পূর্ববঙ্গের প্রতিরোধ লড়াই এবং রবীন্দ্রনাথ – পর্ব ০৩

Comments

।। কামাল লোহানী ।।

১৯৬২ সালের মে মাসে সাড়ে তিনমাস জেল খেটে আমি যখন ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে মুক্তি পেলাম তার কিছুদিন পরেই একদিন প্রেসক্লাবে ওয়াহিদ ভাইয়ের সাথে দেখা। তিনি আড়ালে ডেকে বললেন,‘তোমার কি মনে হয়, আমাদের একটি সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট গড়ে তোলা প্রয়োজন? হ্যাঁ- সূচক জবাব দিতেই কথা আরও এগুতে থাকল। এক পর্যায়ে আমি তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জিজ্ঞেসই করলাম, “কেন এমন ভাবছেন?” ওয়াহিদ ভাই হেসে বললেন,“আসলে পার্টি একটি সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট গড়ে তুলতে আগ্রহী।” আমার হাসিই পেল, কারণ পার্টিতো আমাকেও ফ্রন্ট গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছে। কথাটি ওয়াহিদ ভাইকে বললাম, তখন দুয়ে মিলে একই ভাবনা ভাবতে শুরু করলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম,“কেন ছায়ানট সংগঠনের কি অবস্থা?” তিনি বললেন ওটা মৃতপ্রায়, কোন কার্যক্রম নেই। তুমি যদি আস, তবে চেষ্টা করি পুনরুজ্জীবনের জন্য।” বুঝলাম, রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন, কমিটি-কমিটিতে যে প্রতিযোগিতা ও বিরোধ, তা বোধহয় ভুলে গেছেন ওয়াহিদ ভাই এবং কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট গড়ে তোলাটা জরুরী। তাই তিনি আমাকে সরাসরি প্রস্তাব করলেন,“তুমি এসো, দায়িত্ব নাও। আমরা মিলে ছায়ানটকে পুনরুজ্জীবিত করি।” ত্বরিৎ এ সিদ্ধান্তে আমি পরদিনই মিনু আপার (সনজীদা খাতুন) আজিমপুরের বাসায় বসে সংগঠন সম্পর্কে জানলাম এবং আমাকে ‘সম্পাদক’ হিসেবেই যোগ দিতে বললেন। এরপর ছায়ানট সংগঠন হিসেবে কতটা সরব ও সক্রিয় ছিল, তা ইতিহাসই বলবে। আমি ৬২ থেকে ৬৬ সাল পর্যন্ত ‘ছায়ানট’-এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছি। নীতিগত প্রশ্নে বিরোধ দেখা দেয়ায় আমি শেষদিকে পদত্যাগ করি। পার্টিগত যে সিদ্ধান্তে ছায়ানট গঠিত হয়েছিল, তার অবলুপ্তি দেখে আমি চলে আসার কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশ্য মার্কসবাদের আদর্শভিত্তিক ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। এই সংগঠনের সকল অনুষ্ঠান খোলা ময়দানেই আয়োজন হতো এবং শ্রমিকাঞ্চল ও কৃষক এলাকাই ছিল আমাদের অনুষ্ঠানের স্থান।

পূর্ববঙ্গের প্রতিরোধ লড়াই এবং রবীন্দ্রনাথ -এর চারটি পর্ব পড়ুন

পর্ব ০১
পর্ব ০২
পর্ব ০৩
শেষ পর্ব

তবে ছায়ানট প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই দাঙ্গা প্রতিরোধ আর ঘূর্ণিবিদ্ধস্ত দূর্গত মানুষজনের সেবা ছাড়াও বঙ্গসংস্কৃতির শারদোৎসব, বসন্তৎসব, বর্ষামঙ্গল, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্ষবরণে রমনার বটমূলে অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। ১৯৬৬ সালে সিদ্ধান্ত হলেও ১৯৬৭ সালে প্রথম বাইরে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় এবং আজ সেই আয়োজন জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিপুল লোক সমাগমে ধন্য রমনা পার্ক পরিপূর্ণ জনকোলাহলে যেমন মুখরিত হয় তেমনি উৎসবে পরিবেশিত গান, বাদন ও আবৃত্তিতে স্বাদেশিকতা প্রবল হয়ে দর্শক-শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে। জঙ্গী সন্ত্রাসবাদের আত্মঘাতি বোমা হামলায় রমনার বটমূলে দশজন সঙ্গীত পিপাসু শ্রোতাকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে ২০০১ সালে। সেই রক্ত-স্নানে শানিত হয়েছে ছায়ানট। কিন্তু রবীন্দ্র চর্চা যে কতটা প্রবল ও জনপ্রিয়-গ্রহণযোগ্য হয়েছে, তা ছায়ানটের সমৃদ্ধিই প্রমাণ করে। ধন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তোমায় প্রণাম।

ষাটের দশকটা ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জল। যত সেনাশাসনবিরোধী সংগ্রাম এই সময়েই অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে রুষ্ট-ক্রুদ্ধ সামরিক জান্তা রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের গান- কবিতার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেও যখন পারল না দমাতে তখন পরিস্থিতিকে বেহাল না করে তারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করলো। তাদের সামরিক ঔদ্ধত্ব্যে রবীন্দ্রনাথকে একেবারে বিসর্জন দেয়া সম্ভব হলো না। সেইসাথে পূর্ববাংলার অমিততেজ ছাত্রসমাজকেও বাগে আনতে ব্যর্থ হলো।

অবশেষে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের প্রায় ছ’বছর পর পাকিস্তান সামরিক জান্তার তথ্যমন্ত্রী-এই বাংলার কুলাঙ্গার ভ্রাতৃদ্বয়ের অন্যতম খাজা শাহাবুদ্দিন (খাজা নাজিমউদ্দিনের ছোট ভাই) পাকিস্তান পার্লামেন্টে এক বক্তৃতার মাধ্যমে বলে দিলেন- “টেগর ইজ নট এ পার্ট এন্ড পার্শেল অব আওয়ার আর্ট অ্যান্ড লিটারেচার”। এই ঘোষণার পর রবীন্দ্রসঙ্গীতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কবিগুরুকে সম্পূর্ণ বর্জনের নির্দেশ জারি করল। এই ঘোষণা শোনামাত্রই পূর্বপাকিস্তানের সচেতন নাগরিক গোষ্ঠী এবং সংস্কৃতিসেবী সকলেই ক্ষুব্ধ হলেন। সে ছিল ১৯৬৭ সালের জুলাই মাস। তথ্যমন্ত্রীর ঔদ্ধত্বপূর্ণ রবীন্দ্র বিরোধী কুৎসিত মন্তব্য এবং রোষানলকে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে প্রথমেই এগিয়ে এসেছিল ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী। তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় তারা এক জরুরী বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী উক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ঐ প্রতিবাদী সংবাদটি ‘রেজিমেন্টেশন অব কালচার’ হেডিং দিয়ে ছাপা হলো। ক্রান্তি ঢাকা প্রেস ক্লাবের সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে আহ্বান জানালো বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য। যখন ছায়ানটকে এই সংগ্রামে পাওয়ার জন্যে আগ্রহী হয়ে অনুরোধ জানাতে ডেইলী মর্নিং নিউজ পত্রিকায় কর্মরত ওয়াহিদুল ভাইয়ের কাছে গেলাম, তিনি তখন বললেন, “তোমরা করো আমরা আছি”। তারা সেই প্রতিবাদ সমাবেশে ক্লাবে আসলেন না। বরঞ্চ প্রেসক্লাবের সেক্রেটারী এ বি এম মুসা যিনি তথ্যমন্ত্রীর উক্তির প্রতিবাদী সংবাদ এত গুরুত্ব সহকারে ছাপলেন, সেই মুসাভাই-ই আমাকে ডেকে বললেন, “তোমাদের এ মিটিং প্রেসক্লাবে করা যাবেনা।” তার মুখেই শুনলাম, ওয়াহিদ ভাই আপত্তি করেছেন এবং বলেছেন,“মুসা তুমি ক্লাবে পলিটিক্যাল মিটিং করতে দিচ্ছ কি করে?” ফলে মুসা ভাই বিগড়ে গেলেন এবং আমাদের সভা বাতিল করে দিলেন। সিনিয়র সাংবাদিক এবং ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা কে জি মুস্তফা মুসা ভাইয়ের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে,“লোহানীদের সমাবেশ করতে দিতে হবে” বলে কড়া স্ট্যান্ড নিলেন। আমি আর মোস্তফা কামাল হায়দার (মতিয়া চৌধুরীর বড় মামা) তাঁর ভেসপায় চেপে রাতে অবজারভার অফিসে গেলাম। কিন্তু বেমক্কা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হলো। কে জি এবং মূসা ভাইয়ের মধ্যে টেবিলের এপারে-ওপারে বসে বেশ জোরেসোরেই টেবিল চাপড়ে তর্ক করতে দেখলাম। আমরা দুজন সরে পড়লাম। অবজারভার পত্রিকার নিউজ ছিল তখন নিচের তলায়। দূরে কাচের জানালার ফাঁক দিয়ে দুই বন্ধুর টেবিল চাপড়া-চাপড়ি দেখছিলাম। কে জি ভাই আমাদের পক্ষ নিয়ে সোচ্চার আর মুসা ভাই ওয়াহিদ ভাইয়ের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে আমাদের সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনের সম্মিলিত বৈঠক করতে দিচ্ছিলেন না। অবশেষে তাঁরাই সিদ্ধান্ত নিলেন যে, দৈনিক ইত্তেফাকের স্বনামখ্যাত শ্রদ্ধেয় বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দিন হোসেন দুই পক্ষের সাথে আলাপ করে যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটিই দুপক্ষ অর্থাৎ আমরা এবং ওয়াহিদ ভাইরা মেনে নেবেন।

একদিন সিরাজ ভাই দুপক্ষকে প্রেসক্লাবে ডাকলেন। সেই সাথে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে অবজারভারের আব্দুল মতীনকেও ডাকলেন। সেদিন সকালবেলা যথাসময়ে প্রেসক্লাবে হাজির হলাম। গিয়ে দেখি ক্লাবের রেষ্টুরেন্ট রুমটাতে এক কোনায় বসে আছেন। তিনি আমাকে বসতে দিলেন না, বললেন,“তুই ঐ ঘরে বোস! মতিন এখানে বোসো”। তাই হলো, সিরাজ ভাই মতিনের কাছ থেকে ফার্স্টহ্যান্ড রিপোর্ট জেনে নিয়ে আমাকে ডাকলেন। বসলাম, নানান প্রসঙ্গেই আলাপ করছিলেন সিরাজ ভাই। ক্লাবে আমাদের সর্বদলীয় সমাবেশের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখালেন না। ভাবলাম, কি হলো। খানিক পরে ওয়াহিদুল হক আসলেন ক্লাবে। তিনি ঢুকতেই সিরাজ ভাই বললেন, “ঐ ওয়াহিদুল তুই আমারে মিথ্যা কইলি ক্যান”। আচমকা প্রশ্ন করায় ওয়াহিদুল ভাই ঘাবড়ানোর পাত্র নন। তিনি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। সিরাজভাই চুপ করে শুনলেন প্রথমে। পরে দুচারটে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। তারপর সোজা সাপটা সিদ্ধান্ত দিয়ে বললেন,“ওয়াহিদুল তোরা কবি জসিমউদ্দিনের বাসায় যে বৈঠক করতে চাইছিস ঠিক আছে পৃথকভাবে সেটাই কর আর লোহানীদের সর্বদলীয় সাংস্কৃতিক সমাবেশ ক্লাবেই হোক।” কিন্তু তারপর উভয় বৈঠকের পর দুই পক্ষকেই ক্লাবের দোতলার ভিআইপি লাউঞ্জে যৌথ বৈঠক করার সিদ্ধান্ত দিলেন। আমরা মেনে নিলাম। ক্লাবে আমাদের বৈঠক হলো ছায়ানট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ, ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী, সৃজনী সাহিত্য ও শিল্প সংসদ, ঐক্যতান, বুলবুল একাডেমী মিলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, সবার প্রতিনিধিত্বে যে সংগঠন সৃষ্টি হলো, তার নাম ওয়াহিদ ভাই দিলেন,“সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ” এবং কবিগুরু যে আমাদের সাংস্কৃতিক উওরাধিকার, এ বিষয়টিও আমাদের কর্মকান্ডে ও অনুষ্ঠানমালায় প্রকাশিত হয়, সে জন্যই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিরন্তর রবীন্দ্রবিরোধিতা এবং ধারাবাহিকভাবে বঙ্গসংস্কৃতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানী চক্রের যে দুরভিসন্ধি তাকেই প্রতিহত করার উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হলো এই পরিষদ। পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক হলেন ওয়াহিদুল হক ও কামাল লোহানী। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আমরা ন্যুনপক্ষে তিনদিনের অনুষ্ঠানমালা সাজাবো। রবীন্দ্র কাব্যপাঠ, কবিতা আবৃত্তি, নাটক মঞ্চায়ন এবং নৃত্যনাট্য পরিবেশন এতে থাকবে।

একটা তথ্য দিতে ভুলে গেছি, সে হলো, আমরা ক্রান্তি সর্বদলীয় বৈঠক আয়োজনের আগ পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পশ্চিম-পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সকল সদস্যের কাছে আমাদের প্রতিবাদ টেলিগ্রাম আকারে পাঠালাম। আবার জাতীয় পরিষদ সদস্যদের টেলিগ্রাম ছাড়াও পূর্ব-পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির অন্যতম শীর্ষনেতা ও জাতীয় পরিষদ সদস্য মসিউর রহমান (যাদু মিয়া)-র হাতেও প্রতিবাদলিপি পাঠালাম, বিলি করার জন্য। শুনেছি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে বিরতির সময় পার্লামেন্ট রেস্টুরেন্টে যাদু ভাইয়ের সাথে সামরিক জান্তার পরিষদীয় ডেপুটী লীডার এ কে সুমারের সাথে রীতিমত ধ্বস্তাধস্তি হয়েছিল। এ দায়িত্বটা নেয়ার পেছনে যাদু ভাইয়ের বড় ভাই মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই)-এর অবদান ছিলো। তবু যাদু ভাই সেদিন এই দায়িত্ব পালন করে আমাদের কৃতার্থ করেছিলেন।

…. চলবে

 লেখক:
কামাল লোহানী: শব্দসৈনিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Kamal Lohani

 

 

 

 

পূর্ববঙ্গের প্রতিরোধ লড়াই এবং রবীন্দ্রনাথ -এর চারটি পর্ব পড়ুন

পর্ব ০১
পর্ব ০২
পর্ব ০৩
শেষ পর্ব

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.