নষ্টনীড় পরবর্তী অধ্যায়

Comments

। মৌসুমী দাশগুপ্তা ।

অমলের পত্র:


চারু, আমার চারুলতা!

তোমাকে বৌঠান বলিয়া আজ আর ডাকিলাম না।

মনে পড়ে সেই তোমার বিবাহের পরের দিনটির কথা? পিসিমাতা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, “আয় অমল, তোর নতুন বউঠানকে প্রণাম করিয়া যা।” আমি দেখিলাম লাল রঙের নতুন ডুরি শাড়িতে মোড়ানো আমার চেয়েও মাথায় ছোট একটি বালিকা তার ডাগর চক্ষুজোড়া একবার তুলিয়া আমাকে দেখিল, আবার পরক্ষণেই নামাইয়া ফেলিল। সে চাহনিতে কী ছিল চারু? কেন মূহুর্তেই আমার মনে হইয়াছিল, এই বালিকাটি একান্ত আমারই খেলাঘরের সাথী, আর কাহারও নয়!

অত ছোট মানুষকে বৌঠান ডাকিতে আমার ভারি আপত্তি ছিল। নতুন ধূতি চাদরে আর মচমচে নতুন জুতোয় আমার তখন নিজেকে মস্ত একজন মনে হইতেছিল। কিন্তু গুরুজনদের শাসনে তোমাকে ‘বৌঠান’ মানিতেই হইল।

কার্যত তুমি আমার খেলাঘরের সাথীই ছিলে। আট দশ বছরের দুই বালক বালিকা খেলিয়া বেড়াইবে, তাহা কাহারও চোখে দৃষ্টিকটু ঠেকিত না। ঘরকন্না দেখার জন্যে পিসিমাতা ছিলেন, কাছারির কাজ দেখার জন্যে দাদা। শুধু সন্ধ্যেবেলায় দাদা ফিরিবার সময় ঘনাইয়া আসিলে তোমাকে গা ধুইয়া, চুল বাঁধিয়া, দাদার চা প্রস্তুত করিতে হইত। আর আমারও মাষ্টারমশায়ের কাছে গিয়া পড়িতে বসিতে হইত। প্রদীপের আলোয় হাতের লেখা মকশ করিতে করিতে আমি কেবলই ভাবিতাম, “আহা! আমি যদি দাদার মত বড়মানুষ হইতে পারিতাম! এই ছাইপাঁশ হাতের লেখা না লিখিয়া আমি সেজবাতির সামনে বসিয়া চশমা চোখে খবরের কাগজ পড়িতাম, আর তুমি পাশে বসিয়া চা করিয়া দিতে। তোমার চুড়িতে রিনঝিন শব্দ উঠিত, বাহিরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর চামচের টুংটাং শব্দের সাথে তাহা মিশিয়া গিয়া কী অপরূপ এক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করিত!”

অতঃপর নিজেদের অজানিতেই আমরা ধীরে ধীরে বাড়িয়া উঠিলাম। পিসিমাতা স্বর্গবাসী হইলে ঘরকন্নার দায় তোমার কাছে আসিয়া পড়িল। কিন্তু তুমি তো আর দশজন সাধারণ গৃহবধূর মতো ছিলে না। ঘরের কাজে তোমার না ছিল মন, না ছিল পারদর্শিতা। তুমি অনায়াসে স্বর্গসভায় অপ্সরী হইতে পারিতে, কিন্তু পুরচারিকার ভূমিকায় তোমাকে কোনোকালেই মানাইল না।

তাহাতে আমাদের কোন আক্ষেপ ছিল না। প্রাচীন গৃহকর্মিকের দল পূর্বের নিয়মে কাজ করিত আর আড়ালে আবডালে তোমার নিন্দা করিত। তুমি আর আমি আমাদের আপন ভুবনে বাস করিতাম। দুটি নবীন কিশোর প্রাণ আপন আনন্দে বাগান, লেখা আর কিছু অর্বাচীন স্বপ্নে মশগুল থাকিয়া দিন পার করিয়া দিত। ভূপতি দাদাও তাঁর খবরের কাগজ আর তাঁর পারিষদের দল লইয়া সুখেই ছিলেন। তুমি তাঁর ডেস্কের সেজবাতিটির মতোই ছিলে, অপরিহার্য আলো, কিন্তু মনোযোগ দিয়া দেখিবার মতো বিশেষ কিছু নয়।

কিন্তু আমার কাছে চারু, আমার কাছে তুমি ছিলে ধ্রুবতারকাটির মতো, তোমাকে ছাড়া আমি এক দিকভ্রান্ত নাবিক। আমার সব লেখার নায়িকা, আমার হৃদয়কুন্জের হরিণী, আমার ঝিলের জলে নীলপদ্ম, সবই ছিলে তুমি! অথচ দেখ, পৃথিবীর নিয়মে তুমি আমার ছিলে না।

আমি কত চেষ্টা করিলাম! মন্দা বৌঠান আসিল, আমি বিবাহ করিলাম, তোমাকে ছাড়িয়া সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়া ভিন দেশে চলিয়া আসিলাম! কিন্তু তোমা হইতে আজও দূরে যাইতে পারিলাম না। আমার শয়নে, স্বপনে এখনও আমি সেই লাল ডুরি শাড়ি পরা বালিকা বধূকেই দেখিতে পাই। হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় ঐ বুঝি ফিসফিস করিয়া পর্দার আড়াল হইতে তুমি ডাকিতেছ, “অমল! ঠাকুরপো! আর কত পড়িবে! বেলা পড়িয়া আসিল! বাগানে যাইবে না!” আবার কখনও তোমার চুড়ির শব্দ শুনি, কখনও বা তোমার চুলের গন্ধটা যেন ভাসিয়া আসে!

চারু! আমার চারুলতা! আমি কি উন্মাদ হইয়া যাইতেছি! মায়াবিনী, তোমাকে ছাড়িয়া আসিয়াও ছাড়িতে পারি না কেন? আমি পুরুষ মানুষ, আমাকে যে জগত সভায় আপন স্থান করিয়া লইতে হইবে! এ ছেলেখেলা লইয়া আর কতদিন ভুলিয়া থাকিব?

এ মায়ার বাঁধন কাটাইবার মন্ত্র আমাকে বলিয়া দাও! চারুলতা, তোমার বাহুডোরের বাঁধন এবার খুলিয়া দাও!

‘টুকরো করে কাছি
আমি ডুবতে রাজি আছি!’

চারুর পত্র:


অমল ঠাকুরপো,

আজ সকালে তোমার পত্র পাইয়াছি। আশা রাখি তোমরা কুশলেই আছ। তোমার স্ত্রীর সাথে আমার পরিচয় হইয়া উঠিল না। তাহাকে চারুদিদির আশীর্বাদ দিও। তাহার ভাগ্য যেন আমার মতো না হয়। স্বামীসুখে সে সৌভাগ্যশালিনী হোক, আয়ুস্মতী হোক, সন্তানের মুখে ‘মা’ ডাক শুনিবার অপার আনন্দ তাহার হোক।

তুমি যথার্থই বলিয়াছ, আর দশজন নারীর মতো সাধারণ সুখ বিধাতা আমার ললাটে লেখেন নাই। অষ্টম বর্ষীয়া যে বালিকাটিকে তোমাদের পিসিমাতা তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতুষ্পুত্রের নিমিত্তে বহু যত্নে বাছিয়া আনিয়াছিলেন, সে সংসারের কীইবা বুঝিত! তাঁর মনে হইয়াছিল সে এক খেলাঘর ছাড়িয়া অন্য খেলাঘরে আসিল মাত্র। পিসিমাতা জননীর ন্যায় স্নেহ করিতেন, সমস্ত দিন তোমার সহিত খেলিয়া বেড়াইতাম আর দিনান্তে চুল বাঁধিয়া, মাথায় কাপড় টানিয়া তোমার দাদার জন্যে চা লইয়া তাঁর ঘরে যাইতাম। তিনি হাসিমুখে একবার চাহিতেন, বলিতেন, “চারু আসিয়াছ! আচ্ছা, গোল করিও না। চা ঢালিয়া চুপটি করিয়া বসিয়া থাক।” তারপর চা আর তামাকু হাতে তিনি খবরের কাগজে ডুবিয়া যাইতেন, আমি বিছানার একপ্রান্তে চুপচাপ বসিয়া থাকিতে থাকিতে কখন যে ঘুমে ঢুলিয়া পরিতাম তাহা নিজেও টের পাইতাম না। তাঁহাকে আমার ভয় করিত না, কিন্তু তাঁহার প্রতি ভালবাসাটুকুও জন্মাইল কই!

তোমার সাথে খেলিবার জন্যেই আমার মন পড়িয়া থাকিত। ক্রমশ এক খেলা ফুরাইয়া অন্য খেলায় মন গেল, আমরা লেখা লেখা খেলিলাম, বাগান রচনার খেলা খেলিলাম, আমাদের খেলাঘরে সংসার রচনা করিলাম। আমাদেরকে পৃথক করিবার মত গুরুজন কেহ ছিলেন না, আমরা যে কোন মায়াজালে জড়াইতেছি তাহা আমরা জানিতে পারিলাম না।

সহসা এক প্রভাতে কঠিন আঘাতে আমার খেলাঘর ভাঙ্গিয়া পড়িল। তোমার দাদা তোমাকে বিবাহ দিয়া বিলাত পাঠাইবেন। আমি খুব আশা করিয়াছিলাম তুমি কিছুতেই রাজি হইবে না। বিবাহ করিলেই বুঝি দূরদেশে যাইতে হয়? আমি নিজেই তোমার জন্যে ফুটফুটে একটি বউ খুঁজিয়া আনিতাম আর তাহাকে আমাদের খেলাঘরের সাথী করিয়া লইতাম।

কিন্তু তোমরা পুরুষ মানুষ, তোমাদের খেলাঘরের খেলায় মন ভরে কই! তোমাদের তরে বহির্জগতের আহ্বান ভাসিয়া আসে, খ্যাতি, বিত্ত আর সম্মানের মোহ তোমাদের দূর হইতে আরও দূরে ভাসাইয়া লইয়া যায়।

তোমার দাদা ভালবাসিতেন তাঁর খবরের কাগজটিকে, আর তুমি ভালবাসিলে কাব্যলক্ষ্মীকে। এক সাধারণ নারীর ভালবাসা তোমাদের তরে যথেষ্ট হইল না। দেবযানী যেমন তাঁর কচকে ধরিয়া রাখিতে পারেন নাই, ঠিক তেমনই স্বর্গসুখ আর অমরত্ব লাভের বাসনা তোমাকেও আমা হইতে দূরে লইয়া গেল।

বলিতে দ্বিধা নাই, আমি আশৈশব তোমাকেই ভালবাসিয়াছি। সেই বেহিসাবি ভালবাসার মূল্যও দিয়াছি, আজও দিতেছি। আমার স্বামী এ জীবনে আমার হইলেন না, সন্তানের মুখে ‘মা’ ডাক শুনিবার সৌভাগ্য আমার হইল না। এ জীবনে এক অভ্রভেদী শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নাই।

অমল! আমার অমল! তুমি আমার মায়ার বাঁধন কাটাইতে চাও? আমাকে ভুলিতে চাও? তবে আমি আর কাহার জন্যে বাঁচিব? কোনো একদিন তুমি ফিরিয়া আসিয়া আবার বৌঠান বলিয়া ডাকিবে, আবার তোমার হাসিমুখটি দেখিতে পাইব, আবার আমার হাতখানি ধরিয়া আগের মতো বাগানে টানিয়া লইয়া যাইবে, আবার আমরা সেই আমড়াতলায় বসিয়া আবোলতাবোল গল্প করিব, তুচ্ছ সেই সুখগুলির আশায় এই শূন্যপুরি আগলাইয়া ছিলাম। আজ তোমার পত্র পাইয়া সেইসব সুখের কল্পনাগুলি শিকলিকাটা পাখির মতোই এক নিমেষে ডানা মেলিয়া উড়িয়া গেল। ভালই হইল।
এইবার আমার মুক্তির ডাক আসিল।

অমল, আমার জন্যে শোক করিও না। আমি তোমার মঙ্গল কামিনী, তুমি জগতসভায় আপন আসন গড়িয়া লও, তাতেই আমার সুখ হইবে। শেষবেলায় একটি ভিক্ষা মাগি। কাব্যলক্ষ্মীর মায়ায় তোমার গৃহলক্ষ্মীটিকে অবহেলা করিও না। তাহার প্রাপ্যটুকু তাহাকে দিতে ভুলিও না। আমার এই শেষ অনুরোধটুকু রাখিও। 

আরও বহু কথা লিখিতে মন চাহিতেছে। কিন্তু আর মায়া বাড়াইব না। তোমার হাতে এ পত্র যখন পৌঁছাইবে তখন অভাগীনি চারুলতার ছাইটুকুও আর বাতাসে থাকিবে না। ভালই হইবে। তোমার দাদার জন্যে এইবার একটি সংসারী পাত্রী খুঁজিয়া আনিও। আমি তাঁহার উপযুক্ত যত্ন করিতে পারি নাই।

‘যখন বেলাশেষের ছায়ায় পাখিরা যায়
আপন কুলায় মাঝে
সন্ধ্যা পূজার ঘন্টা যখন বাজে
তখন আপন শেষ শিখাটি জ্বালবে এ জীবন
আমার ব্যাথার পূজা হবে সমাপন’।

লেখক:
Mousumi Dasgupta
মৌসুমী দাশগুপ্তা, কবি ও গদ্যকার

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট