ফিরে দেখা: ১ আগষ্ট, ২০১৮ – নিরাপদ সড়কের দাবীতে অচল ঢাকা

Comments

বুধবার, ১ আগষ্ট, ২০১৮

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চতুর্থ দিনে অচল হয়ে পড়ে পুরো রাজধানী। বিভিন্ন সড়কে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাহত হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা।
বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে চলমান এই আন্দোলনে বুধবার রাজধানীতে চলাচলকারী বেশিরভাগ পরিবহনের বাস নামেনি। ফলে অফিসগামী ও অফিস ফেরত লোকজনকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়।
এরপরও দুর্ভোগের শিকার নগরবাসী বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীরা তাদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। পরিবহন সেক্টরের এই নৈরাজ্যের সমাধান হওয়া জরুরি’।
৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বুধবার বিকালে ঘাতক বাসের মালিক শাহাদত হোসেনকে র‍্যাব গ্রেফতার করে।
বুধবার শনির আখড়া, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, শাহবাগ, রামপুরা, খিলক্ষেত, মতিঝিল, ভাটারা, মিরপুর-১০ নম্বর গোল চক্কর, ফার্মগেট, বিমানবন্দর গোল চক্কর, হাউজ বিল্ডিং মোড়, ধানমন্ডি-২৭ নম্বর, নিউমার্কেট ও মোহাম্মদপুর এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়কগুলোতে অবস্থান নিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল করে। এসময় দুই একটি স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে বাস ভাংচুর করা হয়।
তবে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বাস আটকের পর বহিরাগতরা আকষ্মিকভাবে বাস ভাংচুর করে। কাওরানবাজারে এরকম বাস ভাংচুর করার অভিযোগ এক বহিরাগতকে শিক্ষার্থীরা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। ভাংচুর শেষে বিকালের দিকে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় পড়ে থাকা কাঁচ ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করে দেয়। দিনব্যাপী চলতে থাকা
এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বাসচালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করে। চালকরা তাদের লাইসেন্স দেখাতে না পারলে, শিক্ষার্থীরা গাড়ির চাবি কেড়ে নিয়ে সেখানেই বাসটি আটকে রাখে। বিভিন্ন স্থানে লাইসেন্সবিহীন চালক পুলিশের গাড়ি চালানোর বিষয়টি ধরা পড়ে। অনেক সার্জেন্টের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় শিক্ষার্থীরা মোটরবাইক আটকে  ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে কথা শুনিয়ে দেন। এর বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ছাত্ররা পুলিশ সদস্যদের ফুল উপহার দেয়।
Road Safety Movement_Licence Check
শনির আখড়ায় একটি ছোট ট্রাকের (পিকআপ) ড্রাইভিং লাইসেন্স তল্লাশি করতে গেলে চালক এক শিক্ষার্থীর ওপর চালিয়ে দেয়। আহমেদ ফারহান ওরফে ফয়সাল নামে ওই শিক্ষার্থীকে আহত অবস্থায় স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন বুধবার রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে।
এই আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন একটি বিষয় দেখতে পাওয়া যায়। আন্দোলন চলাকালে বিভিন্নস্থানে বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। গাড়ির জানালা ও দরজার কাঁচ এবং উইল্ডশিল্ড ভাংচুর করা হয়। এতে রাস্তার বিভিন্নস্থানে কাঁচ জমে যায়। সড়ক চলাচলে এই কাঁচ পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। এমন ভাবনা থেকে শিক্ষার্থীরা বিকালের দিকে ভাংচুর করা কাঁচ ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করে ফুটপাত সংলগ্ন নীচু স্থানে রেখে দেয়। এমন দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানীর বেইলী রোড, মালিবাগ ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে।
এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বুধবার সেতু ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপদ সড়কসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনকারীরা যে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে তা যৌক্তিক। তাদের আবেগের পেছনে বাস্তব কারণ আছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার নিজেই উদ্যোগ নিয়েছেন। সড়ক পরিবহন আইন পাস হলে লাগাম টেনে ধরার জন্য আরও কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে’।
বুধবার চতুর্থ দিনের মতো শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের ফলে সৃষ্ট অচল অবস্থা নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়,পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বেলা ১টার পর সচিবালয় জরুরি বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠক শেষে  এক সংবাদ সম্মেলনে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল  ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেন , ‘আমরা অনুরোধ করব, তোমাদের দাবি সবই মানা হয়েছে। যারা অন্যায় করেছে, যারা ঘাতক, আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি যাতে তারা পায়, সেই ব্যবস্থা আমরা করছি। অভিভাবক, শিক্ষক যারা আছেন, তাদের বলছি, আপনারা আপনাদের ছেলে মেয়েদের, ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধ করুন, তারা যেন ক্লাসরুমে ফিরে যায়। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রিয় ছাত্রছাত্রী ভাইয়েরা অবরোধ তুলে নেবেন, এই অনুরোধ আমরা জানাচ্ছি’।
শাহবাগ
সকাল পৌনে ১০ টার দিকে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, সিটি কলেজ, সিদ্বেশ্বরী কলেজ, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজসহ প্রায় ত্রিশটি স্কুল ও কলেজের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে সড়ক অবরোধ করে। সেখানে শিক্ষার্থীরা নৌমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করে। ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়নি।
দুপুর ১ টার দিকে শাহবাগ ও বাংলামটর এলাকায় পুলিশের অনুরোধে শিক্ষার্থীরা মূল সড়কের একপাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যায়। তখন গাড়িগুলো কিছুটা ধীরে ধীরে চলতে থাকে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সড়কের প্রত্যেকটি গাড়ির লাইসেন্স দেখতে চান। এতে গাড়ির চালকের সঙ্গে তাদের তর্কাতর্কি হয়। যেসব গাড়ির চালক তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে পারেননি, সেসব গাড়ির চাবি তারা কেড়ে নেয়। ওইসব গাড়িগুলো সড়কের একপাশে রেখে দেয় চালকেরা। লাইন ধরে প্রত্যেক চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখার কারণে প্রচন্ড যানজট দেখা দেয়।
সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়
সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও বিসিআইসি স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই এলাকায় সড়ক অবরোধ করে। এসময় যানজটে আটকে থাকা একটি অ্যাম্বুলেন্সকে নিরাপত্তা দিয়ে শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে যেতে সাহায্য করে। এসময় একটি বাস ভাংচুর করা হয়।
উত্তরা হাউজ বিল্ডিং
সকাল সাড়ে ৯টা থেকে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এবং জসীমউদ্দীন মোড়ে অবস্থান নেয় উত্তরা ইউনিভার্সিটি, মাইলস্টোন কলেজ, স্কলাস্টিকা, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিমানবন্দর সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা সব ধরনের গাড়ির চালকের লাইসেন্স তল্লাশি করে। ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাউজক মডেল কলেজসহ বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দর গোল চক্কর থেকে খিলক্ষেত এলাকা পর্যন্ত রাস্তার বিভিন্ন স্থানে অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় কাওলা ওভার ব্রিজের সামনে একটি বাস ভাঙচুর করা হয়।
ফার্মগেট
সকাল ১০টার পর পরই ফার্মগেট মোড়ে ২ পাশের সড়কেই অবস্থান নেয় সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, তেজগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, আইডিয়াল কমার্স কলেজ ও তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা ফার্মগেট থেকে কাওরানবাজারমুখী সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। কাওরানবাজারে শিক্ষার্থীরা যানজটে আটকে থাকা বাসে তল্লাশি চালায়। এসময় শিক্ষার্থীরা একেকটি বাসে উঠে চালককে বলে, ‘লাইসেন্স থাকলে দেখান।’ চালক লাইসেন্স না থাকার কথা জানালে শিক্ষার্থীরা চিৎকার করতে থাকেন। এসময় বাসের সকল যাত্রীকে শিক্ষার্থীরা নামিয়ে দেয়। এরই মধ্যে এক যুবক বাসে ঢিল মেরে সামনের কাঁচ ভেঙ্গে ফেলে। শিক্ষার্থীরা ওই যুবককে আটক করে বলতে থাকে, ‘তুই গাড়ি ভাঙলি ক্যান। আমরা কি গাড়ি ভাঙার আন্দোলন করছি?’ পরে ওই যুবক নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী দাবি করেন। শিক্ষার্থীরা ওই যুবককে পুলিশে সোপর্দ করে।
মিরপুর
দুপুরের দিকে মিরপুর ১০ নম্বরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। এসময় তারা পাঁচ থেকে সাতটি বাস ভাঙচুর করে। বেলা ৩টার দিকে মিরপুর-১৪ নম্বর থেকে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান ১০ নম্বরের দিকে আসলে আন্দোলকারীরা ইট-পাথর ছুড়তে থাকে। এসময় পিকআপ ভ্যান রেখে পুলিশ সদস্যরা চলে গেলে শিক্ষার্থীরা ভ্যানটি ভাঙচুর করে উল্টে দেয়।
রামপুরা ও মতিঝিল
বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে বনশ্রী থেকে ইমপেরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা রামপুরা ব্রিজের দিকে রওনা দেয়। পৌনে ১২ টার দিকে বনশ্রীর আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী রামপুরা ব্রিজ অবরোধ করে রাখে। সেখানে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুরে দিকে খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল ও কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সলিমুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়।
চট্টগ্রাম
নিরাপদ সড়ক ও রাজধানীতে বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিচারের দাবিতে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ হয়। বুধবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকশ শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করইয়ন। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকায় জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল ও শ্লোগান দিয়ে জামালখান এলাকায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হন।
বরিশাল
রাজধানীতে বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় বরিশালে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। বুধবার বেলা সাড়ে ১২টা থেকে ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের নগরীর চৌমাথা এলাকায় অবরোধ করে তারা। অবরোধের ফলে  সড়কের দুই পাশে শতশত যানবাহন আটকা পড়ে।
খুলনা
ঢাকায় আন্দোলনরত ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে খুলনায় মানববন্ধন করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে নগরীর শিববাড়ি মোড়ে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
সাভার
সড়ক-মহাসড়কে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, নিরাপদ সড়ক ও ঢাকায় বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থী মৃত্যুর বিচারের দাবীতে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শিক্ষার্থীরা এ অবরোধ কর্মসুচি পালন করে। মহাসড়কে শিক্ষার্থীদের অবরোধের ফলে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
টঙ্গী (গাজীপুর)
বুধবার টঙ্গীতে বিভিন্ন স্কুল কলেজ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ)
ঢাকার দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপায় হত্যার ঘটনায় বুধবার শাহজাদপুরের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ’র শিক্ষার্থীরা অস্থায়ী ক্যাম্পাসের সামনে মানববন্ধনের চেষ্টা করলে পুলিশের বাধার মুখে তা পন্ড হয়ে যায়।
বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.