ফরিদ আহমদ দুলালের কবিতা

Comments

এপিটাফ

সুকীর্তির ভারে যারা নুয়ে থাকে তাদেরই এফিটাফ লেখা হয়
ঝরা পাতাদের এপিটাফ থাকে না কোত্থাও বিশ্বময়,
ঝরা পাতারা বারবার ফিরে আসে অমোঘ মৃত্যুকে করে জয়
এপিটাফ লেখে না ফড়িং-প্রজাপতি-ফুল প্রকৃতির থাকে না সংশয়;
এপিটাফ লেখে ভয় চিত্তের সংশয় মৃত্যুকে যাদের ভয়
পাথরের বুক খুঁড়ে আগামীর কাছে ভয় উৎকলিত হয়;
স্মৃতিময় যত পথ যত বৃক্ষরাজি গোপাটের অচেনা রঙিন ফুল
রজনীর আঙিনায় ঝরে শিউলি কুল-ফুল এবং বকুল;
পরকীয়া রাধিকার এপিটাফ থাকে ঝরা পাতার মর্মরে
এপিটাফ লিখে রাখি বৃষ্টিভেজা উদ্যানের ব্যর্থ অভিসারে।

কষ্ট প্রবাহ অচলায়তন হলে কষ্টগুলো এপিটাফ করে রাখি
সুকীর্তি জমেনি বলে কষ্ট-পংক্তি দিয়ে ব্যর্থতার লজ্জা ঢাকি
বালক মাছের উদাস সাঁতারে এপিটাফ লিখে রাখে নিশিবক
বলাকার সারিবদ্ধ ফেরার উড়ালে চোখ রাখে তৃষিত চাতক;
পাথরের বেদীতে অঞ্জলি দিতে যদি ভুলে দীর্ঘশ্বাস পড়ে
মনে রেখো এপিটাফ লিখেছি ভালোবেসে তোমার অন্তরে।

নতুন যুদ্ধের ডাক

একদিকে মূর্খ অন্ধকার অন্ধতার সমাবেশ
অন্যদিকে আলোকিত প্রজ্ঞা অনিঃশেষ;
সরলতা নিয়তি নির্ভর—প্রজ্ঞাবান দেখে বুঝে পথ চলে
অন্ধতা স্থবির-পশ্চাৎপদ প্রজ্ঞা প্রগতির কথা বলে;
একচক্ষু-হরিণ মূর্খতা নিরালোক পথে হাঁটে
আলোর দিশারী প্রজ্ঞালোকের দশদিগন্ত খোলা উদয়াস্ত খাটে মাঠে,
প্রজ্ঞা ঈশ্বরকে আলোকিত করে দেখে ঈশ্বর নিজেই অন্ধকার
অন্ধতার স্বগোত্রীয় মূলসূত্র সে ধর্মান্ধতার;
অসভ্যতা হয়ে কাঁধে বসে আছে সিন্দাবাদের অনড় ভূত
অশিষ্ট-অভব্য প্রতারক পেত্নির স্বার্থান্ধ পুত!

ধৈর্য এবং সৌজন্যবোধে শ্রদ্ধাশীল নয় অশিষ্ট অন্ধরা
মূর্খ উত্তাপে বিপন্ন আজ প্রেমময় বসুন্ধরা,
তাছাড়া অন্ধতা ছড়িয়েছে ব্যাধি আলোর উদ্যানে সুকৌশলে
উলুপোকা হয়ে আশ্রয় নিয়েছে বৃক্ষের বল্কলে;
বিভ্রান্ত সপক্ষ-লোভমত্ত সমর্থকেরা সদলবলে
কাড়াকাড়ি করে মরা গরু নিয়ে ভাগাড়-অঞ্চলে,
কূপমণ্ডূকেরা ত্রিশ লক্ষ রক্তাক্ত ভাস্কর্য চায় সর্বাংশে-সমূলে
বেহিসাবি হিস্যা চায় অনৈতিক সুদাসলে।

দুঃখিনী মায়ের অশ্রু মুছে দিতে সাহসী সন্তান
জেগে ওঠো বর্শা-ধনুক-বল্লম হাতে বাঁধো শিরস্ত্রাণ
যুদ্ধে ডাকছে তোমায় সহস্র রক্তাক্ত নদী দীপ্ত একাত্তর
কলঙ্কমোচনে প্রতিরোধ গড়ো মারো চিহ্নিত-শত্তুর!

বিজয়ী বাংলা

যে বিজয় আমার মোছেনি অন্ধতা সব
আমার অজ্ঞতা-অহংকার ভেঙে করেছে রক্তোৎসব;
যে বিজয় আনেনি মুক্তির পূর্ণ দিশা
কাটেনি জীবনের অতলান্ত অমানিশা;
পরাজিত শত্রু বুঝি নিচ্ছে সব বিজয় সম্ভ্রম কেড়ে
পতাকা-উড্ডীন গাড়িতে প্রতারক-শঠ যদি দু’হাত নেড়ে
বিজয়গাথা বলে অসম্মান করে রক্তের সমস্ত নদী
ধর্মান্ধতার বিভ্রান্তি দিয়ে সত্যাড়াল করে যদি
লক্ষ বাঙালির রক্তঋণ যদি বিস্মৃতিতে ঢেকে যায়,
এ বিজয় নেবো না! এ প্রাপ্তি ছলনা, ফাঁকি বলি নির্দ্বিধায়।
অর্ধ শতাব্দী ক্রন্দন এবার দিলাম দূরে ঠেলে তাকে
পূর্ণ মুক্তি যে অন্ধতা বিহীন সেই মুক্তি দেবো মা-কে।
পরাজিত শত্রু ভুল গ্রন্থে যত আলো প্রক্ষেপণ করে
দৃশ্যের বদলে উত্তাপ চেয়েছি ক্রমশ আলো যায় মরে;
জরায়ুর কুমারী সময় কেটেছিলো শুদ্ধতার সুরে সুরে
বিজয়ের প্রাপ্তি অন্ধের ঘায়ে সরে গেছে দূর-সুদূরে।

একাত্তর ডাকে মুজিব-চেতনায় জাগো বীর বাঙালি তুমি
অন্ধতা মুক্ত সন্তানকে চায় বিপন্ন বঙ্গভূমি!
বিশ্বাস যাদের সত্যে ও শৌর্যে—প্রগতির স্বপ্নে ঋদ্ধ
মানবিক ধর্মে কল্যাণ-কর্মে তারা জাগবে প্রথাসিদ্ধ!
বাংলা বাঙালির সহস্রবর্ষ মমতায় রেখেছি বুকে
কারো আস্ফালনে নাড়ির বন্ধন যাবে কি সাকুল্য চুকে?
বঙ্গবন্ধুকে পিতৃজ্ঞান করি তেরোশত নদীর জলধারা সাঁতারু জল
মৃত্তিকার বুকে আশ্রয় আমার নিঃশ্বাসের সম্বল।

বোয়ালচরিত

বোয়াল রাক্ষুসে মাছ সে-তো জানা ছিলো
ওর মাথা ব্যবচ্ছেদে আজ কারণটা বোঝা গেলো!
সে-বার বর্ষায় এক-ডিঙি পোনা কিনে ভেবেছিলাম হলাম লাভবান
তখন দস্তুর মৎস্যচাষী লক্ষ মীনশিশু পুকুরে সন্তরমান
ঝাঁক বেঁধে সাঁতরায় বিকেলে অবিরাম;
যোগ হলো লক্ষের সাঁতারে নদী থেকে কেনা সহস্রের ভিড়
আগামীর স্বপ্ন খেলা করে বুকে প্রেমিক চাষীর।
সকাল-বিকেল খৈল-কুড়া বিতরণ মীনের স্বাস্থ্যচিন্তায়
মৎস্যশিশু খৈল-কুড়া খায় তবু কেন কমে যায় গণনে-সংখ্যায়!
অতঃপর বুঝি পুকুরে অনুপ্রবেশ করেছে বোয়ালশিশু কতিপয়
ওরা খায় খৈল-কুড়া সাথে মীনশিশুর সঞ্চয়!

জানা হয়েছিলো বোয়ালের রাক্ষুসে দাপট
জানা হলো মৎস্যচাষে রাক্ষস বোয়ালে কত প্রকট সংকট!
আজ জানা হলো বোয়ালচরিত মুখ ভরা ধারালো দাঁতের সারি তার
বিচিত্র বিন্যাসে স্তরে স্তরে সাজানো দন্তবাহার!
জলবিশ্বে বোয়ালেরা নিত্য দাপটের সাথে ঘোরে
বিশ্বময় বোয়ালচরিত রাক্ষসেরা রক্ত ঠোঁটে নিয়ে ওড়ে,
স্বার্থান্ধ পৃথিবীজোড়া বোয়ালের ভীড়
যতোবার লোভ জাগে বোয়ালের বিষদাঁত করে সমাজ অস্থির!

বট-অশ্বত্থের আগ্রাসন

সুপ্রাচীন কাল থেকে দু’জনার প্রবল প্রভাব
প্রণাম করেনি দু’জনারে তেমন মানুষ বড়ই অভাব;
গ্রাম-গঞ্জ ঘুরে দেখি অসংখ্য বাজার জমে বটবৃক্ষ ছায়ে
অশ্বত্থের বিস্তৃতি দেখেছি মাঠে অগণন গাঁয়ে;
অশ্বত্থ-পাকুর দু’জনেই পাখির আশ্রয়-ছায়া
দু’জনার আছে পাতায় পাতায় স্নেহময় মায়া।
বটবৃক্ষ-অশ্বত্থেরা সমীহ পাবার দাবিদার
মহত্তম মহিরুহ সমাদৃত ‘বটবৃক্ষ’ নামে, এটা লোকের আচার।

সমাজে মূর্খেরা ‘বটবৃক্ষ’ হলে যেমন অহং বৃদ্ধি পায়
পাশাপাশি শিষ্টাচার—সৌজন্য হারায়;
জল-খাদ্য-স্বাস্থ্য সর্বস্ব একাই ক’রে নেয় গ্রাস
অধস্তন অনুগত ব্রাত্যদের ক’রে সর্বনাশ!
বটবৃক্ষ এবং অশ্বত্থ অবয়বে না-হোক চরিত্রে অবিকল
কোথাও আশ্রয় পেলে করে আশ্রয়দাতার জীবন বিকল!
পৃথিবীতে বটবৃক্ষ-অশ্বত্থের সংখ্যা কম বটে
তবু দাপট-প্রতাপ কিন্তু অশ্বত্থ এবং বটে;
বট নই মেঠোপথের অবহেলিত ঘাস আমি
অশ্বত্থের আগ্রাসনে সর্বনাশ আমার লিখেছে অন্তর্যামী।

লেখক:
Farid Ahmed Dulal 1
ফরিদ আহমদ দুলাল, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট