। ড. নিজামউদ্দীন আহমেদ ।
সেই সময়ের অন্য সবার মতো আমার জীবনেও একাত্তর সবচেয়ে ঘটনাবহুল এবং অনপনেয় একটা বছর। আমি তখন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। যুদ্ধ শুরুর আগেই আমরা যার যার বাড়ি চলে যাই। পঁচিশ মার্চ কালরাতে গণহত্যার বিষাদে নিমজ্জিত বাঙালির রুখে দাঁড়াবার যুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন আমি পুরো পরিবারের সাথে ঢাকায় আমাদের বাসায়।
আবাসিক কলেজে চার দেয়ালের ভিতর জীবন কাটালেও দেশব্যাপী প্রবহমান উত্তেজনা তখন ছুঁয়ে গেছে দেশের আনাচকানাচ। আমাদের মতো তরুণরা তখন সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও ক্রোধে ফুসছে। ঢাকা শহরে আমার বন্ধুমহলেও একই উত্তাপ বিরাজমান। শুনতে পাচ্ছি অনেকে পালিয়ে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে, ওখানে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে অনেক জায়গায়। আমরা কয়েক বন্ধু গোপনে গোপনে যোগাযোগ রেখে সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম, যুদ্ধে যোগ দেবো। সবাই উৎকণ্ঠিত– বাসায় বললে অনুমতি পাবো কি-না। অতএব বাসায় কিছু না জানিয়েই আমরা কয়েকজন পালিয়ে ঢাকা ছাড়লাম। উদ্দেশ্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইন্ডিয়া যাবো। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেবো। দীর্ঘ সময় পথ পাড়ি দিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী পৌঁছে গেলাম মেলাঘর। খালেদ মোশারফের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ চলছে ওখানে। দলে দলে অকতোভয় উদ্যমী বাঙালি ট্রেনিং নিচ্ছে। তারপর দেশের নানান স্থানে মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডের অধীনে যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। আমাদের সম্পৃক্তি ঘটলো দুই নম্বর সেক্টরের অধীনে। ট্রেনিং শেষে আমি যেখানে যুদ্ধে যোগ দিলাম সেখানে সাদেক হোসেন খোকাও (পরবর্তীকালে ঢাকার মেয়র) আমার সহযোদ্ধা ছিলেন।
প্রথম দিকে আমাদের কয়েকজনের দায়িত্ব ছিল কসবা এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মরক্ষামূলক অবস্থানগুলো গড়ে তোলা এবং সেগুলোর নিরাপত্তা বিধান করা, রক্ষা করা। কসবা এলাকার আশেপাশে তখন মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানী বাহিনী কিংবা তাদের দোসরদের সাথে হরহামেশা খণ্ডযুদ্ধ লেগেই থাকতো। কিছুকাল এভাবে ওখানে থাকার পর অবস্থান সুসংহত হলে আমরা নরসিংদির দিকে অগ্রসর হই। তারপর নরসিংদি থেকে এগোতে শুরু করি ঢাকার দিকে। উদ্দেশ্য পাকিস্তানি বাহিনীর স্থাপনাগুলো অর্থাৎ ক্যাম্প বা অবস্থানগুলোতে হামলা করে হটাতে হটাতে ঢাকায় গিয়ে ওদের উপর চূড়ান্ত হামলা চালানো। পথিমধ্যে আমাদের এক সহযোদ্ধা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো তার দেখাশোনা করার জন্য দল ছেড়ে তাকে নিয়ে পেছনে রয়ে যেতে। দল এগোতে থাকলো। পরে আমাকে আবার নির্দেশ দেয়া হলো তাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে।
ঢাকায় ফিরে মন টানলো পরিবারের সবার সাথে দেখা করতে কিন্তু দেখা করতে গিয়ে আটকা পড়লাম। এতদিন ধরে আমার জন্য দুশ্চিন্তায় গোটা পরিবার গভীর শঙ্কা ও উদ্বিগ্নতায় সময় পার করেছে। আমাকে ফিরে পাওয়ার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অল্প কিছুদিনের মধ্যে জোরপূর্বক পশ্চিম পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয় এক আত্মীয়ের বাসায়। না বলে যুদ্ধে চলে যাওয়া ঘিরে বাসায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমি বাবা-মাকে না করার সাহস পেলাম না।
কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছার পর থেকেই ফের পালাবার উপায় খুঁজতে শুরু করলাম। আরো দুজন সঙ্গীও জুটিয়ে ফেললাম। আমরা কয়জন মিলে ফের পালালাম। তবে এবার সোজা ঢাকায় বা দেশে ফিরবার উপায় না পেয়ে গন্তব্য ঠিক করলাম আফগানিস্তান। স্থির করলাম কাবুল যাবো তারপর ওখান থেকে দেশে ফেরার পথ খুঁজে বের করবো। ১৫০০ রুপি দিয়ে একজন গাইড ভাড়া করলাম, যে আমাদেরকে সীমান্ত পার করে আফগানিস্তান পৌঁছে দেবে। এক সপ্তাহ সময় ধরে পায়ে হেঁটে, গাধার পিঠে আর ঘোড়ার ক্যারাভানে চড়ে আমরা জালালাবাদ পৌঁছাই। সেখানে পৌঁছে প্রথমেই আমরা গেলাম ভারতীয় দূতাবাসে। তারা আমাদের আশ্রয় দিল এবং দিল্লি যাবার ব্যবস্থা করে দিল। দিল্লি থেকে ভারত সরকারের সহযোগিতায় অবশেষে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে আমরা যখন দেশে প্রবেশ করলাম। দেশ তখন এক স্বাধীন ভূখণ্ড, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধে আমার সম্পৃক্ততা যতটুকু সামান্যই হোক, বাঙালির উপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচার, নিপীড়ন, নিগ্রহ আর শোষণ এবং সর্বোপরি গণহত্যার ঘৃণ্য নজির আর তার বিপরীতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ আপামর বাঙালির যে সংগ্রাম ও জনযুদ্ধ অন্তরে তার আবেগ উত্তাপ তীব্র প্রখর ও জ্বলজ্বলে।
দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে তরুণ প্রজন্মের সাথেই কেটেছে আমার সিংহভাগ সময়। আমি সবসময় তাদেরকে সত্যের জন্য সোচ্চার হতে বলেছি। সংকোচ ও সংশয় ঝেড়ে ফেলে প্রকাশোন্মুখ হতে পরামর্শ দিয়েছি। বলেছি স্পষ্টবাদী ও নির্ভীক হতে, কেননা আমার বিশ্বাস এই তরুণদের মাঝেই সুপ্ত আছে একজন বঙ্গবন্ধু কিংবা মহাত্মা গান্ধীর অস্তিত্ব।
আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, যখন খুব সহজেই একটা মিথ্যাকেও সত্যের পরিচয়ে দাঁড় করিয়ে ফেলা যায় তখন সেই মিথ্যের বলয় ভাঙতে আমাদের খুব প্রয়োজন সাহসী ও সত্যনিষ্ঠ তারুণ্য। আমি চাই উচ্চশিক্ষা বা কর্মজীবনের তাগিদে পৃথিবীর যে প্রান্তেই তাকে যেতে হোক, কল্যাণ ও অবদানের প্রশ্নে অর্জনের ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশই যেন তার চূড়ান্ত গন্তব্য হয়।
লেখক:
ড. নিজামউদ্দীন আহমেদ
মুক্তিযোদ্ধা, স্থপতি;
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ও সফল ব্যবসায়ী
উপাচার্য, বিইউএফটি (বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এণ্ড টেকনোলজি)
কমনওয়েলথ স্কলার ও কমনওয়েলথ ফেলো
বাংলাদেশে একমাত্র ব্যাডেন পাওয়েল ফেলো
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সিলভার টাইগার খেতাবপ্রাপ্ত
চার্টার প্রেসিডেন্ট রোটারিয়ান