নাসির আহমেদের একগুচ্ছ কবিতা

Comments

প্রতিটি প্রত্যাশা আজ

একদিন চেয়েছি কিছু মমতার মতো স্নিগ্ধ রোদ
সামান্য জ্যোৎস্নার শুভ্র কুচি
চেয়েছি কিছুটা অন্তরঙ্গতার সূক্ষ্মতম বোধ
এবং কিঞ্চিৎ নতি, যেমন জুতোর দিকে মুচি।

একদিন তৃষ্ণায় খুব সামান্য প্রত্যাশা ছিল জল
চেয়েছি তৃষ্ণার্ত চোখ এবং সামান্যতম দয়ার্দ্র হৃদয়
চেয়েছি গোধূলিলগ্ন রক্তিম আভার ঝলোমল।
সেদিন সামান্য কিছু দাওনি দ্বিধায়, বৃথা ভয়!

আজ সব খুলে দিচ্ছো অসীম প্রভায়
কিন্তু তৃষ্ণা মরে গেছে, মুছে গেছে রোমান্টিক বোধ
সে কি ফিরে আসে আর যায় যে সময়!
রক্তে টলে ক্লান্তি আজ, সামান্য কথায় বাড়ে ক্রোধ।

নদীর কল্লোল ছিল একদিন নৌকো ভাসাবার
আজ নদী মরাস্রোত ধু ধু বালিয়াড়ি
সেদিন সম্মতি যদি দিতে একবার
তাহলে কি হতো আজ সময়ের এত বাড়াবাড়ি?

যেখানে থাকার কথা আমরা সেখানে কেউ নেই
প্রতিটি প্রত্যাশা তাই পদে পদে হারিয়েছে খেই।

ছোট্ট সংসারে সুখি হও

একটা স্নিগ্ধ আলো জ্বলছে দূরে। তোমার জন্মদিনের
বিগলিত মোমবাতির কথা মনে পড়লো এই সন্ধ্যায়
নিদ্রিত রাত্রির গভীরতা টানছে আমাকে। স্তব্ধ অপরাহ্নের
গভীর সান্নিধ্যের স্মৃতি চলে আসছে দ্রুত স্নায়ুকোষে।

তোমার ভেজা চুল থেকে পৌষের মধ্যরাতের তীব্র শিশির
ঝরছে টুপটাপ; তুমি একটু আগেই স্নান সেরে এসেছ
রাতের সঙ্গমস্মৃতি ফুরোতে না ফুরোতেই পরকীয়া ঢেউ
তোমাকে নামিয়ে দিলো শুভ্র শয্যার সমুদ্রে পুনর্বার!

অতৃপ্ত তোমার তৃষ্ণা এবার মেটাও ভালো করে
পান করো মোমের আলোয় সেই আশ্চর্য সঙ্গমস্মৃতি!
পড়ে থাক বরফে ঢাকা দাম্পত্য সংসার প্রাত্যাহিক
ছেলেরা স্কুলে থাক, মেয়েটি আসুক একা একা!

তুমি যাও প্রবল বৃষ্টির মধ্যে জন্মদিনের কাছে
তুমি যাও হা-করা মাছের মুখে তৃষ্ণা বিসর্জনে।

চাঁদের কথা

পথ চলছি পথে একলা, ওই আকাশে চাঁদও চলছে
যেন আমাকে দেখে দেখে সে কিছু বলছে!
আমি দূরে যাই, সে-ও দূরে যায়
আকাবাঁকা পথ সে-ও ঘুরে যায়!

ওই চাঁদ কি রোজ রাত্রে খোঁজে আমাকে
আমি বেরুলে সে-ও বের হয়, নীল জামাকে
তার জ্যোৎস্না করে উজ্জ্বল! আরও উজ্জ্বল!
আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি সে জ্যোৎস্না—জল
কী যে ঝলমল!

রাত চাঁদনী, আমি বের হই, ঘরে থাকি না
চাঁদ সঙ্গী, হাঁটি একলা সাথী কাউকে আমি ডাকি না।
মাকে বলেছি—একী কাণ্ড!
চাঁদ কেন মা সাথে হাঁটে রোজ?
মা বলেন এই পৃথিবীটা যে
গোল তোর কি নেই সে খোঁজ?
গোলাকার তাই মনে হয় চাঁদ
সাথে আসছে
পৃথিবীর সব প্রান্তেই চাঁদ তাই ভাসমান, শুধু ভাসছে।

মিথ্যা এ গৌরব

সবকিছু ধুলো, ছাই, জল
সমস্ত উচ্চাশা লীন এই মাটিতেই
মানুষ বোঝে না শুধু এই সত্যটুকু
মানুষ সাঁতার কাটে ভ্রমে অবিরল।

এই পরিণাম জেনে লালন ফকির
মহান জীবন গড়ে হলেন অমর
হাছন রাজার বোধে শূন্যতার ঘর
সত্য হয়েছিল বলে তিনিও অমর।

মানুষের মুর্খতার দেয়াল তবুও ঊর্ধ্বে ওঠে
যেন তা আকাশ ছুঁতে ঊর্ধ্বগামী হয়!
অক্ষরই যে জ্ঞান নয়, আখেরী রাসুল
জানিয়ে গেলেন সত্যজ্ঞান কারে কয়!

আগুনে-মাটিতে মিশে শেষ হবে সব
তাই ভয়ে কেঁপে উঠি যখন মানুষ করে সৃষ্টির গৌরব।

প্রতীক্ষা সুসময়ের

আবার কখন ফিরে আসবে সময়
সেই আশ্চর্য সময়! যখন পরস্পর
মানুষে মানুষে গাঢ় সান্নিধ্যের উষ্ণতার
সুসময় কবে ফিরে আসবে এ বিচ্ছিন্নতা ছিঁড়ে!

সোনালি ভোরের লাল অথবা গোধূলিময়
স্বর্ণাভ সন্ধ্যার মতো স্নিগ্ধ সুসময়
আমাদের জীবনকে করেছিল নান্দনিক
মন্ময়—তন্ময়। জীবনের ভাষা ছিল সান্নিধ্যে মুখর!

এ কেমন অভিশাপ নেমে এলো পৃথিবীতে
মানুষকে মানুষেরই ভয়! কেউ নয় আপন এমন—
যার মুখোমুখি বসা যায়, উল্টো মনে হয়
ভয়াল ভাইরাস তারও নিঃশ্বাসে রয়েছে!

একদিন ছিল খুব খোলামেলা করমর্দনের মতো
উষ্ণতার দিন। এখন উষ্ণতাহীন
আত্মীয়তাহীন দিন যায়, যেন শীতে ঝরাপাতা…
আসবে আবার কবে বসন্তের হাওয়া ঘরে ঘরে।

রৌদ্রস্নানে কী উচ্ছ্বল ফসলের মাঠ ভাবনাহীন
মানুষেরই হাসি নেই, হৃদয়ে গভীর অমানিশা।

শিউলি-শরৎ ডাকছে তোমাকে

আকাঙ্ক্ষা ছিল একদিন এই বাড়িতে
ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে সন্ধ্যা আনতো
আমাদের সব স্বপ্ন সে ছুঁয়ে থাকতো
স্বপ্নের নীল রাত্রিকে সে-ই চিনতো।

আকাঙ্ক্ষা আজ ভুলেছে প্রেমের তৃষ্ণা
কামক্রোধহীন যেন এক সাধু-সন্ত
ঘুমিয়ে পড়েছে পুষ্পিত সেই উদ্যান
হৃদয়ের কথা ফুরিয়ে সে আজ নিঃস্ব।

উদ্যানে ফুল ফুটছে না আর আজকে
মহামারী যেন ছুঁয়েছে ফুলের বাগানও!
কামের আগুন জল ঢেলে ছাই করেছে
কুমারী মেয়েটি যদিও স্বপ্নে দুলছে।

আকাঙ্ক্ষাহীন এইভাবে বাঁচা যায় কি!
ফিরে এসো মেয়ে ফিরে আসো তুমি এখনই
তুমি তো সড়ক জীবনের গন্তব্যের
তুমি না থাকলে জীবনের আলো জ্বলে কি?

শারদ সন্ধ্যা ডাকছে তোমাকে
ও মেয়ে!
শিউলি শরৎ ডাকছে ঢাকের শব্দে।

লেখক:
Nasir Ahmed
নাসির আহমেদ
কবি, নাট্যকার, শিশু সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ঢাকা, বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট