নুসরাত সুলতানার কবিতা

Comments

ফুটবল

পেট মোটা, শীর্ণকায় সাত বছরের ছেলেটি
বাবার কাছে একটা ফুটবল চেয়েছিল।
ফুটবলের দাম বারোশ’ টাকা। 
উচ্চমান সহকারী বাবা বলেছিল;
ইদের বোনাস পেয়ে কিনে দেবে।
তারপর ইদের আগেই বন্যা আসল!
ভেঙে গেল দোচালা ঘর।
বোনাস পেয়ে বাবা গোল-পাতার ঘর বানালেন,
আবার কিনলেন ধবলী,
লালী যে ভেসে গেছে বন্যায়।
খোকাকে দুধ খাওয়াতে হবে যে!
অনেক বড়ো হবে খোকা!
তারপর জেলা শহর থেকে ফেরার পথে;
বাবাকে পিষ্ট করেছে ট্রাক।
খোকার দৃঢ় সংকল্প;
অনেক বড় হবে সে!
একটা আস্ত ফুটবলের দোকান দেবে সে।
আজ খোকা মস্ত ইঞ্জিনিয়ার। 
খোকা তার আত্মজর জন্য 
কিনে আনে সবচেয়ে দামী ফুটবল। 
পাঁচ বছরের আত্মজ বলে;
আমি তো ফুটবল ট্যাবে খেলি!
ওটা তুমি নাও।
খোকার দীর্ঘশ্বাস কি সুন্দর এক ফুটবল!

মিথ্যে

তুমি বরং মিথ্যেবাদী রাজনীতিবিদদের মতো-
কিছু মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দাও।
তুমি বলো-
গোধূলির সূর্য থেকে কমলা
রং এনে তোমার শাড়ির পাড়ে নকশা বসিয়ে দেবো।
বলতে পারো-
তোমার চন্দ্র বিধৌত রূপে
আমি স্নান করে
পরিচ্ছন্ন, শুদ্ধ পুরুষ হবো।
বলতে যদি চাও;
তোমার আগমনী বাণী শুনে
আমি অপেক্ষা করতে করতে
এক ঘর্মাক্ত, ক্ষুধার্ত প্রেমিক হয়ে
গ্রিনিজ বুকে নাম লেখাব।
আমার কিসে আপত্তি বলো!
সব মিথ্যে জেনেও-
আমি এসব অমৃত বাণীই শুনতে চাই-
জীবন কিছু মোহময় মিথ্যা চায়।
জীবন তো
মন্দির, মসজিদ আর গীর্জা না
যে কেবলই সত্য আর শুদ্ধতার চাষাবাদ হবে।
বরং তুমি কিছু মোহময় মিথ্যে বলো।
তোমার কাছে না-হয়;
কিছু মিথ্যের রুপোলী ঋণ থাক!

বিকল্প

আমার প্রেম ছিল-
মৃত্যুর মতো সৎ, অবাধ্য আর কোমল।
তুমি তাকে লালন করেছিলে-
জীবনের মতো ছলা-কলা দিয়ে।
আমার কাছে তুমি ছাড়া আর কোনো
বিকল্প ছিল না।
যেমন মৃত্যুও অবাধ্য এক প্রেমী।
যাকে নিতে আসে তাকেই নেয়।
তোমার কিন্তু অনেক বিকল্প ছিল-
বকুল, জুঁই, চামেলী কিম্বা শিউলি।
সকলই তোমার প্রগাঢ় ভালো লাগার পরিপ্রেক্ষিত। 
অবশেষে আমিই নিজেকে বাতিল করেছি-
প্রাক্তন রাজধানীর মতো। 
যেখানে কেবলই ইতিহাসের বাস।

টেকার মন্ত্র

টিকে থাকার মন্ত্র বেশ ভালো জানে পিঁপড়ে। 
পিঁপড়েরা মারামারি না করে-
ভাগাভাগি করে নিতে জানে।
মন্দির -মসজিদ, বেশ্যালয়, বাড়ি-
সর্বত্র কেবল নিবিড় এবং নিরীহ প্রয়োজনে
মেতে থাকে।
দাঙ্গা নেই, হল্লা নেই-
চুপচাপ বুঝে নাও নিজের অনিবার্য প্রয়োজন। 
মানুষের এত এত
বুদ্ধিজীবী, ধর্মগুরু, কবি লেখক;
কেউ তো বলেনি-
নিজেকে ভালোবেসে আত্মস্থ হও,
নতজানু হও কেবল
নিজের অনিবার্য প্রয়োজনের কাছে।

তামাশা

ধরো তোমার নাম দুঃখ 
আমার নাম বিষাদ। 
যতই তোমার দিকে বাড়িয়েছি হাত,
ততই আলিঙ্গন করেছি
দুঃখের বোধিবৃক্ষ। 
আর যতবার তুমি আমায় চেয়েছ-
ততবার ডুবেছ বিষাদের চোরাবালিতে। 
আমাদের কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের নাম স্বপ্ন
আর আমাদের আরাধ্য প্রেমের নাম জোছনা 
অতঃপর তুমি-আমি যুগল পদব্রজে হেঁটে যাই-
অন্তঃসার শূন্য বিষাদ সাগরের তীরে
তারপর কোরাস গাই-
সবকিছু অর্থহীন–জন্ম, মৃত্যু, প্রেম, সঙ্গম সব!
এ শুধু দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ঈশ্বরের তামাশা।

লেখক:
Nusrat Sultana
নুসরাত সুলতানা, কবি, গল্পকার

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট