নিয়মিত সাধারণ নির্বাচন হলে কী হতে পারত

Comments

। আনোয়ার শাহাদাত ।

যুগের পর যুগ ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা সচেতনভাবেই এমন ভান করে যে রাজনীতি এক দুর্বোধ্য, জটিল বিজ্ঞান- যা সাধারণ মানুষের বোঝার ক্ষমতার বাইরে। এই ভাঁওতাবাজির আড়ালেই তারা দুঃশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, অবাধে লুটপাট করেছে, চুরি-চামারি ও দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করেছে, এবং রাষ্ট্রকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছে। আইন, নীতি, নৈতিকতা- সবকিছুই জলাঞ্জলী দিয়ে তাদের খেয়ালের কাছে তুচ্ছ করে রেখেছে। যা ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা- এমন বেপরোয়া আচরণই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরা একটি স্থায়ী ও প্রতিষ্ঠিত রূপ দিয়েছে।

ফলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, সেই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যত ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সে চেষ্টা দলটি করছিল। তার মধ্যে একাধিক নেতা হত্যার ঘটনা, বিরোধী দলের প্রধাকেও উদ্যোগ ছিল। উদ্দেশ্য ছিল- এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আর ক্ষমতায় আসতে না পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই উদ্দেশ্যে সফল হয়নি। বরং দমনমূলক ও বিরোধী-নিরোধমূলক ব্যবস্থা যে দলটির বিরুদ্ধে (আওয়ামী লীগ) তারা করেছিল, ঠিক সেই শক্তিই- অর্থাৎ আওয়ামী লীগই- ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসে তারা আগের ক্ষমতাসীন দলের মতোই আচরণ করে, প্রতিপক্ষকে (বিএনপি) দমন করে। অর্থাৎ ক্ষমতায় দল বদলালেও আচরণের ধরন বদলায়নি; পুনরাবৃত্তি ঘটেছে একই পদ্ধতির। অর্থাৎ আওয়ামীলীগ সেটাই করেছে, যা তার আগে বিএনপি করেছিল। বিএনপি যেমন চেয়েছিল আওয়ামী লীগ আর কখনো ক্ষমতায় আসতে না পারে, আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় এসে সেটাই চেয়েছে। তফাৎ হলো- তা বিএনপি করতে পারেনি, আওয়ামী লীগ তাতে সফল হয়েছে; অর্থাৎ ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে পেরেছে।

এখন প্রশ্ন হলো- এই সাফল্য কী ধরনের এবং এতে কতটা লাভ বা লোকসান হয়েছে? আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা সবার জানা আছে। এটা কী চূড়ান্ত কোনো অর্জন? বিএনপির জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চাওয়ার ফল ছিল দুই বছরের সামরিক শাসন, তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন, দেশত্যাগ- এসবই ঘটেছিল বিএনপির ক্ষমতা জোর করে রাখতে চাওয়ার কারণে। এরপর ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। অথচ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচন করে। ঠিক এমনটাই আগে বিএনপি করতে চেয়েছিল। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল অবশ্য ৯০-এর স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর বিএনপি প্রথম ক্ষমতায় এলে; মেয়াদ শেষে তারা ক্ষমতায় থাকতে চায় (১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন) ১৯৯৬ সালে। যদিও সেবারও বিএনপি ব্যর্থ হয়েছিল।

২০০৭ সালে যদি বিএনপি জোর করে ক্ষমতায় থাকতে না চাইত, তাহলে কী হতো? সাধারণ নির্বাচন হতো, হয়তো তারাই ভোটে ক্ষমতায় থাকত অথবা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসত। এর ভিন্ন কিছু নয়। তারা জোর করেই থাকতে চাইলেও বিরোধী দলের আন্দোলনে বিএনপির পক্ষে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হয়নি। এরপর দুঃখজনক কী- মজার ব্যাপার হলো- আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসবার পরে ক্ষমতায় থেকে বিএনপি যা করেছিল, যাতে আওয়ামী লীগ কখনো ক্ষমতায় আসতে না পারে, কেবল তারাই পাতানো নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকবে- আওয়ামী লীগ সেই পথই অনুসরণ করে। পরপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে তিনটি নির্বাচন করে। যদিও শেষেরটার কিছুদিনের মধ্যেই তাদের পতন হয় বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে।

এগুলো হলো সংক্ষিপ্ত তথ্য। এখন আসা যাক পরবর্তী বিষয়ে- যদি আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে জোর করে ক্ষমতায় না আসত, তাহলে কী হতে পারত? প্রথম সম্ভাবনা ছিল এই যে, আওয়ামী লীগই আবার নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় আসত, যেহেতু তাদের কাজ ভালো ছিল। যদি আসন কম হতো, তাহলেও তারা যৌথ সরকার গঠন করতে পারত। আর যদি নির্বাচনে জয়ী না-ও হতো, তবে অন্তত ১৩০–১৪০টি আসন তো পেতই। এতে দেশে অর্থপূর্ণ গণতন্ত্র থাকত, আবার রাষ্ট্র-ক্ষমতার অংশীদারও থাকত। বিরোধী দল [এমপি] হিসেবে যে সাধারণ ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাব- সেসব থাকত। সরকারে না থেকেও রাষ্ট্রের কাঠামোরই অংশ থাকত। শেখ হাসিনা থাকতেন মন্ত্রী পদমর্যাদার বিরোধী দলের নেতা, প্রধানমন্ত্রী-সমান্তরাল। সে ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি গণতান্ত্রিক ভারসাম্য তৈরি হতো। দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের উপর একটি স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ থাকত। সব মিলিয়ে বলা যায়, রাষ্ট্র একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চলতে পারত।

সংগত কারণেই পরের বার আওয়ামী লীগের পুনরায় ক্ষমতায় আসার বাস্তব সম্ভাবনা থাকত। সেটাই গণতন্ত্রের নিয়ম। তাদের প্রথম মেয়াদে তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভালো কাজ করেছিল বলে খ্যাত। অতএব বলা যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়েও আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসতে পারত নিরপেক্ষ নির্বাচনে।
সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে- তখন বিএনপির অবস্থান কী হতো, ২০১৪-তেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে?

সর্বসম্মতভাবেই বিএনপি একটি শক্তিশালী ও বড় বিরোধী দল হতো এবং সংসদে তাদের আসনসংখ্যা ১২০ থেকে ১৪০-এর মধ্যেই হয়তো থাকত। তেমন হলে ক্ষমতাসীন দলের একচেটিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার সীমিত হতো, রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকত- যা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে যদি ২০১৪-তে ধরা যায় আওয়ামী লীগই আবার ভোটে ক্ষমতায় এলো, তবে ২০১৮-তে হয়তো বিএনপি বা তার শরিক দল জিততো। তখন ধরে নেওয়া যায় বিএনপি ১৫০টির বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করত। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগেরও ১০০টির বেশি আসন থাকত- সম্ভবত ১১০, ১২০ কিংবা ১৩০টির কাছাকাছি।

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকত। সরকার ও বিরোধী দল- দুই পক্ষই শক্ত অবস্থানে থাকত। কিন্তু লোভের কারণে সেই সম্ভাবনাগুলো আর থাকে না। সব মিলিয়ে বলা যায়, কোনো না কোনোভাবে এই দুই দল কিংবা এই দুই দলের জোটের মধ্যেই ক্ষমতার পালাবদল ও ভাগাভাগি ঘটত। যদি সেই ক্ষমতা ভাগাভাগি হতো, তাহলে তাদের দ্বারা নির্মিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকত। তবে এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আরও শক্তভাবে টিকে থাকত- তা হলো- গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন, জয়-পরাজয়ের স্বাভাবিক পদ্ধতি।

এক দলের শাসনকালে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হলো, আকাশ-রেল হলো, বড় নদী-সেতু হলো, ইত্যাদি। প্রশ্নটি উন্নয়ন নয় মাত্র, প্রশ্নটি পদ্ধতির। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর বহু দেশে স্বৈরশাসকেরা তথাকথিত উন্নয়নের গল্পই সবসময় উপস্থাপন করেছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি। উন্নয়ন গল্পের জন্য ভালো শোনাতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবনের মান কতটা উন্নত হয়েছে- সেটিই আসল বিষয়। এবং এই উন্নয়ন অর্থবহ তখন, যখন তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসে। গণতন্ত্রবিহীন ব্যবস্থায় কেউ যদি দাবি করে- তিনি মানুষকে সুন্দর জীবন দিচ্ছেন- সে দাবি গ্রহণযোগ্য হয় না। একইভাবে ভবিষ্যতের কোনো সরকার যদি স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় থেকে সুন্দর জীবনের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেটিও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

দেশের উন্নয়ন ও ভালো জীবনের মূল্যায়ন নির্ভর করবে কোন পদ্ধতিতে একজন বা দল ক্ষমতায় এসেছে এবং ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করছে- এবং কীভাবে ভবিষ্যতে ক্ষমতার রদবদলের ঘটনা হবে- সে পদ্ধতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চয়তার মাধ্যমে।

লেখক পরিচিতি:
Anwar Shahadat
আনোয়ার শাহাদাত
লেখক, গল্পকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা; নিউইয়র্ক

*প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট