তসলিমার দেশে ফেরা

Comments
২০১৪ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তসলিমা নাসরিন বলেছিলেন, ‘যতদিন বাঁচব ততদিন আমার দেশে ফেরার লড়াই চলবে। হয়তো সেখানে থাকব, হয়তো থাকব না – কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্যই আমি আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে চাই, বাংলাদেশে ফিরতে চাই!’
সেই অধিকার আদায় করার জন্যই এখনও নিয়ম করে কিছু দিন পর পরই মেয়াদ ফুরোনো পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনে হাজিরা দেন বলেও তিনি জানান। তাঁর ভাষ্যে দূতাবাস তাঁকে বার বার ফিরিয়ে দেয়, লিখিতভাবে কখনও কিছু জানায়ও না কেন তার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। তসলিমার কথায়, ‘দূতাবাসের কর্মীরাও অনেকেই আমার প্রতি সহানুভূতিশীল, কিন্তু সরকারের নির্দেশের বাইরে যাওয়ার এক্তিয়ার তো তাদেরও নেই!’ তাকে দেশে ফিরতে না-দেওয়ার ব্যাপারে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সবাই চিরকাল একমত ছিল বলেই তসলিমার বক্তব্য। ‘তাদের মধ্যে হাজারটা বিষয়ে চুলোচুলি থাকতে পারে, কিন্তু আমার ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনও মতভেদ নেই’, বলছিলেন তিনি।
Taslima02_FP
২০১৮ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘এতো বছর পর দেশে ফেরার আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি। দেশে ফিরলেই আমাকে মেরে ফেলা হবে।’
এটাই স্বাভাবিক। মৌলবাদীদের হুমকির মুখে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন ১৯৯৪ সালে। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আর দেশে যেতে পারেন নাই। ফলে, আশাহত হওয়াটাই স্বাভাবিক তাঁর জন্য। আশার বেলুন চুপসে যাওয়াটাই যৌক্তিক।
১৯৯৪ সাল থেকে তিনি আর দেশে যেতে পারেন না, এটা যেমন তসলিমা নাসরিন নিজে বলেন, তেমনি আমরা অনেকেও এই বিশ্বাসটাকেই আঁকড়ে ধরে আছি। যে কারণে জানি না যে দেশ ছাড়ার মাত্র চার বছরের মাথাতেই তসলিমা নাসরিন আসলে দেশে ফিরেছিলেন একবার। একদিন বা দুই দিনের জন্য নয় সেই ফেরা। দীর্ঘ চার মাস দেশে কাটিয়ে তারপর ফিরে গিয়েছিলেন তিনি সুইডেনে আবার।
সেই সময়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিলো। শেখ হাসিনা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কাজেই তসলিমার ভাষ্যে ‘শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সবাই চিরকাল একমত ছিলো তাঁকে দেশে ঢুকতে না দেবার ব্যাপারে’- সেই বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক না। তিনি দেশে ঢুকেছেন আর শেখ হাসিনা সেটা জানতো না, এটা বিশ্বাসযোগ্য না। শেখ হাসিনা না চাইলে তাঁর পক্ষে দেশে ঢোকা সম্ভব হতো না।
১৯৯৮ সালের অগাস্ট মাসে তসলিমা নাসরিনের ক্যান্সার আক্রান্ত মা চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে যান। সাথে ছিল তসলিমা নাসরিনের বাবাও। সেখান থেকে সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ তারিখে তাঁরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ঢাকাতে পৌঁছেই তসলিমা নাসরিন অজ্ঞাতবাসে চলে যান। অক্টোবর মাসে চার তারিখে ইসলামি শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনের একটা বিক্ষোভ দিবস ছাড়া আর বড় কোনো ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেনি তাঁকে নিয়ে। সেই বিক্ষোভকেও সরকার কড়া হাতে দমন করেছিলো। বাংলাদেশ বাসের পুরোটা সময়ই পুলিশ প্রটেকশনে ছিলেন তিনি। হানিফা ডীন তাঁর ‘দ্য ক্রিসেন্ট এন্ড দ্য পেন’ বইতে লিখেছেন, “Although she stayed away from the public eye, unofficially in hiding, her whereabouts must have been known to senior officials as she was receiving police protection.”
১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে তাঁর মা মারা যান। পঁচিশ তারিখে তসলিমা নাসরিন পুনরায় দেশ ত্যাগ করে সুইডেনে চলে যান। এর পরে অবশ্য আর দেশে ফেরা হয়নি তাঁর। পাখি হয়ে আসা ছাড়া আর কোনো সুযোগ তাঁর নেই দেশে ফেরার।

লেখক:
Farid Ahmed
ফরিদ আহমেদ, প্রবাসী, প্রাক্তন শিক্ষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট