পূর্ববঙ্গের ডিএনএ-এর সৌন্দর্য্য । মাসকাওয়াথ আহসান

Comments

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরে ইংরেজদের সহমত ভাই যে নতুন জমিদার শ্রেণীটি তৈরি হয়; তারা সন্তানদের ইংরেজি শিখিয়ে ও কলকাতায় সেকেন্ড হোম তৈরি করেই; যাদের সম্পদ লুন্ঠন করে তাদের এই সাহেবি কেতা; পূর্ববঙ্গের সেই মানুষকে প্রজা হিসেবে বর্ণনা শুরু করে। তাদেরকে ঢালাওভাবে “ছোট লোক” তকমা দেয়। নতুন এই বড়লোকেরা ইংরেজদের  “চাটার দল” হিসেবে নব্য এলিটিজমের মালিক হয়ে; এরসঙ্গে মিশিয়ে ফেলে তাদের ধর্মীয় কাস্ট সিস্টেমের সুপিরিয়রিটি।

দেখবেন, বৃটিশ স্তাবক এই জমিদার শ্রেণীর লেখকেরা পূর্ববঙ্গের মানুষকে  নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমান হিসেবে বর্ণনা করছে। উল্লেখ্য যে, এই নব্য জমিদার শ্রেণীকে আবার একইভাবে বৃটিশ রাজনীতিক উইনস্টোন চার্চিল সাবহিউম্যান ও ইঁদুর হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

শুধু পূর্ববঙ্গ নয়; পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে; এখানে চারটি অঞ্চলের মানুষ অভিবাসী হয়েছে। আফ্রিকা, পারস্য, মধ্য এশিয়া ও দূর প্রাচ্য। তারমানে এইখানে নিজেকে সান অফ দ্য সয়েল বা ভূমিপুত্র হিসেবে নিজেকে দাবি করার কিছু নেই। এমেরিকা সমৃদ্ধশালী হওয়ায় সেখানে যেমন নানান রকম মানুষ অভিবাসী হয়েছে; প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।

এই অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন থেকে বেশিরভাগ মানুষের বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেবার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। আর ছিলো আফ্রিকার সহজিয়া ধর্মের মতো প্রকৃতি পুজারি মানুষ। যারা এই ভূখণ্ডে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে বিবাদমান; সেই হিন্দু ধর্ম ও ইসলাম ধর্মের সেরকম কোন পুরাকীর্তি তো নেই। সবই ফিকশনাল গর্ব ও কীর্তি।

সেন যুগ আর সুলতানি আমল; এই দুটি সময়ে হিন্দু ও মুসলমান শাসকদের সক্রিয় দেখতে পাই পূর্ববঙ্গে। তার আগে পাল যুগটি বৌদ্ধ শাসকের। ইতিহাসের এইসব চিহ্ন থেকে সমৃদ্ধ পূর্ববঙ্গের ছবি পাই। সম্পন্ন কৃষক, কারিগর, জেলেদের জীবন ছবি থেকে সচ্ছল ও সহজিয়া জনপদের খোঁজ পাওয়া যায়। বৃটিশ আগমনের পরে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্র ধরেই সম্পন্ন মানুষদের দারিদ্র্যকরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর থেকেই বৃটিশ ও তাদের তাঁবেদার জমিদাররা; মনগড়া ন্যারেটিভে পূর্ববঙ্গের মানুষকে নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে চিত্রিত করেছে; নিজেদের শোষণ, নিষ্ঠুরতা, গণহত্যা ঢাকতে।

ঠিক একারণেই বাংলাদেশের মানুষকে জীনগতভাবে ইনফেরিয়র বলে স্বীকার করে নিতে আমি রাজি নই। কারণ প্রত্ন প্রমাণে এ ছিলো সমৃদ্ধ জনপদ। বরং বৃটিশ ও তাদের সহমত জমিদারেরা নিজেরা ইনফেরিয়র ছিলো বলেই; এতো সুপিরিয়রিটি জাহির করেছে তারা ইতিহাস ও সাহিত্য রচনায়। বাংলাদেশের এক শ্রেণীর দুস্থ প্রগতিশীল যেভাবে যত্রতত্র মানুষকে “ছোট লোক” ও “চাষা” বলে; এটা এসেছে বৃটিশের রাজবদর জমিদারদের কৃত্রিম প্রগতিশীল সেন্স অফ হায়ারার্কি থেকে।

আপনি আজকের যুগে যেরকম দেখতে পারেন; সমাজের ভ্যাগাবন্ডগুলোই সরকারের পা চেটে ফইন্নি থেকে নব্য জমিদার হয়; বৃটিশের পদলেহী জমিদারেরাও ছিলো ঠিক তাই। যারা সম্পন্ন কৃষক ও কারিগর ছিলো; তারা ছিলো দ্রোহী ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন পরিশ্রমী মানুষ।

শিল্পী এস এম সুলতানের পেশীবহুল কৃষকই পূর্ববঙ্গের আদম সুরত। আরাকান রাজসভার সাহিত্য আসর, স্বাধীন সুলতানী আমলের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এসব গর্বের চিহ্ন মুছে দিয়ে বৃটিশের আদলে তৈরি করা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বাঙ্গালির হাজার বছরের সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেবার যে চল আজকের সরকার তোষক দুস্থ প্রগতিশীলদের মাঝে; তা তাদের মানসিক দৈন্যেরই বহিঃপ্রকাশ।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরপরই পূর্ববঙ্গে একটি বড় গণহত্যা ঘটে। সম্পন্ন কৃষকদের নিঃস্ব করে ফেলা হয়। মসলিনের মত জগত সেরা শিল্পের কারিগরদের ঢাকা আড়ং-টি নিশ্চিহ্ন করা হয়। মুঘল যুগের সরাইখানার মালিক-কর্মীদের পথে বসিয়ে দিয়ে তাদের “ঠগী”-র তকমা দেয়া হয়। একটি সমৃদ্ধ জনপদের বিনাশ করে, বৃটিশ প্রশাসকেরা এ এলাকার মানুষকে সাবহিউম্যান বলে বর্ণনা করে। আর বৃটিশের স্তাবক জমিদারেরা এদেরকে নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে চিত্রিত করতে থাকে  বৃটিশ স্পনসরড ইতিহাস ও সাহিত্যে।

আমরা যখন গ্রামে মানুষের দ্বারে দ্বারে বইফেরি করা পলান সরকারকে দেখে বিস্মিত হই কিংবা বিদ্যানুরাগী জিয়াকে দই বিক্রি করে সমাজ সেবা করতে দেখে বিমোহিত হই;  রিক্সা শ্রমিককে যাত্রীর ফেলে যাওয়া লাখ টাকার ব্যাগ ফেরত দিতে দেখে অবাক হই; একজন দার্শনিককে উদাস মুখে চাখানায় বসে জীবনের মিস্টিক দিকগুলোর গল্প করতে দেখি; অথবা নির্মাণ শ্রমিক জাদুকরি বাঁশী বাজায়; তখন এর প্রত্ন কারণ খুঁজলেই খুব সম্ভব পূর্ববঙ্গের ডিএনএ-এর সৌন্দর্য্য পুনরাবিষ্কার করতে পারবো।

ফিচার ফটো: এসএম সুলতানের অংকিত চিত্র অবলম্বনে।

লেখক:
Maskwaith Ahsan02
মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক ও শিক্ষক

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট