পশ্চিম কেন ‘চার্চ ও রাষ্ট্রে’র ভেতর বিচ্ছিন্নতা চেয়েছিল বা চায়?

Comments

। অদিতি ফাল্গুনী ।

‘রাষ্ট্র’ ও ‘চার্চ’ বা ‘গির্জা’ পৃথক এবং স্বতন্ত্র থাকবে অথবা সরকার ধর্ম দিয়ে প্রভাবিত হবে কিনা এই বিতর্ক সারা পৃথিবীর রাষ্ট্র-বিজ্ঞানীদের কয়েক দশক ধরেই ভাবাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে বহু সমাজেই ‘ধর্ম’কে ‘রাষ্ট্র’-র সাথে মেশানো হলেও রেনেসাঁ বা আলোকায়ন যুগের ভাবুক জন লক ও ভলতেয়ার ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থাকেই অনুমোদন করেছেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয় প্রায়শঃই ‘রাষ্ট্র’ ও ধর্মস্থানের ভেতর বিচ্ছিন্নতা মেনে চলা হলেও রাষ্ট্র-ভেদে ব্যাখ্যার পরিসর বদলে যায়। ফ্রান্সের মতো কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে সৌদি আরবের মতো যে সব রাষ্ট্র নিজেই একটি ধর্মকে বিশেষভাবে অনুমোদন করে, এমন নানা ধরনের রাষ্ট্রই আজকের পৃথিবীতে বিদ্যমান। আজকের পৃথিবীতে তাই ’ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম গণশৃঙ্খলা, সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো চ্যালেঞ্জগুলো দেখা দিচ্ছে। ‘রাষ্ট্র’ ও ধর্মস্থানে’র মধ্যবর্তী দূরত্বকে বুঝতে পারলে আইন, নীতিমালা ও সামাজিক অস্থিরতাকে বোঝা সহজ হয়। 

‘রাষ্ট্র’ ও ‘ধর্মস্থান’ পৃথক থাকা উচিত কী অনুচিত বিতর্ক: প্রাচীন যুগ থেকে রেনেসাঁ বা আলোকায়নের সময়

‘রাষ্ট্র’ ও  ‘ধর্মস্থান’কে পৃথক করার ভাবনাটি নতুন কিছু নয়, সত্যি বলতে– হাজার বছর ধরে এই ভাবনার বিবর্তন ঘটেছে। প্রাচীন সভ্যতাসমূহে ‘ধর্ম’ এবং সরকার’ বরাবরই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল। প্রাচীন মিশরে ফারাওদের দৈবী বা ঐশী প্রতিনিধি মনে করা হতো। রোমক সম্রাটের ক্ষমতাকে প্রথমে আদি প্রতিমাপূজারী ও পরে খ্রিষ্টান ঐতিহ্যাবলীর সাথে একীভূত করা হয়। পবিত্র রোমক সাম্রাজ্য (৯-১৯ শতক) সিজারোপ্যাপিজম-এর এক দারুণ নমুনা, যেখানে চার্চের নেতারা ধর্মনিরপেক্ষ শাসকদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন।

মধ্যযুগ নাগাদ ‘ক্যাথলিক চার্চ’ বিপুল রাজনৈতিক প্রভাব অর্জনে সমর্থ হয় এবং চার্চের এই রাজনৈতিক প্রভাবের সাথে ইউরোপের রাজন্যবর্গ বা সম্রাটদের প্রায়ই দ্বন্দ উপস্থিত হতো। উদাহরণ হিসেবে, রোমক চার্চের আনুগত্য থেকে রাজা হেনরী অষ্টমের সরে আসা এবং প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারের কথা বলা যায়। ‘ওয়েস্টফ্যালিয়ার শান্তি চুক্তি (১৬৪৮)’ ইউরোপের ইতিহাসে একটি নতুন ধারার সূচনা করে যা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোকে তাদের স্বকীয় ধর্মীয় নীতিমালা সংজ্ঞায়িত করতে অনুমোদন দান করে– যদিও ইউরোপের বহু রাষ্ট্রই তখন অব্দি রাষ্ট্রীয় গির্জা বা চার্চ থাকার পক্ষেই ছিল। 

আঠারো শতকে বা রেনেসাঁর সময়ে জন লকের মত ভাবুক ‘প্রাকৃতিক অধিকার’ এবং ‘ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ’-এর পক্ষে যুক্তি দাঁড় করান, যখন ভলতেয়ার রাষ্ট্রীয় শাসনে ধর্মীয় মতবাদের গোঁড়ামিকে উপহাস করেছিলেন। ভলতেয়ারের বিখ্যাত উক্তি ‘অবিশ্বাসীকে ধ্বংস করো! (যা চার্চ বা গির্জার উদ্দেশ্যে করা একটি ঠাট্টাই ছিল) ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য সমাজের অগ্রসর অংশের চাপকেই প্রতীকায়িত করে।      

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা বিশেষজ্ঞ’ ডেভিড ক্যালাওয়ের মতে, মার্কিনী সংবিধানের ‘প্রথম সংশোধনী’তে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ‘কোনো ধর্মের প্রতিষ্ঠার জন্য কংগ্রেস কোনো আইন প্রণয়ন করবে না’। ‘প্রথম সংশোধনী’র সূচনা পংক্তিগুলোতেই বলা হয়েছে যে সরকার কোন ধর্মকে ‘দাপ্তরিক ধর্ম’ বা ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সমর্থ হবে না এবং এক ধর্মকে অন্য ধর্ম বা নাস্তিক্যবাদের তুলনায় শ্রেয়তর হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে না। মূলতঃ ১৬৪৪ সালে রোড আইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ব্যাপ্টিস্ট চার্চের প্রতিষ্ঠাতা রজার উইলিয়ামস ‘ইহজাগতিক পৃথিবী’ ও ‘পবিত্র গির্জা’র ভেতর একটি ‘দেয়াল বা বেড়া’ দেবার কথা বলেন। তাঁর মতে, চার্চ ও রাষ্ট্রকে মেলানো হলে দু’টিই দূর্নীতিগ্রস্থ হবে। উইলিয়াম একটি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে সব নাগরিকের সমান উপাসনার অধিকার ছিল। 

মার্কিনী সংবিধান প্রণেতারাও এবং বিশেষতঃ থমাস জেফারসন ও জেমস মেডিসন মনে করতেন যে সরকার নাগরিকদের উপর ধর্ম জোর করে চাপালে নিজের প্রত্যয়মতো ব্যক্তির জীবনকে গড়বার স্বাভাবিক অধিকারকে ব্যাহত করা হয়। ‘রাষ্ট্র ও চার্চে’র বিচ্ছিন্নতা বিষয়ক ভাবনাকে জেফারসন অমর করে যান ‘ড্যানবারি ব্যাপ্টিস্ট এ্যাসোসিয়েশন’কে লেখা একটি চিঠিতে। উক্ত প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রে একটি সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান সম্প্রদায় হিসেবে সংখ্যাগুরু প্রোটেস্ট্যান্টদের কাছে নিরাপদ থাকতে পারা বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি লিখলে জেফারসন তাদের উত্তর করেন যে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ‘চার্চ ও রাষ্ট্রে’র ভেতরে একটি বিচ্ছিন্নতার দেয়াল তুলে দেবে।’ ১৯৪৭ সালে ‘এভার্সন বনাম বোর্ড অফ এডুকেশন (১৯৪৭)’ সালের মামলায় সুপ্রীম কোর্টের বিচারক হুগো ব্ল্যাক বলেন যে ‘প্রথম সংশোধনী’তে চার্চ ও রাষ্ট্রের ভেতর একটি দেয়াল গড়া হয়েছে যাকে সমুন্নত ও অভেদ্য রাখতে হবে। আবার ১৭৮৪ সালে ভার্জিনিয়ায় ‘খ্রিষ্ট ধর্মের শিক্ষকদের’ সহায়তা করার জন্য সাংসদ প্যাট্রিক হেনরী একটি সাধারণ কর আরোপের বিল প্রণয়ণ করতে গেলে, জেমস ম্যাডিসন পাল্টা যুক্তি দেন যে ধর্ম হলো সরাসরি বিধাতার সাথে সংযোগের বিষয় এবং নাগরিক সমাজের কর্তৃত্ব থেকে এই আত্মিক বিষয়ের পুরো মুক্ত থাকা উচিত। তিনি এই বলে সতর্ক করেন যে কোনো ধর্মের বিকাশের জন্য ‘তিন পেন্স’ করও আরোপ করা হবে না। ম্যাডিসনের পক্ষে সংখ্যালঘু ব্যাপ্টিস্ট ও অন্যান্য খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুরা জোট বেঁধে এই বিলকে পরাস্ত করা হয়। এর পরের বছরই ভার্জিনিয়ায় থমাস জেফারসন ’ভার্জিনিয়া স্ট্যাটিউট ফর রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ রচনা করেন।

যে তত্ত্বসমূহ রাষ্ট্রধর্মস্থান পৃথক হওয়া উচিত কী নয় বিতর্ককে আজকের আকার দিয়েছে:

প্রাকৃতিক আইন তত্ত্ব (লক): সরকারের ভূমিকা হলো জীবন, স্বাধীনতা, এবং সম্পদ রক্ষা করা– নাগরিকের ওপর কোনো ধর্মকে চাপিয়ে দেওয়া নয়।  

সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব (রুশো): নাগরিকেরা আইন মানতে সম্মত এবং ধর্ম ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে থাকা উচিত। 

ধর্মনিরপেক্ষতা (ড্যুরখেইম, কোঁত): সমাজ যত যুক্তিবাদী এবং বৈজ্ঞানিক হবে, ধর্মের প্রভাব তত হ্রাস পাওয়া উচিত। 

রাষ্ট্রধর্মস্থান পৃথক হওয়া উচিত কী নয় বিতর্কে মূল মাইলফলকসমূহ: 

১৭৭৬ সালের মার্কিনী বিপ্লব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল: মার্কিনী সংবিধানের প্রথম সংশোধনী (১৭৯১) কংগ্রেসকে রাষ্ট্রে কোনো নির্দিষ্ট বা একক ধর্মকেই বিশেষ প্রতিষ্ঠা দেবার ক্ষমতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ প্রসঙ্গে থমাস জেফারসনের ‘পৃথকীকরণের দেয়াল’ প্রতীকটি উল্লেখযোগ্য (যা জেফারসন ড্যানবারি ব্যাপ্টিস্টদের কাছে একটি চিঠিতে জানান)। ইতোমধ্যে, ফ্রান্সে ‘পাদ্রিদের জন্য নাগরিক সংবিধান (১৭৯১)’ গ্রহণের ফলে চার্চ বা গির্জাকে জাতীয়করণ করা হয় যার ফলে রোমের পোপের সাথে সমস্যা বা সংঘাত দেখা দেয়। 

উনিশ শতকে ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য ঢেউয়ের পর ঢেউ ওঠে:

প্রুশিয়া (১৮৭১): বিসমার্কের ‘কুলটুরকাম্পফ’ সমাজে ক্যাথলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে যা আইনী লড়াইয়ে গড়ায়।  

ইটালী (১৮৭০): ‘রোমক প্রশ্ন’ পোপের অস্থায়ী ক্ষমতার অবসান ঘটায়, যদিও ১৯২৯ সাল পর্যন্ত ভ্যাটিকান একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে থেকে যায়। 

বিশ শতকে নতুনতর অস্থিরতা দেখা দেয়: নাজি জার্মানীতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অমানবিক নিপীড়ন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে নাস্তিক্যবাদপন্থী নীতিমালা গ্রহণ এটাই প্রমাণ করে যে কীভাবে একটি ভাবাদর্শ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে সশস্ত্র করে তুলতে পারে (সোভিয়েত ইউনিয়ন) বা ধর্মীয় পীড়ন ঘটাতে পারে (জার্মানী)। 

তুলনামূলক সময়রেখা

বছরঘটনাচার্চ-রাষ্ট্র আন্ত:সম্পর্কের উপর এর প্রভাব
১৭৯১মার্কিনী সংবিধানের প্রথম সংশোধনীচার্চ ও রাষ্ট্রের ভেতর কঠোর পৃথকীকরণ প্রতিষ্ঠিত;
১৮৭১প্রুশিয়ান ‘কুলটুরকাম্পফ’   শিক্ষা ও পাদ্রিদের নিয়োগ বিষয়ে রাষ্ট্র বনাম গির্জার দ্বন্দ
১৯২৯ল্যাটেরান চুক্তি (ইতালী)বোঝা-পড়া: ভ্যাটিকান সিটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত; ইতালীতে ক্যাথলিক চার্চ স্বীকৃত।
১৯৪৮সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রঅনুচ্ছেদ ১৮-তে ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকৃত হলেও এর ব্যখ্যা পৃথিবীর নানা দেশে নানারকম।


আজকের পৃথিবীতে অবশ্য ধর্মস্থান-রাষ্ট্র বিভেদ সংস্কৃতি ভেদে খুবই ভিন্ন ভিন্ন চেহারায় দেখা দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং তুরস্কে রাষ্ট্র ও ধর্মস্থানের ভেতর কঠোর বিচ্ছিন্নতা বিদ্যমান থাকলেও, রাষ্ট্রীয় নীতিমালার প্রয়োগে রয়েছে ভিন্নতা। যেমন, ফ্রান্সের ’লাইসিতে’ (ধর্মনিরপেক্ষতা) অনুযায়ী সরকারী স্কুলগুলোয় ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার নিষিদ্ধ যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছু কিছু প্রদেশে স্কুলে প্রার্থনা করা যায়। পৃথিবীর আরো নানা রাষ্ট্রেই ধর্ম ও শাসনের একটি সংমিশ্রণ দেখা যায়: 

সৌদি আরব: ইসলাম রাষ্ট্র-ধর্ম। শরীয়া আইনই ব্যক্তিগত এবং ফৌজদারি বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ করে। 

ইরান, আফগানিস্থান: ‘মজলিশে শুরা’ নিশ্চিত করে যে দেশের আইন-কানুন ইসলামী শরীয়া বিধিমালা অনুযায়ী প্রণীত ও প্রয়োগ করা হচ্ছে। 

ভারত: পরপর তিনবার ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (বিজেপি) ক্ষমতায় এলেও সে দেশের সংবিধান আজো ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ তবে সে দেশের সুশীল সমাজ এবং বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্র ডানপন্থার দিকে কিছুটা হলেও মোচড় নিচ্ছে কিনা এমন ভাবনায় চিন্তিত।

বাংলাদেশ, পাকিস্থান: বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের সংবিধান ’ধর্মনিরপেক্ষ’ হলেও সেনাশাসক তথা রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্ত করা এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বদলে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ আনা হয় এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আবার কিছুটা সংশোধনের চেষ্টা করে। জেনারেল এরশাদ ৮ম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে ঘোষণা করলে শুধু শেখ হাসিনা নন, সে সময়ের দুই বিরোধী নেত্রীর অন্যতম খালেদা জিয়াও এটার বিরোধিতা করেছিলেন– যদি তা শুধুই এরশাদ বিরোধিতা থেকেও করে থাকেন, তবু করেছিলেন বা তাঁকে করতে হয়েছিল। পাকিস্তান তো আত্ম-ঘোষিত ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র।’ 

ইউরোপেও আজ ‘বহু-সংস্কৃতি’ এই বিতর্ককে জটিল করে তুলেছে। বৃটেন এবং জার্মানীর মতো দেশগুলো অনেক অভিবাসী তথা সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিজেদের কিছু কৃষ্টি বা আচার-আচরণ পালন করতে দেয়। যেমন, ইহুদিদের ‘কোশের’ বা মুসলিম ‘হালাল’ মাংস খেতে দেয়া, মুসলিমরা তাদের নিজস্ব পোশাক বিধি অনুযায়ী পোশাক পরতে পারা। আবার সুইজারল্যান্ডে মসজিদের মিনার বিষয়ে রীতিমতো প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক ভোট হয়েছে।

রাষ্ট্রগুলো কীভাবে এই রাষ্ট্র বনাম ধর্মস্থান প্রশ্নকে দেখছে:

দেশ   নমুনা বৈশিষ্ট্যসমূহবিতর্ক
 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্ররাষ্ট্র ও ধর্মস্থানের ভেতর কঠোর পৃথকীকরণএই মর্মে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আনা হলেও প্রদেশগুলোয় তারতম্য রয়েছে। যেমন, অনেক অঙ্গরাজ্যেই স্কুলে প্রার্থনা হয়।  ধর্মীয় অব্যাহতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে (উদাহরণ হিসেবে, কোভিড-১৯ নির্দেশিকার কথা বলা যায়)। 

ফ্রান্স
লাইসিতে (কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতা)সরকারী বিদ্যালয়গুলোয় ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ; রাষ্ট্রই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করে। মুসলিম সংখ্যালঘুদের ‘সাংস্কৃতিক ভাবে বর্জন’ করার অভিযোগ অবশ্য ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রয়েছে। 

সৌদি আরব
ইসলাম রাষ্ট্র-ধর্ম শরীয়া আইন: ধর্মই সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে।নারী অধিকার ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিষয়ে মানবাধিকার উদ্বেগ রয়েছে। তবে, সেদেশের নতুন যুবরাজ হালে অনেক প্রগতিপন্থী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। 

ভারত
ধর্মনিরপেক্ষ তবে জটিলতা আছেসাংবিধানিক ভাবে ধর্ম-নিরপেক্ষ তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নানা সম্প্রদায়সহ হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। সাম্প্রতিক সময়ে ’নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।

একুশ শতকের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ সমূহ

রাষ্ট্র ও ধর্মস্থানের ভেতর সামঞ্জস্য রক্ষা করতে গিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো নিচের সমস্যাসমূহের মুখোমুখি হচ্ছে:   

ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম জনশৃঙ্খলা: সরকারগুলোর কি ধর্মীয় আচার-আচরণসমূহকে আত্মস্থ করা (উদাহরণস্বরূপ, হালাল খাবার, স্যাবাথের বন্ধ) অথবা নৈর্ব্যক্তিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করা উচিত? ফ্রান্সে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার মতো বিষয়গুলো এ জাতীয় অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে।  

সাংস্কৃতিক সংঘর্ষসমূহ: ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে ঐতিহ্যবাহী সমাজের প্রায়শঃই দ্বন্দ দেখা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের হিজাবের ওপর তুরস্কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজিত হয়, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামী আদালতগুলো ধর্মনিরপেক্ষ আইনের সাথে সহাবস্থান করে। 

রাজনৈতিক মেরুকরণ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এলজিবিটিকিউ+ আন্দোলনকারীদের অধিকার এবং গর্ভপাত প্রশ্নে ধার্মিক ডান বনাম ধর্মনিরপেক্ষ বামের হাতাহাতি লড়াই এটাই প্রমাণ করে যে, মানুষের ধর্ম-বিশ্বাস কিভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিমালাকেও প্রভাবিত করে। একইভাবে, ইউরোপে অতি-ডানপন্থী দলগুলো ধর্মনিরপেক্ষতাকে অভিবাসনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। 

উদীয়মান ইস্যুসমূহ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিকতা: ধর্মীয় নীতিমালা দ্বারা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ পরিচালিত হওয়া উচিত (উদাহরণ হিসেবে ইসলামী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা বনাম ধর্মনিরপেক্ষ নির্মোহ দৃষ্টিকোণের কথা বলা যেতে পারে)

জলবায়ু পরিবর্তন: পরিবেশবাদ বিষয়ে সরকারসমূহ কি বৈজ্ঞানিক ঐক্যমত্যকে গুরুত্ব দেন, নাকি এ বিষয়ে ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দেন? 

ট্রান্স-ন্যাশনাল ধর্মসমূহ: সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া ওয়াহাবী আন্দোলন বা ‘ইস্কন’ আন্দোলনকে রাষ্ট্রসমূহ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে? 

সমাজে এই বিতর্কের বাস্তব প্রয়োগ:

ধর্মস্থান-রাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতা আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে মৃদু ও গভীর– উভয়ভাবেই প্রভাবিত করে:

ধর্মীয় শিক্ষায় অভিগম্যতা (উদাহরণ হিসেবে, সার্বজনীন স্কুলের ভাউচার বনাম বিশেষ স্কুল– মিশনারী স্কুল বা মাদ্রাসা যেমন)। 

জন পরিসরে ধর্ম আচরণের অধিকার  (উদাহরণ হিসেবে ধর্মীয় প্রতীক পরা, কর্মক্ষেত্রে উপবাস বা রোজা রাখা ইত্যাদি)। 

– ‘বিবাহ ও পারিবারিক আইনের আইনী স্বীকৃতি (উদাহরণ হিসেবে, সম-লিঙ্গ বিয়ে বনাম ধর্মীয় প্রতিবাদ)। 

সরকারসমূহের জন্য:

রাজস্ব নীতিমালা: গির্জা বা চার্চসমূহ কি কর পরিশোধ করে (আমেরিকায় চার্চ বা গীর্জাকে কর মকুব করা হলেও ফ্রান্সে সেই সুযোগ নেই)। 

স্বাস্থ্য-সেবা বিষয়ক নৈতিকতা: হাসপাতালগুলো কী বিশ্বাসগত কারণে গর্ভপাত বা স্বেচ্ছা-মৃত্যুর জন্য রোগীর আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে? 

পররাষ্ট্র নীতিমালা: ধর্মবাদী রাষ্ট্রসমূহের সাথে সম্পর্ক (ভ্যাটিক্যান সিটি বনাম ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক)। 

কেস-স্টাডি: গর্ভপাত আইন  

পশ্চিমে রাষ্ট্র বনাম ধর্মস্থানের বিতর্ক সবচেয়ে প্রকট হয় ‘গর্ভপাতের অধিকার’ প্রশ্নে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, রো বনাম ওয়েড (১৯৭৩) মামলায় নারীদের গর্ভপাতের অনুমতি দেয়া হলেও ২০২২ পরবর্তী কোর্টের রুলিংগুলোয় গর্ভপাতের অধিকার বাতিল করা হচ্ছে। পোল্যান্ডে ক্যাথলিক চার্চের প্রভাবে গর্ভপাত প্রায় পুরোই নিষিদ্ধ হবার পথে হাঁটলে প্রবল প্রতিবাদ দেখা দেয়। অবশ্য কানাডা এবং নেদারল্যান্ডসে রোগীর অনুরোধের প্রেক্ষিতে গর্ভপাত অনুমোদিত।

রাষ্ট্র ও ধর্মস্থান একত্রিত হওয়া অথবা বিচ্ছিন্ন থাকা কোনটি উচিত? 

বিচ্ছিন্নতার পক্ষের যুক্তিবিচ্ছিন্নতার বিপক্ষের যুক্তি
ধর্মীয় চরমপন্থা কমায় (ইনক্যুইজিশন, তালিবানী শাসন)নৈতিক কম্পাসের বিলোপ– সরকারসমূহ নৈতিক পথ-প্রদর্শন সঙ্কটে ভুগতে পারে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় আধিপত্যের হাত থেকে বাঁচায়সাংস্কৃতিক আত্ম-পরিচয়কে দূর্বল করে (উদাহরণ হিসেবে, ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্য)
বহুত্ববাদকে প্রেরণা যোগায়– নানা বিশ্বাসের সহাবস্থানধর্ম সামাজিক সংহতি বাড়াতে পারে (নানা সম্প্রদায়গত অনুষ্ঠানে যাওয়া, একই রকমের মূল্যবোধ)।

শেষকথা:

সবকিছুর পরও পশ্চিম ধর্ম প্রশ্নে এই উপমহাদেশের মতো মন্দ রেকর্ডের অধিকারী নয়। এই লেখাটি লিখতে বসা বা এটা নিয়ে পড়তে শুরু করা মূলতঃ সামাজিক মাধ্যমে একাধিক রীলসে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েই পশ্চিম বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন মন্দির দর্শনকালে বিভিন্ন দৃশ্য দেখে। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ এখনও সাংবিধানিক ভাবে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ যদিও তৃণমূল সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুরুতে ইমাম এবং পরে পুরোহিতদের জন্য যে বিশেষ ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন, মন্দির ভ্রমণকারী নতুন মুখ্যমন্ত্রী সেই উভয় ভাতাই বাতিল করেছেন এবং সেদিক থেকে তাঁর পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতা ম্যাডিসনের মতো হলেও কিংবা সন্ন্যাসীদের প্রণাম তিনি যদি হাজার বছরের ভারতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই করে থাকেন। 

আবার নিজ দেশেও প্রতিটি নির্বাচনের আগে বড়ো দলগুলোর প্রার্থীদের সিলেটে শাহজালালের মাজারে গিয়ে প্রচারণা শুরু করা থেকে এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম বিল আনা থেকে শুরু করে নানা কিছুই মনে পড়ছিল। মমতা সরকারে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিরুদ্ধে কথা বলা জামাতি মন্ত্রী ছিলেন বা র‌্যাডিক্যাল ওয়াহাবি আন্দোলনের পৃষ্ঠ-পোষকতা তাঁর সরকার করে থাকলেও, পাশাপাশি এটা না ভেবে পারছি না যে আফ্রিকার একটি ছোটো রাষ্ট্রের সেই তরুণ শাসকের মতো সৌদি আরবের তরফ থেকে মসজিদ বানিয়ে দেবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে স্কুল ও হাসপাতালের কথা বেশি বেশি বলার মতো অনেক সুশাসক আমাদের কবে হবে? সেই কবে রবীন্দ্রনাথ ’বিসর্জন’-এ রাজ পুরোহিত রঘুপতির সাথে ত্রিপুরারাজ গোবিন্দ মাণিক্যের বিরোধ দেখিয়েছেন!

এমন অনেক বিষয় নিয়ে লিখব ভেবেও জীবন সংগ্রামে কাতর একজন ’ঊনমানুষ’ হিসেবে আমার বা আমার মতো অনেক মানুষেরই যে সেটা হয়ে উঠছে না। সেটাও একটা লেখার বা ভাবার বিষয় নিশ্চয়! 

তথ্য সূত্র:

The Split Between Church & State: Historical & Modern Perspectives – CompleteEra

Separation of Church and State: How Jefferson’s Wall Became Constitutional Law | GovFactsSeparation of Church and State: Definition, History and More

লেখক:
Audity Falguni
অদিতি ফাল্গুনী
কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক; ঢাকা

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট