দীপায়ন ভট্টাচার্যের কবিতা

Comments

নিভন্ত

যাযাবর বসন্তের গা ঘেঁষে
এক অখ্যাত রাত নেমে এসেছিল
তোমার ঘুমন্ত মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে
নিবিষ্ট নজরে তাকিয়ে ছিলাম
মোমবাতির আলোয় নিটোল মুখ বেয়ে
চার-পাঁচটি শাখানদী বয়ে যাচ্ছিল,
সাদা ভাবলেশহীন সবক’টি-
আমার ভেতরে তখনো সজাগ হয়নি ওথেলো 
কোনো প্ররোচনায় কান দিইনি
কিন্তু কুহক নিতান্ত অপছন্দ করি আমি 
এও স্হাণু সত্য,
কোণের টেবিলে নীল কালির দোয়াতটা ওল্টানো

শীত জাঁকিয়ে বসলে হেমন্তের দৈনন্দিন বিকেল
ভুলে যাওয়া আমাদের পুরোনো অভ্যেস,
ভালোবাসার আভাসটুকু না দিয়ে
কেবল আঙুলে আঙুল জড়িয়ে হেঁটে যাওয়া
এর চেয়ে ঢের ভালো ছিল

নীল কালিতে রুপোলি শিখা তখনো কাঁপছিল
তোমাকে ডেকে তুলিনি আর-
ঘুমন্ত কিছু মানুষ জেগে উঠলে মৃত হয়ে যায়।

তলব

এই বয়সে ঘুমোনোর পর অবচেতনে
দিনা জেগে ওঠে,
মাথা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে
শিরা দিয়ে বয়ে যায় ঝেলাম

মৃতদেহের স্তূপ ও পরিযায়ীদের মিছিল
আমাকে ঘুমোতে দেয়নি বহুবছর
বইয়ের পাতা উল্টে অবলম্বন খুঁজেছি
লণ্ঠনের আগুনকে গল্প শুনিয়েছি
অনুভবে অন্বেষণ করেছি কত উত্তর
যা জীবন জিজ্ঞেস করে এসেছে এত বছর
শব্দ ওজন করে একে একে ফিরিয়ে দিয়েছি সব
প্রেম ও অভিমান প্রাজ্ঞ করে তুলেছে আমায়

পশমী রাতে দিনা কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে!
চোখ বুজলে ক্রমাগত ধোঁয়া ওঠে ঝেলাম থেকে।

অন্ধযুগ

আদিকাল থেকে সামলে রাখা
মুঠোবন্দী বালির মতো মুহূর্তেরা
প্রজন্মান্তরে এসে প্রত্যঙ্গ অবশ লাগে
যুদ্ধবাজের শরীরে আঁটা বাৎসরিক বর্ম
আস্তিনে লোকানো বন্ধুতার তাস

অগ্নিভ আহুতি সোমরস দিয়ে পূর্ণ
নেশাতুর কব্জায় উন্নাসিক সমর্পণ
চৈতন্য ক্রমশ নিরুপায়, সম্মোহন গর্বিত 
খাণ্ডবদাহনের অধ্যক্ষ বদলায় মধ্যরাতে

মুহূর্তেরা পাতালমুখে তাকিয়ে রয়েছে অপারগ অপেক্ষায়

ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা এখন অতিরঞ্জিত মনে হয়,
শরশয্যা নয়।

ব্যবচ্ছেদ

নিহত হওয়ার পর যে লাশকাটা ঘরে
আমাকে আনা হলো, তার ভেতরে
কোনো আলো ছিল না,
মাথার উপর জমে থাকা কিউমুলোনিম্বাস মেঘ
টেবিলের পাশের করিডর দিয়ে
সোজা চলে গেলে বটগাছটা,
ওর পাশের মেঠো পথ ধরে গ্রামের বাড়ি

আমার পাকস্থলীতে তখনো বিষম ঘণ্টাধ্বনি
আধপোড়া চুলে শিশির মাখানো,
সার্জেনের অভ্যস্ত হাতে জেগে উঠছে
গতজন্মের পরিযায়ী শীতরাত্রিগুলো
বুকের পাশে কোনো চেনা পকেট ছিল না
বলে কেউ ঠিকানা খুঁজে পায়নি,
ভাগ্যিস!

তলপেট বেয়ে কারখানার তিন বছরের ভোঁ
গড়িয়ে চলে গেছে টেবিলের তলায়,
গ্রামের বাড়ি থেকে শোনা অসম্ভব
জেলাজুড়ে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি শুরু হলো

বটগাছের গায়ে বুলেটপোড়া একটা দাগ-
সাইরেনে তিরতির কেঁপে ওঠে
একনিষ্ঠ শুকনো ছালগুলো

দেখা হলে, জানিও
আমার হত্যাকারীকে।

উন্মাদটার জন্য

উন্মাদটাকে নিজের মতো থাকতে দাও
ও ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খাক
ছেঁড়া ময়লা কম্বল জড়িয়ে শুয়ে থাকুক
উদাত্ত কণ্ঠে আওড়াক মেঘনাদবধ
বিড়বিড় করুক দেশভাগ, একাত্তর

নিজের ব্যাসার্ধ বহির্ভূত চলমানতা দিয়ে
যখন রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করবে
কয়েক পা এগিয়ে এসে ঘোলাটে চোখে
তোমার দিকে তাকাবে
তুমি যেন পালাবার পথ না পাও
যেন যাতায়াতের পথ বদলে দাও

তোমার আশৈশব সংক্রমণ যেন কোনোভাবেই
ওই উন্মাদকে স্পর্শ না করে!

লেখক:
Dipayan Bhattacharjee
দীপায়ন ভট্টাচার্য
কবি, মুক্তগদ্য লিখিয়ে, শর্টফিল্ম ও ফটোগ্রাফি কুশীলব, কোলকাতা, ভারত।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট