নয় নয় এ মধুর খেলা…

Comments

। পল্লল ভট্টাচার্য ।

যত বিতর্কই থাকুক, ফুটবল তথা বিশ্বকাপ ফুটবলকে ‘মধুর খেলা নয়’ বলে আমি মানতে রাজি নই। বিতর্ক কিন্তু খেলাটাকে বেশি স্মরণীয় এবং মধুর করে রেখেছে।

যদি মধুরই না হয় তাহলে কয়েকশ’ কোটি সমর্থক রাত জেগে খেলা দেখবেন কেন? নিজ পছন্দের খেলোয়াড় এবং দলের জন্য গলা ফাটাবেন কেন। জিতলে কেন ঘরে বাইরে আনন্দোৎসব করবেন। হেরে গেলে কেনইবা খুঁটিনাটি নিয়ে অভিযোগ তুলবেন।

অভিযোগের অন্ত জীবনেও নেই। যেমন, অন্যে পেলো, আমি পেলাম না কেন, এ তো নিত্যকার অভিযোগ। আমার পকেট ফুটো, অন্যের পকেটে বাড়তি কড়ি। এমন ভেবেই তো আমরা রোজ একবার করে মরি। সুখ-দুঃখের নৈমিত্তিক জীবনে ফুটবল কোটি মনকে বেঁধে বেঁধে রাখে।

শুধু বিতর্কের দিকে চোখ রাখলে ফুটবলের আনন্দ উপভোগ করা যায় না বলেই আমার ধারণা। আরো মত আমার, খেলোয়াড়রা এসব বিতর্কের জন্মদাতা নন। যাঁরা খুঁত খোঁজেন তাঁদের অধিকাংশই বিশেষজ্ঞ। সমর্থকদের এঁরাই গোলে না পাঠিয়ে গোল্লায় পাঠান।

গোল্লায় পাঠানোর মানুষ এখন সংখ্যায় বেড়েছে সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমানদের আবির্ভাবে। দেখছি এই বুদ্ধিমানদের দুষ্টভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন মানুষেরা পুরানো কীর্তিমানদের (ক্রয়ুফ, মারাদোনা, ভ্যান বাস্তেন প্রমুখ) মুখে মন্তব্য বসিয়ে সামাজিক মাধ্যমের বাজারে নেমেছেন।

সর্বক্ষণ দেখতে পাই, যত না খেলার কথা, তার চাইতে বেশি কথা নতুন কীর্তিমানদের নিয়ে (মেসি, রোনাল্ডো, ভিনি, এম্বাপে, আলান্ড, ইয়ামাল)। বল নিয়ে কী ওঁরা একাই খেলেন!

একের বোঝা দশের লাঠি কী করে হয়, সবাই দল বেঁধে খেলে বলে তবেই না হয়। তবুও দশের দক্ষতা এক পর্যায়ের হয় না বলে সব দলেই এঁদের মতো বিশিষ্ট কিছু খেলোয়াড় থাকেন যাঁরা পরাজয়ের মুখকে জয়ের দিকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হন।

সাম্প্রতিক কালে কিছু গোলরক্ষক (যেমন ভোজিনিয়া, মার্তিনেস, কুর্তোয়া) সঙ্গত কারণে প্রশংসা পাচ্ছেন বৈকি। কিন্তু রাশিয়ার লেভ ইয়াসিন ছাড়া আর কেউ আজ অব্দি ব্যালন ডি’অর-এ ভূষিত হননি। ইংলন্ডের গর্ডন বাঙ্কস, যার বাচানো পেলের গোল প্রচেষ্টা (১৯৭০) এখনো পর্যন্ত সেরা ‘সেভ’ বিবেচিত হয় তিনিও পাননি।

মানছি আছেন এমন কিছু খেলোয়াড় যাঁরা মাঠে নানান ছলনায় জড়ান। ‘প্লে একটিং’ তার এক দিক; অন্য দিক ‘স্পিরিট অফ ফুটবল’; মুখে বলেন বটে অনেকেই, কিন্তু কাজের বেলায় মানেন না। মাঠের মধ্যে প্রায়ই কেন দুটো বল ঢুকে পড়ে, কেউ বলতে পারেন? এই বিশ্বকাপে এমন কান্ড বেশি চোখে পড়ছে যেন!

গুঁতোগুতি, লাথালাথি, জামা টানা, চুল টানা, কনুইয়ের ঠুস, গায়ে থুতু এসবও চলে। ‘মাথা দিয়ে ঢুস’ দেখেছি তো যার কারণে জিদান লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন। আশ্চর্য, জিদান কেন এমন করেছিলেন তার খোঁজ কেউ নিলো না!!

বিশ্বকাপ ১৯৭০-এর পুরানো খেলা আবার দেখলে দেখতে পাবেন ‘মহান’ পেলেও বিপক্ষের খেলোয়াড়কে জামা টেনে মাটিতে ফেলে দিচ্ছেন। উদ্দেশ্য আঘাত করা নয়, প্রতিপক্ষের খেলার ছন্দকে আপাতত থমকে দেওয়া।

‘নো টু রেসিজম’ ফিফার আপ্তবাক্য। অথচ এবারই মিশরের কোচ মেসিকে উদ্দেশ্য করে বর্ণবাদী ভঙ্গি করেছেন। বিশ্বকাপের সঙ্গে গাজার (প্যালেস্টাইন) বা আর্জেন্টিনার সম্পর্ক কী; একই খেলায় একই কোচ প্যালেস্টাইনের পতাকা ওড়ালেন কেন? ধর্মীয় আবেগ? খেলার মাঠে এই আবেগ সুস্থ নয়।

সামরিক জান্তার অন্যায় শাসনের প্রতিবাদ আর্জেন্টিনাই প্রথম করেছিল ১৯৭৮-এ নিজেদের মাঠে। ওরা কোনো পতাকা ওড়ায়নি, স্লোগানও তোলেনি; শুধু দুদিকের গোলপোস্টের নিচের দিকটাতে কালো কালির ছোপ লাগিয়ে দিয়েছিল।

সেবার ওদের জয়ের পেছনে রাজনৈতিক কুকীর্তি ছিল অনেক; কিন্তু তার জন্য পাসারেল্লা, আর্দিলাস, লুকে, ক্যাম্পেস প্রমুখ খেলোয়াড়রা দায়ী ছিলেন না।

মারাদোনা নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইটালির জনগণকে আহ্বান করেছিলেন যেন ওঁরা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেন। এ নিয়ে ইটালি উত্তর দক্ষিণ দুভাগে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছিল। উত্তরাঞ্চল ধনীদের এবং শিক্ষিতদের, দক্ষিনাঞ্চল অশিক্ষিত এবং গরিবদের, তাই মাফিয়াদেরও।

দক্ষিনের (মারাদোনার দল নাপোলি সেই অঞ্চলের) মানুষ ঢেলে সমর্থন জানিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। তাও শেষ রক্ষা হয়নি। ফাইনালে রেফারির ভুল পেনাল্টি সিদ্ধান্তে (অভিযোগ) এক গোলে জার্মানির কাছে হার মানতে হয়েছিল।

নানান শাস্তির ব্যবস্থা করে এসব অনেক কমানো গেছে, কিন্তু ঐ প্লে একটিংটা কমানো যায়নি। এই বিশ্বকাপেও তার অভাব ঘটেনি। তবুও কিছু খেলোয়াড়ের খারাপ আচরণের জন্য সবাইকে দায়ী করা কী ঠিক?

প্রশ্ন করি নিজেকে, রেফারিরা কী মানুষ নন? ভুল ওঁরা করতেই পারেন। এইসব ভুলকে এড়াতে যোগ হয়েছে প্রযুক্তি। নতুন অভিযোগ, প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে কোনো কোনো মহল।

কারা এঁরা? শুনছি ফিফা, কিছু কিছু খেলোয়াড়, রাজনীতির মানুষজন এবং বাণিজ্যের কারবারিরা। সবাই নাকি কারচুপি করে চলেছে যার যার মতো করে!

তির দেখছি বেশি মেসির দিকে। ‘ফিফার পোস্টার বয়’, ওদের জেতাতেই হবে নইলে নাকি ফিফার ভাড়ার পূর্ণ হবে না। কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তবে তার দায় মেসির নয়।

দেখেছি, বার্সেলোনা ছাড়ার পর মেসি যেখানেই গেছেন (ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্র) সেখানে বাণিজ্য এবং ফুটবলের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছে। ঠিক এমনটাই ঘটেছিলো যখন মারাদোনাও বার্সেলোনা থেকে ইটালির নাপোলিতে খেলতে গিয়েছিলেন।

বিশ্বকাপ নয় আমেরিকার ফুটবল লীগে মেসিদের খেলায় উপস্থিত গড় দর্শকের সংখ্যা এখন ষাট হাজার। আগে মাঠ ভরতো না। বাস্কেটবল, বেসবল, আমেরিকান ফুটবল (রাগবীর হার্ডকোর সংস্করণ) এবং আইস হকির দেশে কে ফুটবল দেখে।

বেকহ্যামের মতো যাঁরা খেলা বোঝেন এবং বাণিজ্যও বোঝেন তাঁরা বোঝেন মেসি বা ইন্টার মায়ামির খেলা দেখতে আমেরিকানরা মাঠ ভরিয়ে দিচ্ছে কেন।

তার আগে পেলে, বেকহ্যাম, ইব্রাহিমোভিচ, থিয়েরি অঁরি-রাও খেলেছেন আমেরিকার অখ্যাত লীগে; কই কেউ তো এতো এতো দর্শককে মাঠে আনতে পারেননি।

পরস্পরের সান্নিধ্যে আসার, মানসিকভাবে হলেও, বিশ্ববাসীদের এই সুযোগ চার বছরে একবারই মেলে। অন্যভাবেও এই সান্নিধ্য মিলতে পারে, কিন্তু ফুটবল (বা খেলাধুলা) বিনা অন্য কিছুতেই এই সান্নিধ্য নির্মল, সরল এবং সামষ্টিক আনন্দের হয় না।

বিশ্বকাপের দর্শকদের অধিকাংশ বোধহয় চার বছরে একবার রাত জাগেন। তাই ‘লিপ ইয়ার’-এ কেন একটা দিন বেশি থাকে তার মাহাত্ম্য বুঝে উঠতে পারেন না।

পাঠক, রাগ করবেন না যেন। যে যার নিজ পছন্দমতো দল এবং খেলোয়াড়দের পাশে থাকুন, উৎসাহ দিন। বিভিন্ন বিদেশী লীগের খেলা যতোটা পারবেন দেখবেন। আমিও দেখেছি যতটা সম্ভব সেই ১৯৭৪ সাল থেকে। দক্ষিণ আমেরিকার খেলা আমরা দেখতে পাই না দিবা-রাত্রির উল্টো অবস্থানের কারণে; সেটা হোলে আনন্দ আরো বাড়তো।

বিতর্কে জড়াতে নেই, আশা ছাড়তে নেই, দক্ষতা ও মেধায় ভরসা রাখতে হয়। কে বলতে পারে আজ যারা হারছে কাল তারাই আপনাদের সমর্থনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বকাপ জিতবে না।

লেখক:
Pallal Bhattacharjee
পল্লল ভট্টাচার্য
সাংবাদিক, গদ্যলেখক, প্রাবন্ধিক; কলকাতা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট