পাশাপাশি

Comments

। তিস্তা।

দীপা ঘুমাচ্ছে। শ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। নিয়মিত। শান্ত। এই শব্দ পনেরো বছর ধরে শুনছি। কখনো অদ্ভুত লাগেনি। আজ লাগছে। কেন লাগছে জানি না। বাইরে একটা কুকুর ডাকছে। থামছে। আবার ডাকছে। পাশের ফ্ল্যাটে কেউ একজন ফিরল এইমাত্র। দরজা খোলার শব্দ হলো। তারপর আবার নিঃশব্দ। 

শহর ঘুমাচ্ছে। আমি জেগে আছি। ঘড়িতে রাত দুটো। ঘুম আসছে না। কারণ খোঁজার চেষ্টা করলাম। পেলাম না। এই জেগে থাকাটা ভয় বা চিন্তার নয়। একটা অদ্ভুত অস্বস্তির। যেন কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছি। কী বোঝার চেষ্টা করছি, সেটা জানি না। পাশ থেকে শ্বাসের শব্দ আসছে। এই শব্দটা চিনি। এত চেনা যে সাধারণত শুনতে পাই না। আজ পাচ্ছি।

ভাবছি, এই মানুষটাকে ভালোবাসি কিনা। এই প্রশ্নটা আগে কখনো করিনি নিজেকে। অথবা করেছি, কিন্তু উত্তর না খুঁজেই এগিয়ে গেছি। এগিয়ে যাওয়া সহজ। থেমে জিজ্ঞেস করা কঠিন। আজ রাতে ঘুম নেই। তাই থেমেছি। আজ উত্তর জানি। উত্তরটা হ্যাঁ নয়। কিন্তু না-ও নয় পুরোপুরি। মাঝখানে একটা জায়গা আছে যেটার নাম জানি না। সেখানে বসে আছি অনেকদিন ধরে। কতদিন, হিসেব করিনি।

পনেরো বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের আগে দু’বছর পরিচয়। মোট সতেরো বছর। সতেরো বছরে দুটো বাড়ি বদলেছি। একটা শহর বদলেছি। দুটো চাকরি বদলেছি। দুটো চাকরি বদলানোর সময় ও কিছু বলেনি। প্রথমবার বলেছিলাম, ভালো একটা সুযোগ এসেছে। মাথা নেড়েছিল। দ্বিতীয়বার আগে থেকে বলিনি। হয়ে যাওয়ার পর জানিয়েছিলাম। সেদিনও ও কিছু বলেনি। শুধু বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়েছিল। সেই তাকিয়ে থাকাটা স্বাভাবিক ছিল না। যেন কিছু বলতে চেয়েও বলল না। কেন, জানতে চাইনি। সতেরো বছরে একটা মানুষকে চেনা হয়। অভ্যেস হয়। অভ্যেস আর ভালোবাসা এক জিনিস কিনা, এই প্রশ্নটা মাঝে মাঝে আসে। আজ রাতেও এল। 

ঘুমের মধ্যে ও একটু কাত হলো। আমার দিকে নয়, অন্যদিকে। দেখলাম। ঘুমের মধ্যে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় না। শরীর নিজে থেকেই কার্যকলাপ করে। শরীর অন্যদিকে গেল। এটা নিয়ে কিছু ভাবার নেই। কাল সকালে উঠে চা বানাবে। এটা জানি। পনেরো বছরে একদিনও বাদ যায়নি। অসুস্থ থাকলেও বানিয়েছে। আমি বলেছি, থাক, আমি বানাচ্ছি। তারপরেও উঠে গেছে। আমার কাপে দু’চামচ চিনি দেবে। জানে, চায়ে আমি একটু কড়া মিষ্টি ভালোবাসি। প্রথমবার চা বানিয়ে দেওয়ার দিন জিজ্ঞেস করেছিল, কতটা চিনি? বলেছিলাম, দু’চামচ। তারপর থেকে আর জিজ্ঞেস করেনি। পনেরো বছর ধরে মনে আছে। এটাকে কী বলে? ভালোবাসা বললে সহজ হয়।

ভালোবাসার একটা সংজ্ঞা খোঁজার চেষ্টা করলাম। পেলাম না। বইয়ে থাকে। সিনেমায় থাকে। কিন্তু বইয়ের সংজ্ঞা আর রাত দুটোয় শুয়ে থাকা মানুষের সংজ্ঞা এক হয় না। রাত দুটোয় পাশাপাশি এই শুয়ে থাকাকে কি ভালোবাসা বলা যায়! হয়তো। পাশে আছে। ঘুমিয়ে। তাহলে ভালোবাসা আছে। কিন্তু এই যুক্তিটা অনেক সহজ। সহজ যুক্তি সবসময় ঠিক হয় না। ভালোবাসা আর অভ্যেস আলাদা করার কোনো যন্ত্র নেই। থাকলে ভালো হতো। থাকলে আজ রাতে কাজে লাগত।

একটা সময় ভেবেছিলাম, আমাদের একটা বাচ্চা হবে। হয়নি। এই না-হওয়াটা নিয়ে আমরা খুব বেশি কথা বলিনি কোনোদিন। দরকার পড়েনি। অন্যদের বাচ্চা বড়ো হতে দেখেছি। জন্মদিনে গেছি, উপহার দিয়েছি, ফিরে এসেছি। মাঝে মাঝে ভেবেছি, থাকলে কেমন হতো! এই ঘরে আরেকটা শ্বাসের শব্দ থাকত। হয়তো রাতে ঘুম ভাঙত অন্য কারণে। অথবা হয়তো এই প্রশ্নগুলো আসত না, নীরবতাটা অন্যরকম হতো। আবার এটাও মনে হয়েছে, এই নীরবতাটাই হয়তো আমাদের মতো করে ঠিক আছে।

একটা কথা মনে পড়ল এই প্রসঙ্গে। বছর পাঁচেক আগে একদিন রাতে ঝগড়া হয়েছিল। বড়ো ঝগড়া। মনে আছে, অনেক কথা বলেছিলাম যা বলা উচিত হয়নি। ও-ও বলেছিল। কথার স্বর একটু একটু করে চড়ছিল। দরজাটা জোরে বন্ধ করেছিল। তারপর অনেকক্ষণ চুপচাপ। রাতে দুজনে পাশাপাশি শুয়েছিলাম। মাঝখানে একটা দূরত্ব ছিল। ইচ্ছে করে রাখা। সকালে উঠে চা দিয়েছিল। দু’চামচ চিনি। আমি নিয়েছিলাম। কিছু বলিনি। ও-ও বলেনি। কেউই আর তুলিনি আগের দিনের কথা।

আরও বেশ কয়েকবার ঝগড়া হয়েছে। এখন মজার ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ ঝগড়ার কারণই মনে নেই। মনে থেকে গেছে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। দীর্ঘ নীরবতা। দুজনের আলাদা ঘরে বসে থাকা। কিন্তু কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল? টাকা? সময়? কোনো আত্মীয়? নাকি এমন কিছু যা আজ আর গুরুত্বপূর্ণই নয়? মনে পড়ে না।

মানুষ আসলে কী মনে রাখে, সেটাও একটা রহস্য।

ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি। ছাদে একটা দাগ আছে। বর্ষায় জল চুঁইয়ে হয়েছিল। রং করার কথা ছিল। হয়নি। দু’বছর ধরে দাগটা আছে। ধীরে ধীরে একটু ছড়িয়েছে। দুজনেই দেখেছি। কেউ আর এ নিয়ে কথা বলি না। কতকিছুই তো ঠিক করার কথা থাকে। কিন্তু ঠিক করা হয় না। এই দাগটার মতোই সেগুলো থেকে যায়। পাশে ঘুমাচ্ছে। এই মানুষটার সঙ্গে পনেরো বছর কাটিয়েছি। পনেরো বছরে কত রাত পাশাপাশি শুয়েছি। গুনিনি—কত রাত কথা বলেছি ঘুমানোর আগে, কত রাত চুপ করে শুয়ে থেকেছি। আজকের মতো চুপ করে! 

একটা কথা ভাবলাম। যদি কাল সকালে উঠে চা না বানায়। যদি ভুলে যায় দু’চামচ চিনির কথা। তাহলে কেমন লাগবে আমার? ভাবলাম। খারাপ লাগবে। খারাপ লাগবে মানে কিছু একটা আছে। ‘কিছু একটা’-র নাম ভালোবাসা কিনা, নিশ্চিত নই। কিন্তু নাম না জানলে জিনিসটা থাকে না, এমন নয়।

ও একটু নড়ল। চোখ খুলল কিনা বুঝলাম না অন্ধকারে।

তারপর শুনলাম, “ঘুমাসনি?”

বললাম, “না।”

বলল, “কিছু হয়েছে?”

বললাম, “না। ঘুম আসছে না।”

কিছু বলল না।

একটু পরে অনুভব করলাম, হাতটা এদিকে এল। আমার হাত খুঁজল। পেল। ধরল। আঙুলগুলো জড়িয়ে গেল। খুব হালকা একটা চাপ। কিছু বলল না। আমিও বললাম না। হাতটা ধরে আছে। ঘুমের মধ্যে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় না। কিন্তু এটা ঘুমের মধ্যে নয়। আধো ঘুমে। আধো ঘুমে যা করে, সেটা সত্যি। হাতটা ধরে আছে। এটাকে কী বলে? ভাবলাম। কিন্তু প্রশ্নটা আর আগের জায়গায় নেই। প্রশ্নটা তার জায়গা থেকে সরে গেছে। কোথায় গেছে, বলতে পারব না। ঘুম আসছে। 

হাতটা ধরা আছে। 

ভালোবাসি কিনা প্রশ্নটা এখনও আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে জরুরি মনে হচ্ছে না। জরুরি না লাগাটা উত্তর কিনা, জানি না। কাল সকালে চা হবে। দু’চামচ চিনি। এই মুহূর্তে এটুকুই জানি। এটুকু যথেষ্ট কিনা তাও জানি না। 

কিন্তু এই মুহূর্তে এটুকুই আছে!

লেখক:
Tista02
তিস্তা
কবি, গল্পকার, প্রবন্ধকার; কলকাতা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট