নীল ছবির তর্জমা

Comments

কি আঁতকে উঠলেন? আহা  কত কিছু নীল হয়।  এই যেমন নীল আকাশ, নীল সাগর, নীল তিমি……..  সে এক লম্বা লিস্ট।  কিন্তু এই লিস্টে সবচেয়ে বেশি যে নামটি চোখ ‘আঁকড়ে’ ধরে তা হচ্ছে ‘নীল ছবি।’ আমি একটি নীল ছবির তর্জমা দিব।  আহা  এখনি ল্যাপটপ বন্ধ করার দরকার নেই।  আগে তর্জমাটি পড়ুন, একটু ভাবুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।

শনিবারে আমি কাজ করি না।  কিন্তু লকডাউনের কারণে প্রায় সাতদিনই কাজের কথা ভাবতে হয়।  এই শনিবারেও তাই কাজ করার জন্য যখন প্রস্তুত হচ্ছিলাম তখন তানিম একটি লিংক পাঠালো। ছবিটি দেখার জন্য আমি উন্মুক্ত হয়ে বসে ছিলাম। ছবিটির নানা খবর  শুনছিলাম, ছোট ছোট ভিডিও দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, ‘ছবিটি দেখবো কবে?’

শনিবার সকালে হাতে চাঁদ পাওয়ার মত  অবস্থা হলো।  ভাগ্যিস আমার প্রথম রুগী দশ  মিনিট দেরী  করে জুম এ ঢুকলো। সেই ফাঁকে ওই পনের মিনিটের জানালা দিয়ে ছবিটি অনলাইনে ভাড়া করে ফেললাম। তারপর কি আর সেশনে মন বসে? তিনটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে, এক দৌড়ে আমি আর মৌসুমী থিয়েটার রুম অন্ধকার করে দেখা শুরু করলাম।

ছবির নাম ‘মরিয়ম রেহানা নূর।’ অনেক প্রশংসা পেয়েছে। এ বছর কান উৎসবে তো সবার চোখ ছিল এই ছবির উপর। এবার তাহলে একটু তর্জমা শুরু করি। গল্পটি একজন ডাক্তারকে নিয়ে ।  সেই ডাক্তার কিছু ঘটনার মধ্যে জড়িয়ে গেলেন যখন একটি হাসপাতালে রুগী দেখছিলেন আর পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সাথে আমরা দেখছিলাম সেই ডাক্তারের মনোজগতে কি কি ঘটছিল? কি সেই উথাল পাথাল! কেমন সেই সমুদ্রের ঢেউ! আমি ইচ্ছে করেই ছবির গল্পটি বলব না। তাতে কোন মুন্সিয়ানা নেই। গল্পটি কিভাবে নির্দেশক আমাদের বললেন বরং সেটা নিয়ে কথা বলি।

রেহানা ভীষণ ‘ডিস্টার্ব’ একজন মেয়ে। মাথা ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখে, অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না, রাগে কটমট করে, আবেগ দিয়ে পরিস্থিতি  বিশ্লেষণ করে, জেদ করে, অন্যের উপর মনের ঝাল ঝাড়ে, আর হুট পাট সিদ্ধান্ত নেয়। এমন একটি মানুষের গল্প যখন আমরা শুনবো – তখন তো আমাদের একটু বেশি মনোযোগী হতে হবে। বুঝতে হবে – এই মেয়েটি কি বলতে চাচ্ছে?  গল্পটি শুরু হয় – দরজায় ক্রমাগত ধাক্কা দেয়া থেকে। মনে প্রশ্ন জাগে – মেয়েটিকে কি কেউ আঁটকে রাখল? কে করল? কেন করল? এমন প্রশ্ন যখন মাথায় ঘুরে তখন লম্বা একটি করিডরের শট দীর্ঘ সময় ধরে দেখতে দেখতে আমাদের মনে আরও প্রশ্ন জন্ম দেয়। আমাদের মন যখন জানতে চায় রেহানা সেই বদ্ধ ঘর থেকে বের হয়ে কোথায় গেল?  কিন্তু ক্যামেরা তো আর ঘুরছে না। আমরা শুধু দেখছি একটি ফাঁকা করিডর। কাক পক্ষীও নেই সেখানে। আমরা লিফট এর শব্দ শুনি। অনুমান করি রেহানা সেই লিফট এ ঢুকেছে ।  কিন্তু মুহূর্তেই সেই করিডরের ফাঁকা ফ্রেমে একটি মেয়ে যখন আরেকটি শিক্ষকের রুম থেকে বিধ্বস্ত অবস্থায় বের হয় – তখন বুঝি এই লম্বা শট এর কারণ। আমি বলি এটা ছিল নির্দেশকের ‘মুনশিয়ানা নম্বর-এক’।

তারপর গল্প এগুতে থাকে। খুব ধীর গতি নিয়ে গল্প বলেন  নির্দেশক। আমরাও ধীর গতি নিয়ে গল্প শুনি। দেখি মেয়েটির ছোট্ট মেয়েকে, ভাইকে। সেই সাথে জানি মেয়েটির পরিবারের কথা। বুঝতে পারি যে ঘটনা অন্য একটি ছাত্রীর সাথে ঘটেছে – সেটা নিয়ে রেহানা ভীষণ বিরক্ত এবং এক সময় দেখলাম – রেহানা সেই মেয়ের ঘটনা নিজের গায়ে মেখে (বা নিজের কাঁধে নিয়ে)  বিষয়টির সুরাহা করতে চাচ্ছে।  তখনই মনে হয়েছে নির্দেশককে বলা দরকার, ‘থামুন ! থামুন ! থামুন।’

রেহানা তো একজন ডাক্তার। অন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে উনার বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে তো তাঁর অনেক বেশি পরিপক্ক হওয়া উচিত? তা না হলে উনি ডাক্তার হলেন কি করে? আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি যে মেডিক্যাল প্রফেশনে আমরা শিখি কি করে অন্যের আবেগ, সমস্যা নিজের মাথায় নিতে হয় না। বরং অন্যকে তাঁদের সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে কথা বলি। যদি তা না করি তাহলে দিনে ২০ জন রুগী দেখলে তো ‘বিশ’ তখন ‘বিষ’ হয়ে যাবে। কিন্তু রেহানা তাই করলেন। উনি নিজেকে একজন আবেগ প্রবণ ডাক্তার হিসাবে উপস্থাপন করলেন। আমার মনে প্রশ্ন জাগলো -‘আপনার ডাক্তারি জীবনে হাজার হাজার ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, সেক্স এবিউজ এর রুগী দেখবেন।  আপনি কি সবার সমস্যা নিজের কাঁধে তুলে নিবেন ? নাকি রুগীদের তাদের সমস্যা নিয়ে তাদের কিছু করতে বলবেন?’

রেহানা অন্যের সমস্যা নিজের করে ভেবেছেন। তাই নিজেও ধীরে ধীরে বদলে গেছেন। ভাইয়ের সাথে এমন কি নিজের মেয়ের সাথে  রূঢ় আচরণ করেছেন। ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটি যখন মায়ের কাছ থেকে একটু সময় চাচ্ছিল, ভেবেছে মায়ের সাথে থাকবে – মা তখন ব্যস্ত, বিরক্ত অন্যের সমস্যা নিয়ে। এই সমস্যার সমাধান এই ছোট্ট মেয়েটির মাকে যে একা একা করতে হবে তা নয়। আরও অনেকেই মেয়েটিকে সাহায্য করতে পারতো। কিন্তু ডাক্তার মেয়েটি একা কিছুই করতে না পেরে – মনের ঝাল ঝাড়লো ছোট্ট  মেয়েটির উপর। আর সবচেয়ে ভয়াবহ কাজটি করলো শেষ দৃশ্যে। দর্শক হিসাবে আমারও মনে হয়েছিল, রেহানা ওর মেয়ের হাত থেঁতলে দিতে পারে। কারন ডাক্তার মেয়েটি সুস্থ নয়। মিষ্টি ছোট্ট মেয়েটি ঘরে আটকে রইলো আর আমি ভাবলাম – কি এক অদ্ভুত পৃথিবীতে এই মেয়েটি বড় হবে? সার্কেল অফ ভায়লেন্স ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

এই যে রেহানা এতো ডিস্টার্ব – তার কারন কি?  আমি কিছুই জানলাম না।  আমি অনুমান করি – রেহানা একটি ডিস্টার্ব ‘সম্পর্ক’, ‘বাজে একটি বেড়ে উঠার’ অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছে। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স একটি সার্কেলের মতো।  যেভাবে রেহানা বেড়ে উঠেছে, সেই একই যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে রেহানার মেয়েটিও বড় হবে।  মেয়েটির মা সেই পরিবেশ তৈরি করেছে। দর্শক হিসাবে আমার জানতে ইচ্ছে হয়েছে যে কেন রেহানা এতো ডিস্টার্ব? নাকি নির্দেশক ভেবেছেন – যে যার মত  করে ভেবে নিক? তাহলে আমার প্রশ্ন হচ্ছে – আমি কার গল্প শুনতে বসেছি? রেহানার গল্প। তাহলে আমি যে জানতে চাইবো রেহানা কে ? কোথা থেকে এলো? আর কেনই বা ওর এমন খিটখিটে মেজাজ? কেন মেয়ের হাত থেঁতলে দিতে চায়? কেন অন্যের দোষ অযৌক্তিক ভাবে নিজের ঘাড়ে  নিতে চায়।  মনে পড়লো এই রেহানা শিক্ষক  হিসাবে একটি মেয়েকে  নকল করে পরীক্ষা দেয়ার কারণে সাসপেন্ড করেছিল। অন্যের ‘সেক্স এবিউজ’ এর ঘটনা- নিজের ঘাড়ে  নেয়া আর যাই হোক সাহসের কাজ নয়।  বরং ওই নকলের মত  কাজ।  বিশেষ করে একজন ডাক্তারের কাছ থেকে এমন কাজ কিছুতেই আশা করিনি।  আমি স্বীকার  করি ডাক্তারও একজন মানুষ। কিন্তু সাধারণ মানুষের যে ‘কোড অফ কন্ডাক্ট’ নেই ডাক্তারের তো তা আছে।  তাহলে একজন ডাক্তার এমন আবেগের বসে সিদ্ধান্ত নিলে রোগীদের কি অবস্থা হবে ? একজন ডাক্তার অবশ্যই কস্ট পাবেন, অন্যায়ে সোচ্চার হবেন। কিন্তু উনি বিপ্লবী হিসাবে যত বেশী সমাধান পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী হবেন স্ট্রেটিজিক প্ল্যান নিয়ে। কিন্তু এটা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ এর গল্প। উনি মুল চরিত্র রেহানার অনেক কথা আমাদের জানাতে চাননি এবং উনি এই ভাবেই গল্পটি বলতে চেয়েছেন। আমি হোঁচট খেয়েছি।

যাক এবার কি ভাল লাগলো সেটা বলি।  অধিকাংশ শট বেশ লম্বা মনে হয়েছে। কিছু কিছু ভাল লেগেছে।  যেমন একই শটে  মেয়েটির দশ -বারো বার মুখ ধোয়া। অনেকের বিরক্ত লাগতে পারে। কিন্তু ওই শটটি আমার বেশ অর্থপূর্ণ মনে হয়েছে। নির্দেশকের এই কাজটিকে বলব – ‘মুনশিয়ানা–দুই’। ভাল লেগেছে রেহানাকে যখন সবাই দেখতে আসে আর সেই দৃশ্যটি যখন একটি টানা লম্বা শটে নেয়া হয়েছে। সেই ফ্রেমে আমরা অনেক কিছু দেখলাম। এতো মানুষের আনাগোনা,  এতো ছোট ছোট ঘটনা ঘটছে – কিন্তু মূল দৃশ্য হারিয়ে যায় নি।  ক্যামেরা জায়গা পরিবর্তন করেনি। এটা  হচ্ছে ‘মুন্সিয়ানা – তিন’।

পুরো ছবিতে প্রচুর লম্বা শট রেখেছে – যা আগেও বলেছি। সবগুলো ভাল লাগেনি।  তবে একটা ব্যাপার বেশ লেগেছে। তা হলো, আমরা অধিকাংশ ছবিতে দেখি যে – দুজন কথা বলছে, তার পর কাট।  এরপর একজনের ক্লোজ শট, ওভার দি শোল্ডার, তারপর আবার কাট  শট, তারপর আবার দুজন এর শট।  কিন্তু ভাবুন তো আপনি চোখের সামনে দুজনকে কথা বলতে দেখছেন। আপনার চোখ কি এই কাজ করবে ? এই মানে, প্রথমে দুজনকে দেখবে , তারপর শুধু  একজনকে দেখবে , তারপর আবার শুধু আরেক জনকে দেখবে – তারপর দুজনকে আবার একসাথে দেখবে ? উহু। ….. সেটা তো হবে না।  আপনি পুরো দৃশ্যটি একসাথে দেখবেন।  ছবির ডিওপি বোধহয় বিষয়টি মাথায় রেখেছিলেন।  তবে লম্বা শটগুলো আর একটু কম হলে ভাল লাগতো।  বাঁধন ভাল অভিনয় করেছেন।  নির্দেশক সাদ যা চেয়েছেন – উনি তাই দিয়েছেন।  শুরু থেকে সাহস পর্যন্ত অভিনয়ে কন্সিস্টেন্সি ছিল। আর ছোট্ট মেয়েটিকে কি বলবো?  একেবারে জান্টু  জান্টু  অভিনয় করেছে। কি চমৎকার এক্সপ্রেশন ছিল মেয়েটির চোখে, মুখে এবং গলায়।

ও হ্যাঁ।  নীল ছবির কথা তো বলা হলো না।  দেখুন রেহানা একজন ডিপ্রেসিভ মানুষ। আমি অনুমান করছি মেয়েটির পুরানো ট্রমা নিয়ে কিছু অমীমাংসিত বিষয় আছে।  অতএব ওর কাছে পৃথিবীটি ভীষণ অসুখী, অশান্ত, বিষন্নতায় ভরা।  আর জানেন  তো বিষন্নতার রং হচ্ছে ‘নীল।’ রেহানার চোখে একটি নীল রঙের চশমা সব সময় লটকে থাকে।  তাই ও যা দেখে তা সব কিছু নীল, বিষণ্ণ। নির্দেশক এবং গল্পকার আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ এর এই মুন্সিয়ানা কে বলবো ‘মুন্সিয়ানা -চার’।  নির্দেশক সাদ  হয়তো এই গল্পটি এমন ভাবেই বলতে চেয়েছেন। আর আমরা দেখলাম যে পরিবারে একজন নিগৃহীত হলে বাচ্চাদেরও নিগৃহীত হবার সম্ভাবনা থাকে – যদি না আমরা সেই চক্র থেকে বের না হই। কিন্তু অতৃপ্তি থেকে যায় যখন গল্পের ‘নীল চশমা’ পড়া মেয়েটিকে ভীষণ অচেনা মনে হয়।

আরেকটি কথা। সিনেমায় বিনোদনের খোরাক জোড়া লাগান কোন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু নির্দেশক ভীষণ সচেতন ভাবেই ওগুলো এড়িয়ে গ্যাছেন। একটি বিষণ্ণ ভরা গল্প, বিষণ্ণতার লয়ে শৈল্পিক ভাবে ফ্রেমে ধরেছেন। তার জন্য পুরো টিমকে অভিনন্দন। আমরা আগামীতে নিশ্চয় আরও ভাল ভাল গল্প শুনবো।

যারা এই লেখাটি পড়ছেন – তাঁদের জন্য একটি কথা। ছবিটি দেখুন। নাহলে এই লেখাটি পড়ে কি লাভ হোল?

লেখক:
John Martin01
জন মার্টিন, প্রবাসী, মনোবিজ্ঞানী, সাংস্কৃতিক কর্মী

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট