। এস এম মাসুম বিল্লাহ ।
মি. জাস্টিস রেফাত আহমেদ অবসর নিলেন। কিন্তু জানা গেলো না, তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলায় কোন সংবিধান আইনবিজ্ঞান প্রয়োগ করে গেলেন। তবে কি সেই অবসরের পরেই রায় লেখা? ধীরে সুস্থে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে যুক্তি সাজানো? কৌতূহলী মন জানতে চায়।
আমাদের দেশে আইনি বিশ্লেষণধর্মী লেখা নিঠুর কঠিন। এর কতগুলো কারণ আছে। যেমন:
এক. এখানকার উচ্চ-আদালত উপস্থিত রায় লেখেন না; যে সংক্ষেপ আদেশ দেন, তাতে ঠিকমতো রায়ের স্পন্দন (ratio) বোধগম্য ভাষায় লেখা থাকে না, থাকলেও, আমাদের গণমাধ্যম তার ভেদ-বিচার যথাযথ দক্ষতা ও সূক্ষতার সাথে মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারে না। এতে করে, আমাদের আইনি সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক প্রবাহ গ্রাস করে ফেলে।
দুই. আইনজীবীরা সাবমিশন শেষে সাংবাদিকদের যে ‘ব্রিফ’ দেন, তাতে বেশিরভাগ সময় দুর্বল যুক্তি, অনেক সময় হাস্যকর এবং দুর্বোধ্য কথার মারপ্যাঁচ থাকে। আর অনেক সময়, গণমাধ্যমের সম্পাদনা টেবিলে বা দৃষ্টিভঙ্গির লেন্সে ব্যবচ্ছেদ হয়ে তা ভুল বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দেয়।
যাহোক, তত্ত্বাবধায়ক সিস্টেমের কথায় ফিরে আসি। আপিল বিভাগের রায়ের প্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থার আইনি পরিণতি প্রকৃতপক্ষে কি দাঁড়ালো? এই লেখায় সেটিই খুঁটিয়ে দেখতে প্রয়াস পাবো। সাথে জানতে চাইবো, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আসলে এখনো আটক আছেন কেন?
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা (১৩-তম সংশোধনী) দুইভাবে বাতিল হয়:
এক. আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে। ওই মামলার প্রধান রায় লেখেন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। সমর্থনমূলক রায় দেন আরো তিনজন বিচারপতি। ভিন্নমত দেন তিনজন বিচারপতি। চার-তিন ভোটে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধান থেকে সরে যায়। মামলাটির কেতাবি নাম আব্দুল মান্নান খান বনাম বাংলাদেশ, যা ডিএলআর-এর ৬২ বালামে তোলা আছে।
দুই. সংসদের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মান্নান খান মামলার রায় আরেক দফা সুরক্ষা পায়, এবং ত্রয়োদশ সংশোধনী সংসদের মাধ্যমে বাতিল করা হয় (এরকম ক্ষেত্রে, সংসদের মাধ্যমে নতুন করে আর বাতিলের দরকার পড়ে না, তবে নিজের মতো করে বাতিল করার ক্ষমতা সংসদের আছে)।
এই দু’টি বিষয়ই আমাদের পলিটিকো-লিগ্যাল ডিসকোর্সের আলাপে নিবিড়ভাবে আনা দরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে (২০১১) তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের এই দুই তরিকা-ই এখন বাতিল হয়ে গেছে বা হবার পথে। ফলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বেঁচে উঠেছে বা সংবিধানে পুনরায় ফিরে এসেছে বলে তত্ত্বগতভাবে ভাবনার সুযোগ আছে। ব্যাপারটা নিচে আরও খোলাসা করছি।
এক.
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আপিল বিভাগ মান্নান খান মামলার রায়টি রিভিউ করে বাতিল করে দিয়েছেন। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বেঁচে উঠলো কি মরেই থাকলো সে আলাপ আইনিভাবে কৌতূহলোদ্দীপক। আপিল বিভাগ সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেছেন যে, ব্যবস্থাটি বেঁচে উঠলেও, এর কার্যকারিতা ভবিষ্যৎ থেকে শুরু হবে। আদালত ‘রেস্টোরেশন (চালু)’ এবং ‘অপারেশন (কার্যকরণ)’ এর মধ্যে পার্থক্যরেখা টানছেন (বা টানবেন) বলে প্রতীয়মান হয়। টানবেন বলছি এজন্য যে, পূর্ণাঙ্গ রায়টি এখনো বাজারে আসেনি। এও বোঝা যায় যে, ভবিষ্যৎ বলতে তাঁরা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনের আসন্ন নির্বাচনকে বোঝাচ্ছেন না, এর পরের জাতীয় নির্বাচনকে বোঝাচ্ছেন।
মজার ব্যাপার হলো, জেনেছি যে, রায় লেখার ভার পড়েছে বর্তমান আপিল বিভাগের সবচেয়ে অনুজ বিচারপতির উপর। এখানে দু’টি কথা বলে রাখি।
এক. রায় লেখার এই যে চল ও ধরণ, তা বিচারিক প্রসেসে সুন্দর নয়। এখানে, অনুমান করার সুযোগ আছে যে, একজন বিচারপতি রায় প্রস্তুত করবেন, বাকিরা তাতে একমত পোষণ করে স্বাক্ষর দেবেন। এতে সমৃদ্ধ সাংবিধানিক আইনবিজ্ঞান উন্মেষে বাঁধার সৃষ্টি হয়।
দুই. আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতিবৃন্দ প্রত্যেকেই অনেক প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ। একজন সদ্য এলিভেশন পাওয়া নতুন বিচারক তাঁদের রায় রিভিউ করবেন এটা গ্রহণযোগ্য নয়। যারা জুডিশিয়াল ক্রাফটসম্যানশিপ বোঝেন, একুমেন বোঝেন, রেশিও-অবিটার নিয়ে ঘাঁটেন, তাঁদের কাছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আরো অনুতাপের বিষয় হলো, প্রধান বিচারপতি রেফাত আহমেদ অবসরে গেলেন, কিন্তু রিভিউ রায়টি দিয়ে গেলেন না। অন্তত এটি এখনও জনপরিসরে নেই।
এখন তিনিও কি বিচারপতি খায়রুল হকের মতই অবসরে যাবার পরে রিভিউ রায় লিখবেন বা এন্ডোর্স করবেন? সেটি কোন ক্ষমতা বলে? রিভিউ রায় লিখতে তো এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগার কথা নয়। তাহলে প্রশ্ন হলো, অবসরের পরে রায় লেখাতে জাস্টিস খায়রুল হকের অপরাধ কোথায় ছিল?
দুই.
এর আগে এই ২০২৪ সালেই সুজনের ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ আরো কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন (রিট নম্বর ৯৯৩৫ এবং ১২৪৩১)। স্মর্তব্য যে, উক্ত সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল, জাতির পিতার স্বীকৃতি, আদিবাসী জাতিসত্তার স্বীকৃতি, পরিবেশ অধিকার স্বীকৃতি, সংরক্ষিত নারী আসন বাড়ানো, অবৈধ ক্ষমতা দখলদারের শাস্তি, বেসিক স্ট্রাকচার ক্লজ সরাসরি সংবিধানে সংযুক্তি, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্তি, ১৯৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি পুনরুদ্ধারসহ আরও বেশকিছু বিষয় ছিল। ২০২৪ এর ডিসেম্বরে হাইকোর্ট বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু কিছু বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেন (দেখুন, প্রকাশিত রায় ৮ জুলাই ২০২৫), আর কিছু বিষয় জিঁইয়ে রাখেন (বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং দেবাশীষ রায় চৌধুরীর দ্বৈতবেঞ্চ)। হাইকোর্ট বিভাগ বাকি বিষয়গুলোর ফয়সালা আসন্ন গঠিতব্য সংসদের উপর ছেড়ে দেন। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বৈধতার প্রশ্নটি পড়েছে হাইকোর্টের অবৈধ ঘোষিত হওয়ার অংশে।
হাইকোর্ট বিভাগের মূল রায় লেখেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, বিচারপতি চৌধুরী শুধু সম্মতি স্বাক্ষর দেন। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব তাঁর লেখা রায়ে বলেন যে, পঞ্চদশ সংশোধনী দিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়াটা সমীচীন হয়নি। ১৩৯ পাতার সেই রায় সুখপাঠ্য নয়, আইনজীবীদের সাবমিশন হুবহু তুলে দেয়া এবং বিভিন্ন অংশে ভিন্নমানের ইংরেজি ভাষার প্রয়োগ টের পাওয়া যায়। রায়ের মূল কথা হলো, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, এবং যেহেতু গণতন্ত্র সংবিধানের একটি ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ তাই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাও একটি ‘বেসিক স্ট্রাকচার’, তাই এটিকে সংসদ পরিবর্তন করতে পারে না।
বিচারপতি ফারাহ তেমন মুন্সিয়ানা ছাড়াই মান্নান খান মামলার রিজনিং বাতিল করে দিয়েছেন। প্রথমত, রায়ে গণতন্ত্র আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে এক করে দেখা হয়েছে, যেন এই ব্যবস্থা ছাড়া গণতন্ত্রই চলতে পারে না। অথচ গণতন্ত্র একটি মূল আদর্শ, আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল একটি উপায়, উপায় নিজেই ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ হয়ে যায়, এমন কোনো কেস রেফারেন্স তিনি দিতে পারেননি। ভারত, কলম্বিয়া ও জার্মানি থেকে বেসিক স্ট্রাকচার ও জনগণের কনষ্টিটুয়েন্ট পাওয়ার এর ভ্রান্তিকর সন্নিবেশ করেছেন তিনি তাঁর রায়ে। সংসদীয় গণতন্ত্রে যেখানে তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন হয়, তার কোনো রেফারেন্স তিনি জাজমেন্টে আনেননি। আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়ার ‘পরিণতি’ যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে বিচারপতি ফারাহ বলেছেন, যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের ফলে ১৫ বছরের পরিণতিতে ২০২৪-এ এসে অনেক মানুষ প্রাণ দিয়েছে, তাই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা অবৈধ। প্রশ্ন হলো, ২০১১ তে দাঁড়িয়ে কোনো কোর্ট বা সংসদ কি করে বুঝবেন যে, ২০২৪ এ এসে অনেক মানুষ মারা যাবে? এভাবে সংবিধান ব্যাখ্যা করা যায় না, হয়ও না।
যাহোক, এখন যেহেতু পঞ্চদশ সংশোধনীর তত্ত্বাবধায়ক অংশ বাতিল হল, তাই ত্রয়োদশ সংশোধনী জীবন ফিরে পেল অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা হাইকোর্ট বিভাগের রায়েও বেঁচে উঠলো। কিন্তু হাইকোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ থেকে কার্যকরী হবে এমন কথা বলা নেই, যেমনটি বলা আছে আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক রিভিউয়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে।
তাই আপিল বিভাগের মান্নান খান মামলার রিভিউ এর রায় বনাম হাইকোর্টের বদিউল মামলার এই রায়ের দোটানার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক এখনই জীবিত আছে কি না সে প্রশ্ন তাত্ত্বিকভাবে হলেও সামনে চলে আসে।
বদিউল মজুমদার, জামায়াত-বিএনপিসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে তাই একযোগে আপিল করে রেখেছে আপিল বিভাগে। এখন সেই আপিলেরও শুনানি চলছে। আপিলে তারা পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল চাচ্ছে। এর মানে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ৭২ এর সংবিধান বলতে তারা কিছু রাখতে চান না, তত্ত্বাবধায়ক একটা অজুহাত মাত্র। এই আপিলের সর্বশেষ শুনানি হয়েছে ১১ নভেম্বর ২০২৫।
জটিল অবস্থা উপলব্ধি করে, আপিল বিভাগ এই মামলার চূড়ান্ত শুনানির পরবর্তী তারিখ ঠিক করেছেন আসন্ন নির্বাচনের পরে, অর্থাৎ মার্চে। মাঝে একটি লুকোছাপা ব্যাপারও জানা গেলো। আস্থাহীনতা থেকে আপিল বিভাগ রিভিউতে নিস্পত্তি হয়ে যাওয়া মান্নান খান মামলাটিও আবার কোন অদ্ভুত কারণে, কার্যসূচিতে এনেছিলেন। সেটি নিয়ে পরে আর কিছু অবশ্য জানা যায়নি। পরিষ্কার যে, আপিল বিভাগ এখানে একটি কৌশলী অবস্থান নিয়ে এর নিজের দেয়া মান্নান খান মামলার রিভিউ রায়টিকে অক্ষুন্ন রাখতে দীর্ঘদিনের জন্য বর্তমান বদিউল মামলার আপিল শুনানিটি স্থগিত রাখলেন।
আপিল বিভাগ হয়তো ভেবেছেন যে, এই ফাঁকে তারা মান্নান খান মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় দিয়ে দিতে পারবেন। সেই পূর্ণাঙ্গ রায়ের সাথে মিলিয়ে মার্চে শুনানি শেষে তারা বর্তমান আপিলটি সুরাহা করবেন। এতে করে কুল ও শ্যাম দুটোই রক্ষা হবে।
তাছাড়া আপিল বিভাগ হয়তো এও ভেবেছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ভাগ্য নিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকার তথাকথিত “জুলাই চার্টারে” বর্ণিত আলী রিয়াজ প্রেসক্রিপশন অনুসারে ব্যবস্থা নেবে। তখন আপিল বিভাগের আর দায় থাকবে না। অর্থাৎ ভাবার অবকাশ আছে যে, আপিল বিভাগ এখানে চূড়ান্ত রকম রাজীনীতিতাড়িত আছেন। ‘জুলাই চার্টারে’ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার নতুন লম্বা দুর্বোধ্য ফর্মুলা দেয়া আছে। আপিল বিভাগের সেটি না জানার কোন কারণ নেই। সুতরাং, আপিল বিভাগ এখানে ঠেকিয়ে খেললেন।
এই সময়ের সুযোগে, আপিল বিভাগকে দিয়ে বর্তমান সরকারের আইনগত বৈধতার স্বীকৃতি আদায় করে নিচ্ছে বা নিয়েছে ইন্টারিম সরকার, বিএনপি ও জামাতপন্থী আইনজীবীরা। সাবমিশন পড়ে বোঝা যায়, এ সব আইনজীবী সাংবিধানিক অভিজ্ঞান মানোত্তীর্ণ নয়। তারা কি যেন একটা কিছু মিডিয়ার সামনে এসে বলছেন, কিন্তু আমরা তা বুঝতে পারছি না। মাঝে তারা বিপ্লবী তত্ত্ব দিয়ে, কোর্টকে দিয়ে বলিয়ে নিয়েছেন যে, ইউনুস সরকার সাংবিধানিকভাবে বৈধ। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেই যে, বর্তমানে উচ্চ আদালতের অধিকাংশ বিচারপতিই নিয়োগ হয়েছে অসাংবিধানিক উপায়ে, অনিয়ন্ত্রিত জনতার চাপে।
এবার এই পরিস্থিতির কিছু ডাইমেনশনের দিকে চোখ দেয়া যাক। কথা হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এই মুহূর্তে চালু হয়েছে কি না? এর উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেয়া যাচ্ছে না। আপিল বিভাগের রিভিউ রায়টি সংক্ষিপ্ত আদেশ আকারে হয়েছে। সেই আদেশে বলা হয়েছে যে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরে এসেছে বটে, তবে সেটি বর্তমান থেকেই কার্যকর করা হচ্ছে না। আর হাইকোর্ট বিভাগের বদিউল আলমদের ১৫-তম সংশোধনী মামলার রায়টি বর্তমানে আপিলে অপেক্ষমাণ আছে।
প্রথমে আসি, চালু হয়েছের যুক্তিতে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরে এসেছে মর্মে যে রায়টি হাইকোর্ট বিভাগ দিয়েছেন তার ফলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বর্তমানেই চালু হয়ে আছে। কেননা, আপিল চলাকালীন নিচের আদালতের প্রদত্ত রায় স্থগিত না হলে সক্রিয় থাকে। আমরা জানি, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়টি স্থগিত না করেই আপিল শুনছেন। তাই সেটি সক্রিয় আছে। এটিই মীমাংসিত নীতি। তবে এর বিপরীতে বর্তমান ইন্টারিম সমর্থকরা বলবেন যে, যেহেতু হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের ভাগ্য আপিলে ঝুলে আছে, আর অন্যদিকে আপিল বিভাগের মান্নান খান মামলার রিভিউ রায় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে, সেহেতু আপিল বিভাগের রায়টি প্রাধান্য পাবে। সে বিবেচনায়, ইন্টারিম সরকার একটু আশ্বস্ত ও নিরাপদ বোধ করছে এই ভেবে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা উপস্থিত চালু হয়ে যায়নি।
কিন্তু এই অবস্থানে আইনি বিতর্কের একটি জায়গা রয়ে গেছে।
জায়গাটা হলো, যদি সংবিধানের কোন ব্যবস্থা অথবা বিধান আদালতের রায়ে বাতিল ঘোষিত হয়, তাহলে বাতিলের আগের বিধান বা ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় (দেখুন, রিভাইভাল মতবাদ: অষ্টম সংশোধনী মামলা, মিনার্ভা মিলস, ওমান রায় প্রভৃতি মামলা)। স্বয়ংক্রিয় চালু হয়ে যাওয়ার জিনিস জোর করে বন্ধ করা যায় না। যদি বন্ধ করা হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে, আদালত প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক আইনবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। যেটি আদালতের রায়েরও স্ববিরোধী। একটা ব্যবস্থা সংবিধানের অংশ হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে গেলে সেটিকে স্থগিত করে দেওয়ার ক্ষমতা কোর্টের নেই। কোর্ট নিজে সংবিধান লিখতে পারেন না।
এই যুক্তিতে ওজন আছে। তাই বলা যায়, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা এখনই চালু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট কৌশলে সেটি বন্ধ করে রেখেছেন।
কিন্তু দেশে এখন নৈরাজ্যকর সরকার ব্যবস্থা চালু থাকায়, সরকারের উপর আইন ও সংবিধান মানার বালাই না থাকায়, রাজনৈতিক দলগুলোর ভবিষ্যৎ সম্বিৎ না থাকায়, এবং সরকার ও উচ্চ আদালত নিজেই পুরো “রঙিন বিপ্লবপ্রসূত অবস্থার সৃষ্ট” হওয়ায় এই যুক্তি কারো কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে না। এই যুক্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্টেট নেসেসিটি, বিশৃঙ্খলা এসব গ্রাউন্ড দেখিয়ে বলবে যে, বর্তমান সরকার বৈধ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিধান ফিরে আসলেও, আদালতের ক্ষমতা রয়েছে দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় বা সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার মতবাদ মতে, এর কার্যকারিতা ভবিষ্যৎ সময় পর্যন্ত স্থগিত করে দেওয়ার।
সম্ভবত, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই যুক্তিরই আশ্রয় নেয়া হবে। যেটি খুব দুর্বল আইনি যুক্তি, বড়োজোর একটি ক্ষয়িষ্ণু আইনবিজ্ঞানের উদাহরণ হতে পারে। প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যৎ থেকেই যদি কার্যকরী হবে, তাহলে সরকারমনা ব্যক্তি বা তত্ত্বাবধায়ক দাবির জেদ ধরা রাজনৈতিক দলসমূহ, বা সুষ্ঠু নির্বাচন চাওয়া সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা তত্ত্বাবধায়ক মামলা নিয়ে এতদিন এতো বিচলিত ছিলেন কেন?
এখন একটা কথার কথা বলি। যদি দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠা করা যেত যে, কোর্টের রায় মতে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরে এসেছে, তখন আইনত বলতে হতো সেটি ফিরে এসেছে ২০১১ সাল থেকেই, কেননা ওই সালেই তত্ত্বাবধায়ক অবস্থা বাতিল হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক ছাড়াই ইতোমধ্যে তিনটি নির্বাচন হয়ে গেছে, তাই সেটিকে ২০১১ সাল থেকে কার্যকরী হয়েছে বলে ভাবার বাস্তব সুযোগ নেই। সুতরাং, এই বর্তমান অন্তর্বর্তী অবস্থায় সেটি কার্যকর হয়েছে বলে ভাবতে হতো। সেক্ষেত্রে, যেহেতু সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অপশন, সংসদ ভাঙ্গা না ভাঙ্গা অপশন, প্রধানমন্ত্রী থাকা না থাকা অপশন ইত্যাদি আর আর অপশন এখন কাজ করছে না, তখন সবমহলের সম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাজ করতে পারতো। সেটিও ত্রয়োদশ সংশোধনীর কাঠামোর মধ্যেই পড়ে। এই যুক্তি একদমই তাত্ত্বিক এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব।
একটা প্রাসঙ্গিক মন্তব্য করা যায়। আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু কার্যকরী করতে দিচ্ছেন না, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায়। এর অর্থ দাঁড়ায় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বৈধ হলেও, এটি সব অবস্থায় ভালো ফলাফল বয়ে আনে না। এবং, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চরমভাবে ক্ষুন্ন করে। বিচারপতি খায়রুল হক যে রায় দিয়েছিলেন তার মূল কথাটিও এই-ই ছিলো। তাহলে বিচারপতি রেফাত আহমেদ এর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের রিভিউ রায়টি যদি ভাল হয়, এ সংক্রান্ত জাস্টিস খায়রুল হকের রায়টি কেন খারাপ হতে যাবে?
বিচারপতি রেফাত আহমেদ জানেন যে, জুলাই চার্টারে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার নতুন ফর্মুলা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আগামী নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বর্তমান রূপে যে কার্যকর হবে না সেটি তাঁর সজ্ঞানে রয়েছে। যেহেতু তিনি জানেন, অতএব তেরোতম সংশোধনীর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে বৈধ বলে রায় দিয়ে তিনি নিজে ভালো থাকলেন এবং বিচারপতি খায়রুল হকের ‘রিজনিং’ এর থেকে মৌলিকভাবে আলাদা কোনো কিছু না লিখে বা বলে অবেদনকারীদের রাজনৈতিক অনুসন্ধিৎসাকে অনুমোদন দিলেন। এতে করে, তাঁর পূর্বসূরি একজন প্রধান বিচারপতিকে সাংবিধানিক রায় দেবার জন্য হয়রানি হতে সাহায্য করলেন, এবং চেয়ে চেয়ে দেখলেন। এটিও জাতির সঙ্গে বিচারপতি রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের একধরনের লুকোচুরি খেলা হলো বৈ কি! নাকি কৌতূহলী পাঠক, এ প্রশ্নও করবেন যে, জাস্টিস রেফাত আহমেদ তাঁর বাবার দেওয়া ‘ইশতিয়াক ফর্মুলা’-র প্রতি অনুরাগ থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার শুরুর দিককার ইতিহাসের প্রতি নার্সিসাস প্রেমের প্রকাশ ঘটালেন?
বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে এ ধরনের কোন লুকোচুরি ছিল না। বরং তিনি নিজেই নিজেকে স্যাক্রিফাইস করেছিলেন। খায়রুল হকের রায়ে বলা ছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বর্তমানরূপে (মানে অবসরে যাওয়া বিচারপতিদের জড়িয়ে যেভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বলা আছে) সাংবিধানিক নয়, যদি সাংবিধানিক হতে হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোকে বা সংসদকে ভিন্ন মডেলের কোন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় একমত হতে হবে। সেদিক দিয়েও জাস্টিস খায়রুল হকের রায়ের মূল থিমের সঙ্গে বিচারপতি রেফাত আহমেদের প্রদানতব্য রিভিউ রায়ের কোন পার্থক্য নাই। অথচ বিচারপতি খায়রুল হক-কে জেল খাটতে হচ্ছে, আর রেফাত আহমেদ বাহবা কুড়ালেন বটে। তিনি অবসর নিলেন, কিন্তু পুর্নাঙ্গ রায়টি তো দিয়ে গেলেন না। তিনিও তো খায়রুল হকের পথেই হাঁটলেন। অতএব, অবসরের পরেও রায় লেখা যায়, বা অনুমোদন দেয়া যায়!
আর একটা প্রশ্ন।
বিচারপতি খায়রুল হক যদি কারসাজি করে তাঁর প্রাথমিক আদেশ থেকে সরে এসে পুর্নাঙ্গ রায় দিয়ে থাকেন, তাহলে সেই কারসাজি বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান থাকা অবস্থায়, পুর্নাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ শুনানি কি করে হলো? তাহলে তো ধরে নিতে হবে, বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের কার্যকরী অংশ কোন প্রতারণাপূর্ণ পরিমার্জনের ফল নয় — গণ্য করেই আপিল বিভাগ রিভিউটি নিস্পত্তি করলেন।
আর যদি যদি তাই-ই হয়, বিচারপতি খায়রুল হক জেলে রয়েছেন কিসের জন্যে?
লেখক
এস এম মাসুম বিল্লাহ, পিএইচডি
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ভিজিটিঙ রিসার্চার, কোট দ্য জুর বিশ্ববিদ্যালয়, নিস, ফ্রান্স
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক