ধর্ম-জাতপাত: লালন ও রবীন্দ্রনাথ – কিছু আলো কিছু কথা

Comments

সন্দীপ দে 

“ধর্ম যদি অন্তরের জিনিস না হইয়া শাস্ত্রমত ও বাহ্য আচারকেই মুখ্য করিয়া তোলে তবে সেই ধর্ম যতো বড়ো অশান্তির কারণ হয়, এমন আর-কিছুই না। …বিশেষ শাস্ত্রমতের অনুশাসনে বিশেষ করিয়া যদি কেবল বিশেষ পশু হত্যা না করাকেই ধর্ম বলা যায় এবং সেইটে জোর করিয়া যদি অন্য ধর্মমতের মানুষকেও মানাইতে চেষ্টা করা হয়, তবে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ কোনোকালেই মিটিতে পারে না।”

ওপরের কথাক’টি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছিলেন ‘কালান্তর’-এর ছোটো ও বড়ো’ প্রবন্ধে ।

আবার অন্যদিকে বিশ্ববন্দিত ফকির লালন সাঁই সেই কবে তাঁর গানে উচ্চারণ করেছিলেন–

“জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সবি দেখি তা না-না– না।
আসবার কালে কি জাত ছিলে
এসে তুমি কি জাত নিলে,
কি জাত হবা যাবার কালে
সে কথা ভেবে বল না।”

বাংলা সংস্কৃতির দুই মহান পুরুষ লালন সাঁই (১৭৭৪-১৮৯০) এবং রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) ধর্ম ও জাতপাত নিয়ে তাঁদের মতো করে যে অমোঘ বাণী উচ্চারণ করে গেছেন, তার প্রাসঙ্গিকতা আজও উজ্জ্বল। 

Rabindranath_Full_Ph S Ghosh

এস ঘোষের তোলা ছবিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সম্ভাব্য সন ১৯৩৫।

১৬৪তম জন্মদিনে কবি রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে গিয়ে এই মুহূর্তে নজরে আসে আমাদের দেশ তথা উপমহাদেশ এমনকী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ধর্ম ও বর্ণের নামে হিংসা, উন্মত্ততা মানবতাকে কীভাবে আঘাত করছে, মনুষ্যত্বকে পদদলিত করছে; সেই অনুষঙ্গে তাঁর ধর্ম নিয়ে নিয়ে যে ভাবনা এবং এ বিষয়ে তিনি যে অনুভব ব্যক্ত করে গেছেন সেদিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কিছুটা মনোযোগ আকর্ষিত হয়।

এই সময়েই বাংলাদেশের বুকে মহাত্মা লালন ফকিরের একটি বিখ্যাত গানের দু’টি লাইন সমাজমাধ্যমে তুলে ধরার জন্য একজন  নিরীহ মানুষকে পুলিশের দ্বারা নিগৃহীত ও গ্রেপ্তার হতে হয়। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, শরিয়তপুর জেলার মহিষার গ্রামে (উপজেলা: ভেদরগঞ্জ) সঞ্জয় রক্ষিত তাঁর ফেসবুক স্টোরিতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন লালনের অতিপরিচিত গানের দু’টি লাইন: “সুন্নত দিলে হয় মুসলমান / নারীর তবে কী হয় বিধান” …আপাতদৃষ্টিতে একটি সামান্য বিষয়কে জটিল করে একজন সাধারণ মানুষের ওপর শাস্তির খাঁড়া নামিয়ে আনে বাংলাদেশের পুলিশ। অভিযোগ তোলা হয়, সমাজমাধ্যমে এমন পোস্টের মাধ্যমে নাকি স্থানীয় তথাকথিত ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে’ এবং এতে মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়। তাই আইনশৃঙ্খলা  পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় নিরপরাধ একজনকে গ্রেপ্তার! এই গানের লাইন যদি তুলে ধরা অপরাধ হয় তবে তো স্বয়ং লালন ফকিরকেই অস্বীকার করতে হয়! এই সময়ে লালন ফকির জীবিত থাকলে কি তাঁকেও অভিযুক্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তি বিধান হতো? সার্বিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলা এবং বঙ্গবন্ধুর চেতনা ধারণ করে চলার দাবি করা সরকারের আমলে এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা কোন সংকেত বহন করে? শরিয়তপুর জেলায় ঘটে যাওয়া এই জঘন্য প্রগতিবিরুদ্ধ ঘটনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ-ধিক্কার ধ্বনিত হয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে। প্রতিবাদে শামিল হয়েছে অগ্রণী সাংস্কৃতিক সংগঠন  উদীচীসহ বিভিন্ন সংগঠন। এটা অবশ্যই আশার দিক। বিভিন্ন স্তরে প্রতিবাদের জেরে পুলিশ সঞ্জয়কে জামিন দিতে বাধ্য হয়েছে। এই ঘটনার সূত্রেই লালনের দর্শন, চেতনা ও সৃষ্টিসম্ভারের সঙ্গে আমাদের অনুভবের যোগসূত্র স্বাভাবিকভাবেই আবারও স্থাপিত হয়ে যায়। তাই এই আবহে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর সম্পর্কে আলোচনায় ভাবনার তরঙ্গে লালনের প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বৈরশাসনামলে যেমন রবীন্দ্রনাথের ওপর নিষেধাজ্ঞার ফরমান জারি হয়েছিল, তেমনি পরবর্তীকালে, এমনকী আজও বাংলাদেশে কখনো কখনো রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কট্টর মৌলবাদীদের নানা বিরূপ মন্তব্য ও অনৃতভাষণ ভেসে আসতে দেখা যায়। তাই মানুষের ভজনা করা উদার মানবতার সাধক লালনের বাণী যে এদের মনে জ্বালা ধরাবে, এদের বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাতে আর আশ্চর্যের কী!

আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথতো আক্রান্ত হয়েছিলেন আমাদের দেশেও জরুরি অবস্থার কালোদিনগুলোতে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে তাঁর চিন্তা ও আদর্শকে নস্যাৎ করার অপচেষ্টা হয়েছে প্রগতিবিরোধীদের দ্বারা, তাঁর রচনাকে বিকৃত করার মতো জঘন্য নজিরও লক্ষ্য করা গেছে ।  আজ উগ্রসাম্প্রদায়িক শক্তির শাসনে বারে বারে স্বাধীন যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তার পথিকরা যেভাবে সরকারি রোষানলে পড়ছেন, হিংস্র সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন, এমনকী বেশ কয়েকজন গবেষক, চিন্তাবিদ, লেখকদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা গোটা দেশকে কালিমালিপ্ত করেছে। এই ধরনের কুৎসিত বীভৎসতা ‘পরে ধিক্কার হানতে সোচ্চার হয়েছেন ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। বর্তমান সময় ও পরিস্থিতি দাবি জানাচ্ছে, এই সমস্ত হিংসা, অরাজকতা, অনাসৃষ্টির বিরুদ্ধে শুভবোধসম্পন্ন আলোর পথিকদের নিরন্তর লড়াই কতটা জরুরি। এই লড়াই জরুরি সমাজ ও মানবতার স্বার্থে, সার্বিকভাবে দেশের কল্যাণের লক্ষ্যে — ভারত-বাংলাদেশ দু’দেশেই। এই লড়াইয়ে আমাদের অন্যতম আয়ুধ লালন-রবীন্দ্রনাথের মতো উদার মানবতাবাদী প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীরা। আজকের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায় নিয়ে চারপাশের বিভেদ-বিসংবাদ, অপহ্নবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেই এই প্রবন্ধের অবতারণা।

মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ

জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, ধর্ম, সম্প্রদায় ইত্যাদি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা বহুল আলোচিত নাহলেও এক্ষেত্রে তিনি একজন মানবতাবাদীরূপে শ্রেষ্ঠস্থানে অধিষ্ঠিত। জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন হিন্দু, আবার ধর্মচিন্তায় তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। কিন্তু কালের গতিতে তাঁর ধর্মবিষয়ে মতামত ও চিন্তার পরিবর্তন ঘটে। একইসঙ্গে অন্ত্যজ নিম্নবর্গের হিন্দু ও মুসলমানদের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিরও বিবর্তন ঘটে। এটা সম্ভব হয় ১৮৯০ সালের পর পারিবারিক জমিদারি পরিদর্শন সূত্রে শিলাইদহ আসার পর। পল্লিবাংলার সঙ্গে নিবিড় সংযোগের সূত্রে তিনি নিম্নবর্গের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে যে অমানুষিক ব্যবহার করা হতো তা তিনি প্রত্যক্ষ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন এই মানুষেরা জন্ম, পেশা বা কোনো দিক থেকেই অপমানিত বা বঞ্চিত হতে পারেন না। এখান থেকেই আদি ব্রাহ্মসমাজের আবহে লালিত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের দ্বন্দ্বের সূচনা।

১৮৮৪ সালে ‘ধর্ম’ সম্পর্কে একটি আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছিলেন:

“জগৎ কাহাকেও একঘরে করে না, ধোপা-নাপিত বন্ধ করে না। চন্দ্র-সূর্য-রোদ-বৃষ্টি জগতের সমস্ত শক্তি সমগ্রের এবং প্রত্যেক অংশ সমগ্রের দাসত্ব করিতেছে। তাহার কারণ এই জগতের মধ্যে যে কেহ বাস করে কেহই জগতের বিরোধী নহে।”

জমিদারি তদারকি করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিবিড়ভাবে জনসমাজের পরস্পরের মধ্যে সামাজিক ও ব্যবহারিক সম্পর্কের চরম অবনতি প্রত্যক্ষ করেন। তিনি এই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন ‘কালান্তর’-এর  ‘হিন্দুমুসলমান’ শীর্ষক একটি অংশে:

“অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে একধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্‌কার জন্মেছিল।”

এই একই কথার পুনরাবৃত্তি লক্ষ করা যায় ‘হিন্দুমুসলমান’ শীর্ষক ‘কালান্তর’-এর অপর একটি রচনায়। তিনি লিখেছেন:

“আমি যখন প্রথম আমার জমিদারি কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলুম তখন দেখেছিলুম, কাছারিতে মুসলমান প্রজাকে বসতে দিতে হলে জাজিমের এক প্রান্ত তুলে দিয়ে সেইখানে তাকে স্থান দেওয়া হত। অন্য-আচার- অবলম্বীদের অশুচি বলে গণ্য করার মতো মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের এমন ভীষণ বাধা আর কিছু নেই।”

চিরাচরিত প্রথার অবসান

রবীন্দ্রনাথ জমিদারির দায়িত্বভার পাবার পর ১৮৯১ সালে প্রথম শিলাইদহে এলেন পূণ্যাহ উৎসবে যোগ দিতে। এসেই প্রথমে যে বৈপ্লবিক কাজটি তিনি করলেন তা হলো, পূণ্যাহ অনুষ্ঠানে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমল থেকেই সম্ভ্রম, মর্যাদা ও জাতি-বর্ণ অনুযায়ী যে বিভিন্ন আসনের বন্দোবস্ত ছিল তা তিনি তুলে দিলেন। প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী হিন্দুরা বসতেন একপাশে চাদরে ঢাকা শতরঞ্চির উপর, তার মধ্যে ব্রাহ্মণদের জন্য স্থান ছিল আলাদা। আর মুসলমান প্রজারা বসতেন অন্য ধারে চাদর ছাড়া শতরঞ্চিতে। সদর ও অন্য কাছারির কর্মচারীরাও নিজ নিজ পদমর্যাদা অনুযায়ী  বসতেন ভিন্ন আসনে। আর জমিদারের জন্য নির্দিষ্ট ছিল ভেলভেট মোড়া সিংহাসন। রবীন্দ্রনাথ পূণ্যাহ অনুষ্ঠানে এসেই এই ব্যবস্থা মানতে অস্বীকার করলেন। এ নিয়ে নায়েব-গোমস্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে তাঁর প্রচণ্ড মতবিরোধ হলো। এমনকী তাঁরা একযোগে পদত্যাগেরও হুমকি দিলেন। তবুও নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল রইলেন রবীন্দ্রনাথ। শেষ পর্যন্ত তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সব প্রজা আসনের ভেদাভেদ তুলে দিয়ে ঢালা ফরাসের উপর বসে পড়লেন। আর সিংহাসন ছেড়ে মাঝখানে বসলেন তাঁদের ‘বাবুমশাই’– রবীন্দ্রনাথ। এই সংবাদ পেয়ে দলে দলে আরও লোক কাছারি বাড়িতে এসে সমবেত হলেন। সেদিনের ঘটনা থেকেই ঠাকুর এস্টেটের পূণ্যাহ অনুষ্ঠানে শ্রেণিভেদ প্রথা বিলীন হয়ে গেল।

Rabindranath_Full_Setted

অজ্ঞাত চিত্রগ্রাহকের ক্যামেরায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

 ‘মানুষের ধর্ম’

রবীন্দ্রনাথ কোন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন বা তাঁর ধর্মচিন্তা কী ছিল ইত্যাদির উত্তর সন্ধানে অথবা উপসংহারে পৌঁছাতে হলে আমরা দেখি তাঁর  ধর্মচিন্তা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। নিজের গভীর উপলব্ধি, মানসিক দ্বন্দ্ব বিরোধ বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতার পথ পরিক্রমা করে তিনি যে ধর্ম চিন্তায় উপনীত হয়েছিলেন তা হলো ‘মানুষের ধর্ম’। তাঁর এই ধর্ম মানুষকে মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়। মানুষকে মানুষের সাথে ঐক্যের সূত্রে গেঁথে দেয়। মানুষের ধর্মের মধ্যে মনুষ্যত্ব তার সমস্ত গুণাবলি নিয়ে সজীব থাকে। মানবমিলনই হয় তার অভিমুখ। ‘রিলিজিওন অফ ম্যান’ বক্তৃতামালায় রবীন্দ্রনাথ শুনিয়েছেন মানুষের ধর্মই পারে মানুষকে ‘অপরাজিত মানুষ’ এই আখ্যা লাভে প্রেরণা দিতে। প্রাতিষ্ঠানিক যে ধর্ম রবীন্দ্রনাথের কথায় যা  ‘সাম্প্রদায়িক ধর্ম’, যাকে তিনি কখনও বলেছেন ‘ধর্মতন্ত্র’। এর মূল উৎস মানুষের অসহায়তাবোধ, দুঃখ, বিপন্নতা, রোগজরা ও মৃত্যুজনিত ভয় এবং দুর্বলতা। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ যে ধর্মকে আত্মস্থ করে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে চান তা মূলত ব্যক্তিগত ও যৌথ জীবনযাপনের এক অতি উন্নত আদর্শ। অর্থাৎ জীবনের ইতিবাচক ও অনুকূল দিকগুলিকে আমরা কীভাবে গ্রহণ করব, কোন বস্তু, বিশ্বাস, আদর্শ  গ্রহণ বা বর্জন করব; অন্য মানুষ প্রাণী এবং বিশ্বজগতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী হবে– এই ধর্ম তার যুক্তিসংগত ও মানবিক নির্দেশ দেবে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ব্যক্তি জীবনে ধর্মে বিশ্বাসী হয়েও রবীন্দ্রনাথ সব রকম ধর্মীয় উন্মাদনা, সাম্প্রদায়িক ভেদ বুদ্ধি, অসম্প্রীতির বিরুদ্ধে আমৃত্যু সোচ্চার প্রতিবাদ ধ্বনিত করেছেন। তিনি ‘ধর্মমোহ’ (পরিশেষ ১৯৩২) কবিতায় উচ্চারণ করেছেন:

“ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে-জন মারে আর শুধু মরে।
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,
ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।
শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,
শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো।”

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এই সময়ে ভারতের মতো দেশে উগ্র ধর্মান্ধতার অভিঘাতে এক অস্থির বিকারগ্রস্ত পরিবেশে এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য।  

ঈশ্বরের নামে এবং অসহায় বিপন্ন মানুষদের দুর্বলতার সু্যোগে একশ্রেণির গুরুদেব, মহান্ত, মোল্লা, পাদরি, পুরোহিত নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে চূড়ান্ত ভণ্ডামির মাধ্যমে মানুষকে নিংড়ে যেভাবে শোষণ করে তার বাস্তব চিত্র আমরা লক্ষ করি রবীন্দ্রনাথের লেখায়-চিঠিপত্রে। তেমনই একটা দৃষ্টান্ত রয়েছে ১৯৩১ সালের ১৭ জুন তারিখে হেমন্তবালা দেবীকে লেখা এক চিঠিতে —

“গয়াতে যখন বেড়াতে গিয়েছিলাম তখন পশ্চিমের কোন এক পূজামুগ্ধা রানী পান্ডার পা মোহরে ঢেকে দিয়েছিলেন–ক্ষুধিত মানুষের অন্নের থালি থেকে কেড়ে নেওয়া অন্নের মূল্যে এই মোহর তৈরি। দেশের লোকের শিক্ষার আলো, অন্নের জন্যে আরোগ্যের জন্যে এরা কিছু দিতে জানে না, অথচ নিজের অর্থ সামর্থ্য সময় প্রীতি ভক্তি সমস্ত দিচ্ছে সেই বেদিমূলে যেখানে তা নিরর্থক হয়ে যাচ্ছে। মানুষের প্রতি মানুষের এই নিরৌৎসুক্য, এত ঔদাসীন্য কোনো দেশেই নেই, এর প্রধান কারণ এই যে, এদেশে হতভাগ্য মানুষের প্রাপ্য দেবতা নিচ্ছেন হরণ করে।”

আবার ধর্মমোহে, ধার্মিকতার ভাবালুতায় মানুষ যে কতভাবে অপমানিত, বিপর্যস্ত ও বঞ্চিত হয় রবীন্দ্রনাথ তারও স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। ১৯৩৭ সালের ২০ চৈত্র হেমন্তবালা দেবীকে লেখা আরেকটি চিঠিতে তিনি মানসিক ক্ষোভ ব্যক্ত করে লিখছেন:

মাদুরার মন্দিরে যখন লক্ষ লক্ষ টাকার গহনা আমাকে সগৌরবে দেখানো হল তখন লজ্জায় দুঃখে আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল। কত লক্ষ লক্ষ লোকের দৈন্য অজ্ঞান অস্বাস্থ্য ঐসব গহনার মধ্যে পুঞ্জিভূত হয়ে আছে। খেলার দেবতা এইসব সোনা জহরতকে ব্যর্থ করে বসে থাকুন— এদিকে সত্যকার দেবতা সত্যকার মানুষের কঙ্কালশীর্ণ হাতের মুষ্টি প্রসারিত করে ওই মন্দিরের বাহিরে পথে পথে ফিরছেন…. আমি মানুষকে ভালোবাসি বলেই এই খেলার দেবতার সঙ্গে আমার ঝগড়া।”

কবির এই বক্তব্যগুলির মধ্য দিয়ে বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রতীক পুজো, সাধনভজন ইত্যাদি আড়ম্বরপূর্ণ অপব্যয়ের চেয়ে দরিদ্র নিরন্ন হতভাগ্য মানুষদের তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং মানুষকেই দেবতার আসনে বসিয়েছেন। ভাবময়তার চেয়ে যুক্তি, বুদ্ধি, বিজ্ঞান ইত্যাদি তাঁর কাছে তথাকথিত ধর্মের চেয়ে যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাও স্পষ্ট করেছেন। তাই ধার্মিকের চেয়ে কর্মোদ্যোগী নাস্তিকের সমাদর করতে তিনি আগ্রহী। তিনি লিখেছেন:

“কত লোক দেখেছি যারা নিজেকে নাস্তিক বলেই কল্পনা করে, অথচ সর্বজনের উদ্দেশে নিজেকে নিঃশেষে নিবেদন করছে, আবার এও প্রায়ই দেখা যায়, যারা নিজেকে ধার্মিক বলেই মনে করে তারা সর্বজনের সেবায় পরম কৃপণ, মানুষকে তারা নানা উপলক্ষ্যেই পীড়িত করে বঞ্চিত করে।” (৮ আষাঢ়, ২৩ জুন ১৯৩১,চিঠিপত্র)।

রবীন্দ্রনাথ অকপটেই উল্লেখ করেছেন-

আমার ঠাকুর মন্দিরেও নয়, প্রতিমাতেও নয়, বৈকুণ্ঠেও নয়– আমার ঠাকুর মানুষের মধ্যে–যেখানে ক্ষুধা তৃষ্ণা সত্য, পিত্তিও পড়ে, ঘুমেরও দরকার আছে– যে দেবতা স্বর্গের, তার মধ্যে এসব কিছুই সত্য নয়।… যেখানে মন্দিরের দেবতা মানুষের দেবতার প্রতিদ্বন্দ্বী, যেখানে দেবতার নামে মানুষেরা প্রবঞ্চিত সেখানে আমার মন ধৈর্য মানে না।”(হেমন্তবালা দেবীকে লেখা চিঠি, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৮,চিঠিপত্র-৯ )

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’

রবীন্দ্রনাথের অনেক আগেই মরমি সাধক লালন ফকির মানবতার জয়গান করেছেন। এই উদার মানবতার সাধক জাতিভেদ প্রথা মানতেন না বলে তাঁর গান সব সম্প্রদায়ের কাছে ছিল সমান জনপ্রিয়। মানবধর্মে উদ্বুদ্ধ লালন সম্প্রদায় ছিল সম্প্রীতির ধারক ও বাহক। সৃষ্টির আদি থেকেই প্রচলিত ধর্ম জাতপাত মানুষকে নানাভাবে বিভক্ত করে সাম্প্রদায়িক  বিভাজনের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু লালন ফকির  সাম্প্রদায়িক বিভেদ-সংকীর্ণতাকে মেনে নিতে পারেননি। মরমি সাধক হিসেবে বিশেষ কোনো ধর্ম বা জাতের উপর তিনি আস্থা রাখেননি। তিনি সবসময় নিজেকে পরিচিত করেছেন জাত ধর্মের ঊর্ধ্বে একজন মানুষ হিসেবে। লালন তাঁর জাত ধর্ম নিয়ে অবিরত প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন, যা আজও প্রবহমান। সেই সময়ে ধর্মীয় গোঁড়ামি, শ্রেণি শোষণ, বর্ণ ও গোত্র বৈষম্য তিনি প্রকটভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। তৎকালীন সময়ে জাতপাত, ধর্ম ভেদাভেদ সমাজ মানুষের ব্যক্তিসত্তার মূল্যবোধে আঘাত করে। এসবেরই  নিদারুণ প্রকোপে তিনি নিজের স্বজন পরিবার ও আপন গৃহ থাকা সত্ত্বেও গৃহত্যাগী হতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর সহধর্মিনী সঙ্গী হতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের কারণেই। জীবনের এই মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতাই তাকে জাতপাত ধর্ম বর্ণের ঊর্ধ্বে এক উদার মানবপ্রেমী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। লালন গানে গানে এই বিভেদ-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ধ্বনিত করেছেন। তিনি রচনা করেছেন:

“জাত না গেলে পাইনে হরি কি ছার জেতের গৌরব করি
ছুঁসনে বলিয়ে।
লালন বলে হাতে পেলে, জাত পোড়াতাম  আগুন দিয়ে।”

লালনের জীবন বৃত্তান্ত, বেড়ে ওঠা, শৈশবকাল ইত্যাদি ধোঁয়াশায় আবৃত। তাঁর আশেপাশের মানুষও খুব একটা কিছু জানতেন না কোথায় তাঁর বাড়ি ঘর, কে তাঁর বাবা মা, কোন বংশ বা জাতি, কোন ধর্মের মানুষ তিনি। তাই মীর মোশাররফ হোসেন হোসেন সম্পাদিত পাক্ষিক ‘ হিতকরী’ পত্রিকায় প্রকাশিত লালনের মৃত্যু সংবাদে লেখা হয়েছে:

ইঁহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছুই বলিতেন না। শিষ্যেরা হয়ত তাঁহার নিষেধক্রমে না হয় অজ্ঞতাবশত কিছুই বলিতে পারে না।”

 লালন নিজেই নিজেকে আড়াল করে রাখতে পছন্দ করতেন। তাই তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানার উপায় নেই। তিনি দীর্ঘদিন বাস করেছেন শিষ্যদের মধ্যে। দীর্ঘ জীবন শেষে চলে গেলেও কেউ জাত ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারেননি। তাঁর গানেও এর আভাস মেলে না। তবে জীবতকালেই যে তাঁর জাত-ধর্ম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল তার ইঙ্গিত মেলে তাঁরই একটি বিখ্যাত গানে-

“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।

লালন হিন্দু বা মুসলিম কোনো ধর্ম পরিচয়েই জীবন নির্বাহ করতে চাননি। তিনি যেমন কখনো নামাজ পড়েননি, আবার পূজা অর্চনায় অংশ নেননি। তিনি যুক্তি দিয়ে বিচার করতে চেয়েছিলেন জাত ধর্মকে। জাত ধর্ম সম্প্রদায় কোনো কিছুর উপরেই তাঁর আস্থা ছিল না। এসবের কোনো মূল্য ছিল না তাঁর কাছে। উলটে জাতের চিহ্ন বা ধর্মের বাহ্যিক আবরণ নিয়ে নির্দ্বিধায় প্রশ্ন তুলতে পেরেছিলেন —

 “কেউ মালা কেউ তসবি গলায়/ তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়/ যাওয়া কিংবা আসার বেলায় / জাতের চিহ্ন রয় কার রে”….

মানুষের সাধক লালন ফকির কোনো জাতধর্মের সংকীর্ণ আবরণে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি। সে কথাই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন তাঁর গানে:

“জগৎ বেড়ে জাতের কথা/ লোকে গৌরব করে যথা তথা। / লালন সেই জাতের ফাতা/ বিকিয়েছে সাত বাজারে। “

ধর্ম সম্পর্কে লালন ছিলেন একজন সমন্বয়বাদী। সকল ধর্মের মধ্যে তিনি মিলনের সেতু রচনা করতে চেয়েছিলেন। মানুষের সার্বিক মঙ্গল কীসে হবে, কীসে সমস্ত দ্বন্দ্ব-বিভেদ ঘুচে গিয়ে একটি সুন্দর সুখী সমাজ গড়ে উঠবে সেই ভাবনাই পোষণ করতেন ফকির লালন সাঁই। তিনি লিখেছেন :

“এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে / যেদিন হিন্দু মুসলমান বুদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।”

লালন ফকিরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও ধর্মীয় পরিচয়ের কিছুটা আভাস মেলে ‘হিতকরী’ পত্রিকায়। সেখানে লেখা হয়েছে-

“লালন নিজে কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মাবলম্বী ছিলেন না; অথচ সকল ধর্ম্মের লোকেই তাহাকে আপন বলিয়া জানিত।” তাঁর শিক্ষা ও শাস্ত্রজ্ঞান সম্পর্কে ‘হিতকরী’ পত্রিকা লিখেছে :

“নিজে লেখাপড়া জানিতেন না; কিন্তু তাহার রচিত অসংখ্য গান শুনিলে তাঁকে পরম পণ্ডিত বলিয়া বোধহয়। তিনি কোন শাস্ত্রই পড়েন নাই; কিন্তু ধর্ম্মালাপে তাঁহাকে বিলক্ষণ শাস্ত্রবিদ বলিয়া বোধ হইত।”

এই পত্রিকা থেকেই জানা যায়, প্রয়াণের পর কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। সেজন্য কোনো মোল্লা বা পুরোহিত কারো প্রয়োজন হয়নি।

লালন ও রবীন্দ্রনাথ

সম্ভবত লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। জমিদারি পরিচালনা করতে এসে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাউল বৈষ্ণবদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। বাংলার প্রত্যন্ত পল্লিপ্রান্তের অজ্ঞাত লোকশিল্পীদের সম্পর্কে তাঁর দরদ ও কৌতূহল ছিল অপার। সেই সূত্রেই লালনের গানের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। লালনের সঙ্গে  সাক্ষাৎ না হলেও তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে বেশ যোগাযোগ ছিল। শান্তিদেব ঘোষের বাবা কালীমোহন ঘোষকে একটা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

“তুমি তো দেখেছ শিলাইদহে লালন শাহ ফকিরের শিষ্যগণের সহিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার কিরূপ আলাপ জমত। তারা গরিব। পোশাক- পরিচ্ছদ নাই। দেখলে বোঝার জো নাই তারা কত মহৎ। কিন্তু কত গভীর বিষয় কত সহজভাবে তারা বলতে পারত।”

Lalon sketch by Jyotirindranath Tagore

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত লালন সাঁই-এর একমাত্র প্রত্যক্ষ স্কেচ।

লালনের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হলেও পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত লালনের কথা শুনেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৮৮৯ সালের ৫ মে শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরকে পদ্মার বুকে হাউসবোটে বসিয়ে তাঁর একটি প্রতিকৃতি (স্কেচ) এঁকেছিলেন। লালনের জীবনের তখন প্রান্তবেলা। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তবুও লালনের একটা ছবির সন্ধান অন্তত মেলে। পরবর্তীকালে নন্দলাল বসুসহ বাকি সবার ছবিই কল্পনার রঙে আঁকা। যাইহোক, লালনের গানের ভাষা, ছন্দ ও সুর রবীন্দ্রনাথকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অগোচরেই তাঁর গানের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুর এস্টেটের কর্মচারী বামাচরণ ভট্টাচার্যকে দিয়ে লালনের প্রায় তিনশত গান তিনি নকল করিয়ে নিয়েছিলেন। বিদ্বৎসমাজে তিনিই লালনকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ১৩২২ সালের বৈশাখ মাস থেকে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘হারামনি’ বিভাগ চালু করে লালনের মোট ২০টি গান প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথ  লালনের গানে এতটাই মোহিত হয়েছিলেন যে, “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি/ কমনে আসে যায় / ধরতে পারলে মন-বেড়ি/  দিতাম তাহার পায়”– লালনের দেহতত্ত্বের এই গানটিকে তিনি ইংরেজি অনুবাদও করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ  চেয়েছিলেন এই গানের মর্মার্থ সর্বসমক্ষে পৌঁছে দিতে। হয়তো সে কারণেই ১৯২৫ সালের ভারতীয় দর্শন মহাসভার অধিবেশনে ‘ The philosophy of our people’  শীর্ষক ইংরেজি বক্তৃতায় এই গানের উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছিলেন, অচিনপাখির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে কত সহজে মরমি অনুভব পৌঁছে দিয়েছিলেন লালন ফকির। লালনের এই গানটির সঙ্গে তিনি ইংরেজ কবি শেলির কবিতার তুলনা করে মর্যাদা দিয়েছিলেন বাংলার মরমি কবিকেই।  এছাড়া ১৯৩১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে হিবার্ট বক্তৃতায় ‘রিলিজিয়ন অফ ম্যান’ শীর্ষক বিষয়ে লালনের নাম উহ্য রেখে এই গানটির ইংরেজি অনুবাদ যোগ করেন। একইভাবে ‘ছন্দ’ বইতে লালনের নাম না করেই তাঁর প্রশংসা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানটি একজন বাউলের মুখে ব্যবহার করেছেন। লালনের গানে  রবীন্দ্রনাথ যে অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। তাই তাঁর রচিত বেশ কয়েকটি গানের ভাবধারায় সেই মিল লক্ষ করা যায়। যেমন –

ক) মিলন হবে কত দিনে /আমার মনের মানুষের সনে [লালন]

 * আমি তারেই খুঁজে বেড়াই / যে রয় মনে আমার মনে [রবীন্দ্রনাথ ]

) ক্ষ্যাপা তুই না জেনে তোর আপন খবর পাবি কোথায় [লালন ]

 * খ্যাপা তুই আছিস আপন খেয়াল ধরে [রবীন্দ্রনাথ]

গ) কারে বলব আমার মনের বেদনা [লালন ]

  * আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল [রবীন্দ্রনাথ]

) আছে যার মনের মানুষ আপন মনে /সে কি আর জপে মালা [লালন ]

 * আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে/ তাই হেরি তায় সকল খানে [রবীন্দ্রনাথ]

‘মানুষের কি হয় জাতির বিচার?’

বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চেতনার অন্যতম পুরুষ, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আহমদ শরীফ লালন সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, “ভেদবুদ্ধিহীন মানবতার উদার পরিসরে সাম্য ও প্রেমের সুউচ্চ মিনারে বসেই লালন সাধনা করেছেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাধক ও দার্শনিকদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে তিনি সাম্য ও প্রেমের বাণী শুনিয়েছেন। তিনি রুমি জামী ও হাফেজের সগোত্র এবং কবীর, দাদূ ও রজবের উত্তরসাধক। লালন কবি, দার্শনিক, ধর্মবেত্তা ও প্রেমিক। তাঁর গান লোকসাহিত্য মাত্র নয়, বাঙালির প্রাণের কথা, মনীষার ফসল ও সংস্কৃতির স্বাক্ষর।”

এক সময়ে গোড়া রক্ষণশীল সমাজের নিষ্ঠুর অনুশাসনে লালন সমাজ-সংসার থেকে বিতাড়িত হয়ে সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ফকির-বাউলদের জীবন ধারণ করে লোকায়ত সমাজের ধারায় জীবন চালিত করেন। একজন মরমি সাধক ও কবি হিসেবে তিনি অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার অনুসারী অবস্থান গ্রহণ করেন। সমাজের নানা অনাচার অত্যাচার বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী চেতনা সবসময় জাগ্রত ছিল। সমস্ত ভণ্ডামি, ধোঁকাবাজির বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। তাঁর গানের ভিতর দিয়ে সেই অনুভবই সবার হৃদয়ে সঞ্চার করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। সারাজীবন তিনি অন্ত্যজ গরিব অসহায় শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে বসবাস করে তাঁদের জন্যই সৃষ্টি করে গেছেন কতশত গান। লালন ফকির আজীবন ‘মনের মানুষ’ খুঁজে ফিরেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষ কেবলই সাধারণ একজন মানুষ নয়, প্রতিটি মানুষেরই মাঝে আছে ‘মানুষরতন’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা —“এই মানুষে আছে রে মন / যারে বলে মানুষরতন”।

lalon-shai by Nandalal Basu

নন্দলাল বসুর আঁকা লালনের স্কেচ।

মানবপূজারি লালন ফকির না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন ১৮৯০ সালে। তারপর ১৩৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজও জাতপাত, ধর্ম, বর্ণের বিদ্বেষ ঘোচেনি আমাদের সমাজ থেকে। লালনের গান এর বিরুদ্ধে তীব্র কশাঘাত হানছে-

“সবাই সুধায় লালন ফকির /কোন জাতের ছেলে। / কারে কি বা বলব আমি / দিশা না মেলে। / হয় কেমনে জাতির প্রমাণ / হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্ট যবন? / জাত বলিতে কি হয় বিধান শাস্ত্রে খুঁজিলে /…..মানুষের কি হয় জাতির বিচার? / এক এক দেশে এক এক আচার / লালন কয় জাতির ব্যবহার / গিয়েছি ভুলে। “

সত্যনিষ্ঠ মানুষের সন্ধানে লালন ফকির আমাদের বলেছিলেন:

“মানুষ তত্ত্ব যার সত্য হয় মনে / সে কি অন্য তত্ত্ব মানে?”

আর রবীন্দ্রনাথ? জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনন্ত অভিজ্ঞতার সঞ্চয় নিয়ে তিনি ভাবলোক থেকে মর্ত্যধূলির ‘পরে পদচারণা করে মানবলোকে উপনীত হয়েছেন। তিনি মানুষকেই তাঁর দেবতার আসনে বসিয়েছেন। দৃঢ়চিত্তে তিনি উচ্চারণ করেছেন: “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” যাবতীয় অশিক্ষা-কুশিক্ষা, কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাস, উগ্রধর্মান্ধদের আস্ফালন এবং শতাব্দী প্রাচীন রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী সচল থেকেছে। পরাধীনতার গ্লানি মোচনে এবং বিপন্ন মানব সভ্যতার ত্রাতার ভূমিকায় রাজপথে নেমে তিনি সংগ্রামের বাণী উচ্চকিত করেছেন। তাঁর এই দুর্ভাগা দেশে আজ যখন মূঢ় ধর্মান্ধদের শাসনে ঘনঘোর বিপর্যয়ে অন্ধকারের কালোছায়া নেমে এসেছে,তখন শুনি তাঁরই অমোঘ আহ্বান–

“যে পূজার বেদি রক্তে গিয়েছে ভেসে
 ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে,
ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,
এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।”  (‘ধর্মমোহ’)

তথ্যসূত্র:

রবীন্দ্র রচনাবলী ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, নভেম্বর ১৯৯০;
★প্রসঙ্গ: অনন্য রবীন্দ্রনাথ -নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন, সার্ধ-শততম রবীন্দ্র জন্মোৎসব উদ্‌যাপন সমিতি, নবযুগ প্রকাশন, গুয়াহাটি -৭৮১০০৩;
★ রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তা-দেবলোক থেকে মানব লোক, সম্পাদনা: বিজয়পাল, পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা, মেদিনীপুর -৭২১১০১;
★লালন ফকির ও তাঁর গান- অন্নদাশঙ্কর রায়, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা- ৭৩;
★লালন, সুধীর চক্রবর্তী, প্যাপিরাস, কলকাতা-৪;
★লালনের খোঁজে, তানভীর মোকাম্মেল, সোপান, কলকাতা-৬;
★লালন সাঁই, চন্দন চৌধুরী, কথা প্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০;
★ বাউল শিরোমণি লালন শাহ, এস এম আফজাল হোসেন, অনুপ্রাণন প্রকাশন, কাঁটাবন, ঢাকা -১২০৫;
★লালন ফকিরের গান, ইন্ডিয়ান বাউল সার্চ একাডেমি, কলকাতা-৪৭;
★ফকির লালন সাঁইয়ের নির্বাচিত একশত সংগীত, সদর প্রকাশনী, ঢাকা-১১০০;

লেখক:
Sandeep Dey
সন্দীপ দে, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট