দিলারা হাফিজের কবিতা

Comments

কেউ একজন

যখন আমি আর একদণ্ড
অপেক্ষা করবো না,
জ্বলন্ত অগ্নি…
তখন বুঝবে তুমি 
কেউ একজন ছিলো
তোমার সত্য ও সুন্দরকে পাহারা দিতে…

তোমার কোমল হৃদয়টি যেন ব্যথা না পায়,
শূন্যতার গভীর খাদে পিছলে না পড়ে যাও,
ভুল সুখ খুঁজে অযথা বিব্রত না হও…

কেউ একজন এসব চেয়েছিলো তোমার জন্যে
সেই হাহাকারটুকু পড়ে থাক তবু
আমাদের সেতু পথ-জুড়ে।

২৬/১০/২৩ –  টরন্টো

এখানে জীবন

এখানে জীবন গায় গান একা আপন সুরে
এখানে জীবন শীত ও শীতেল বাতাসে ওড়ে
জীবন এখানে হেঁটেই বেড়ায় নিজের ছায়ায়
জীবন এখানে ম্যারাথনে খোঁজে আনন্দ-ভোর
জীবন এখানে জীবনের রসধামে বাড়ে
জীবন এখানে প্রকৃতির আলিঙ্গনে বাঁচে 
জীবন এখানে জলের কলরবে সরোবর
জীবন এখানে প্রাণিকুলের মিলমিশ
জীবন এখানে প্রাণের গভীরে নড়ে
জীবন এখানে বাইসাইকেলে চড়ে
জীবন এখানে স্ট্রিট-কার ছেড়ে সাবওয়ে ধরে
জীবন এখানে টিকি-ট্যাক্সি চড়ে নাচে
জীবন এখানে রেড ওয়াইনে ছিপি খোলে
জীবন এখানে জরা-মৃত্যুও দেখে অবিরত
জীবন এখানে হোমলেস-হোমে বসত করে।

২৪/৯/২৩  –  টরন্টো

নিদয়াল তুমি

দয়াল, চোখে জল আসে তোমার নামে,
যে দিকে ফেরাই চোখ
তোমাকেই দেখি নয়নে নয়ন,
সব পথ শেষ হয় তবু তোমারই বুকের গানে।

স্মৃতির ঝর্ণাতলায় আজো তো
বিরহে অচঞ্চল, ভিজে যাচ্ছি
পুড়ে যাচ্ছি, নিভে ভিজে যাচ্ছি রোজ
দহনেও একি অপরূপ তুমি
প্রেমে ও পূজোয়।

২৮/১০/২৩  –  টরন্টো

অভিন্ন

আহা সন্তান, 
জানি না কোথা থেকে এসেছো তুমি—পক্ষপুট,
আমার কল্পনায় ছিলে তুমি কুসুমিত শিল্পকলা—
তোমাকে রচনা করেছি মাত্র ২৮০দিনের উষ্ণতায়
আমার রক্ততিলকে লেখা তুমি এক ক্লাসিক মহাকাব্য,
তুমিই আমার প্রশান্ত মহাসাগরের পুবালি হাওয়া…

কেবলি ভাবি—কে আর এমন করে হাতটি বাড়িয়ে দেয়
যখন আমি স্কেলিটরে ভীত-বিব্রত পা বাড়াই 
যখন আমি অন্যমনস্ক ওপরে-নিচে 
ধুপ-ধাপ সিঁড়ি ভাঙি শঙ্কিত,
কে আর এমন করে পরম মমতায় 
নিজের হাতটি বাড়িয়ে দেয়, যেন পড়ে না যাই।

যখন আমি সাবওয়ের দরোজা ধরতে যাই
সে বলে ওঠে, এখানে জার্ম থাকে মা,
এটা না, তুমি আমার বাম হাতের কনুইটা ধরো
তুমি তো সেনিটাইজার রাখো না ব্যাগে,
দাঁড়াও, আজই এক ডজন নিয়ে আসবো তোমার জন্যে।
সাবওয়ের ভীড়ের মধ্যে যবে আমি বসে থাকি,
তখন আমাকে ঘিরে সে দাঁড়ানো পুষ্পরথ…

হঠাৎ সে বলে ওঠে, এই স্টেশন পরেই আমি 
কিংস স্ট্রিটে নেমে যাচ্ছি—মা,
বলেই কপালে আলতো চুমু রেখে বিদায়-বলতে
থমকে দাঁড়ায়, পুনরায় বলে,
এখান থেকে কিছুটা দূর, তোমাকে একা যেতে হবে,
পথ হারিয়ো না আবার!
ইউনিয়নে নেমে ফাইভ টেন স্ট্রিটকার ধরবে—
বুঝলে—বাসায় পৌঁছে একটা কল দিও, 
ওহ্, শোন, হাতটি কিন্তু ধুয়ে নিও সবার আগে।

কে আর এমন করে বলে, আমি জানি না।

মাঝে মধ্যে ভাবি, সেকি কিছুটা তার পিতার মতো,
সামান্য এক ঝোলাব্যাগ কাঁধে, একজোড়া ভেজাচোখ নিয়ে 
যে এসেছিলো আমার একান্তে…
অবশ্য সঙ্গে ছিলো অসামান্য কিছু কবিতা,
ব্রজবুলি প্রেম ও প্রত্যয়ের বর্ষাতি…
এছাড়া সেদিন ছিলো না…. আর কিছুই…
আজো তার ভালোবাসায় অন্ধ আমি 
হারিয়ে ফেলি চেনাপথ…
বার বার হারিয়ে ফেলি এই অচেনাকে…

মা-বাবার জন্যেই যেন জন্মেছো অভিন্ন
এই পৃথিবীর নোঙর,
এমন অলৌকিক ব্রত কাঁধে নিয়ে স্বেচ্ছায় 
তুলে নিয়েছে শূন্যতার ঝোলা, 
তুচ্ছ করে চলেছে সে যত শত পার্থিব-পলাশ…

আহা সন্তান,
চোখের নোনাজল ছাড়া কি আর আমি 
রেখে যাবো তোর জন্যে?

২৬/১০/২৩  – আইসবোট টেরেস, টরন্টো

প্রস্থানভূমি

হাত ছুঁয়ে—হাত ছেড়ে দিই,
নত হয় প্রস্থানভূমি,
কতবার ছুঁয়ে ছুঁয়ে না ছোঁয়া জলে 
সঞ্চিত করি তৃষ্ণার-মন্ত্র
একটি চুম্বন উড়ে গেলে
বাতাস গান গায় পূর্বরাগে—

দীর্ঘ রাত্রির অন্ধকার ছাই হলে
ফিরে আসে রূপকথার প্রান্তর।

১১/১২/২৩  –  ধানমণ্ডি, ঢাকা

অস্থির প্রণয়

জানি বেঁচে থাকার মূল সূত্র প্রণয়-ভৈরবী
মানবের প্রেম এবাদত, আরাধনার নিয়ামক,
নিভৃত প্রেম, চঞ্চল প্রেম, অস্থির প্রেম
প্রেমের এই নানারূপ বৈচিত্র্যের বাহার
রূপে-রঙে গন্ধ-সৌরভে 
দ্বিধাগ্রস্ত নারী-পুরুষ,
অথচ সতত তার সাধনায় সে আমূল পাল্টে যায়—

চল্লিশ বছর আগে চেনা মুদিদোকানদার 
হঠাৎ দেখতে পেয়ে ছুটে এসে যখন 
নিজের পরিচয় বলে এবং 
কুশলাদি জানতে চায় আমারও
প্রসঙ্গত, কবি স্যারের স্মৃতিচারণ করে,
এর নাম কি তবে—নিভৃত প্রেম?

যখন তরুণ্যে মাতোয়ারা ফেসবুক ফ্রেন্ড
বার বার ম্যাসেঞ্জারে নক করে
এবেলা ওবেলা শুভ সকাল ও সন্ধ্যার
সেঁজুতি জ্বালায় 
কি বলবো তাকে?
চঞ্চল প্রেম…

যখন কেউ প্রেমপ্রার্থী, হাজারটা প্রশ্ন মনে
কিংবা হাই-বাই লিখে সেন্ট করে নানাকিছু
দিনের পরে দিন অপেক্ষা শেষে
বেদনাতুর মেসেঞ্জার স্লেট থেকে
প্রার্থিতা উইথড্রো করে আশাহত…

ভাবছি, এর নাম দিবো
অস্থির প্রণয়!!!

৬/১২/২৩  –  নিউমার্কেট, ঢাকা

তুমি কি সেই মানুষটা

তুমি কি আমার সেই মানুষটা?
সমুখে দাঁড়ালে যার,
পৃথিবী আমার যায় খুলে যায়
বুকের সিংহ দরোজা ডাকে, আয়-আয়…
মগ্নপথের জলাধারে যায় ভেসে যায় গন্ধ বকুল,
চোখের পাতায় একটু ছোঁয়া 
এক জনমের ভরসা পায়,
ব্যাকুলতর অন্ধকার মুক্তি খোঁজে অনন্যোপায়।
তুমি কি আমার সেই মানুষটা?

১০/১২/২৩  –  ধানমণ্ডি, ঢাকা

লেখক:
Dilara Hafiz 3
দিলারা হাফিজ, কবি, লেখক ও গবেষক 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট