ফার্নান্দো বতেরোকে যেভাবে চিনলাম

Comments

। মিরাজুল ইসলাম ।

২০২৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে মৃত্যুবরণ করা শিল্পী ফার্নান্দো বতেরো’র নাম শুনলেও সেভাবে কয়েক বছর আগেও চিনতাম না। ১৯৩২ সালের ১৯ এপ্রিলে জন্ম নেয়া এই কলম্বিয়ান শিল্পীকে অনুধাবন করা অতোটা সহজ ছিল না। 

১৯৯০ সালের ২২ অক্টোবরে নিউইয়র্ক শহরে নিজের একটি ভাস্কর্যের সাথে
ফার্নান্দো বোতেরো।

কারণ, বাংলাদেশে পলিমাটির দেশে বসবাস করে লাতিন আমেরিকার নির্যাস পুরোপুরি আয়ত্ত্ব করা সম্ভব হয়নি। বতেরো’কে বুঝতে হলে লাতিনদের সংস্কৃতি কিছুটা হলেও ধারণ করতে হয়।

কথাটা দিয়াগো রিভেরা’র ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। মিশিগানে ডেট্রয়েট আর্ট মিউজিয়ামে মোক্সিকান শিল্পী দিয়াগো রিভেরার বিশাল ম্যুরালের সামনে না দাঁড়ালে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারতাম না।

একই অনুভূতি হয়েছিল যখন মিনিয়াপলিস ডাউনটাউনে রাস্তার ধারে বতেরো’র নয় ফুট উঁচু ‘ড্যান্সারস’ ভাস্কর্যটা দেখেছিলাম।

The dancers (১৯৮৭)

মনে মনে বলেছিলাম, আসলেই লাতিন ছেলেগুলো এমন মোটাতাজা, আর মেয়েগুলো এমন বাড়ন্ত সুন্দর! 

২০০৩ সালে স্থাপিত ভাস্কর্যটির বাজার মূল্য এখন আনুমানিক ১.৭ মিলিয়ন ডলার।

মার্কিন দেশে আসার পর প্রচুর হিস্পানিক-লাতিন লোকজনের সাথে দেখা হয়েছে। কথা বলেছি, তাদের ভাষা বোঝার খানিকটা চেষ্টা করেছি। দেখেছি বিভিন্ন বয়সের মেক্সিকান-বলিভিয়ান-গুয়েতেমালা-হণ্ডুরাস-পেরু-ব্রাজিল-কলম্বিয়ার নারী-পুরুষ।

গত দুই বছর এদের কাছ থেকে না দেখলে বতেরো কিংবা রিভেরা কিংবা আরো পরিচিত ফ্রিদা’দের মনমানসিকতা আন্দাজ করতে পারতাম না। 

লাতিন মানুষজন কথা বলে সরাসরি। ডন হুলিও কিংবা ক্যাসামিগো টাকিলা আর মদেলো বিয়ারের মতোই তারা একাধারে কড়া এবং মজাদার তেতো। 

শারিরীক গঠনেও তাদের বৈচিত্র চোখে পড়ার মতো।

ইউরোপিয়ানদের জিরো ফিগারের চেয়েও লাতিন নারীদের যাবতীয় সৌন্দর্যের একক হিসেবে ধরা হয় তার বলিষ্ঠতা। পেলব শরীরে থাকতে হবে মাংসল ভারসাম্য। উচ্চতা যাই হোক, উন্নত বক্ষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিতম্ব তাদের পছন্দ। বঙ্গদেশের সাথে সমিল আছে। 

Dancers at the Bar (২০০১)

কিন্তু দেখনদারীতে রয়েছে আমাদের সাথে মহা পার্থক্য। আমরা যা গোপন করতে পছন্দ করি সামাজিক এবং ধর্মীয় ট্যাবুতে, লাতিন নারীদের সেই বাধা নেই। 

তাই বাধাহীন তাদের চলাচল।

লাতিন নারীদের সৌন্দর্যের প্যারামিটার সম্ভবত বতেরো’র চেয়ে কোন শিল্পী এমন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারেননি। 

বতেরো মনে করতেন, ভিঞ্চির মোনালিসা কিংবা ওল্ড মাস্টারদের আঁকা পুতুল পুতুল চেহারার নারীরা অপার্থিব। বাস্তবের সাথে যাদের কোনো মিলই নেই। 

বিশেষ করে লাতিন নারীদের দেহরূপ-সৌন্দর্য প্লেবয় ম্যাগাজিনের মডেলদের সাথে তুলনা করাটা আরো অন্যায়।

প্যারিস-ফ্লোরেন্স-নিউ ইয়র্ক ঘুরে শিল্প পাঠ এবং শিল্প ভ্রমণ শেষে ১৯৫৬ সাল থেকে নিজস্ব ঘরানার সূচনা করেছিলেন বতেরো। 

এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

Bather on the beach (২০০১)

বতেরো’র ছবি এবং ভাস্কর্যে লাতিন আমেরিকার নিজস্ব সৌন্দর্য প্রাণ পায় এবং সেটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে বিশ্ব জুড়ে। 

মাঝে একটু বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন। ইরাকে মার্কিন আধিপত্য মানতে পারেন নি। বিশেষ করে আবু গারিব জেলখানায় ইরাকী কয়েদীদের উপর অমানবিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছিলেন রং-তুলিতে। 

২০০৭ সালে সাতাশিটি ছবি আঁকেন মার্কিনী সৈন্যদের দ্বারা জেল-নির্যাতনের। কিন্তু যা হবার তাই হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন শুরুতে অনুমতি দেয়নি পেইন্টিংগুলো আমেরিকার মাটিতে প্রদর্শনীর। 

লাতিন শিল্পী কড়া সমালোচনা করলেন। 

বললেন, যারা মানবাধিকারের কথা বলে, মুক্তচিন্তার কথা বলে তারাই কিনা আমার কাজকে আটকে দিচ্ছে? সেই সাথে এটাও বলেছিলেন– কোনো বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে ছবিগুলো যে আঁকেননি এবং আরো বলেছিলেন যে, সব ছবিগুলো কোনো আগ্রহী মিউজিয়ামকে দান করে দেবেন। 

সমালোচনায় কাজ হয়েছিল। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে কর্তৃপক্ষ বতেরো’র আবু গারিব সিরিজের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রের মান বাঁচিয়েছিল। 

পাশাপাশি নিজ দেশ কলম্বিয়াতেও আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন বতেরো। কলম্বিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন, দুর্নীতি, ড্রাগ মাফিয়াতন্ত্র নিয়েও ছবি এঁকেছেন, ভাস্কর্য গড়েছেন। অবশ্য সেই সব ছবি তিনি নিজ শহর মেডেলিনের মিউজিয়ামে দান করে গেছেন। 

জীবনভর সাফল্যের পরও ১৯৯৫ সালে মেডেলিনে বতেরো’র গড়া ১.৮ টন ওজনের ‘দ্যা বার্ড’ ভাস্কর্যটি সন্ত্রাসীরা বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। এতে বাইশ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং দুইশো জন আহত হয়।

একজন আপাদমস্তক লাতিন শিল্পীর কাজে রক্ত ঝরবে না, ক্ষরণ হবে না, তা কি হয়?

লেখক:
Mirajul Islam
মিরাজুল ইসলাম
লেখক, শিল্পী, গবেষক;
সেন্ট পল, মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট