ‘আমাদের শাসন-কর্ত্তারা যদি বঙ্গসাহিত্যের আদর জানিতেন, তাহা হইলে বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র ও মাইকেল পিয়ারেজ পাইতেন ও রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধিতে ভূষিত হইতেন’।

লক্ষণীয়, রবীন্দ্রনাথ নাইটহুড পান ১৯১৫ সালে, দ্বিজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পরে। আর রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছিলেন ১৯১৩ সালের নভেম্বরে। তারই কয়েক মাস আগে, ১৯১৩ সালের ১৭ মে প্রয়াত হন দ্বিজেন্দ্রলাল। ‘ভারতবর্ষ’ প্রকাশিত হয় একই বছরের জুন মাসে।

দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনী লেখেন তাঁর বন্ধু দেবকুমার রায়চৌধুরী। সে গ্রন্থের ভূমিকা লিখতে অনুরোধ করেন রবীন্দ্রনাথকে। বিস্তৃত সেই ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ যা লেখেন, তার সারকথা— ‘দ্বিজেন্দ্রলালের সম্বন্ধে আমার যে পরিচয় স্মরণ করিয়া রাখিবার যোগ্য তাহা এই যে আমি অন্তরের সহিত তাঁহার প্রতিভাকে শ্রদ্ধা করিয়াছি এবং আমার লেখায় বা আচরণে কখনও তাঁহার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করি নাই… আর যাহা-কিছু অঘটন ঘটিয়াছে তাহা মায়া মাত্র।’

তথ্য সৌজন্য: আনন্দবাজার পত্রিকা

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.