নতুন সূর্যের দেশ । বিশেষ সম্পাদকীয়

Comments

বাংলার মানুষের জীবনে আজ অত্যন্ত আনন্দের এক দিন। হাজার বছর কেটেছে এই দিনের তপস্যায়। সে তপস্যা মৌনতার নয়, ধ্যাননিমগ্ন তপস্যা নয়। সে তপস্যা শ্রমের, ঘামের, রক্তের অবিরল ধারায় প্রবাহিত জীবনের। সে তপস্যা সাহস, সংকল্প, শৌর্য্যের। দ্রোহ আর প্রেম একাকার হয়ে বাংলার মানুষের মুক্তির সূর্য উদয়ের সেই দিন আজ, ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবস।

বঙ্গের সমতটের তামাটে এই জাতিকে পরাভূত করার চেষ্টায় সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই বহিরাগত বিভিন্ন জাতি তাদের সর্বশক্তি ব্যবহার করেছে। শুধু আর্য্য নয় শস্য শ্যামল এই ব-দ্বীপের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সুদূর মেসিডোনিয়া থেকে টেনে এনেছিল অ্যালেক্সান্ডার দা গ্রেট কে সেই প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। কিন্তু শৌর্য্য-বীর্যে বলীয়ান এই ভূখন্ডের অধিবাসীকে পরাভূত করা অসম্ভব জেনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল গঙ্গা পাড় থেকে। এরপর এসেছে মোগল, এসেছে পাঠান, এসেছে প্রবল ইংরেজ কখনো ধর্ম প্রচারের লেবাসে কখনো বাণিজ্যের আবরণে কখনোবা বাহূবলে তাদের বিজয় পতাকা উড়িয়েছে এই বঙ্গে। ছলে-বলে-কৌশলে এই জাতিকে পদানত রাখবার কম চেষ্টা করেনি এরা। কিন্তু এ দেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখার সব কৌশল ব্যর্থ করে সাম্রাজ্যবাদের নখর ভেঙে বেড়িয়ে এসেছে মুক্তিকামী জনতা।

অদূর অতীতে ইংরেজ শাসনামলে ১৯৩০ সালে স্বাধীনতার অভ্যূদয় ঘটে মাষ্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে। সেদিনের অগ্নিগর্ভ ইতিহাসের স্রষ্টা মুক্তিকামী, সাহসে প্রদীপ্ত, মুষ্টিমেয় তরুণের সংগ্রামসংক্ষুব্ধ চট্টগ্রাম মুক্ত করার রক্তক্ষয়ী দিনপঞ্জীর ১৮ থেকে ২২ এপ্রিল ছিল এক মহতী শিক্ষার উজ্জ্বল দিন। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অদম্য প্রেরণা এবং দৃপ্ত প্রত্যয়ের উজ্জ্বল স্বাক্ষর। যুব বিদ্রোহের অগ্নিস্ফূলিঙ্গ। সে স্ফূলিঙ্গ আগুনের গোলা হয়ে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। এই গৌরবগাথা বছরের পর বছর ধরে দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে, আজও  করছে। যার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার মুক্তিযুদ্ধ। গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের যে সংগ্রাম এদেশের মুক্তি পাগল মানুষ আজও  চালিয়ে যাচ্ছে তার সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, সুভাষ বসু, সূর্য সেন, প্রীতিলতা, বিনয়-বাদল-দিনেশ, ইলা মিত্র,  সালাম, বরকত, আসাদ, মতিউর, ভাসানী, শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন সহ হাজারো বীর।

শুধু রাজনৈতিক মুক্তির জন্যেই নয় সংগ্রামী জনতা তার কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই করে চলেছে প্রতিনিয়ত। বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসে তাই যুক্ত হয়েছে ফকির-সন্যাস বিদ্রোহ, সিপাই বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, ফারায়েজী আন্দোলন,  তেভাগা আন্দোলন, নাচোল বিদ্রোহ, টংক বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, নানকার বিদ্রোহ, খাপরা ওয়ার্ড প্রতিরোধ লড়াই, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথ-বর্জন বিরোধী আন্দোলনসহ আরও অসংখ্য সংগ্রামের নাম।

দীর্ঘ সংগ্রাম আর ত্যাগের শেষে হাজারো বছরের তপস্যার সেই দিনটির দেখা মিলেছিল ১৯৭১ সালে, ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ৪৭ বছর আগের এদিনে বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হাতের অস্ত্র ফেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল বিজয়ী বীর বাঙালীর সামনে। আত্মসমর্থনের সনদে করেছিল স্বাক্ষর। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের।

সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম, যুদ্ধাপরাধের বিচার, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ আর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে গত ৪৭ বছর কাটিয়েছে বাংলার মানুষ তবু মাথা নত করেনি। একে একে এসব কিছুকে পায়ে দলে এগিয়েছে বাঙালী তার শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তাই আজ বিশ্বে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল মানচিত্র। নতুন সূর্যের দেশ।

সাগর লোহানী
সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.