পাকিস্তান এবং ভারতে রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক । রাহমান চৌধুরী

Comments

রাষ্ট্রভাষা নিয়ে ভারতেও দু-দুবার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একবার অনশন করে আত্মহত্যা আর একবার গুলি করে হত্যা। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে ঘিরে সে প্রসঙ্গগুলিই আলোচিত হবে। বাংলাদেশের হত্যাকাণ্ড ঘটে উনিশশো বায়ান্ন সালে আর আসামের শিলচরে একই ভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটে উনিশশো একষট্টি সালে। আসামের শিলচরে বাংলাভাষার জন্য যে দীর্ঘ আন্দোলন হয় এবং উনিশশো একষট্টি সালের উনিশে মে এগারোটি তাজা প্রাণ রক্ত দেয়, তা অনেকেরই জানা। আসামে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, বাংলা ভাষার মর্যাদা দান ইত্যাদি নিয়ে লিখতে গেলে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা দরকার হবে। বর্তমান রচনাটি দীর্ঘ হয়ে যাওয়ায় সে প্রসঙ্গে খুব আলোকপাত করার সুযোগ নেই। উনিশশো বায়ান্ন সালেই তেলেগু ভাষার মর্যদার প্রশ্নে অনশন করে প্রাণ দেন গান্ধীবাদী শ্রীরামালু। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার সঙ্গে ভারতের কংগ্রেসের রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে কি না সেটা নিয়ে সামান্য আলোকপাত করা এই রচনার উদ্দেশ্য।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উনিশশো আটচল্লিশ সালে পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে ঘোষণা দেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা। জিন্নাহর মাতৃভাষা গুজরাতি। তিনি সিন্ধু প্রদেশের করাচিতে পড়াশুনা এবং ছেলেবেলায় বসবাস করলেও ভালো উর্দু জানতেন না। বরং সে তুলনায় গুজরাতি ভাষা কিছুটা বলতে পারতেন। পাকিস্তানের যে পাঁচটি প্রদেশ ছিলো, তাদের কারো ভাষা উর্দু ছিলো না। জিন্নাহ তাহলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বেছে নিলেন কেন? খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে বেছে নেয়ার কোনো যুক্তি ছিলো না। কারণ যারা বাইরে থেকে পাকিস্তানে শরণার্থী হিসেবে চলে এসেছিলেন সে রকম পাঁচ শতাংশ মানুষের ভাষা ছিলো উর্দু। জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তানে এসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলা ভাষা আন্দোলন আরম্ভ হলো। কিন্তু তারমানে এ নয় যে তার আগে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলা হয়নি। বহু বছর আগেও অবিভক্ত ভারতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা উঠেছিলো।

ব্রিটিশ ভারতে উনিশশো আঠারো সালে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষাকে অবিভক্ত ভারতের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবি জানিয়েছিলেন। তিন বছর পর উনিশশো একুশ সালে সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে লিখিত প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। সেই সূত্রে দৈনিক আজাদ পত্রিকা উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের তেইশে এপ্রিল “ভারতের রাষ্ট্রভাষা” শীর্ষক এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়। দেশ ভাগের স্বল্পকাল পূর্বে সেকেন্দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দিন আহমদ প্রস্তাবিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার পক্ষে মত দেন। তিনি বলতে চান ভারত যদি তাদের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি করতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে প্রস্তাবিত পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার জন্য উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা অপরিহার্য। জিয়াউদ্দিনের এই বক্তব্যে সামান্যতম যুক্তি ছিলো না। জোর করে ভাষা চাপিয়ে দিয়ে সংহতি রক্ষা করা যায় না, সর্বস্তরে তা চালু করাও যায় না। জিয়াউদ্দিনের এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রতিবাদ হিসেবে উনিশশো সাতচল্লিশ সালের উনত্রিশে জুলাই কলকাতার দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ভাষাবিদ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ নামক নিবন্ধ ছাপা হয়। তিনি সেখানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে অগ্রগণ্য মনে করেন। তিনি আরো বলেন, তারপরেও যদি অন্য কোনো ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের কথা উঠে, শুধু তাহলেই উর্দুর কথা চিন্তা করা যেতে পারে।

পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরে রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নিয়ে বহু বিতর্ক আরম্ভ হয়। স্বাধীনতা লাভের পরের মাসে পূর্ব পাকিস্তানের তমদ্দুন মজলিস ‘পা‌কিস্তা‌নের রাষ্ট্রভাষা কি হই‌বে? বাংলা না‌কি উর্দু’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। সেখানে সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্টভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়। সেই সময়ে সরকারি কাজকর্ম ছাড়াও সকল ডাকটিকেট, পোস্টকার্ড, ট্রেনের টিকেটে সবকিছু কেবল ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লেখা থাকতো। খেয়াল করতে হবে, “তমদ্দুন মজলিস” যারা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করছে, তারা নিজেরাই নিজেদের সংগঠনের নামটি বাংলায় রাখেনি। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিৎ সে ব্যাপারে একটি সভা আহ্বান করেন। সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের কাছে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় দাবি করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ঠিক এর মাস দুই পরে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়। ডিসেম্বরের শেষের দিকে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। পরের বছর ফেব্রুয়ারি মাসে গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সংসদে প্রথমবারের মতো বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। আবদুল হামিদ খান ভাসানী সহ বাঙালী গণপরিষদ সদস্যরা এই প্রস্তাবকে সমর্থন দিলেও মুসলিম লীগ সমর্থিত সাংসদরা এর বিরোধিতা করেন। খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন এই বিরোধিতার শীর্ষে।

আরও পড়ুন:
বাংলা ভাষা আন্দোলনে ভদ্রলোকদের দ্বিচারিতা এবং কিছু মতামত । রাহমান চৌধুরী
বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষা প্রদান এবং রবীন্দ্রনাথ । রাহমান চৌধুরী
ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে বাংলা ভাষায় শিক্ষা । রহমান চৌধুরী

ঠিক এর পরে জিন্নাহ কর্তৃক ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা উর্দুর কথা ঘোষণা দেয়া হলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে। জিন্নাহ এই ঘটনার কয়েক মাস পরেই উনিশশো আটচল্লিশ সালের এগারোই সেপ্টেম্বর মারা যান। পরবর্তীতে নাজিমুদ্দিন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী বাংলা ভাষার এই আন্দোলনেকে গুরুত্ব দেননি। বাঙালীদের পক্ষ থেকে বা আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি ছিলো না। উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো, পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে সরকারি কাজকর্মে এবং শিক্ষাদানের একমাত্র ভাষা করার পাশাপাশি উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক। খাজা নাজিমুদ্দিন তা না করে বরং বাংলাকে আরবি হরফে প্রচলন করার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যখন বাংলা ভাষার জন্য এইরকম আন্দোলন চলছে, তখন আন্দোলনের পক্ষের অন্যতম নেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। নামটির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেখানে উর্দু শব্দ আছে কিন্তু কোনো বাংলা শব্দ নেই। পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনের পক্ষের লোকদের দ্বারা গঠিত “আওয়ামী লীগ” ও “ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি” সংগঠন দুটির নাম দেখে বাংলা ভাষার প্রতি তাঁদের সত্যিকার দরদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

যাই হোক, বাংলাভাষার জন্য আন্দোলন চলতে থাকে। দীর্ঘদিন আন্দোলন চলার পর উনিশশো বায়ান্ন সালের সেই রক্তাক্ত অধ্যায় পুরো জাতিকে নাড়া দেয়। কিন্তু তবুও বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয় না। উনিশশো চুয়ান্ন সালে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে প্রস্তাব গ্রহণ করে। উনিশশো ছাপ্পান্ন সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গণপরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। কিন্তু এই সকল আন্দোলনের পরেও, বহু মানুষের সংগ্রাম এবং রক্তদানের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেলেও, এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে চালু করা যায়নি বা চালু করা হয়নি। চারদিক থেকে ইংরেজি আর অন্য ভাষা আমাদের গ্রাস করে রেখেছে। বাংলাদেশে একদল যেমন কারণে-অকারণে আরবী ভাষা প্রয়োগ করছে, আর একপক্ষ অকারণেই ইংরেজি বলছে। দুপক্ষের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য খুব একটা নেই। যারা ইংরেজি বলছে তারা বরং নিজেদের প্রতিপত্তি দ্বারা বাংলাভাষাকে অনেকবেশি অবদমিত করে রেখেছে। যদিও এই ভদ্রলোকরা খুব ঘটা করে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে ফুল দিতে যান আর পহেলা বৈশাখে পান্তা খেয়ে নিজেকে বাঙালী প্রমাণ করার এক হাস্যকর অভিনয়ে মেতে ওঠেন। বহু ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোকরা সর্বস্তরে বা শিক্ষার বাহনরূপে বাংলা ভাষা চালু না করার জন্য ষড়যন্ত্র করে চলেছেন। ফলে ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষা আন্দোলন প্রশ্নবোধক হয়ে রয়েছে।

রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুধু পাকিস্তানে নয়, ভারতেও শুরু হয়েছিলো। সুভাষচন্দ্র বসু উনিশশো আটত্রিশ সালের উনিশে ফেব্রুয়ারি হরিপুরায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতির দীর্ঘ ভাষণে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বলেন, জাতীয় একতা যাতে বৃদ্ধি পায় সেই উদ্দেশ্যে আমাদের সর্বজনগ্রাহ্য একটি ভাষা ও একটি লিপি গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন জাতীয় প্রসঙ্গে আমার মনে হয়, হিন্দি ও উর্দুর মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা নেহাতই কৃত্রিম। আমাদের পক্ষে সব থেকে স্বাভাবিক ভাষা হবে এই দুই ভাষার মিশ্রণ। বাস্তবিক পক্ষে দেশের ব্যাপক অঞ্চলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সেই ভাষায় চলে এবং সাধারণ ব্যবহারের জন্য ভাষানাগরী বা উর্দু যে কোনো লিপিতে তা লেখা যেতে পারে। আমি জানি ভারতবর্ষে এমন অনেকে আছেন যাঁরা এই লিপি দুটির একটিকে বাদ দিয়ে অপরটি গ্রহণের পক্ষে উগ্র মত প্রকাশ করবেন। আমাদের নীতি কিন্তু বর্জনের নীতি হবে না। দুই লিপির যে কোনো একটি লিপি ব্যবহার করতে আমরা পুরোপুরি সায় দেবো। একই সঙ্গে আমার এ কথা মনে হচ্ছে, এই সম্পর্কে শেষ সমাধান এবং শ্রেষ্ঠ সমাধান হলো এমন এক প্রকার লিপি গ্রহণ করা যা আমাদের বাকি দুনিয়ার সঙ্গে একই সূত্রে গ্রথিত করবে। হতে পারে আমাদের কোনো কোনো দেশবাসী আতঙ্কে শিউরে উঠবেন যখন তাঁরা আমার মুখ থেকে রোমান লিপি গ্রহণের কথা শুনবেন। কিন্তু তাঁদের আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে আবেদন জানাবো, তাঁরা যেন সমস্যাটিকে বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে বিচার করে দেখেন।

যদি আমরা তা করি, আমরা তখনই বুঝতে পারবো যে, কোনো লিপিকেই পরম পবিত্র বলে আগলে রাখার মতো কিছু নেই। যে নাগরী লিপিকে আমরা দেখছি তা বিবর্তনের বেশ কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করে আজ এই জায়গায় পৌঁছেছে। তা ছাড়া ভারতবর্ষের প্রধান প্রদেশগুলির অধিকাংশেরই নিজস্ব লিপি আছে। এর ওপর উর্দু লিপি ব্যবহার করে থাকেন ভারতবর্ষের উর্দুভাষী জনসাধারণ এবং পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশের হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক। এতো রকম বিভিন্নতা আছে বলেই সারা ভারতবর্ষের জন্য একই রকম লিপি স্থির করতে হলে তা করা উচিৎ পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ মনোভাব নিয়ে, যাতে কোনোরকম পক্ষপাত না থাকে। আমি স্বীকার করছি, এক সময়ে আমি ভাবতাম বিদেশী লিপি গ্রহণ করা হবে জাতীয়তা বিরোধী। কিন্তু উনিশশো চৌত্রিশ সালে তুরস্কে যাবার পরে আমার মত বদলে যায়। তখনই আমি বুঝতে পারলাম বাকি দুনিয়া যে লিপি নিয়েছে সেই লিপি গ্রহণ করলে কী দারুণ সুবিধা। আমাদের দেশের জনসাধারণের দিক থেকে ভেবে দেখলে যেহেতু দেশের শতকরা নব্বই ভাগের বেশি নিরক্ষর এবং কোনো লিপির সঙ্গেই তাঁদের পরিচয় নেই, সে ক্ষেত্রে যে লিপিই গ্রহণ করা হোক তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। এ ছাড়া রোমান লিপি জানা থাকলে ইউরোপীয় ভাষা শেখা তাদের পক্ষে সহজ হবে। আমাদের দেশে রোমান লিপি এখনই চালাতে গেলে জনমত যে কী পরিমাণ বিক্ষুব্ধ হবে সে বিষযে আমি যথেষ্ট সচেতন। তা সত্ত্বেও আমাদের দেশবাসীর কাছে আমার নিবেদন, তারা যেন বিচার করে দেখেন শেষ পর্যন্ত কোন সমাধান সব দিক থেকে বিজ্ঞজনোচিত।

ইংরেজি শিক্ষিত দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্র আসলে তথাকথিত ইংরেজ সাহেব ছিলেন। তিনি সবসময় ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গান্ধী ছাড়া আর প্রায় সবাই ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতেন। গান্ধী যা কিছু লিখতেন, লিখতেন ইংরেজিতে। গান্ধী যদিও ভীষণ রকম ইংরেজি শিক্ষা এবং ইংরেজি ভাষা বিদ্বেষী ছিলেন, কিন্তু সারাজীবন ইংরেজিতে লিখে গেছেন। গান্ধী অবশ্য বহু ব্যাপারেই স্ববিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন ইংরেজ শাসনের ভক্ত। তিনি ইংরেজদের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করলেও, নিজে ব্যারিস্টার হয়েছিলেন। তিনি অবশ্য ব্যারিস্টারি পড়তে যান, তাঁর নানান মতবাদ তৈরি হবার আগেই। কিন্তু নিজের ছেলেদের ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষা দিতে চাননি, সে কারণে তাঁর বড় ছেলে হরিলাল বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। হরিলাল পরবর্তীতে লেখাপড়া শিখতে না পারার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন। বাবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে তিনি কিছুদিনের জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। গান্ধী হরিলালকে বলতেন, ইংরেজদের এইসব শিক্ষা তোমাকে মানুষ বানাবে না, মানুষ হবার চেষ্টা করো। তিনি হরিলাল বা তাঁর অন্য ছেলেদের বলতেন, মানুষের সেবা করা সবচেয়ে বড় শিক্ষা। হরিলাল যখন কিশোর বয়সে বাবার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যোগ দেন এবং কারাগারে যান, গান্ধী হরিলালকে বলেছিলেন, সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা তুমি এখান থেকেই পাবে। পিতার বক্তব্যে হরিলাল, কস্তুরবা বা অন্য ছেলেরা একমত হননি।

গান্ধী পরবর্তী জীবনে ইংরেজি শিক্ষিত আমলাদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করে বলেছেন, এরা জনবিচ্ছিন্ন। ভারতের কোনোই উপকার সাধন এদের দ্বারা হবে না। কিন্তু ইংরেজি জানা ভারতীয় ভদ্রলোকরা যাতে তাঁর চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, আর ইংরেজ শাসকদের কাছে যাতে তাঁর বাণী পৌঁছে যায় সেজন্য তিনি ইংরেজিতে লিখতেন। গান্ধী সন্তানদের ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষার বিরুদ্ধে বললেও, সবসময় ইংরেজদের সুসভ্য জাতি বলে জ্ঞান করেছেন। মনে করেছেন, ইংরেজদের সাম্রাজ্য টিকে থাকা উচিৎ। তিনি নিজে যে রাজভক্ত সে কথা প্রমাণ করার জন্য, দক্ষিণ আফ্রিকায় “বুয়ার যুদ্ধ” এবং জুলু বিদ্রোহে” ইংরেজ শাসকদের পক্ষ নেন। দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয়দের ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে তিনি রীতিমতো ইংরেজ সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করেন। অহিংস গান্ধী তখন ইংরেজদের পক্ষে রক্তাক্ত লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করাটা ন্যায়সঙ্গত মনে করেছেন। অহিংসার পূজারি গান্ধী এমনকি প্রথম মহাযুদ্ধে ভারত থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ইংরেজদের পক্ষে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলামও সেই যুদ্ধে হাবিলদার হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু শিক্ষার বাহন হিসেবে ইংরেজি নয়, গান্ধী সর্বদা বলেছেন মাতৃভাষার কথা।

ভারতে উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস যখন সাতটি প্রদেশে জয়লাভ করে, ক্ষমতায় বসেই তখন তারা হিন্দিকে জোর করে কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলিতে চাপিয়ে দিতে চায়। কারণ কংগ্রেসকে যারা টাকা দিতো সেই ব্যবসায়ীরা হিন্দি ভাষার প্রসারের জন্য নানারকমভাবে চেষ্টা চালাতেন। খুব সচেতনভাবেই কিছু কিছু ব্যবসায়ী এবং কংগ্রেসের কিছু নেতা উর্দুভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করেন। হিন্দু, জৈন, পার্সি ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা হিন্দি ভাষাকে সর্বস্তরে চালু করার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ভারতের বিভিন্ন স্থানে একটা দাবি উঠেছিলো যে, ভাষার ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজ্যসীমা নির্ধারিত হোক। কিন্তু এই দাবি মেনে নিতে রাজি ছিলেন না নেহরু সরকার। বিশেষ করে নেহরু হিন্দি ভাষা প্রচলনের পক্ষপাতী ছিলেন। আসলে “হিন্দু-হিন্দি সংহতি”র প্রবক্তাদের চাপের কাছে মাথা নত করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ নেহরু। সংবিধান সভায় মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত হয় যে, হিন্দি হবে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা। এই সিদ্ধান্তই কার্যকর করে নেহরু সরকার। ফলে ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উপর বৃহৎ বুর্জোয়াশ্রেণীর তথা বৃহৎ ব্যবসায়ীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবিটা ছিলো বহুদিন ধরেই ভারতের বড় বড় ব্যবসায়ীদের, তাদের সে উদ্যোগ সফল হলো। উনিশশো আটচল্লিশ সালেই ভাষাভিত্তিক প্রদেশ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হলো, যতদিন পর্যন্ত না ভারত একটি জাতিতে পরিণত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ভাষাভিত্তিক প্রদেশগুলির সংকীর্ণ ঝোঁকগুলিকে অবদমিত রাখতে হবে। বহুজন এটা মেনে নিতে চায়নি। নিজেদের জাতিসত্ত্বা হারিয়ে ভারতীয় হয়ে যেতে চায়নি। উনিশশো বায়ান্ন সালের বিশে অক্টোবর তেলেগুভাষী গান্ধীবাদী নেতা পট্টি শ্রীরামালু মাদ্রাজের তেলেগুভাষী এগারোটি জেলা নিয়ে পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের দাবিতে অনশন শুরু করেন। দুর্ভাগ্যজনক যে, এই অনশন নেহরুকে বিচলিত করেনি। উনিশশো বায়ান্ন সালের পনেরো ডিসেম্বর অনশনরত পট্টি শ্রীরামালু মারা যান। শ্রীরামালুর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে তেলেগুভাষী জেলাগুলিতে দাঙ্গা শুরু হয়। উনিশশো বায়ান্ন সালের আঠারোই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা অন্ধ্রপ্রদেশ নামক পৃথক রাজ্য গঠন করতে বাধ্য হয়।

হিন্দিকে ভারতের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছিলো অনেকদিন ধরেই। গান্ধী এই সম্পর্কে কী বলছেন। হিন্দি, হিন্দুস্তানী এবং উর্দু এই কথাগুলি হচ্ছে একটিমাত্র ভাষারই বিভিন্ন নাম, যা উত্তরের হিন্দু বা মুসলমানেরা ব্যবহার করে থাকেন এবং একে দেবনাগরী বা পার্শিয়ান যে কোনো লিপিতেই লেখা যায়। উর্দু কথাটি প্রচলিত হবার আগে হিন্দু-মুসলমান উভয়ের ব্যবহৃত এই ভাষার নাম ছিলো হিন্দি। এই একই ভাষাকে পরে হিন্দুস্তানী নামে অভিহিত করা হয়। গান্ধীর উপরের বক্তব্য সম্পূর্ণ সঠিক নয়। গান্ধী এরপরে লিখছেন, উত্তরের এক বিরাট জনগোষ্ঠী যে ভাষা বুঝতে পারে, হিন্দু ও মুসলমানদের সেই ভাষায় কথা বলতে শেখা উচিৎ। বিরাট ভারতের নানা ভাষাভাষী মানুষের উপর গান্ধী কেন শুধু উত্তর ভারতের ভাষা চাপিয়ে দিতে চাইছেন? বাংলার হিন্দু মুসলমানকে কেন উত্তরের হিন্দি বা বাংলা ভাষা বলতে হবে? গান্ধী আরো লিখছেন, নির্বিচারে বহু হিন্দু ও মুসলমান যথাক্রমে সংস্কৃত এবং পার্শিয়ান বা আরবী শব্দ ব্যবহার করতে চাইবেন। যতদিন পর্যন্ত পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং পৃথক থাকার ভাব থাকবে ততদিন এসব আমাদের বরদাস্ত করতে হবে। যখন অভিন্ন হৃদয় হয়ে প্রাদেশিকতা বর্জন করে ভারতকে নিজদেশ মনে করে গর্ব অনুভব করবো, প্রদেশের কাজের জন্য তখন প্রাদেশিক ভাষা বজায় রেখেও আমরা একই লিপি সম্বলিত একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা ব্যবহার করবো। কোনো প্রদেশ, জেলা বা কোনো একদল লোকের উপর কোনো এক বিশেষ ধরনের হিন্দি ভাষা বা লিপি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া দেশের স্বার্থের পরিপন্থী হবে।

গান্ধী এরপর লিখছেন, সাধারণ ভাষার ব্যাপারটিকে ধর্মের পার্থক্য থেকে আলাদা করে দেখতে হবে। তিনি সুভাষচন্দ্রের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, রোমান লিপি ভারতের সাধারণ লিপি হতে পারে না বা হওয়া উচিৎ নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু পার্শিয়ান এবং দেবনাগরী লিপির মধ্যে হতে পারে। দেবনাগরীর নিজস্ব স্বাভাবিক যোগ্যতার কথা ছেড়ে দিলেও সারা ভারতের জন্য এইটিকেই সাধারণ লিপির মর্যাদা দেওয়া উচিৎ। কারণ বেশিরভাগ প্রাদেশিক লিপিই সৃষ্টি হয়েছে দেবনাগরী থেকে। সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান বা অন্য যারা জানে না, তাদের মধ্যে জোর করে এই লিপি চালানোর কোনো রকম প্রচেষ্টাই হওয়া উচিৎ নয়। বর্তমান অবস্থায় মুসলমানরা যে দেবনাগরীর উপর জোর দেবে একথা মনে আনা যায় না। দেবনাগরী বা পার্শিয়ান যে কোনো লিপিতেই লিখিত হোক না কেন, উত্তরের হিন্দু এবং মুসলমানরা সাধারণত যে ভাষা ব্যবহার করে থাকেন, তাকেই আমি হিন্দি বা হিন্দুস্তানীর সংজ্ঞা হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব করছি। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও আমি সেই সংজ্ঞাই মেনে চলি। নিঃসন্দেহেই একটি দেবনাগরী আন্দোলনের সঙ্গে আমি সর্বান্তঃকরণে জড়িত। সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত বা এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ভাষাগুলির জন্য একটি সাধারণ লিপি থাকা উচিৎ, আর দেবনাগরীই হওয়া উচিৎ সে লিপি। কোনো এক প্রদেশবাসীর অন্য প্রদেশের ভাষা শেখার পক্ষে বিভিন্ন লিপিগুলি এক অহেতুক বাধাস্বরূপ। ভারত এক-জাতিত্বের দাবি করা সত্ত্বেও এবং বস্তুত এক জাতি হওয়া সত্ত্বেও ভারতে কেন একটি মাত্র লিপি প্রবর্তিত হবে না? তাই দেবনাগরী বা উর্দু লিপির যে কোনো একটিকে বেছে নেবার অধিকার দেওয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে দেশের জনসাধারণের অধিকাংশই নিরক্ষর। শুধু বাজে ভাবপ্রবণতার জন্য বা চিন্তাশক্তির দুর্বলতার জন্য তাদের উপর নানারকম লিপি চাপিয়ে দিলে সে হবে আত্মঘাতী নীতি। দেবনাগরীই একমাত্র লিপি বা ভারতে সর্বজনগ্রাহ্য হওয়া সম্ভব। স্বেচ্ছায় মুসলমানরা শুধু বৈজ্ঞানিক কারণে বা জাতীয় প্রয়োজনের খাতিরে দেবনাগরীর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার না করা পর্যন্ত উর্দু বা পার্শিয়ান যুগপৎ এর সঙ্গে চলতে থাকবে।

আরও পড়ুন:
বাংলা ভাষা আন্দোলনে ভদ্রলোকদের দ্বিচারিতা এবং কিছু মতামত । রাহমান চৌধুরী
বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষা প্রদান এবং রবীন্দ্রনাথ । রাহমান চৌধুরী
ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে বাংলা ভাষায় শিক্ষা । রহমান চৌধুরী

গান্ধী তাঁর বক্তব্যের শেষে আসলে হিন্দি আর দেবনাগরী লিপির পক্ষেই কথা বলছেন। তবে মুসলমানরা যদি মেনে না নেয়, তবে আপাতত পাশাপাশি উর্দু চলতে পারে। কিন্তু তাঁর মতে চূড়ান্তভাবে হিন্দিই হচ্ছে ভারতের গ্রহণযোগ্য ভাষা। নিজে কিন্তু তিনি গুজরাটি। ব্রিটিশ শাসনে গান্ধী যখন এসব কথা বলছেন তখন কংগ্রেস ভারতের এগারোটি প্রদেশের আটটিতে নিজেদের সরকার গঠন করে বসে আছে। সেইসব জায়গায় একরকম জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেয়ার ফলে, তার বিরোধিতা করেন জিন্নাহ। জিন্নাহর উনিশশো আটত্রিশ-উনচল্লিশ সালের বক্তৃতায় এবং বিভিন্ন ভাষ্যে তা পাওয়া যাবে। কংগ্রেসের চাপিয়ে দেয়া হিন্দি ভাষা এবং বন্দে মাতরম গান দুটোরই তীব্র নিন্দা করেন জিন্নাহ। তবে সাঁইত্রিশ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের বহু আগে থেকেই হিন্দু মহাসভা আর কংগ্রেস দলে হিন্দির পক্ষে প্রচার চলছিলো। জিন্নাহ সে কারণেই উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের নির্বাচনী ঘোষণায় তাদের চোদ্দটি দফার এক দফায় বলেছিলেন, মুসলিম লীগ ক্ষমতায় এলে উর্দু ভাষার বিকাশে সহযোগিতা করবে। জিন্নাহ এ কথা বলেছিলেন এ কারণেই যে, তিনি জানতেন ব্যবসায়ীরা হিন্দি ভাষাকে ভারতের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে আর একই কারণে উর্দু ভাষাকে গুরুত্বহীন করে তুলছে।

সন্দেহ নেই, উর্দু ছিলো তখন শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট এগিয়ে থাকা ভাষা। দিল্লি এবং লক্ষৌয়ে উর্দু ভাষার তখন যথেষ্ট সমাদর। সারা ভারতের কথা যদি বিবেচনা করা যায়, তাহলে হিন্দির চেয়ে তখন উর্দু এবং বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা অনেক বেশি হচ্ছিলো। তার আগের ভারতীয় সাহিত্যে অবদান রেখেছে প্রাচীন যুগে সংস্কৃত আর পালি ভাষা, মধ্যযুগে ফার্সী ভাষা। কারণ পালি ছাড়া বাকি দুটোই ছিলো তখন সরকারি ভাষা। কিন্তু উর্দুর জন্ম কিন্তু সরকারি ভাষা হিসেবে নয়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেনাছাউনিতে এই ভাষার জন্ম। উর্দু কথাটার মানেও তাই সেনাছাউনি। মুসলিম শাসনে বা মুঘল যুগে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতেন। ফলে বিভিন্ন ভাষাভাষী সৈনিকদের মধ্যে কথাবার্তা বলা বা যোগাযোগ সৃষ্টির জন্য উর্দু ভাষার জন্ম। ভাষাটি সেনাছাউনিতে জন্ম নিলেও, তা রাজদরবারেও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। উর্দু ভাষার সঙ্গে হিন্দি ভাষার যথেষ্ট মিল রয়েছে। মধ্যযুগের শেষেও এবং আধুনিক যুগেও ভারতের সাহিত্য-সঙ্গীত রচনায় উর্দুভাষা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে চলেছিলো। সরকারি পৃষ্টপোষকতায় ততটা নয়, যতোটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে। মুসলমানরাই যে শুধু উর্দু ভাষায লিখতেন তা নয়, প্রচুর হিন্দু বংশদ্ভুতরাও লিখতেন। কৃষণ চন্দর, মুন্সিপ্রেম চাঁদের মতো লেখকরা ছিলেন, যাদের শক্তিশালী রচনা এখানকার অনেক পাঠকরাই পড়েছেন। উর্দু শুধু মুসলমানদের ভাষাও ছিলো না। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক যখন চলছিলো ভারতবর্ষে তখন সাহিত্য আর সঙ্গীতের অঙ্গনে বাংলা ভাষা অনেক এগিয়ে ছিলো। ভারত ভাগ বা ভারতের স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষ হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করে, জিন্নাহ বেছে নেন উর্দুকে। দুটির মধ্যে কি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়?

প্রশ্নটা হলো, বাংলা যদি ভাগ না হতো, তাহলে তো আমাদেরকে উর্দু না হোক হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে হতো। উর্দুর বিরুদ্ধে যেভাবে আন্দালন করা গেছে, ইতিহাস বলে স্বাধীন ভারতে হিন্দির বিরুদ্ধে সে রকম আন্দোলন করা যেতো না। আর ভারতে বাংলা ভাষা কখনোই রাষ্ট্রভাষা হতো না। বাংলা ভাগের ভিতর দিয়ে অন্তত বাংলাকে একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা করা গেছে। জিন্নাকে কেন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিলেন, তার কিছুটা অনুসন্ধান এখানে মিলবে। এখানে আর একটি কথা বলে রাখা দরকার, পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে এখন যে গানটি গাওয়া হয়, জিন্নাহ কিন্তু এই গানটি বাছাই করেননি। জিন্নাহ উর্দু ভাষার একজন হিন্দু কবি জগন্নাথ আজাদকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় সঙ্গীতটি রচনা করার। প্রচুর মুসলমান কবি থাকা সত্ত্বেও তিনি জগন্নাথ আজাদকে এই দায়িত্ব দেন আস্থার সঙ্গে। জিন্নার মৃত্যুর পর কট্টোর মুসলমানদের চাপে সে গানটি বাতিল করা হয়, পাকিস্তানে এখন আর কেউ প্রথম জাতীয় সঙ্গীতটির কথা মুখেও আনেন না। জগন্নাথ আজাদের জন্ম উনিশশো আঠারো সালে, মারা যান দুই হাজার চার সালে।

লেখক পরিচিতি:
রাহমান চৌধুরী, লেখক, শিল্প সমালোচক
Raahman Chowdhury

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.