ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত পাবার বিষয়টিকে শোরগোল করে প্রচার করা হচ্ছে হাল্ আমলের একটা স্মার্ট ধর্মীয় ফ্যাশন। এই ফ্যাশনের ডিজাইনার হচ্ছে মুসলমান ধর্মের অনুসারী উগ্রবাদী গোষ্ঠীসমূহ। বাংলাদেশের জন্য কাজটা করছে স্রেফ জামাত-শিবির; নানা নামে, নানা ঢংয়ে।
নেপথ্য ফ্যাশন ডিজাইনার জামাত-শিবির হলেও এই দেশের ইসলাম ধর্ম-প্রবণ সাধারণ মানুষকে তারা এই ফ্যাশন ভালমতোই রপ্ত করাতে পেরেছে। বুঝে হোক আর না বুঝেই হোক একশ্রেণীর মানুষ ধর্ম রক্ষার নামে বিশাল হৈ চৈ করছে যা প্রত্যক্ষভাবে ধর্মব্যবসায়ীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। আর সে কারণেই মহাসমারোহে চলছে ধর্মানুভূতি বাণিজ্য।
সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হালকা সুড়সুড়ি মতো ধর্মানুভূতি তৈরি করে তাকে পূজি করে চালানো হচ্ছে এ বাণিজ্য। আপনার সরল ধর্ম অনুভূতিকে খুব সূক্ষ্মভাবে অন্য কেউ কাজে লাগিয়ে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, এ ব্যাপারে আপনি কতটুকু সচেতন তা নিজেকে প্রশ্ন করে জেনে নিন।
এই দেশের আপামর ধর্মপ্রবণ জনগণের সম্পর্কে আমার ধারণা খুব একটা সুবিধার না। কারণ, ধর্মকে রক্ষার নামে আমাদের দেশের মানুষজনকে খুব সহজেই নানান স্বাদের টোপ গিলিয়ে বিভ্রান্ত করা যায়। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য সেই টোপই গেলানো হয়। এতে যারা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদেরও দায় আছে।
ধর্মানুভূতিতে আঘাত পাবার বিষয়টিকে যত্রতত্র ব্যবহার করার মানে হচ্ছে, দুনিয়ার সকল অসততাকে ধারণ করে নিজেকে ধর্মপ্রাণ হিসেবে জাহির করা। এটা একটা যুতসই ও কার্যকরী পন্থা। মানুষের কাছ থেকে সস্তা বাহবা পাওয়ার জন্য বিনা চালানে ধর্মানুভূতির বিনিয়োগ।
ধর্ম-চর্চাকে আমলে নিলে দেখা যায়, এই দেশের অধিকাংশ মানুষই অসততাকে ধারণ করে এবং তার সাথে ধর্মের মিশ্রণ ঘটায়। তারা ধর্মপ্রাণ না- ধর্মান্ধ অথবা ধর্মপ্রবণ। ধর্ম ও অসততার এই মিশ্রণ সমাজের সর্বনাশ করার জন্য অনেক বেশি দায়ী। যে দেশের মানুষ ধর্মকে ধারণ না করে সততাকে ধারণ করে সেই দেশের অবস্থা আমাদের মতো এতো খারাপ না। যে কয়জন মানুষ নিয়মিত নামাজ পড়েন শুধুমাত্র সেই কয়জন মানুষও যদি প্রকৃত ভালো মানুষ হতো তবে দেশের বাকী সকল মানুষ খুব খারাপ হলেও দেশের এই দুরাবস্থা হবার কথা না।
ধর্মপ্রাণ সাজা আর প্রকৃত ধর্মপ্রাণতাকে ধারণ করা এক কথা নয়। ধর্মের নামে কিছু একটা শুনলেই যারা ধর্ম গেল, ধর্ম গেল বলে শোরগোল তোলেন তারা সঠিক কাজটি করেন না। সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষ মনে করতে পারেন যে, তিনি তার চেতনা থেকেই ধর্মের বিষয়ে কটাক্ষের ব্যাপারে প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু তারা বুঝতেও পারেন না যে, এটা সাজানো, তার মধ্যে খুবই সূক্ষ্মভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া একটা প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ।
ধর্ম কী এতো সহজে যাবার জিনিস যে কিছু একটা হলেই তা চলে যাবে! কেউ যদি এরকম মনে করেন, তবে এটা একদিন এমনিতেই চলে যাবে, জোর-জবরদস্তি করে এটাকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। ধর্মকে মহান হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের চরিত্র ও চর্চা ভাল করেন, নিজেকে আদর্শ ও অনুকরণীয় করে গড়ে তোলেন। এটা যদি করতে পারেন তবে অন্য কোনোকিছুই করার দরকার পড়বে না। গুলি-চাপাতি, কামান-বন্দুকের শক্তির চেয়েও ওই আদর্শ অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর, স্থায়ীও বটে।
ধর্ম গেল, ধর্ম গেল বলে যারা খামোখাই মাঠ গরম করে ধর্মপ্রাণতা দেখাতে ব্যস্ত- নীতি, চর্চায়, আদর্শে, মননে এ সব মানুষেরা খুবই অনাদর্শিক। ধর্ম খালি ওদের গলাবাজিতে, কাজে-কর্মে নয়। দেশের কয়টা মসজিদ সৎ টাকায় প্রতিষ্ঠিত, নিষ্কণ্টক জমিতে এবং শুধুমাত্র নামাজের উদ্দেশ্য তৈরি? নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে খোঁজ নিয়ে দেখুন, শর্ষের মধ্যে ভূত কেমনে বসবাস করছে তা সহজেই বুঝতে পারবেন।
পাবলিক সেক্টরের চাকুরেরা সবাই ধর্মবিশ্বাসী- বুকে হাত দিয়ে বলেন সুযোগ থাকার পরেও তাদের কয়জন ঘুষ খায় না। যারা ঘুষ দেয় তারাও ধর্মবিশ্বাসী। ধর্ম তো মানেন- ঘুষ ছাড়তে পারবেন? পারবেন না, যদি পারতেন তবে ঘুষ ধরতেনই না। ধর্ম আগেও বিশ্বাস করতেন, এখনও করেন। বিশ্বাস করতে করতেই ঘুষ খাওয়া শুরু করছেন এবং চালিয়ে যাচ্ছেন, যাবেনও বটে। ধর্মটা কিন্তু ঠিকই কপচাচ্ছেন এবং যারা একটাও খারাপ কাজ করে না শুধু ধর্মাচার থেকে বিরত, তাদেরকে আপনার অসৎ পথে আসার আহ্বান জানিয়ে নিজেকে সুপিরিয়র হিসেবে দেখছেন। নিকুচি করি আপনার ঐরকম ধর্ম চর্চার।
একজন নাস্তিকের মধ্যে যে সততাটুকু আছে, মানবিকতাটুকু আছে তারসাথে তুলনা করে দেখুন বিশ্বাসী হিসেবে আপনার অবস্থান কোথায়? আপনি ধর্ম মানেন আরেকজন মানেন না- শুধু এইটুকুর জন্য নিজেকে মহৎ এবং উপরের মানুষ না ভেবে, আপনি তার চেয়ে কতোটা ভাল মানুষ, ভাল কাজ করেন, মানবিক কাজ করেন সেটার তুলনা করেন। বিবেক বলে যদি কিছু থাকে তবে দেখবেন আপনি এতো নিচেয় পড়েছেন যে ক্রেন দিয়ে টেনেও আপনাকে তার সমান করা সম্ভব নয়। নিজেদের নড়বড়ে নৈতিক অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়েই ধর্মীয় শোরগোলকারীরা ভীত।
মানবিকতার দৃষ্টিতে ধর্মীয় আর বিধর্মীয় বিষয়টি বিবেচ্য নয়, মানুষ হিসেবে ভালো আর মন্দ বিষয়টাই বিবেচ্য। ধর্ম মানলাম, ধর্মের লোকায়ত চর্চাটা দেখালাম আর দুনিয়ার সকল অপকর্ম করে বেড়ালাম- এটা কোন ভাল কাজ নয়। এর চেয়ে বরং ধর্মাচার না করে মানবহিতৈষী কর্মকাণ্ড করাটা সমাজের জন্য বেশি হিতকর। মানবহিতৈষী কর্মকাণ্ড বেশি জরুরি।
ধর্মানুভুতি একটি আপেক্ষিক বিষয়। অন্য ধর্মকে আঘাত না করে কোন ধর্মই পালন করা সম্ভব নয়। যেমন- এক ধর্মে গান-বাজনা হারাম, অন্য ধর্মে গান-বাজনা ছাড়া ধর্ম পালনই সম্ভব না। এক ধর্মে গরু খাওয়া নিষিদ্ধ, অন্য ধর্মে উৎসব করে গরু খাওয়া হয়। অন্য ধর্ম সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলা হয় না এমন কোন ওয়াজ মাহফিল নাই। সুতরাং ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগানো একটা ফ্যাশন- কখন আঘাত লাগাবেন আর কখন লাগাবেন না সেটা হলো বিষয়।
ধর্মবিশ্বাসীদের অপকর্মের কারণেই ধর্মের উপর থেকে দিন দিন মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। ধর্মানুভূতি প্রচারের আদিখ্যেতা প্রধান হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আদর্শবান হবার কোন লক্ষণ বা চর্চা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আধুনিককালের গান যেমন শুধু শোনার বিষয় না, দেখারও বিষয়; ধর্মও তেমনি শুধু ধারণের বা পালনের নয়, দেখানোরও বিষয়। এ দায় ধর্মবিশ্বাসীদের।
লেখক:

ডা. নাজমুল হাসান, লেখক, গল্পকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ