দেশভাগের অজানা অধ্যায়: পর্ব- দুই । নাজমুল হুদা

Comments

(তারুণ্যের ভাবনা বিভাগের লেখা সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব ভাবনা। এ বিভাগের মতামতের সাথে বাঙালীয়ানা’র ভাবনার কোন সম্পর্ক নেই এবং লেখার জন্য সকল দায় লেখকের – সম্পাদক)

‘দেশভাগ’ তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নিশ্চই একদিনে আসেনি! এর অসংখ্য চরিত্র দেখতে পাবো আমরা। সেখানে কেউ দিনমুজুর থেকে বিদ্রোহী হয়েছেন, কেউ সৈনিক থেকে বিপ্লবী হয়েছেন, কেউ স্বাভাবিক পন্থায় রাজনীতিকে চালিত করেছেন, কেউ কবি থেকে বিপ্লবের রাস্তায় গিয়েছেন- হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র! আবার কেউ কেউ নিম্নশ্রেণীর জনতার সাথে মিশে গড়ে তুলেছেন বিদ্রোহী এক বাহিনী। আজ আমরা এরকমই কোন একজন বিদ্রোহীকে নিয়ে ‘খোড়াখুড়ি’ চালাবো….

আসুন প্রথমেই একটি চিঠির কিছু অংশ পড়ে আসি, চিঠিটি লিখেছেন ব্রিটিশ সামরিক বিভাগের একজন সচিব যেখানে প্রাপক ছিলেন ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর একজন ডেপুটি এডজুট্যান্ট জেনারেল। চিঠি প্রেরনের তারিখ ১৬ই নভেম্বর ১৮৩১! [ ফৌজদারি নথি-৬৯, চিঠির নম্বর-২৩৯, সংগ্রহে- কমনওয়েলথ রিলাশান্স লাইব্রেরী ]

“সরকারের নিকট এই মর্মে নির্ভরযোগ্য সংবাদ এসেছে যে বারাসাত ম্যাজিস্ট্রেসীর তিম্মি অঞ্চলে একদল গোঁড়া ধর্মান্ধ জনসাধারনের উপর অত্যাচার করছে। স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসন এদের দমনের জন্য যে বাহিনী প্রেরন করেছিল তা উক্ত বিদ্রোহীরা প্রতিরোধ করেছে… বারাকপুর থেকে এক ব্যাটালিয়ন স্থানীয় পদাতিক সৈন্য, দুটি ৬ পাউন্ডি কামান, দমদম থেকে প্রয়োজনীয় গোলন্দাজ সহ একজন ফিল্ড অফিসারকে বারাসাতে পাঠাতে পারেন… প্রয়োজনে অধিক গোলাবারুদ ও কামান সরবরাহে পরিবহনের ব্যাবস্থা করা হবে তাছাড়া অধিক সাহায্য পাঠানো হবে। সৈন্যদলের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট সব ধরনের সহায়তা ও রসদ সরবরাহ পরিচালনা করবেন।”

এই চিঠির ভাষ্যমতে বোঝাযায় কলকাতার পাশে অবস্থিত বারাসাত নামক স্থানে কিছু ‘দুষ্কৃতকারী’ বিদ্রোহ টাইপ কিছু একটা করেছে যা দমন করার জন্য সৈন্য পাঠানো দরকার। এই বিদ্রোহীরা আবার ‘গোঁড়া ধর্মান্ধ’!

এখন প্রশ্ন হলো এই ‘বিদ্রোহীরা’ কারা ছিল আর তাদেরকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কে?

তিতুমীর- আপনারা নাম শোনেননি এমন লোকের সংখ্যা খুব কমই পাওয়া যাবে। হ্যা বৃটিশদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম (বাংলায়- সম্ভবত) সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিলেন এই ব্যক্তি ও তার অনুসারীরা। আমাদের দেশের প্রচলিত ইতিহাসের বয়ানে তার যে বিবরণ দেয়া হয় সেটা কতটুকু সত্য জানিনা। তবে একটু ভেতরে গেলে হয়তো ভিন্ন রকমের এক তিতুমীর বেরিয়ে আসবেন হয়তো। চলুন তবে একটু ইতিহাস ঘেঁটে আসি।

‘গডস টেরোরিস্ট’ বইয়ের বিবরণ…

তিতুমীর ১৭৮২ সালে জন্ম নেন একটি চাষী পরিবারে। স্থানীয়ভাবে তিনি দুর্বৃত্তায়ণে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে কলকাতায় এসে কুস্তিগির হিসেবে সময় পার করেন। অতঃপর তিনি একজন প্রতাপশালী জমিদারের লাঠিয়াল হিসেবে সামন্ত রক্ষার কাজে নিয়োজিত হন। পরে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে বিবাদে জড়িয়ে কারাবাসে দন্ডিত হন।…. কারামুক্তির পর তিনি দিল্লীতে গিয়ে মুঘল পরিবারের অনুল্লেখ্য সদস্যের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ নেন আর সেই সুবাদে হজ্জব্রত পালনের জন্য তিনি তাদের সাথে মক্কায় যান। সেখানে ১৮২১ বা ১৮২২ সালে তিতুমীরের সাক্ষাৎ হয় সৈয়দ আহমদের সাথে। সৈয়দ আহমদ, ভারতে ওয়াহাবীবাদের উত্থানের অন্যতম প্রধান একজন ফাউন্ডার। এখানে উল্লেখ্য ‘ওয়াহাবীবাদ’ যথেস্ট উগ্রবাদী একটি ধর্মীয় মতবাদ।

‘দি ইন্ডিয়ান মুসলিমস’ বইয়ের বিবরন…

সৈয়দ আহমদের কলকাতাস্থ মুরীদানের মধ্যে একজন পেশাদার পালোয়ান ও গুন্ডা প্রকৃতির লোক ছিলেন। তার নাম তিতু মিয়া ওরফে মীর নিসার আলী। তার জন্ম চাঁদপুর গ্রামে এবং বাসস্থান ছিল বারাসাতে। এই ভদ্রলোকের জীবন আরম্ভ হয় এক ভদ্র চাষীর সন্তান হসেবে। তিনি স্থানীয় এক ক্ষুদ্র জোতদারের কন্যাকে বিয়ে করে নিজের অবস্থার উন্নয়ন করেন। কিন্তু তার উগ্র মেজাজের কারণে এসব সুযোগ গোল্লায় যায়। কিছুদিন কলকাতায় কুস্তিগির হিসেবে কাটান। তারপরে জমিদারদের লাঠিয়াল হিসেবেও কাজ করেন। এই লাঠিয়াল পেশাগিরিতে তাকে জেলেও যেতে হয়। জেলমুক্ত হয়ে তিনি মক্কায় যান এবং সৈয়দ আহমদের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি ভারতে ফিরে আসেন ধর্মের একজন শক্তিশালী প্রচারক হিসেবে।… হিন্দু জমিদারেরা তার মুরীদদের উপর যে সব ছোটখাট অত্যাচার করতো তারফলে এ সময়ে একটা উন্মত্ত কৃষক-আন্দোলন জেগে ওঠে এবং তিনি তার নেতৃত্ব গ্রহন করেন।…

৫ই নভেম্বর তাদের পাঁচশো যোদ্ধা কুচকাওয়াজ করতে করতে একটি ছোট শহরে প্রবেশ করে ও তারা হিন্দু পুরোহিতকে খুন করে। তারপর তারা দুইটি গরু জবেহ করে ও তাদের রক্তদিয়ে হিন্দুর মন্দির অপবিত্র করে এবং অবজ্ঞাভরে গরুর অঙ্গগুলি দেবমূর্তির সামনে ঝুলিয়ে দেয়। অতঃপর তারা প্রকাশ্যে ঘোষনা করে, ‘ইংরেজ-রাজ ক্ষতম হয়ে গিয়েছে ও মুসলিম রাজ কায়েম হয়েছে’!..

যেসব মুসলমান তাদের মাজহাবে আসতোনা তাদের উপরেও অত্যাচার চালানো হত।… ১৭ তারিখে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট কিছু সাহায্যকারী সৈন্য সংগ্রহ করলেন, ইউরোপীয়ানরা হাতির উপরে উঠে রওনা হলেন কিন্তু পেরে উঠলোনা বিদ্রোহীদের সাথে…

পরে কলকাতা থেকে দ্রুত দেশীয় পদাতিক বাহিনী ও অশ্বারোহী গোলন্দাজ বাহিনীকে পাঠিয়ে দেয়া হল। একটা ভীষণ যুদ্ধ হলো, সেই যুদ্ধে তাদের নেতা তিতুমীর যুদ্ধ ক্ষেত্রেই দেহ ত্যাগ করলেন।]

উপরের দুটি বিবরণ পড়লে আমাদের পরিচিত তিতুমীরের চেহারাকে খুজে পাই না। আসলে তিতুমীরের জিবনীর উপর খুব বেশী বই পাওয়া যায় না। ১৮৫৩-৫৪ সালে প্রকাশিত ৩৮ পৃষ্ঠার ‘নারকেলবাড়ির জঙ্গ’ নামের একটি পুস্তিকা, ‘তারিখ ই আহমদী – জাফর আলী নকভী প্রকাশকাল-১৮৫৫ ‘, ‘তিতুমীর- বিহারীলাল সরকার’ এবং ‘শহীদ তিতুমীর – আবদুল গফুর সিদ্দিকী’ এই কয়েকটি বইই তিতুমীরের জীবনীর উৎস।

এই আদি উৎস থেকে পাওয়া বিবরণের সাথে বর্তমান বাজারে প্রচলিত জীবনীর ব্যাপক ব্যাবধান আছে। সুতরাং ব্রিটিশদের লেখাকেও আপনি ফেলে দিতে পারবেন না। আবার ব্রিটিশরাও তাদের পিঠ বাচাতে মিথ্যার আশ্রয় নিতেই পারেন কারণ এই বিদ্রোহ খানিক হলেও কলকাতা কেন্দ্রিক বৃটিশদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছিল কেননা এই বিদ্রোহ ছিল মূলত ‘কৃষক বিদ্রোহ’! কৃষকেরা তখন নীলচাষের তীব্র বিরোধী ছিল, এই নীলচাষ বিরোধী কৃষকদের একটি বড় অংশ তিতুমীরের অনুসারী ছিল। যদিও এই অংশটুকু (নীল চাষ) ব্রিটিশ লেখকেরা তাদের লেখায় স্কীপ করে গিয়েছেন।

এবার আমরা যদি ‘কোলডিন রিপোর্ট’ [কোলডিন- ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন কাউন্সিল, তিতুমীরের মৃত্যুর পর তার অনুসারীদের বিচারিক মামলায় তিনি প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন] নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করি তাহলে দারুণ কিছু তথ্য বেরিয়ে আসে…

“রামনারায়নই প্রথম সংঘর্ষের পথে অগ্রসর হয়। তাকে অনুসরন করে সৌর প্রসাদ এবং কুলগাছির মহিলা জমিদারের এজেন্ট” [ কোলডিন রিপোর্ট ৩য় অধ্যায়, প্যারা-৯]… এই তথ্য থেকে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারিযে তিতুমীর সাধারন হিন্দু বা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বিরুদ্ধে হয়তো কোন কার্যকলাপ চালাননি।

এই রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায় মোট সাতজন জমিদার যারা তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, শুধু তাইনা ১৮৩১ এর ১৭ই নভেম্বরে তার মৃত্যুর পর তার অনুসারীদের বিচার কাজ চলা কালীন তাদের বিরুদ্ধে কিছু মুসলমান উকিলও কাজ করে। মনে রাখা দরকার সেই সময়ে উকিল ব্যাপারটা শুধু এলিট শ্রেণীর মধ্যেই বিদ্যমান ছিল।

এবার ‘কোলডিন রিপোর্ট’ নিয়ে আরেকটু নড়াচড়া করি সেখানে দেখতে পাব ১৩৬ জন আসামীর মধ্যে কুরান, থান্ডাই, লালচাঁদ, ন্যায়পাল, পাঁচু, বাদল, লঈ, বণমালি, চাঁনমন্ডল, মানিক, গোপাল, পরাণ, হারু, ভোলা, মঙ্গলা টাইপ কিছু নাম যেগুলো সুস্পষ্টভাবেই হিন্দু নাম। অর্থাৎ তিতুমীরের এই বিদ্রোহী দলের মধ্যে অনেক হিন্দুও ছিল। এই হিন্দুরা অতি অবশ্যই নিম্নবর্ণের হিন্দু ছিল একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘কোলডিন রিপোর্টে’ একদম শেষের দিকে বলা হচ্ছে, ‘১৮৩১ সালের নভেম্বরের গোলযোগ ব্যাতীত তিতুমীর ও তার অনুসারীগণ অন্যের বিরুদ্ধে এমন কোন কাজ করেনি যার দ্বারা আমি তাদের অভিযুক্ত করতে পারি’!

‘তিতুমীর’, তাকে আমাদের দেশীয় ইতিহাসবিদেরা (!) যেমন ‘পীর’ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন আবার ব্রিটিশরাও তাকে তেমন পুরোপুরি ‘ভিলেইন’ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। আদতে এর কোনটাই তিনি ছিলেন না।

তিতুমীর আর দশজন ভারতীয় মুসলমানের মত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ বদৌলতে এলিট হিন্দু জমিদার শ্রেণীর অত্যাচার মানতে পারেননি ফলে তিনি জমিদার শ্রেণীর সাথে শুরু করেছেন সংঘর্ষ আবার ব্রিটিশদের অনুসৃত ‘ইংরেজী শিক্ষাকে’ও পূর্বের ‘পার্সী’র বিপরীতে মেনে নিতে পারেননি ফলে তাকে সৈয়দ আহমদের মত লোকের প্রভাবে চরমপন্থার দিকে অগ্রসর হতে হয়েছে। দুয়ে মিলে ব্রিটিশ রাজ যখন দেখেছে একজন তিতুমীর তাদের তল্পিবাহক জমিদারদের পথের কাটা হয়ে উঠতে যাচ্ছে ঠিক তখনই তারা তিতুমীরকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

তিতুমীর কোন ধর্মীয় আন্দোলন করেননি, তার আন্দোলনের কোথাও আমরা ধর্মীয় রীতিনীতি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দেখিনা অথবা রাষ্ট্রীক চিন্তাও খুজে পাইনা। তবে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে মুসলমান রাজ কায়েমের কথা আমরা উইলিয়াম হান্টারের ভাষ্যমতে জানতে পারি যা অন্য কোথাও নেই । সেই হিসেবে তিতুমীরকে একজন কৃষক বিদ্রোহের নেতা বলতে পারি যে কিনা শোষিতের পক্ষ নিয়ে কাজ করেছেন, শোষনের বিরুদ্ধে।

*

দেশভাগ দিয়েছে কি জানিনা। আপনি হয়তো বলবেন একটি রাষ্ট্রতো পেয়েছি! হ্যা আপনি একটি রাষ্ট্র পেয়েছেন সত্য কিন্তু ইদ্রিস চাচার আরেক ভাই এখন ‘ভীনদেশী’ নাগরিক, নাসিমা বেওয়ার দুইছেলের একজন ‘অন্যদেশী’! পাঞ্জাবের মাহিন্দ্র সিং এর বোন এখন অন্যদেশের মানুষ।

কবিদের মনে ক্ষোভ থাকে, তারা বিক্ষোভ করেন নিজের সাথে কালি দিয়ে কলমের খোচায়…

“তারপর,
সমস্ত পথ একটাও কোন কথা না বলে
আমরা হাটতে থাকি- হেটে যেতে থাকি।
একদেশ থেকে অন্যদেশে
এক ধর্ষণের থেকে আরো এক ধর্ষণের দিকে।” [দেশান্তর- শঙখ ঘোষ]

*

গ্রন্থ সহায়তাঃ ব্রিটিশ ভারতীয় নথিতে তিতুমীর ও তার অনুসারীগণ- ড.মুঈনউদ্দীন আহমদ খান,
গডস টেরোরিস্ট- চার্লস অ্যালেন
দি ইন্ডিয়ান মুসলিমস- উইলিয়াম হান্টার
British Ploicy and the Muslim in Bengal- A. R Mallik.

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.