“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” । সাগর লোহানী

Comments

মেধাবী ছাত্র সুভাষচন্দ্র বসু। বাড়ীর সকলের আশা প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনি বিশেষ ভাল ফলাফল করবেন। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগে তিনি হয়ে পড়লেন পড়াশুনায় ভীষণ অমনোযোগী। তাঁর পরিবারের সকলেই খুব হতাশ। সুভাষচন্দ্র বসু তখন পরীক্ষার চেয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী- জীব শিব এবং স্বামী বিবেকানন্দের বাণী- সেবা ধর্মকেই তাঁর জীবনে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেক বেশী।

১৯১৩ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষা দিলেন। কিন্তু সবার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলেন। কুড়ি টাকা বৃত্তি পেলেন তিনি। কিন্তু সেই বৃত্তির টাকা দান করলেন গরিবের সেবায়।

Subhas Bose03

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

সুভাষ মাকে একটা চিঠি লিখলেন। সেই চিঠির শেষের অংশটিতে তিনি লিখলেন, “আমি যদি না পড়িয়া এ স্থান পাই তবে যাহারা লেখাপড়াকে উপাস্য দেবতা মনে করিয়া তজ্জন্য প্রাণপাত করে তাহাদের কি অবস্থা হয়? তবে প্রথম হই আর লাষ্ট হই আমি স্থিররূপে বুঝিয়াছি লেখাপড়া ছাত্রের উদ্দেশ্য নহে- বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চাপ্রাস’ (ডিগ্রী) পাইলে ছাত্ররা আপনাকে কৃতার্থ মনে করে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চাপ্রাস’ (ডিগ্রী) পাইলে যদি কেহ প্রকৃত জ্ঞান না লাভ করিতে পারে- তবে সে শিক্ষাকে আমি ঘৃণা করি। তাহা অপেক্ষা মূর্খ থাকা কি ভাল নয়? চরিত্র গঠনই ছাত্রের প্রধান কর্ত্তব্য- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা চরিত্র গঠনকে সাহায্য করে-আর কার কিরূপ উন্নত চরিত্র তাহা কার্য্যেই বুঝিতে পারা যায়। কার্য্যই জ্ঞানের পরিচায়ক। বই পড়া বিদ্যাকে আমি সর্বান্তকরণে ঘৃণা করি। আমি চাই চরিত্র-জ্ঞান-কার্য। এই চরিত্রের ভিতরে সবই যায়- ভগবদ্ভক্তি,- স্বদেশপ্রেম,- ভগবানের জন্য তীব্র ব্যাকুলতা সবই যায়। বই পড়া বিদ্যা তো তুচ্ছ সামান্য জিনিষ- কিন্তু হায় কত লোকে তাহা লইয়া কত অহঙ্কার করে।”

এই ব্রতই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। আর তাইতো শুধু নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে দেশ ও মানুষের কথা চিন্তা করেছেন। মানুষের দুঃখ-কষ্টের দূরীকরণই তাঁর জীবনের আরাধ্য হয়ে ওঠে। সেকারণেই ব্রিটিশদের শোষণ ও নির্যাতন থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করার জন্য যে সব মহান ব্যক্তি, বিপ্লবী, লড়াকু যোদ্ধা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সুভাষচন্দ্র বসু তাঁদেরই অন্যতম।

Subhas Bose_Gandhi

মহাত্মা গান্ধীর সাথে আলোচনারত নেতাজি

অহিংসায় নয়, উদারতায় নয়, শক্তি প্রয়োগ করেই ব্রিটিশকে ভারত থেকে তাড়াতে হবে- এই মন্ত্রকে ধারণ করে তিনি ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। ভারতের যুব সম্প্রদায়কে সুভাষ বলেছিলেন “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”। উপমহাদেশে সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের সংগঠক হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যে কারণে বিপ্লবী যোদ্ধারা তাঁকে “নেতাজী” বলে সম্বোধন করতেন।

সুভাষচন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারী। উড়িষ্যার কটক শহরে এক বাঙালী পরিবারে। তবে তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল চব্বিশ পরগণা জেলার অন্তর্গত কোদালিয়া গ্রামে। নেতাজীর বাবা জানকীনাথ বসু। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে বাংলা ছেড়ে কটকে চলে যান। সেখানে তিনি অইনজীবী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এ পেশায় তিনি অল্পদিনের মধ্যে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন। জ্ঞানী ও সুপণ্ডিত ব্যক্তি জানকীনাথ বসু কটক মিউনিসিপ্যালিটি ও কটক জেলা বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। সুভাষের মায়ের নাম প্রভাবতী দেবী। তিনি কলকাতার হাটখোলার প্রসিদ্ধ দত্ত পরিবারের মেয়ে। অভিজাত পরিবারের মেয়ে প্রভাবতী দেবী ছিলেন গৃহিণী ও ধর্মপ্রাণ। গরীব-দুঃখী মানুষের সেবা করা ছিল তাঁর সহজাত স্বভাব। সুভাষচন্দ্র বসু বাবা-মার নবম সন্তান ও ষষ্ঠ পুত্র।

Subhas Bose_1943_Tokyo

১৯৪৩ এ টোকিওর এক জনসভায় নেতাজি

১৯০২ সালে পাঁচ বছর বয়সে সুভাষচন্দ্র বসু খ্রীষ্টান পাদ্রীদের দ্বারা পরিচালিত কটক প্রোটেষ্ট্যান্ট ইউরোপীয়ান স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে তিনি ৭ বছর পড়াশুনা করেন। এই স্কুলে বাংলা ছাড়া অন্য সব বিষয় পড়ানো হতো। মেধাবী ও বুদ্ধিমান সুভাষ ছিলেন শিক্ষকদের খুব প্রিয়।

১৯০৮ সালে তিনি কটকের রাভ্যেনশ কলেজিয়েট স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এই স্কুলে পড়ার সময় তিনি নিজ উদ্যোগে বাংলা ও সংস্কৃত ভাষা শেখেন। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত ব্যায়াম চর্চা করতেন, বাগানে সবজি ও ফুল গাছের যত্ন নিতেন। তিনি প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতেন।

এসময় পণ্ডিত বেণীমাধব দাস রাভ্যেনশ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁর সরল অমায়িক ব্যবহারের কারণে ছাত্ররা তাঁকে শ্রদ্ধা করত। মা প্রভাবতী দেবী এবং শিক্ষক বেণীমাধব দাসের নৈতিক আদর্শ তাঁর জীবনকে সুন্দরভাবে গড়তে সহায়তা করে।

সুভাষচন্দ্র বসুর বয়স যখন ১৩/১৪ বছর তখন তাঁর এক আত্মীয় কটকে তাঁদের বাড়ীতে বেড়াতে আসেন। তিনি তাঁদের বাড়ীর কাছেই থাকতেন। সুভাষ একদিন তাঁর বাড়ীতে বেড়াতে যান এবং তাঁর ঘরে স্বামী বিবেকানন্দের অনেকগুলো বই দেখতে পান। তিনি স্বামীজীর বইগুলো তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নেন এবং পড়েন। এভাবে স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। স্বামীজীর বক্তৃতা ও চিঠিপত্রগুলো তাঁকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

কিছু বন্ধু সহযোগে দরিদ্রদের সেবায়, রুগ্নের শুশ্রূষায় এবং দুঃস্থের দুঃখ মোচনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করতে শুরু করেন। স্বামীজীর আদর্শকে জীবনে সফল করাই তখন সুভাষের একমাত্র চিন্তা।

প্রবেশিকা পাশ করার পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে আই.এ ভর্তি হন। এই কলেজে পড়ার সময় তিনি স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ ও ধর্ম চর্চায় আরও বেশী মন দেন। আই.এ. পড়ার একপর্যায়ে মানবসেবার উদ্দেশ্যে তিনি গৃহত্যাগ করেন। এসময় তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থস্থান ঘুরে বেড়ান। কয়েক মাস পর বাড়িতে ফিরে আসেন। বাড়িতে আসার পর তিনি টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে অনেক দিন ভোগেন। সুস্থ হওয়ার পর বার্ষিক পরীক্ষার পড়াশুনায় মনোযোগ দেন।

১৯১৫ সালে সুভাষচন্দ্র বসু আই.এ. পরীক্ষায় মেধাস্থান অর্জন করে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ওই বছরই তিনি দর্শনে অনার্স নিয়ে প্রেসিডেন্সী কলেজে বি.এ. ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় অধ্যাপক ওটেন বাঙালী ছাত্রদের প্রতি অপমানজনক ব্যবহার করায় তিনি তাঁর ওপর খুব ক্ষিপ্ত হন এবং অধ্যাপক ওটেনকে প্রহার করেন। এই ঘটনায় তাঁকে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। কলেজ জীবন থেকেই তাঁর মধ্যে স্বদেশপ্রেম ও বাঙালী জাতীয়তাবোধ গভীরভাবে বিকশিত হতে থাকে।

Subhas Bose_Suprime Command INA

আজাদ হিন্দ ফৌজের সুপ্রিম কমান্ডের সাথে

অবশেষে স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯১৯ সালে তিনি ডিস্টিংশনসহ দর্শন শাস্ত্রে অনার্স ডিগ্রী অর্জন করেন এবং ওই পরীক্ষায় কলেজে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ১৯২০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস এ-পরীক্ষা দেন এবং চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। একই বছর তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে (আইসিএস) যোগ দেন। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস থেকে পদত্যাগ করে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। ভারতকে ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন করার জন্য তিনি সরকারী চাকুরি ত্যাগ করেন। ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আইন অমান্য আন্দোলনের অভিযোগে চিত্তরঞ্জন দাস ও সুভাষচন্দ্র বসুকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্র্রেফতার করে। ১৯২২ সালে তিনি মুক্তি পান।

গান্ধীজির সাথে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। কিন্তু গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। তাই গান্ধীজিকে ছেড়ে তিনি আসেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে। তাঁর সান্নিধ্যে থেকে তিনি নিজেকে রাজনীতিতে আরো পরিপক্ক করে গড়ে তোলেন। এরপর নেতাজী স্বাধীনতা সংগ্রামী চিত্তরঞ্জন দাসের সাথে রাজনীতি শুরু করেন। ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার হিসাবে নিযুক্ত হন। চিত্তরঞ্জন দাস তখন কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসুর মাসিক বেতন ছিল ৩০০০ টাকা। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নেন মাসে ১৫০০ টাকা বেতন নিবেন। ওই বছর অক্টোবর মাসে নেতাজীকে স্বদেশী বিপ্লবীদের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ব্রিটিশরা তাঁকে বার্মার কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। ১৯২৫-২৭ সাল পর্যন্ত তিনি মান্দালয়সহ বিভিন্ন কারাগারে ছিলেন।

Subhas Bose_ Adolf Hitler

বার্লিনে চ্যান্সেলর এডলফ হিটলারের সাথে ১৯৪১ সালে নেতাজি

১৯২৭ সালে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। ১৯২৮ সালে কলকাতায় সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তিনি ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ বাহিনী গড়ে তোলেন। যার চরিত্র ছিল সামরিক। ‘হিন্দুস্থান সেবক দল’ নামে আরেকটি বাহিনী সে সময় তৈরী হয়েছিল। কিন্তু সে দলের সাথে এ দলের পার্থক্য হল ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ বাহিনীতে নারী ও পুরুষ বিপ্লবী ছিল। ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ বাহিনীকে সামরিক মানসিকতায় শিক্ষা প্রদান করা হয় এবং এ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে স্বাধীনতার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তী কালে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ার ক্ষেত্রে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এই ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ বাহিনী থেকে প্রেরণা পান। ১৯২৯ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে তিনি ও বিপ্লবীরা ব্রিটিশ সরকারের পাশাপাশি একটি প্যরালাল সরকার গঠন করার প্রস্তাব করেন।

১৯৩০ সালের ২৩ জানুয়ারী ব্রিটিশ আইনের বিরুদ্ধে এক পদযাত্রায় প্রধান ভূমিকা পালন করার জন্য তাঁকে আবার আটক করা হয়। ওই বছর জেল থেকে বেরিয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি কলকাতার মেয়র হিসাবে নিযুক্ত হন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের মহিরুহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৩১ সালে নেতাজীর নেতৃত্বে কলকাতায় শোভাযাত্রা চলাকালে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে আবার গ্রেফতার করে। এসময় তিনি ৬ মাস পর মুক্তি পান। মুক্তির পরও বিপ্লববাদী সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য ব্রিটিশ সরকার নেতাজীকে তাঁর বাড়িতে নজর বন্দি করে রাখে। ১৯৩২ সালে তিনি আইন অমান্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে ওই আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি হয়ে উঠেন। এসময় তাঁকে আবার ব্রিটিশ সরকার কারাগারে প্রেরণ করে। কিন্তু জনতার আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। বারবার কারা নির্যাতনের কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

Subhas Bose04

নেতাজি

১৯৩৩ সালের মাঝামাঝি সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে ইউরোপে চলে যান। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইউরোপের বহু রাজনৈতিক নেতা ও মহান ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেন, ভারতমাতাকে ব্রিটিশ সরকারের হাত থেকে স্বাধীন করতে হলে অন্য দেশের সেনা ও রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা দরকার হবে। তিনি সমগ্র ইউরোপ ঘুড়ে বেড়ান এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রচার চালান।

তিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রাগে, বার্লিনে, মিউনিখে, মিলানে ও রোমে সভা সমাবেশ করেন। ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত সংগ্রহ করেন এবং ভারতীয়দের সংগঠিত করেন। ১৯৩৬ সালের ৮ এপ্রিল দেশে ফিরে এলে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে আবার গ্রেফতার করে। এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে নিখিল ভারত ‘সুভাষ দিবস’ পালন করে। ১৯৩৭ সালে তিনি মুক্তি পান। ওই বছর তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সচিব এমিলিকে বিয়ে করেন। ১৯৪২ সালে তাঁদের কন্যা সন্তান অনিতার জন্ম হয়।

১৯৩৮ সালে ভারতবাসী তাঁকে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সুভাষ চন্দ্র বসু গান্ধীজীর অহিংস নীতির বিরোধিতা করে ইংরেজ সরকারকে ৬ মাসের মধ্যে স্বাধীনতা প্রদানের জন্য এক চরমপত্র পাঠানোর প্রস্তাব করেন। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেস সহিংস সংগ্রাম শুরু করার পক্ষে ছিল না। গান্ধীজী ওই বিপদের সময় ইংরেজ সরকারকে বিব্রত করতে চাননি। এ প্রশ্নে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিলে সুভাষ বসু পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামে আরেকটি দল গঠন করেন। কলকাতায় প্রবল জনমত সৃষ্টি করলে ইংরেজ সরকার ভীত হয়ে ১৯৪০ সালের ২ জুলাই নেতাজিকে গ্রেফতার করে এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে আটকে রাখে। ১৯৪১ সালের জানুয়ারী মাসে তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় পলায়ন করে আফগানিস্তান হয়ে রাশিয়ার পথে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য সোভিয়েত শক্তির সমর্থন চান। কিন্তু স্টালিন সুভাষচন্দ্র বসুর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

Subhas Bose_Azad-hind-Fauj

আজাদ হিন্দ ফৌজ পরিদর্শনকালে নেতাজি

দেশে ফিরে সুভাষ বসু সরকাতী গোয়েন্দাদের নজরদারি এড়ানোর জন্য মৌনব্রত ও নির্জনবাসের ঘোষণা দেন ও তাঁর ভাতিজা অমিয় বোসের অনুমোদন ছাড়া কারো সঙ্গে দেখা না করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সুযোগে তিনি মৌলভী জিয়াউদ্দীনের মতো দাড়ি রাখেন ও তাঁর মতোই পোশাক পরে গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ পালিয়ে আফগানিস্তান ও মস্কো হয়ে জার্মানির বার্লিন পৌঁছেন। তিনি জার্মান থেকে সাবমেরিনযোগে জাপান পৌঁছেন।

ইতঃমধ্যে ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দলকে বেআইনি ঘোষণা করে। সমগ্র ভারত জুড়ে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দলের সব পার্টি অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এদিকে ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে জাপানের রাজধানী টোকিয়োতে ভারতীয়দের একটি সম্মেলনে গঠিত হয় ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লিগ’ বা ‘ভারতীয় স্বাধীনতা লিগ’। ১৯৪২ সালে ব্যাংককে আরও একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনেই রাসবিহারী বসুকে লিগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় এবং আজাদ হিন্দ বাহিনী (Indian Revolutionary Army, INA) নামে একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাপানিদের হাতে যুদ্ধবন্দী ৪০,০০০ ভারতীয় সেনা নিয়ে গড়ে ওঠে আজাদ হিন্দ ফৌজ। ক্যাপ্টেন মোহন সিং ফৌজের অধিনায়ক নিযুক্ত হন।

Subhas Bose05

সামরিক পোশাকে নেতাজি

১৯৪৩ সালের ৪-৭ জুলাই সিঙ্গাপুরস্থ মহাএশিয়া মিলনায়তনে ভারতীয় স্বাধীনতা লীগের প্রধান নেতৃবৃন্দের মহাসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট বিপ্লবী রাসবিহারী বসু দাঁড়িয়ে সভায় সুভাষচন্দ্র বসুকে পরিচয় করিয়ে দেন। সেই সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতা এবং বার্ধক্যজনিত কারণে বর্তমান পদ তাঁর পক্ষে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান রাসবিহারী বসু। লীগের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুভাষ বসুকে স্থলাভিষিক্ত করার জন্য নিজের ইচ্ছের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “ইতিমধ্যে টোকিওতে আমাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং তিনি দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হয়েছেন।”

এরপর সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ এবং সদস্যবৃন্দ করতালি দিয়ে সুভাষ বসুকে স্বাগত জানান। রাসবিহারী বসু প্রবাসে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের দায়িত্ব নেয়ায় সুভাষ বসুকে ‘নেতাজি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। রাসবিহারী বসুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই মহাসভায় সুভাষচন্দ্র বসু দু’ঘন্টাব্যাপী এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন।

সুভাষচন্দ্র টোকিওতে এসে পৌঁছান ১৯৪৩ সালের জুন মাসে। পরের মাসে সিঙ্গাপুরে এসে ফৌজে যোগ দেন। রাসবিহারী বসু সুভাষচন্দ্রের হাতে আজাদ হিন্দ ফৌজের ভার তুলে দেন। বাহিনী সুভাষচন্দ্রকে অভিবাদন জানায় ‘নেতাজি’ নামে। সিঙ্গাপুরে ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর নেতাজি “আর্জি-হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ” বা “অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার” প্রতিষ্ঠা করেন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আনুষ্ঠানিকভাবে ছিলেন আজাদ হিন্দ সরকারের রাষ্ট্রপতি এবং সমর ও পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী।

ক্যাপ্টেন ডাক্তার লক্ষ্মী স্বামীনাথন (লক্ষ্মী সেহগল) ছিলেন নারী সংগঠন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী। এই দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের মহিলা ব্রিগেড  ঝাঁসির রানী রেজিমেন্ট কম্যান্ডের দায়িত্বেও ছিলেন। এশিয়ায় এই ধরণের নারীবাহিনী ছিল সর্বপ্রথম এবং এক সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।

অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকারের মন্ত্রিসভার অন্যান্য মন্ত্রীরা হলেন:

এস. এ. আইয়ার – সম্প্রচার ও প্রচারণা মন্ত্রী
লেফট্যানেন্ট কর্নেল এ. সি. চ্যাটার্জি – অর্থমন্ত্রী

আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা মন্ত্রী ছিলেন এঁরা হলেন:

লেফট্যানেন্ট কর্নেল আজিজ আহমেদ
লেফট্যানেন্ট কর্নেল এন. এস. ভগত
লেফট্যানেন্ট কর্নেল জে. কে. ভোঁসলে
লেফট্যানেন্ট কর্নেল গুলজারা সিংহ
লেফট্যানেন্ট কর্নেল এম. জেড. কিয়ানি
লেফট্যানেন্ট কর্নেল এ. ডি. লোকণাথন
লেফট্যানেন্ট কর্নেল এহসান কাদির
লেফট্যানেন্ট কর্নেল শাহনওয়াজ খান

আজাদ হিন্দ সরকার সংগঠন ও প্রশাসন পরিচালনায় নিযুক্ত সচিব ও উপদেষ্টারা হলেন:

এ. এন. সহায় – সচিব
করিম ঘানি
দেবনাথ দাস
ডি. এম. খান
এ. এল্লাপা
জে. থিভি
সর্দার ইসের সিংহ
এ. এন. সরকার – আইন উপদেষ্টা

১৯৪৪ সালের ২১ মার্চ ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ ভারতভূমির মনিপুরে প্রবেশ করে। ইম্ফল ও কোহিমায় আজাদ হিন্দের পতাকা উত্তলিত হয়। এই ফৌজের কার্যাবলী খুব দ্রুত ভারতব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু জাপান ১৯৪৫ সালের শুরুতে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’কে সহযোগিতা করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা প্রত্যাহার করে নেয়।

Subhas Bose_Lakshmi Sehgal

ঝাঁসির রানী ব্রিগেড পরিদর্শন করছেন সংগে লক্ষ্মী সেহগল

১৯৪৫ সালে ১৫ আগস্ট দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু হিন্দ ফৌজকে ভেঙ্গে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান। কেউ জানে না কোথায় আছেন তিনি। তন্ন তন্ন করে খুঁজছে তাঁকে বৃটিশ সরকার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত পূর্ব রণাঙ্গনের জাপানি সেনাবাহিনীর মনোবল একেবারে তলানিতে ঠেকেছিল সেই সময়েই সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুর থেকে ব্যাংকক হয়ে সাইগনে পৌঁছেছিলেন। অনেক চেষ্টার পরে একটা জাপানি বোমারু বিমানে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি।

বিমানঘাঁটিতে তাকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের যেসব সহকর্মী, তাদের সঙ্গে করমর্দন করে ‘জয় হিন্দ’ বলে অভিবাদন জানিয়ে কিছুটা লাফিয়েই বিমানের সিঁড়িগুলো বেয়ে উপরে উঠে গেলেন নেতাজি। অন্যদের ‘জয়-হিন্দ’ অভিবাদন জানিয়ে তার এডিসি কর্নেল হাবিবুর রহমানও বিমানে উঠলেন।

Subhas Bose01

নেতাজির পেছনে বাঁদিক থেকে দাঁড়িয়ে প্রথম, এডিসি কর্নেল হাবিবুর রহমান

কথিত আছে, বিমানটিতে ক্রুসহ ১৪ জন ছিলেন। পাইলটের ঠিক পিছনেই নেতাজী বসেছিলেন। নেতাজীর পিছনেই ছিলেন কর্নেল হাবিবুর। বিমানে চড়ার পর জাপানিরা নেতাজীকে সহ-পাইলটের আসনে বসার অনুরোধ করলেও সেই অনুরোধ তিনি বিনম্রভাবে ফিরিয়ে দেন।

দুপুর দুটো ৩৫ মিনিটে বোমারু বিমানটি রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উড়েছিল। ধারণা করা হয় সে দিনটি ছিল ১৯৪৫ সালের ১৯ আগষ্ট। কিন্তু অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশ্যে যাবার পথে ফরমোজার (বর্তমানে তাইওয়ান) আকাশে এই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তবে তাঁর মৃত্যুর সঠিক তারিখ ও স্থান সম্পর্কে এখনো বিতর্ক রয়েছে। তাঁর দেহাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তথ্যসূত্র:
১) বাংলার পাঁচ স্মরণীয় বিপ্লবী: সম্পাদনা-দেবপ্রসাদ জানা;
২) আমি সুভাষ বলছি: শ্রীশৈলেশ দে;
৩) বাংলা ছোটদের সুভাষ চন্দ্র: কালীপদ দাস;
৪) আধুনিক ভারত: প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়;
৫) gunijan.org.bd
৬) লেইড টু রেস্ট: আশিস রায়;

ছবিসূত্র: ইন্টারনেট

লেখক: সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.