নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃষ্টিতে বিপ্লবী চেতনা ও সম্প্রীতির সুর

Comments

সন্দীপ দে 

তারুণ্যের ঔজ্জ্বল্য, যৌবনের উচ্ছলতা, প্রতিবাদ-দৃপ্ত কাব্য সাহিত্য, স্বদেশচেতনায় ও অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভাষ্য ও বিদ্রোহের ঝংকারে বাংলার সমাজ ও রাজনীতির অঙ্গনে এক নতুন তরঙ্গ সঞ্চার করেছিলেন নজরুল ইসলাম (২৫মে, ১৮৯৯ – ২৫ মে, ১৯৭৬)। সাম্প্রদায়িক কলুষিত সমাজে গোঁড়া মৌলবাদীদের ভণ্ডামি এবং জাতপাত -অস্পৃশতা, নানা ভেদ-বিভেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বিদ্রোহী কবি হিসেবে তিনি সাহিত্য ও রাজনীতির অঙ্গনে বিশেষ স্থান অর্জন করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশেষকরে বাংলার স্বাধীনতাকামী তরুণমনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম ও শোষিত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে বিদ্রোহ-বিপ্লবের এক নতুন প্রবাহের উন্মেষ ঘটিয়ে ছিলেন। বিদ্রোহী’ র উদ্দাম ছন্দ ও বজ্রনির্ঘোষে, অগ্নিবীণাদৃপ্ত ঝংকারে নিস্তেজ জাতির জীবনে এনেছিলেন সংগ্রাম-দ্রোহের এক দুর্বার স্পন্দন। তাঁর লেখনীতে নিঃসৃত হয়েছে সেই অমোঘ বাণী:

…”আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না–
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্তআমি সেই দিন হব শান্ত।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নজরুল বাংলার সাহিত্য-ভুবনে ‘ধূমকেতু’ র মতোই উদয় হয়েছিলেন। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার আগেই তিনি কণ্ঠরুদ্ধ (১৯৪২) হয়ে সৃষ্টির জগৎ থেকে চিরতরে দূরে সরে গিয়ে সংবিৎ হারা হয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় ছিলেন জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত। মাত্র ২২-২৩ বছরের সাহিত্য জীবনে তিনি কবিতা,গানসহ অসামান্য সব সৃষ্টির মাধ্যমে, ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল‘ –এর মতো যুগান্তসৃষ্টিকারী পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে এবং প্রত্যক্ষ  রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনমানসে যে তীব্র আলোড়ন তৈরি করতে পেরেছিলেন, তার নজির মেলা ভার।

Portrait by Jaynul Abedin  

শৈশবের বিচিত্র অভিজ্ঞতা

নজরুলের দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট শৈশব অতিবাহিত হয়েছে নানা ঘটনার আবর্তে। তাঁর যখন মাত্র ন’বছর বয়স তখন তাঁর বাবা কাজি ফকির আহমেদের মৃত্যু হয়। তাঁর দুই স্ত্রীর একজন জাহেদা খাতুন, অপরজনের নাম জানা যায় না। দুই স্ত্রীর মোট সাতপুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়। চার পুত্রের অকাল মৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম। তাই সম্ভবত তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দুখুমিয়া’। মার স্নেহস্পর্শ তাঁর বেশিদিন জোটেনি। বাবার মৃত্যুর সময় তিনি সবে গ্রামের মক্তবের পাঠ শেষ করেছেন। পড়াশোনায় মেধা ছিল কিন্তু প্রাথমিক স্তর পেরিয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। তাই মাত্র দশ বছর বয়সে উপার্জনের তাগিদে ওই মক্তবেই প্রায় সমবয়সিদের পাঠের তালিম নেবার দায়িত্ব নিতে হয় তাঁকে। ১৯১১ সালে তিনি বর্ধমান জেলার মাথরুন গ্রামে নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউটে ভরতি হয়েছিলেন। তখন ওই স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। ওই সময়েই পারিবারিক যোগসূত্রে নজরুল লেটোর দলে যোগ দেন। ওই বাল্যকালেই সংসারে নিদারুণ অর্থকষ্টের জন্য রানিগঞ্জে এসে শ্রমিকের কাজ নিয়ে হয়ে গেলেন শিশু শ্রমিক। রেলওয়ের এক গার্ড সাহেবের বাড়িতে তিনি গৃহ সহায়কের কাজ করেছেন, তখন তাঁর মাত্র তেরো বছর বয়স। এছাড়া আসানসোলে এক রুটির দোকানে কাজ করেছেন। এখানে কাজ করার সময়েই স্থানীয় এক পুলিশ কর্তার নজরে পড়ে যান তিনি। পড়াশোনায় আগ্রহ, মেধা এবং গানের প্রতি আসক্তি দেখে ওই পুলিশ কর্তা নজরুলকে তাঁর গ্রাম মৈমনসিংহ জেলার দরিরামপুরে নিয়ে গিয়ে গ্রামের স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভরতি করে দেন (১৯১৪)। সেখানে প্রথম স্থান অধিকার করা সত্ত্বেও এক রকম পালিয়ে চলে আসেন বর্ধমানে, ভরতি হন শিয়ারশোল রাজ স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে। পড়াশোনায় ভালো থাকায় তিনি বৃত্তি পান। এখানে পড়ার সময়েই রানিগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্র, পরবর্তীকালে বিশিষ্ট সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। সেই বন্ধুত্ব অটুট ছিল আজীবন।

বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ

১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত নজরুল শিয়ারশোল  রাজ স্কুলে পড়াশোনা করেন।  শিয়ারশোল রাজ স্কুলে পড়ার সময়েই নজরুল শিক্ষক নিবারণ চন্দ্র ঘটকের নজরে আসেন। এই নিবারণ চন্দ্র ছিলেন বিপ্লবী যুগান্তর দলের সদস্য। তিনিই নজরুলের মনে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপ্ন সঞ্চারিত করেন এবং স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে সজাগ করেন। এর পরবর্তীকালে তিনি কমরেড মুজফ্ফর আহ্ মদের সান্নিধ্যে আসেন। তাঁদের প্রভাব নজরুলকে সংগ্রামী চেতনায় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ হতে অনেকটাই সাহায্য করেছিল। এ কথার সাক্ষ্য মেলে মুজফ্ফর আহ্‌মদের লেখায়। তিনি তার রচিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা য় লিখেছেন :

শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের আরও একটি কথা কথা এখানে বলে রাখি। শ্রী নিবারণ চন্দ্র ঘটক ওই স্কুলের নজরুলের একজন শিক্ষক ছিলেন। তার বাড়িও ছিল শিয়ারশোলেই। তিনি সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের পশ্চিমবঙ্গীয় দলের অর্থাৎ যুগান্তর দলের সহিত সংযুক্ত ছিলেন। পল্টন হতে ফেরার পরে নজরুল আমার নিকটে স্বীকার ছিল যে সে শ্রী ঘটকের দ্বারা তাঁর মতবাদের দিকে আকর্ষিত হয়েছিলেন।(পৃষ্ঠা:১৩)

শিয়ারশোল রাজ স্কুলে তিনি  ক্লাস টেনের ছাত্র। স্কুলের প্রি টেস্ট পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পরিচিত সকলেরই আশা মেধাবী ছাত্র নজরুল ম্যাট্রিকে ভালো ফল করে বৃত্তি পাবেন। হঠাৎ কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগ দেন। চলে যান করাচির সেনা নিবাসে। প্রাণচঞ্চল বহির্মুখী স্বভাবের নজরুল ছিলেন সকলের প্রিয়। এখানে তিনি গানে, কবিতায়, গল্প, রসিকতায়, উচ্চকিত হাসিতে সকলকে মাতিয়ে রাখতেন। এখানে তিনি হাবিলদার পদে উন্নীত হয়েছিল। তিনি ছিলেন রসদ ভাণ্ডারের দায়িত্বে। মাঝে মাঝে নৌশেরায় ট্রেনিংয়ে যাওয়া ও করাচি  শহরে কেনাকাটা করতে যাওয়া ছাড়া কোয়ার্টারে সীমাবদ্ধ জীবন ছিল তাঁর। এখানে পড়াশোনা, লেখালেখি, নানা বাদ্যযন্ত্র শেখা, ছাউনির এক পাঞ্জাবি মৌলবির কাছে আরবি-ফারসির তালিম নেওয়া, স্বরলিপি দেখে রবীন্দ্র সংগীত শেখা, বিপ্লবী পত্র-পত্রিকা গোপনে পড়া,বেশকিছু পত্রপত্রিকা চাঁদা দিয়ে গ্রাহক হয়ে নিয়ম করে আনানো ও পড়া– এই ছিল তাঁর নিবিড় নিচ্ছিদ্র দিনলিপি। নজরুলের সাহিত্য চিন্তা, সমাজ ভাবনা ও আন্তর্জাতিক চেতনার আলোকে মুক্তিসংগ্রামী কবি হয়ে ওঠার প্রস্তুতি পর্ব রচিত হয়েছিল এখানেই।

মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালের মহান রুশ বিপ্লবে লাল ফৌজের বিজয়বার্তা শুনে উচ্ছ্বসিত নজরুল এখানেই এক সন্ধ্যায় সঙ্গী বন্ধুদের নিয়ে আলোচনা, প্রবন্ধপাঠ ও গানের মধ্য দিয়ে আনন্দ উদ্‌যাপন করেছিলেন। এখানে বসেই কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ ও গল্প, কবিতা পাঠানোর সূত্রপাত। ১৯১৯ সালের জুলাই আগস্ট মাসে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় নজরুলের লেখা প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’  প্রকাশিত হয়। এই সূত্রেই তাঁর সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয় ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, তৎকালীন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার সহ-সম্পাদক মুজফ্ফর আহ্ মদ-এর সঙ্গে। শৈশব-কৈশোর থেকে যৌবনের সন্ধিক্ষণে এই সামগ্রিক জীবনপ্রবাহ নজরুলের কবিত্ব শক্তি, সাহিত্য সৃজন, সংগীত প্রতিভা থেকে শুরু করে তাঁর রাজনৈতিক বিপ্লবী চেতনা গড়তে সাহায্য করে। বিশেষকরে মুজফ্ফর আহ্‌মদের সান্নিধ্য এবং শিয়ারশোল রাজ স্কুলে বিপ্লবী যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক নিবারণ চন্দ্র ঘটকের প্রভাব নজরুলকে সংগ্রামী চেতনায় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ  হবার ক্ষেত্রে অনেকটাই সহায়ক হয়েছিল।

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিভেদবিসংবাদের বিরুদ্ধে

 ছেলেবেলায় জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ, অস্পৃশ্যতা এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মাতব্বরদের উগ্র মনোভাব, গোঁড়ামি ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করেছেন নজরুল। ওই অল্প বয়সেই দারিদ্র্যের করালগ্রাস থেকে মুক্ত হতে বিভিন্ন পরিবেশে শ্রমিক জীবন বেছে নিয়েছেন, আবার শৈশবেই অদম্য সংগীত আসক্তির জন্য লেটোর দলে যোগ দিয়ে পাড়ি দিয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে নানা জায়গায়। এসবের মধ্য দিয়ে নানা ধরনের মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন তিনি,ছোটোবেলাতেই কঠোর বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে তাঁর। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে জাতপাত,উগ্র ধর্মীয় ভেদাভেদের সংকীর্ণ বেড়াজাল ছিঁড়ে  মুক্ত উদার মানুষ হতে সাহায্য করেছে। এছাড়া  এটাও সহজে অনুমান করা যায়, হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ-কলুষ ঘোচাবার দৃঢ় মনোভূমি তাঁর গড়ে উঠেছিল করাচির সেনানিবাসে।

Portrait by Satyajit Ray

আজ নজরুলকে স্মরণ করতে গেলে অথবা তাঁর জীবন ও সৃষ্টিসম্ভারের দিকে তাকালে অন্যান্য দিকের সাথে জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অস্পৃশ্যতা,বিভেদ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর দৃপ্ত বলিষ্ঠ অবস্থান, প্রতিবাদী ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে চলে আসে। তাঁর জীবন ও চিন্তা শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী ছিলনা, তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ়চিত্তে লড়াই করেছেন। আজ সাম্প্রদায়িক হিংসা-জর্জর ও নানা সংকটে দীর্ণ ভারতে, এমনকী উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্বেষ- সন্ত্রাসে,শোষণ-বঞ্চনা-অত্যাচারে,ঘৃণা ও সংঘাতে মানবতা ক্ষতবিক্ষত-বিপর্যস্ত।  অন্ধকারের অশুভ শক্তি উন্মত্ত উল্লাসে বিক্ষত করছে মানবিক মূল্যবোধ, লাঞ্ছিত করছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে, আক্রান্ত হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতার চিরন্তন আদর্শ। বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির বর্ণময় মালাটিকে ছিন্নভিন্ন করা নানা রকম অপচেষ্টা চলছে। এই চরম বিপর্যয়কালে আমাদের স্মরণে আসে বিদ্রোহী কবির সেই অনবদ্য সৃষ্টি, যা সমস্ত শুভবোধসম্পন্ন মানুষদের বিবেককে জাগ্রত করে এবং হীন চক্রান্তকারী মনুষ্যত্বহীনদের প্রতি তীব্র কশাঘাত হানে–

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ,
কাণ্ডারী ! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ !
 ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসা কোন জন?
কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র !”

কাজী নজরুল ইসলামের কবিরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ধর্মীয় অনুশাসন ও ভেদাভেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তিনি বিদ্রোহী’ কবিতাটি লিখে(১৯২১) জনমানুষের মধ্যে তীব্র আলোড়ন ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিলেন এবং কবি হিসেবে স্থায়ী আসন করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর কাব্যপ্রতিভা ও সৃষ্টির ভুবন সম্পর্কে একটি কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, তিনি যদি শুধুমাত্র ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে কাব্যজগৎ থেকে অবসর নিতেন, তবুও তিনি কবিখ্যাতির সুউচ্চ আসনে বিরাজ করতে পারতেন। সেই কবিতায় তিনি স্পর্ধার সঙ্গেই উচ্চারণ করেছেন:

আমি বিদ্রোহী ভৃগু  ভগবান বুকে একে দিই পদচিহ্ন !
আমি স্রষ্টা সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন
আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবানবুকে এঁকে দোবো পদ চিহ্ন
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন

সমাজে যারা হীন স্বার্থে ধর্মগ্রন্থের দোহাই দিয়ে মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি দখল করে গোঁড়া ধর্মীয় অনুশাসন ও রক্ষণশীলতার আবরণে মানবতাকে অবদমিত করে, তাদের প্রতি তীব্র ধিক্কার জানিয়ে তিনি লিখেছেন:

হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও’ কা’রা কোরাণ,বেদ,বাইবেল চুম্বিছে মরিমরি!
ও’ মুখ হইতে কেতাবগ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থকেতাব সেই মানুষেরই মেরে
পুঁজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল !– মুর্খরা সব শোনো;
মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।”

তাঁর বস্তুবাদী উন্নত চেতনা এবং মানুষের বিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছিল বলেই এত সোচ্চারে ধর্মের নামে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন। যে ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এবং যে ধর্মকে হাতিয়ার করে একদল মানুষ একটা বিশাল অংশের মানুষকে শোষণ করে– সেই ধর্মকে কখনোই মানতে চাননি নজরুল, তাঁর কাছে এটা কোনো ধর্মই নয়। তবে এর বিরুদ্ধেই বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখনী গর্জে উঠেছে। তিনি বেশ কিছু কবিতা, প্রবন্ধ, হাসির গানে তাঁর জেহাদ ঘোষণা করেছেন। এ প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯২৬ সালে কলকাতায় পরপর তিনবার হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয়েছিল। এই দাঙ্গার খবরে অত্যন্ত বিচলিত ও ক্ষুব্ধ হন কাজী নজরুল। সেই সময় তিনি কৃষ্ণনগরে ব্যস্ত ছিলেন রাজনৈতিক সম্মেলন ও যুব সম্মেলনের প্রস্তুতিতে। উদ্দেশ্য ছিল যুবসমাজকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প থেকে মুক্ত রাখা। তখন মুজফ্ফর আহ্‌মদ-এর উদ্যোগে দাঙ্গার বিরুদ্ধে বাংলায় ও উর্দুতে ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই ইশতেহারে স্বাক্ষর করেছিলেন নজরুল। তখন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সন্তান সাম্যবাদী সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর দাঙ্গার বিরুদ্ধে দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেছেন, গরিব মুসলমান মানুষদের ঠাকুরবাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এজন্য কট্টর হিন্দুত্ববাদী দুর্বৃত্তরা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি আক্রমণ করেছিল বলে জানা যায়। এমনই এক দুঃসময়ের অভিঘাতে নজরুল রচনা করেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গান ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার

Portrait by Kazi Anirban

ছবিটি কবির পৌত্র কাজী অনির্বাণের আঁকা।

এই দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি রচনা করেন মন্দির ও মসজিদ এবং হিন্দু ও মুসলমান প্রবন্ধ দুটি। মন্দির ও মসজিদপ্রবন্ধে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন:

মানুষের কল্যাণের জন্য ঐ সব ভজনালয়ের সৃষ্টি, ভজনালয়ের মঙ্গলের জন্য মানুষ সৃষ্ট হয় নাই। আর যদি আমাদের মাতলামির দরুন ওই ভজনালয়ই মানুষের অকল্যাণের হেতু হইয়া ওঠে যাহার হওয়া উচিত ছিল স্বর্গ মর্ত্ত্যের সেতু তবে ভাঙ্গিয়া ফেল ঐ মন্দির মসজিদ। সকল মানুষ আসিয়া দাঁড়াইয়া বাঁচুক এক আকাশের ছত্রতলে, এক চন্দ্রসূর্যতারা জ্বালা মহামন্দিরের আঙিনাতলে। (রুদ্র মঙ্গল, পৃষ্ঠা:৪৪)

এই প্রবন্ধে তিনি ধর্মের কারবারিদের মুখোশ খুলে দিয়ে বলেছেন:

যিনি সকল মানুষের দেবতা, তিনি আজ মন্দিরের কারাগার, মসজিদের জিন্দানখানায়, গির্জার gaol –এ বন্দী মোল্লা, পুরুত, পাদরী, ভিক্ষু জেলওয়ার্ডারের মত পাহারা দিতেছেআজ শয়তান বসিয়াছে স্রষ্টার আসনে(ওই,পৃষ্ঠা:৩৮)

আবার ধর্মকে কপট স্বার্থে ব্যবহার করে যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে মত্ত, তাদের স্বরূপ উন্মোচন করে তিনি লিখেছেন:

মানুষের পশুপ্রকৃতির সুবিধা লইয়া ধর্ম মদান্ধদের নাচাইয়া কত কাপুরুষই না আজ মহাপুরুষ হইয়া গেল (ওই, পৃষ্ঠা:৪৫)

উগ্র ধর্মান্ধদের ভেতরের হিংস্র ও কুৎসিত প্রবৃত্তিকে তুলে ধরতে তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ‘হিন্দুমুসলমানপ্রবন্ধে লিখেছেন:

একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু মুসলিম সমস্যা নিয়েগুরুদেব বললেন, দেখ, যে ন্যাজ বাইরের তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভেতরের ন্যাজকে কাটবে কে?

হিন্দু মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারে বারে গুরুদেবের ঐ কথাটাই মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে যে, এ ন্যাজ গজালো কি করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ঐ সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায় — তা ভেতরেই হোক আর বাইরেই হোকতারাই হয়ে উঠে পশু। যে সব ন্যাজওয়ালা পশুর হিংস্রতা সরল হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে শৃঙ্গরূপে, তাদের তত ভয়ের কারণ নেই, যত ভয় হয় সেই সব পশুদের দেখে যাদের হিংস্রতা ভেতরে, যাদের শিং, মাথা ফুটে বেরোয়নি। শিংওয়ালা গরু মহিষের চেয়ে শৃঙ্গহীন ব্যাঘ্র ভল্লুক জাতীয় পশুগুলো বেশি হিংস্র বেশি ভীষণ। এ হিসেবে মানুষও পরে শৃঙ্গহীন বাঘ ভালুকের দলে। কিন্তু বাঘ ভালুকের তবুও ন্যাজটা বাইরে, তাই হয়ত রক্ষে কেননা, ন্যাজ আর শিং দুই ভেতরে থাকলে কী রকম হিংস্র হয়ে উঠতে হয়, তা হিন্দুমুসলমানের ছোরা মারা না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না।

প্রবন্ধের এই অংশে তিনি আরো বলেছেন, যে প্রশ্ন করিয়াছিলাম, এই যে ভেতরের ন্যাজ, এর উদ্ভব কোথায়? আমার মনে হয় টিকিতে ও দাড়িতেটিকিপুর ও দারিস্তানই বুঝি এর আদি জন্মভূমি। পশু সাজবার মানুষের একি আদিম দুরন্ত ইচ্ছা। ন্যাজ গজাল না বলে তারা টিকি দাড়ি জন্মিয়ে সান্ত্বনা পেল। (রুদ্র মঙ্গল, পৃষ্ঠা: ৫৩-৫৪)

নজরুল ইসলামের জীবন দর্শন ও জীবনযাপনের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। ব্যক্তি জীবনে তিনি দীর্ঘ সময় কোনো ধর্মাচরণ করেন নি। প্রমীলা সেনগুপ্তকে বিয়ের সময় তাঁকে ধর্মান্তরিত করা বা মুসলিম বিবাহ প্রথা অনুসরণ করেননি। সন্তানদের নামকরণের সময় তিনি কোনো ধর্মীয় পদ্ধতি পালন করেননি। পুত্রদের নাম রেখেছেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, সব্যসাচী এবং অনিরুদ্ধ। তিনি খোলা মনে যেমন হোলির রং মাখতেন, তেমনি ইদে কোলাকুলি করতেন। তবে এটাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মধ্য বয়সে পুত্রশোকে, প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর অসুস্থতায়, তীব্র অর্থাভাবে সাংসারিক টানাপোড়েনে দুশ্চিন্তায় দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে তিনি কবিরাজি, হেকিমিসহ দরগার জলপড়া, তান্ত্রিকের আশ্রয়, ভগবান বিশ্বাসের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। নজরুলের এই পরিণতির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মুজফ্ফর আহ্‌মদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা য় বলেছেন,…১৯২৯ সালের ২০ শে মার্চ তারিখে মীরাট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার সংস্রবে গিরেফতার হয়ে আমি মীরাটে চলে যাই। অনেক ঘাটের জল খেয়ে আমি আবার কলকাতায় ফিরে আসি ১৯৩৬ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে। ফিরে এসে আমার পূর্ব পরিচিত নজরুলকে আমি আর পাইনি। যে নজরুলকে আমি তখন পেলাম পেশার দিক থেকে সে গ্রামোফোন কোম্পানীর সঙ্গে একান্তভাবে বাঁধা। এই কোম্পানীর কোটরেই তার আশ্রয়।  আবার তার যোগ ও সাধনা ইত্যাদি কি কি চলছিল সে সম্বন্ধে আমি কোনো খবর নিইনি। যদিও আমরা পরস্পরের নিকট হতে দূরে সরে গিয়েছিলেম তবুও আমাদের সাধারণ কথাবার্তা আগের মতই হয়েছে। আমি তার আধ্যাত্মিক ব্যাপার সম্বন্ধে কোনো কথাই তুলিনি। আমি জানতাম আমার কথার কোনো জওয়াব না দিয়ে সে চুপ করেই থাকবে। তার সঙ্গে আমার দেখাও এই সময়ে খুব কম হয়েছে।

মুজফ্ফর আহ্‌মদ এ প্রসঙ্গে আরেকটি জায়গায় বলছেন:

নজরুলের সুরশিল্পী বন্ধুরা তার নিকটের বন্ধু ছিলেন কিনা সে সম্বন্ধে আমার কিছু জানা নেইকিন্তু উনিশ শতিরিশের দশকে সে যে আধ্যাত্মিকতার স্রোতে এমনভাবে ভেসে গেল তাতে কি তার বিশিষ্ট সাহিত্যিক বন্ধুদের মধ্যে সকলের সম্মতি ছিল? আমার কিছুতেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না যে তাঁদের সকলেই অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃত ব্যাপারে বিশ্বাসী ছিলেন। যাঁরা বিশ্বাসী ছিলেন না তাঁরা চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই নজরুলকে বাঁচাতে পারতেন। তাঁরা কতটা কি করেছিলেন তা আমার জানা নেই। তবে কিছু কিছু  লেখা পড়ে এটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে তার কোনো কোনো  বন্ধু, তাঁরা তার সাহিত্যিক বন্ধুও ছিলেন, তারা কুসংস্কারকে সাহায্য করেছেন।

এই সময় থেকেই কবির শরীরে জটিল রোগ বাসা বাঁধে। অবশেষে ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই কলকাতা বেতার কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই রোগের কেবল থেকে তিনি আর মুক্ত হতে পারেননি। যাইহোক, অবস্থার চাপে তাঁর এই মানসিক পরিবর্তন হলেও ধর্মীয় অন্ধতা বা গোঁড়ামিতে তিনি আচ্ছন্ন হননি। আমরা দেখি ধর্মের নামে যারা মানুষকে বিভক্ত করে তাদের প্রতি তীব্র ধিক্কার জানিয়ে,  জাত-ধর্মের মেকি বেড়াজালকে ছিন্ন করে তিনি আগেই (১৯২৪) রচনা করেছেন বিখ্যাত গান:

জাতের নামে বজ্জাতি সব  জাত জালিয়াত খেলছ জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে, জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি ভাবলি এতেই জাতির জান
তাই তো বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশোখান
এখন দেখিস্ ভারতজোড়া, পড়ে আছিস বাসি মড়া,
মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত শেয়ালের হুক্কাহুয়া।

(জাতের বজ্জাতি: বিষের বাঁশি)

নজরুলের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ধুমকেতু পত্রিকা প্রকাশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল এই পত্রিকা(১১ আগস্ট, ১৯২২)।

‘ধুমকেতু’র প্রথম সম্পাদকীয়তে তিনি লিখলেন:

” ‘মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে‘ ‘জয় প্রলয়ংকরবলে ‘ধূমকেতু’কে রথ করে আমার নতুন পথে যাত্রা শুরু হল। আমার কর্ণধার আমি। আমায় পথ দেখাবে আমার সত্য। আমার যাত্রা শুরুর আগে আমি সালাম জানাচ্ছি নমস্কার করছি আমার সত্যকে।দেশের যারা শত্রু, দেশের যা কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি মেকি তা সব দূর করতে ধূমকেতু হবে আগুনের সম্মার্জনীধূমকেতু কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়। মানুষ ধর্মই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। হিন্দুমুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ  দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে যেখানে প্রাণ প্রাণের মিল, আদতে সত্যের মিল, সেখানে ধর্মের বৈষম্য, কোনো হিংসার দুশমনির ভাব আনে না। যার নিজের ধর্মে বিশ্বাস আছে, যে নিজের ধর্মের সত্যকে চিনেছে সে কখনো অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।“…

প্রসঙ্গত, ধূমকেতু পত্রিকাই সর্বপ্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানিয়েছিল (১৩ অক্টোবর, ১৯২২)।

নজরুল ইসলাম আজীবন হিন্দু-মুসলমান মিলনের প্রত্যাশী ছিলেন। কবির এই ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কিছু গোঁড়া মানুষ বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন, ব্যঙ্গ্যোক্তি করেছেন। কিন্তু নজরুল ছিলেন অবিচল। ১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর অ্যালবার্ট হলে (বর্তমানে কফি হাউস) কবি নজরুলকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সভাপতির আসনে ছিলেন বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। এই সংবর্ধনার প্রতিভাষণে কবি বলেছিলেন:

কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দুমুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।

নজরুল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বিভেদ ঘুচিয়ে একান্তভাবেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁর এই ভাবনাকে মূর্ত করেছেন ‘নবযুগ'(প্রথম পর্যায়) পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধে। তিনি লিখেছেন:

এসো ভাই হিন্দু! এস মুসলমান! এস বুদ্ধ ! এস ক্রিশ্চিয়ান! আজ আমরা সব গণ্ডি কাটাইয়া, সব সঙ্কীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি।

কবির এই মিলনের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষাই বাঙ্ময় হয়েছে তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কবিতায়:

গাহি সাম্যের গান
যেখানে মিশেছে হিন্দুবৌদ্ধমুসলিম ক্রীশ্চান!”

তাঁর কাছে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষ। তাই তিনি লিখেছেন :

গাহি সাম্যের গান–
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্
নাই দেশকাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি
সব দেশে সবকালে ঘরেঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”

আজকে যখন উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনা, কট্টর মৌলবাদীদের চোখ রাঙানি-হিংস্রতা, জাতি ধর্ম-বর্ণ-বিদ্বেষে কলুষিত আক্রান্ত দেশ তথা এই গোটা উপমহাদেশ, তখন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের মতো দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের হায়দরি হাঁক’-এর প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবেই অনুভূত হচ্ছে। তেমনি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তার সৃষ্টির সেই চিরন্তন সম্প্রীতির বাণী–

মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম
হিন্দু মুসলমান
মুসলিম তার নয়নমণি
হিন্দু তাহার প্রাণ

এই ক্ষুদ্র নিবন্ধের মাধ্যমে ১২৫ তম জন্মবর্ষে বিদ্রোহী কবির প্রতি রইলো আন্তরিক  শ্রদ্ধা।

তথ্যসূত্র :

* সঞ্চিতা- নজরুল ইসলাম, ডি এম লাইব্রেরি, কলকাতা।
* রুদ্র-মঙ্গল, নজরুল ইসলাম, গ্রন্থলোক, কলকাতা।
* কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা, মুজফ্ফর আহ্‌মদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা।
* জনগণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কল্পতরু সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক  পর্ষৎ, কলকাতা।
* নজরুল জীবনী, অরুণ কুমার বসু, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাডেমি, কলকাতা।

লেখক:
Sandeep Dey
সন্দীপ দে, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।

  • বানানরীতি লেখকের নিজস্ব – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট