ডুব দি বাজনদীতে

Comments

পর্ব – এক 

দুই মেয়ে কোলে নিয়ে পুকুরে বজ্রপাত দেখলেন করুণা৷ ছোটো মেয়ে মিতু মাকে জড়িয়ে ধরলে৷ আঁচল দিয়ে মিতুকে বেশ করে ঢেকে নিলেন করুণা৷ শিশুচোখে ভয়ঙ্করকে দেখতে নেই– সেই ছোটোকালে মা বলতেন একথা৷ বলে চলেও গিয়েছেন কবে! আজো করুণার মনে হয়– মা যেন ছোট্ট করুণাকে একা বসিয়ে দিয়ে গেছেন পুকুরপাড়ে৷ পুকুর করুণার খুব প্রিয়৷ মামা আনন্দকৃষ্ণ যখন এ সম্বন্ধ আনেন, করুণা নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন! নাহ! বরের আর কিছু না থাক একটা বড়ো পুকুর আছে৷ বিয়ের দিন সকালেও আনন্দকৃষ্ণকে প্রশ্ন করে জ্বালিয়ে মেরেছেন করুণা! 

– ও মামা! বরের সঙ্গে আমি যে ঘরে শোব সে ঘরের জানলা দিয়ে সমস্ত পুকুরটা আর তার গোটা কালো জল আমি দেখতে পাব তো? বল না মামা– 

– ও মা! বোনের সঙ্গে তুমিও ভয় পেলে নাকি! জলে বাজ পড়ার আলো তো তখনই শেষ হয়ে গেল! জল কি আগুন বাঁচাতে পারে! দাও আমায় দুধ দিয়ে ভাত মেখে দাও৷ ওপরে এট্টু সর দিয়ো আর একটু চিনি৷ ব্যাস আমার পেট ভরে যাবে! কই দাও– 

একটানা ঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছিল সীতু৷ করুণার বড়ো মেয়েটি কেবল খাওয়ার লোভে বেহদ্দ সাহসী হয়ে জন্মেছে৷ এত জোরে কান ফাটানো আওয়াজ হলো৷ কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও কালো জল রুপোলি হলো! তবু দেখো এ মেয়ের খাওয়া ভোলা নেই৷ বিরক্ত মুখে একটা বাটিতে সীতুর দুধ ভাত মেখে দিলেন৷ ভাতের তুলনায় দুধ কম৷ ভাত শুকনো হয়ে যাচ্ছিল হাওয়ায়৷ একটুকরো ভেলি গুড় মিশিয়ে দ্রুত হাতে দুধ ভাত সীতুর মুখে ঠুসলেন করুণা৷ করুণা বড় কিপটে৷ নিজের পেটের মেয়েকেও অনেক দুধ মাখিয়ে ভাত দিতে তাঁর আপত্তি!

– একটা থালায় তো ভাতটা দিতে পারতে মা৷ ছড়িয়ে ছিটিয়ে খেতে পারতাম৷ সীতু ফের ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছে৷ উত্তর না দিয়ে করুণা ছোটোকে নিয়ে উঠে গেলেন৷ ঘুম পাড়িয়ে কুপির আলোয় নতুন শাড়ি মেলে ধরলেন৷ মামা আনন্দকৃষ্ণ বিকেলে এসেছিলেন৷ দুর্গা পুজোয় ভাগনিকে নতুন শাড়ি দিয়ে রাতের ট্রেনেই কলকাতা ফিরেছেন৷ আনন্দকৃষ্ণ রেলের বড়ো চাকুরে৷ বিলাসপুরে তাঁর বদলির অর্ডার এসেছে ৷ পুকুরহীন দেশে চলে যাবেন আনন্দকৃষ্ণ৷ ঘুমন্ত মিতুর কপালে দুফোঁটা জল পড়ল৷ কুপির তেল ফুরোচ্ছে৷ চোখ মুছে গলা যতদূর সম্ভব পরিষ্কার করে করুণা চিৎকার করলেন– আর চাটিস নে৷ ঘরে চলে আয়৷ মনে হচ্ছে সারারাত বাদলা পড়বে!

পর্ব – দুই 

বাবা মারা যাওয়ার পর পরই করুণার মা নিভা যে কোথায় চলে গিয়েছিলেন, কেউ জানে না৷ খবর পেয়ে আনন্দকৃষ্ণ যখন করুণাকে বুকে তুলেছিলেন নিভার নতুন বন্ধুর নামটাও যত্ন করে করুণার কাছ থেকে গোপন করেছিলেন৷ খুব তাড়াতাড়িই করুণাকে নিয়ে চলে এসেছিলেন কলকাতায়৷ আনন্দকৃষ্ণ বিয়ে করলেন না৷ বাবা মা আর নিজের গল্পটা করুণার কাছে অস্পষ্ট হয়ে রইল৷ জয়পুরিয়া কলেজে করুণা যখন পাসকোর্সে বিএ পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে তখন করুণার মাথায় দুটো প্রশ্ন৷ বাবা মরার পর ন্যূনতম সময় না নিয়ে মা পালাল কেন! তবে কি বাবা থাকাকালীনই নিভার ভুবনমোহিনী রূপের দ্বিতীয় সমঝদার জুটেছিল৷ মুখে যখনই প্রশ্ন করেছেন মামাকে, আনন্দকৃষ্ণ থাবা মেরে ভাগনির মুখ বন্ধ করেছেন৷ রবিবারের সকালে বড়ো আলুর টুকরো দিয়ে পাঁঠার ঝোল রেঁধেছেন কিংবা বড়বাজারের ঘনশ্যামের দোকান থেকে তসর কিনে অর্ডার দিয়ে ভাগনির জন্য কাঁথা-স্টিচের কাজ করিয়েছেন৷ মামার এসব আনতাবড়ি টাকা খরচে ভীষণ কষ্ট পেত করুণা৷ খালি মনে হতো, নিভা চলে যাবার মাশুল কেন আনন্দকৃষ্ণ দেবেন! মামার টাকা বাঁচাতে রান্নার লোক ছাড়িয়ে দিলেন করুণা৷ নিজের হাতে বড়ির ঝাল আর ভাত রেঁধে কলেজে যেতেন করুণা৷ টাই প্যান্ট পরে খেতে বসে আনন্দকৃষ্ণ পুরো মুখ কুঁচকে ফেলতেন৷ এত টাকা দেন করুণাকে তবু মেয়েটা হতভাগীই রয়ে গেল! না সে নিজে ভালো মন্দ খায়, না তাঁকে দেয়৷ বাস্তবিকই মামার টাকা বাঁচাতে বাঁচাতে করুণা যে কখন মামার মাছ বন্ধ করে দিয়েছিল তা সে নিজেই জানে না৷

আনন্দকৃষ্ণ যথাসময়ে করুণার বিয়ে দেন৷ পাড়াগাঁয়ে বিয়ে হলেও সে পাড়া গাঁ এখন মফঃস্বল৷ পাত্র দুলালের অনেক জমিজমা৷ সুন্দরী করুণাকে সে মন দিয়ে ভালোবাসে৷ করুণা যেদিন দুলালের সঙ্গে শ্বশুড়বাড় গেল, রাতে আনন্দকৃষ্ণ কী মনে হতে দেরাজ খুললেন৷ দেখলেন, বিয়ের বাজার করার জন্য করুণাকে তিনি যত টাকা দিয়েছিলেন তার আর্ধেকের বেশি টাকা করুণা রেখে গেছে৷ 

বৌভাতের রাতে করুণা দুলালকে ভালোবাসলেন৷ হাত দুখানি বারবার দুলালের গায়ে বোলালেন৷ বৌয়ের আদর পেয়ে দুলালের চোখ ডাগর হলো৷ অসুবিধে একটাই৷ মুনিশদের পেট ভরত না৷ করুণার কাণ্ড দেখে  দুলাল হেসে ফেলতেন৷

– বলি ও করুণা৷ আমার সাতজন্মের মহাশয়া৷ গরীব মুনিশকে তোমার বুকের একটু দয়া দাও৷ ওর পেট ঠাণ্ডা না হলে বরের ক্ষেতে ফসল আসে কী করে! সত্যি বাবা!  অমন মামার এই ভাগনি৷

মুনিশের পাতে এক হাতা ভাত দিয়ে করুণাও হাসতেন– 

ইস! ওনার দয়া দেখে মরে যাই! সংসারে মেয়েরা গুছিয়ে না রাখলে অলক্ষ্মী বাসা বাঁধে৷ মামার সংসারে এমন গুছিয়ে রাখতাম বলে মামা আমাকে মেয়ে বানিয়ে নিয়েছিলেন৷

সেই আনন্দকৃষ্ণ আজ রাতটা করুণার কাছে থাকলেন না৷ বিলাসপুর তাঁর শেষ বদলী৷ বিলাসপুর যাবার বড়ো তাড়া আনন্দকৃষ্ণের! কিংবা হয়ত নতুন স্থানের কোয়ার্টার দেখার আনন্দে করুণার কাছে আর না থাকার তাগিদ৷

করুণা ধীরে ধীরে উঠে বসল৷ দুই মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ বারান্দা থেকে নেমে ঘাসে পা দিল করুণা৷ ঘাস সব ভিজে৷ দুচারটে পোকা পায়ে লাগল৷ করুণা গ্রাহ্য করলেন না৷ এক একটা করে সিঁড়ি টপকে ঘাটে বসলেন৷ এবার জলে নামবেন৷ এ পুকুরে জল কোমর অব্দি৷ গাঁয়ের লোক বলে পত্নীপ্রেমী দুলাল সুন্দরী বৌয়ের খেলার জন্য এমন মাঝারি জলের পুকুর বানিয়ে রেখেছেন৷ জলে  দাঁড়িয়েই জলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে দিয়ে এখন খেলতে লাগলেন করুণা৷ মাথা ভিজিয়ে খানিক চানও করে  নিলেন৷ মনে করতে লাগলেন– আনন্দকৃষ্ণ যখন মা-হারা করুণাকে নিয়ে চোরের মতো পালাচ্ছিলেন পাশের বাড়ির কমলা মাসি হেসে কী একটা বলছিল! কী একটা!

ভোররাতে দুলাল কাজ সেরে ফিরবেন৷ ততক্ষণ দুলালের বউকে জেগে থাকতেই হবে ৷ সরল সিধে দুলালকে আজ করুণার পিতৃপরিচয় জানানোর দিন!

তারপর দিনের আলোয় দেখা প্রথম মুনিশের বৌ কি মেয়েকে আনন্দকৃষ্ণের দেওয়া শেষ শাড়ি দিয়ে দেবেন  করুণা৷ সত্য জানার পর মানুষের মনে দরাজ ভাব জাগে৷ 

তাছাড়া অত গুছিয়ে গুছিয়ে সব রাখতেও নেই ৷

আনন্দকৃষ্ণ বলতেন৷

লেখক:
Mayuri Mitra
ময়ূরী মিত্র
শিশুশিক্ষক, সাহিত্যিক, নাট্যশিল্পী ও সংগঠক; কলকাতা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট