নিন্দাই যার গৌরবের মুকুট

Comments

।। ইন্দ্রাণী ঘোষ ।।

রাজা রামমোহন রায় (মে ২২, ১৭৭৪ – সেপ্টেম্বর ২৭, ১৮৩৩) সম্পর্কে উপরের কথাকটি বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।  যিনি গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে নবজাগরণের, নবযুগের অগ্রপথিক, প্রথম আধুনিক চিন্তানায়ক, তাঁর সম্বন্ধে বলা এই কথাকটি অনুধাবন করতে হলে আমাদের আবারও একটু তলিয়ে দেখতে হবে তাঁর কর্মজীবন, তাঁর ভাবনার জগতকে।

হুগলী জেলার অন্তর্গত খানাকুল-কৃষ্ণ নগরের কাছে রাধানগর গ্রামে রাজা রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেন; পিতা রামকান্ত রায়, মা তারিণী দেবী; দুইজনই ধর্মপ্রাণ মানুষ তাঁর পরিবারের আসল পদবী ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’, কুলীন ব্রাহ্মণ, রাজসরকারে কাজ করে তাঁরা ‘রায়রায়ান’ উপাধি লাভ করেন।

বাবার নির্দেশে রামমোহনকে নয় বছর বয়সের মধ্যেই তিনবার বিয়ে করতে হয়। প্রথম স্ত্রী কিছুদিনের মধ্যে মারা যান। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তী জীবনে তিনি বহু বিবাহ প্রথার তীব্র বিরোধিতা করেন। এমনকি তিনি তাঁর পুত্রদের ওপর শর্ত আরোপ করেন যে, স্ত্রী বেঁচে থাকতে যদি কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করে তাহলে সে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ তিনি মনে করেছিলেন এ প্রথা মেয়েদের জন্য অসাম্য ও অপমানজনক। মেয়েদের যদি বহুবিবাহের অধিকার না থাকে পুরুষের জন্যই বা তা থাকে কোন হিসেবে।

লেখাপড়া সেকেলে ধরণে বাড়িতেই শুরু, গ্রামের পাঠশালায় বাংলার ছাড়াও তিনি এক মৌলভীর কাছে ফারসি ভাষা শেখেন। ফারসি তখন রাজদরবারের ভাষা, ধনী পরিবারে ছেলেদের এ ভাষা শেখার চল ছিল। এর সঙ্গে তিনি শিখে ফেলেন আরবিও। তিনি এই  ভাষাতেই অ্যারিস্টটল ও ইউক্লিড পড়েন, পড়েন কোরান শরিফও। এছাড়া পড়েন সুফিবাদ নিয়ে বই পত্র, তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন রুমি।  কৈশোরে রামমোহন নন্দকুমার বিদ্যালঙ্কার নামে একজন সংস্কৃত অধ্যাপকের কাছে সংস্কৃত শাস্ত্রও পাঠ করেন।  তান্ত্রিক মত তাঁকে  আকর্ষণ করেছিল। এই নানা ধরণের পাঠ অভিজ্ঞতাই ধর্ম ও সমাজ সম্বন্ধে এই প্রতিভাবান কিশোরের উদারতা তৈরি করতে সাহায্য করেছে। পরিবারের গোঁড়া হিন্দুয়ানির সঙ্গে এই সময় থেকেই তাঁর বিরোধের শুরু।

রামমোহনের বয়স যখন ষোল কি সতের, সেই সময় তিনি বাড়ি ছেড়ে বিদেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন। পরে তিনি লিখেছেন, “পরিশেষে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অত্যন্ত ঘৃণাবশত: আমি ভারতবর্ষের বহির্ভূত কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করলাম। তার মধ্যে তিব্বত অন্যতম।” তিব্বত যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে জানার বাসনা, পুরনো পুঁথিপত্র পড়ার ইচ্ছে। যদিও তিব্বতে গিয়ে  একবার তিনি বেশ ভাল বিপদেই পড়েন। তিব্বতের সর্বপ্রধান বৌদ্ধ পুরোহিতকে বা ‘লামা’কে তিব্বতিরা ঈশ্বরের সমান ভক্তি করে, কিন্তু ব্যক্তিপূজার বিরোধী রামমোহন তা মানবেন কেন, বিশেষতঃ যেখানে বুদ্ধ স্বয়ং নিরীশ্বর, অতএব প্রতিবাদে মুখর হলেন তিনি।  তিব্বতিরা বিশেষত লামার প্রাসাদের অধিকর্তারা তাকে মারার জন্যে ক্ষেপে উঠল। এই সময় তিব্বতি মেয়েরা রামমোহনকে রক্ষা করেছিলেন। এখানে তিনি প্রথম অনুভব করলেন নারী স্বাধীনতার সুফল। তাঁদের কথা স্মরণ করতে গিয়ে রামমোহন বলেছেন, নারীজাতির পক্ষপাতী না হওয়া, তাদের দুঃখ দূর করার চেষ্টা না করা তাঁর পক্ষে কৃতঘ্নতা। এর পর তিনি কিছুকাল কাশীতে থেকে হিন্দু শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন, শিখতে আরম্ভ করেন ইংরেজিও।

১৮০৩ সালে বাবার মৃত্যুর পর রামমোহন মুর্শিদাবাদে বাস করেন কিছুদিন, প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম গ্রন্থ ফারসিতে, ‘তুহ ফাতুল-মুয়াহীদিন’, অর্থাৎ একেশ্বরবাদীদের প্রতি উপহার। বইটিতে তিনি নানা আরবি নৈয়ায়িক ও দার্শনিক মতের অবতারণা করেন। ফারসি  ভাষায় লেখা তাঁর অন্য বইটির নাম ‘মনাজারাতুল আদিইয়ান’ বা বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে আলোচনা।

প্রথম জীবনে নিজেদের বিষয়-সম্পত্তি দেখা শোনা করলেও পরে রামমোহন কলকাতায় আসেন, কলকাতা তখন আধুনিকতার বিকাশের ক্ষেত্র। কোম্পানির সঙ্গে নানা ব্যবসা শুরু করেন তিনি, পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কাজও করেন। এরপর তিনি ডিগবি সাহেবের দেওয়ানি করেন, অল্প কয়েক বছরের জন্য। ডিগবি সাহেব তাঁকে ইংরেজি আরও ভাল ভাবে শিখতে সাহায্য করেন।  বিলেত থেকে আসা ইংরেজি পত্রিকাগুলো তিনি রামমোহনকে পড়ার জন্যে দিতেন।  ফলে রামমোহন ইউরোপের রাজনীতি সম্বন্ধে জানতে পারতেন, এছাড়া সাহেব তার ইংরেজি লেখার তারিফ করতেন। পরবর্তী কালে রামমোহন ইংরেজি ভাষায় ‘কেন উপনিষদ’ ও ‘বেদান্তের চূর্ণক’ নামে দুটি বই লেখেন, এর ভূমিকা লেখেন ডিগবি, বিলেত গিয়ে বইগুলোর পুনর্মুদ্রণ করেন তিনি, বিলেতে রামমোহনের পরিচিতি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল এই বইদুটি। এই সময়েই আমরা দেখি রামমোহন মোট ১০টি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন; বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি, আরবি, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসী, ল্যাটিন, গ্রিক ও হিব্রু।

কলকাতায় সমাজ সংস্কারের জন্য সংগ্রামের যুগ রামমোহনের কর্ম জীবনের বেশিরভাগটা জুড়ে আছে। রামমোহন কলকাতায় চিন্তাশীল বিশিষ্ট জনদের নিয়ে একটি সভা গঠন করলেন। এদের মধ্যে ছিলেন জোড়াসাঁকোর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, পাথুরিয়াঘাটার  প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, টাকীর কালীনাথ ও বৈকুণ্ঠনাথ মুন্সী, বৃন্দাবন মিত্র, কাশীনাথ মল্লিক, ভূকৈলাসের রাজা কালীশঙ্কর ঘোষাল, তেলিনিপাড়ায় অন্নদাপ্রসাদ ব্যানার্জি, হরিনারায়ণ তীর্থস্বামী এবং বৈদ্যনাথ ব্যানার্জি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া  ব্রজমোহন মজুমদার, হলধর বসু, রাজনারায়ণ সেন, চন্দ্রশেখর দেব, তারাচাঁদ চক্রবর্তী প্রমুখ। এখানে বেদান্ত শাস্ত্র ও ধর্মের ব্যাখ্যা ও বিচার সম্পর্কে আলোচনা হতো এবং একেশ্বরবাদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন হতো। এ থেকেই ‘আত্মীয় সভা’র প্রতিষ্ঠা। সপ্তাহে একদিন আত্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হতে তাতে বেদান্তানুযায়ী এক ব্রহ্মের উপাসনা এবং পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হতো। সভায় বেদ পাঠের পর ব্রহ্ম সঙ্গীত গাওয়া হতো। শুধু রামমোহনের কয়েক জন বন্ধুই এ সভায় যোগদান করতেন। সে সময় নিন্দুকেরা আত্মীয় সভার বিরুদ্ধে গুজব রটায় যে, আত্মীয় সভায় গো মাংস খাওয়া হয়। এই সভা থেকেই পরে ব্রাহ্ম ধর্মের সূচনা হয়।

১৮১৫ সালে রামমোহন সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যে বেদান্তসূত্র  প্রকাশ করেন, পরে এর সার সংকলন করে সহজতর বেদান্তসার নামে আরেকটি গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। সময়টা ছিল বাংলা গদ্যরচনার শৈশবকাল। রামমোহন প্রথম বাংলাকে সরল গদ্যরূপ দিলেন। এরপর একে একে তিনি ঈশোপনিষৎ, কঠোপনিষৎ, মান্ডূক্যোপনিষৎ, মুন্ডকোপনিষৎ এর অনুবাদ প্রকাশ করেন। মুন্ডকোপনিষৎ ছাড়া সবগুলো বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হয়। সে সময় বই কিনে পড়ার মতন মানসিকতা খুব একটা ছিল না, কাজেই বিনে পয়সায় তিনি বই বিলি করতেন। যে বেদ শূদ্ররা উচ্চারণ করলে জিহ্বা কেটে দেওয়ার রীতি সেই বেদকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এলেন রামমোহন। স্বাভাবিক যে তাঁর বিরুদ্ধে হিন্দু সমাজ চটে উঠল, বিভিন্ন মাধ্যমে শুরু হল নির্যাতন। অন্যদিকে দেশে বিদেশে রামমোহনের নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। লন্ডন, ফ্রান্স, আমেরিকায়ও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

এবার রামমোহন খ্রিস্টান পাদ্রিদের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে, যিশুর অলৌকিক ঘটনাগুলোকে অস্বীকার কলম ধরলেন। ইংরেজ শাসনে থেকে বই লিখে মিশনারিদের চ্যালেঞ্জ করাটা সহজ ছিল না। কিন্তু রামমোহন তো সত্যের সন্ধানকে, কঠিন কাজকেই নিজের ব্রত মেনেছিলেন। মিশনারি কেরি ও মার্শম্যানরা তার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লিখতে লাগলেন। রামমোহন ও জবাব দিতে থাকেন, কিন্তু এই চাপান উতোরের ফলে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস যারা রামমোহনের সব বই ছাপাত, তারা বই ছাপাতে অস্বীকৃত হয়। কিন্তু রামমোহন দমবার পাত্র ছিলেন না। তিনি ‘ইউনিটেরিয়ান প্রেস’ নামে একটি প্রেস খুলে বসলেন। সেই প্রেস থেকে ১৮২৩ সালে তাঁর Final Appeal ছাপা হল। এই বইয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিলেন মার্শম্যানের ভুল কোথায়। এরপর মার্শম্যান নীরব হলেন।

এবার আসা যাক সতীদাহ প্রথা রদে তাঁর ভূমিকার কথায়। রামমোহন ১৮১৮ সালে সতীদাহের বিরুদ্ধে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন, এর ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশ করেন।  এই সময় বিধবা হিন্দু স্ত্রীকে সহমরণে বাধ্য করা হত। বিশেষ করে মৃতের সম্পত্তি অধিকার করার লোভে আত্মীয়রা তার সদ্যবিধবা স্ত্রীকে ধরে বেঁধে, অনেক সময় নেশাগ্রস্ত করে, ঢাক-ঢোলের শব্দ দ্বারা তার কান্নার আওয়াজকে চাপা দিয়ে স্বামীর সাথে চিতায় পুড়িয়ে মারত। তিনি প্রমাণ করে দেখান যে এই প্রথা শাস্ত্র বিরোধী। রামমোহনের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে হিন্দু গোঁড়া সমাজ আবার তার বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হল। রামমোহন শুধু বই লেখা কিংবা ইংরেজদের এই প্রথার বিরুদ্ধে আইন করার জন্যে কাজ করেননি। তিনি নিজের বন্ধুদের নিয়ে একটি দল গঠন করলেন। তারা সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্যে শ্মশানে ছুটে যেতেন। মানুষকে এই প্রথার বিরুদ্ধে বোঝাতে চেষ্টা করতেন। আর এই কাজ করতে গিয়ে তাঁকে অনেক লাঞ্ছনা, অপমান ভোগ করতে হয়েছে। তারপরও তিনি থেমে থাকেননি। ইংরেজরা প্রথমে হিন্দুদের ধর্মীয় আবেগে ঘা দেওয়ার ভয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চায় নি। শেষ পর্যন্ত সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার জন্যে এগিয়ে আসেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। রামমোহন ও তাঁর দলের সমর্থন লাভ করায় তিনি সতীদাহ প্রথা চিরতরে বন্ধ করার জন্য ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথা নিষেধ করে আইন জারি করলেন। এর ফলে হিন্দু সমাজে যেন একটা বোমা বিস্ফোরিত হল। চারদিকে তোলপাড় শুরু হল। গোঁড়া হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাল। কলকাতায় বিশিষ্ট পণ্ডিতসহ মোট ৮০০ অধিবাসীর নাম স্বাক্ষরসহ এক আবেদনে এ আইন প্রত্যাহারের আবেদন জানানো হল। অন্যদিকে রামমোহন ও তাঁর দল বেন্টিঙ্ক সাহেবকে অভিনন্দন-পত্র পাঠালেন এবং প্রকাশ্য সভায় অভিনন্দিত করলেন। গোঁড়া হিন্দু সমাজ সতীদাহ রদ আইনে বাতিল করার জন্যে একজোট হল। রাতারাতি তারা ‘ধর্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করল, তাদের পত্রিকা ‘সমাচার চন্দ্রিকা’য় রামমোহনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে লাগল। এর প্রতিবাদে রামমোহন ১২৮ জন পণ্ডিতের মত খণ্ডন করে সহমরণ বিষয়ক তৃতীয় প্রস্তাব প্রকাশ করলেন। গোঁড়া হিন্দুরা যখন বুঝল ভারতবর্ষে এই আইন রদ হওয়ার কোন সুযোগ নেই তারা বিলেতের পার্লামেন্টে আপিল করে বসল। কিন্তু লাভ কিছু হল না। ১৮৩৩ সালে আইন পাশ হল।

বহুবিবাহ রদের জন্য  সংগ্রাম শুরু করেন রামমোহন, তাঁর কাজকে পরে এগিয়ে নিয়ে যান বিদ্যাসাগর। এছাড়াও রামমোহন শাস্ত্র ঘেঁটে বলেন, মৃত-স্বামীর সম্পত্তিতে পুত্রের সাথে স্ত্রীও সমান অধিকারী। সম্পত্তির অধিকারহীন বিধবার নারীর জীবনকে তিনি মৃত্যুর সমান যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে উল্লেখ করেন।

সমাজ সংস্কার, প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতির অবস্থান নেওয়ার ফলে সামাজিক কুৎসা, জীবনের উপর আক্রমণ সবকিছুই সইতে হয়েছে রামমোহনকে। সমাজের মানুষের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধেও তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়। রামমোহনের পুত্র রাধাপ্রসাদের বিয়ের সময় তার বিরুদ্ধ দল বিয়ে ভাঙার অনেক চেষ্টা করে। এমনকি রামমোহনকে এক ঘরে করে রাখার আয়োজন করা হয়। যদিও তারা ব্যর্থ হয়েছিল। অন্যদিকে মা তারিণী দেবীতো কোর্টে রামমোহনের বিরুদ্ধে মামলা-ই করে বসেন! ছেলে বিধর্মী, তাই পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী যেন না হয় তার জন্যে এই মামলা। রামমোহন প্রথমে মায়ের বিরুদ্ধে মামলায় লড়তে চাননি। কিন্তু তিনি পরে ভাবেন, এতে তার আন্দোলন সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হবে। এ জন্যে তিনি মামলায় লড়েন এবং জয়ী হন। মামলায় জয়ী হওয়ার পর তিনি তার প্রাপ্ত সম্পত্তি মাকে ফেরত দিয়ে দেন। কারণ, তাঁর যুদ্ধ তো মায়ের মামলার বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

রাজা রামমোহনের জীবনের শেষ তিন বছর কেটেছিল ইংল্যান্ডে। দিল্লীর বাদশাহএর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি বিলেত যান। বিলেত যাওয়ার আগে ১৮২৯ সালে তিনি থেকে রাজা উপাধি লাভ করেন। সেই যুগে দেশের শাস্ত্র অনুযায়ী সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ ছিল। রামমোহন প্রথম এসব অযৌক্তিক প্রথাকে উপেক্ষা করে বিলেত যান।  ১৮৩৩এর ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলে তাঁর প্রয়াণ হয়। তখন তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। তাকে স্টাপেল গ্রোভএর সমাধি স্থানে সমাহিত করা হয়। দশ বছর পর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর বিলেতে গিয়ে আরনস ভেল নামক স্থানে পুনঃসমাধিস্থ করে সেখানে একটি ব্রাহ্ম মন্দির স্থাপন করে দেন তাঁর নামে।  

প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের অত্যাচার সহ্য করার পরও রামমোহনের কোন লেখায় কারো প্রতি কোন বিদ্বেষ দেখা যায়নি। কলকাতায় যখন ব্রাহ্মসভায় উপাসনা করতে যেতেন তখন লোকে তার গাড়িতে ঢিল ছুড়ত। তাই বেশির ভাগ সময় গাড়ির জানালা বন্ধ করে রাখতে বাধ্য হতেন। বিরোধী পক্ষ তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা পর্যন্ত করছে। এই জন্যে রামমোহন তাঁর সঙ্গে কিরিচ ও পিস্তল সঙ্গে নিয়ে বের হতেন। কিন্তু এর পরও তিনি এসব নিয়ে রসিকতাই করতেন। সহিষ্ণুতার নীতিতে ছিল তাঁর অগাধ আস্থা। তাই তিনি ভারতপথিক।

ইন্দ্রাণী ঘোষ

ইন্দ্রাণী ঘোষ

লেখক পরিচিতি:

ইন্দ্রাণী ঘোষ। জন্ম মহারাষ্ট্রের পুনা শহরে। পড়াশুনা দশম শ্রেণী অবধি  দক্ষিণ কলকাতার নব নালন্দা ও দ্বাদশ, একাদশ শ্রেণী ডায়সেশন  স্কুলে। পরবর্তী কালে স্নাতকত্তর ডিগ্রী লাভ বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতন থেকে। স্বামীর চাকরি সুত্রে বেশ কিছুদিন কলকাতার বাইরে এবং দেশের বাইরে বসবাস।একটি কন্যা সন্তানের জননী। বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতায় স্থিত এবং একটি বেসরকারি স্কুলে কর্মরত। পিতা অধ্যাপক ছিলেন।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট