বখতিয়ারের বানরগুলি

Comments

। নাসরীন জাহান ।

আজও ছায়ার মধ্য খিড়কির পাল্লা ধরে লটকে আছে সে।

যেভাবে তারও ওপরের কাঁটাতারে ঝুলে আছে বিষণ্ণ কাক আর সন্ধ্যা পেরোনো বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে প্রহরের ঘ্রাণ। 

বখতিয়ার, তুই নাকি খুন করে এসেছিস?

কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে। এমন শব্দ এর আগেও তাকে যখন দিশেহারা করে দিচ্ছিল সে পালাতে পালাতে এখানের এই নির্জনে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

দুবাই থাকা তার শৈশব বন্ধু তাকে বিশাল জমির কিনারের এই বাড়িটায় একেবারে গোপনে বাস করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

দূরবর্তী সামনের মুদি দোকানের এক পিচ্চি এসে তার খোঁজখবর নেয়। বাজার করে দিয়ে যায়। আশ্চর্য! 

মফস্বলের শহরতলীর এই বাড়িটার দক্ষিণটায় জলাভূমি, এবং বসন্ত পেরিয়ে যেতে থাকলেও ঝাঁকঝাঁক কুয়াশায় কিচ্ছু দেখা যায় না।

নিচে জলের বাহার।

তার ওপরে অহর্নিশ লটকে থাকে সে, যেন বাদুড়। 

তার অশরীরী চোখ সব ফেলে শহরের এক জানালাকে নিজের সাথে এখানে নিয়ে এসেছে। যখন রক্তপাতের শব্দে বখতিয়ার উন্মাদপ্রায় বোধ করে তখনই সেই খিড়কির মধ্যে গিয়ে বসে। 

ছোটবেলায় বানরনাচ দেখত খুব। বানরের গতিবিধি সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্ করতে করতে সে নিজের মধ্যে অনুভবগুলোয় বানরের উপস্থিতি অনুভব করে। 

এ একেবারে বখতিয়ারের নিজস্ব অনুভব। 

সে স্পষ্ট দেখতে পায় দুধ-আলতা মিশেলের এক নারীর সারাঘরে সঞ্চালন। কেবল তখনই সে অন্ধকার নরক থেকে বেরিয়ে সুস্থ বোধ করে। এমনকী সুখীও।

নিজের গ্যাটাপ পুরো পালটে ফেলেছে; পুলিশ, সাংবাদিক এবং টিকটকারদের ভয়ে। ঘরভর্তি কাগজ। সারাদিনের রান্না সে একবেলায় সেরে বাকি সময় উপন্যাস কিংবা হাবিজাবি লেখার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। 

সেদিন দুপুরবেলা দুটো ঘটনা ঘটেছিল, 

শৈশবের প্রেমিকা বুলবুলি, যার বিয়ের কথা হচ্ছে বলে সে বিভ্রান্ত বোধ করছিল, তার বাসায় গিয়ে বুলবুলির অবুঝ কান্না থামাতে বলেছিল, আমরা এরমধ্যেই বিয়ে করে ফেলব, পড়াশোনা পরে দেখা যাবে। ঘামের গন্ধে চুবে ডুবে শরীর সম্পর্কে এক হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সহপাঠী অপুর বাসায়। বাবার চাকরির কারণে অপু ইরান ছিলো ছোটবেলা থেকেই। স্বামীর হঠাৎ মৃত্যুর পরে সন্তানকে নিয়ে তার মা এদেশে এসেছে বেশিদিন হয়নি। 

মার কাছ থেকে মোটামুটি ভালো বাংলা শিখেছে অপু। কিন্তু ভার্সিটিতে বখতিয়ারের তুখোড় সাহিত্যবোধ দেখে সে জানায়, তার মা’রও লিটারেচারের প্রতি দারুণ আগ্রহ। বাংলাটা আরও সমৃদ্ধ করার ইচ্ছে তার।

বখতিয়ার ড্রয়িংরুমে বসেছিল।

সারাটা ঘরে এক অপুর্ব শিল্পের কারুকাজ। আর স্নিগ্ধ ঘ্রাণ। অপু কী কাজে যেন ভেতরে গেছিল।

তক্ষুণি একজন ফিনফিনে তরুণী যেন ঘরে ঢুকতেই বখতিয়ার তাৎক্ষণিক সেই ঘ্রাণের উৎস খুঁজে পেয়ে একেবারে বিহবল হয়ে পড়ে।

অপু বলেছিল মায়ের বয়স যখন পনেরো পেরোচ্ছে তখন নাকি তার জন্ম। তাই বলে একজন তরুণ ছেলের মায়ের সদ্য-যৌবন অবয়ব? 

ছিপছিপে অসহ্য এক সুন্দরী নারী, সহসা দেখাতেই বখতিয়ারকে একেবারে নিজের সাথে বিঁধে ফেলবে, এ তার দূরবর্তী কল্পনার বাইরের ব্যাপার ছিল!

এই বসো বসো, মহিলার কণ্ঠ সাবলীল, অপুর কাছে তোমার অনেক কথা শুনেছি। চায়ের সাথে কাপের টুংটাং শব্দ চলতে থাকে। 

এরপর বলেন, আমি মেহজাবিন আখতার নামে টুকটাক লেখালেখি করি।

বলেই প্রচণ্ড লজ্জা নিয়ে হাসেন, একেবারেই খসড়া, কিন্তু বই পড়তে আমি খুব পছন্দ করি। 

বখতিয়ারের নখ থেকে চুল অব্দি কী সব মৃদুতরঙ্গের ছোটাছুটি শুরু হয়।

আপনার বাবা-মা কী ইরানি? কম্পিত ঠোঁটে প্রশ্ন করে সে।

হাসির ঝংকার চারপাশে আছড়ে পড়ে, মা ইরানি বাবা পুরাই বাঙালি, কেন আমাকে দেখতে ইরানিদের মতো লাগে?

বখতিয়ার কার্পেটে পায়ের বুড়ো নখ ঘষটায়। 

চা হাতে তুলে দিয়ে তিনি সোফায় বসে বলেন, তোমার নিজের পছন্দের একটা কবিতা শোনাও, অপুর কাছে তোমার কবিতার খুব প্রশংসা শুনেছি।

উপন্যাস শোনাই? অসতর্ক মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। এবং এমন একটা কথা বলেই বখতিয়ার মহাবিব্রত বোধ করে।

মহিলা গম্ভীর হয়ে বলেন, তুমি আমার সাথে ফাজলামো করছ?

আরে না না, বলতে বলতে টের পায় বহুদিন পরে বানরগুলি উস্কাচ্ছে, ফলে এখানে আর এক মিনিট থাকলে সে কী বলবে, কী করবে নিজেও ঠিক জানতে পারবে না।

ফলে হটকারিভাবে কাউকে কিচ্ছু না বলে আরে! আরে! শব্দের মধ্যে দিয়ে সে ছুটতে ছুটতে বাইরে বেরিয়ে আসে। 

সেই থেকে বখতিয়ার নিজেকে অদ্ভুত এক আঁধারের সাথে নিজেকে বেঁধে ফেলতে শুরু করে।

যখনই কোন মেয়ে তার কাছাকাছি হয়েছে, তক্ষুণি সে টের পেয়েছে তার ভেতর বানরদের মহোৎসব শুরু হয়েছে। এই বানরদের উস্কানির কারণে তার জীবনে একাধিক মেয়ে এসেছে। তাদের সাথে শরীরের সম্পর্ক হয়েছে। বুলবুলি এর কিচ্ছু টের পায়নি। কিন্তু বুলবুলিকে সে বিয়ে করবে, এই ব্যাপারটা অবশ্য নিজের ভেতর চূড়ান্ত ছিল।

বুলবুলির সাথে তার আত্মার শেকড় বাঁধা ছিল।

কিন্তু কাউকে দেখেই কারও ভেতর আগুন ধরে যাওয়ার ব্যাপারটি তার কাছে সবসময়ই মান্ধাতা আমলের ব্যাপার স্যাপার মনে হত। 

এইবার এমন হল যে?

বখতিয়ার নিজেকে চিনতে পারছে না। ভেতর বাহির নিজের কাছেই অচেনা হয়ে ওঠা বখতিয়ার কীভাবে কী করবে, প্রচণ্ড অসহায় বোধ করতে থাকে। 

আর শিখিয়েছে লিটারেচার! আর কোনদিন ওই নারীর মুখোমুখি হতে পারবে না, এটা সে নিশ্চিত করে বুঝে যায়।

এরপর প্রথমেই তার ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ হয়।

কারণ সে টানা ক’দিন সেই বাড়ির আশেপাশে চক্কর খেয়ে একসময় পেছনের একটা দেয়াল আবিষ্কার করে। যার সামনে অসংখ্য গাছপালা। রাজধানীতে এত গাছপালা সহসা তার চোখে পড়েনি।

ফলে সে ক্রমশ সেখানেই লটকে যায়। 

কখনো ছায়া বিকেল কখনো মায়াসন্ধ্যা পেরিয়ে চতুরচক্ষু মেলে থাকে পর্দা টানা একফালি ফোকর দিয়ে। 

প্রায় নিঃশ্বাস আটকে দেখতে থাকে মেহজাবিনের হঠাৎ হঠাৎ ঘরে ঢুকে নানারকম গতিবিধি। বেশিরভাগ সময় ঘরের কোণ, যা এখান থেকে দেখা যায় না, সেখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কী যেন করে। 

একদিন মেহজাবিন গোসল থেকে পেটিকোট পরে বেরিয়ে অপুর্ব স্তন থেকে চুল টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে কাপড় চেঞ্জ করে। 

পুরো ঘটনার বিহবলতায় বখতিয়ারের পুরো অস্তিত্বের রীতিমতো তুফান জ্বর ওঠে, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে যায়, কোনরকমে দেয়াল খামচে বহুকষ্টে সে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করে। এরপর মেহজাবিন মোবাইল চাপতে চাপতে ভেতর যেতে যেতে কাকে যেন বলে, আমার বাথরুমের শাওয়ার ঠিক করাতে হবে। 

তার মানে এটা বেডরুম নয়।

বেডরুম কোনদিকে? 

সন্ধ্যার পরে প্রায়ই মেহজাবিন এই ঘরে আসে। চেয়ারে হেলান দিয়ে গান শোনে। রিল দেখে একা একা হাসে। যখনই সে জানালার কাছে মুখ বাড়ায় মুহূর্তে বখতিয়ার নিজেকে অন্যদিকে টেনে নেয়। 

সারাদিন বাড়িতে পড়ে থেকে যেন ক্ষুধার্ত মশা রক্তের জন্য অপেক্ষা করছে। এ একটা উদাহরণ, আসলে বখতিয়ার রক্ত সহ্য করতে পারে না। রক্তে সে একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়।

এইভাবে সে প্রতিদিন সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করে।  

কখনো মেহজাবিনের।

একেবারে উদোম দেহ দেখার জন্য তার সমস্ত স্নায়ুতে আগুনতৃষ্ণা জন্ম নেয়। এবং কোন একজন পুরুষের জন্য মেহজাবিন বিছানায় ছটফট করছে, কোন একদিন এমন কিছু দৃশ্যের অপেক্ষায় প্রতিদিন সে রোদ পড়লেই দেয়ালের মধ্যে উন্মাদের মতো লটকে পড়ে।

বুলবুলির ফোন অবিশ্রান্ত বেজে যায়। সে তাকে টেক্সট পাঠায়, বাড়িতে তোমাকে বিয়ের ব্যাপার জানাজানি হয়ে গেছে। তারা কিছুতেই ছাত্র অবস্থায় আমাকে বিয়ে করতে দেবে না।

ভার্সিটির পাট চুকিয়ে দেবো, তুমি একটু শান্ত থাকো ক’দিন; আমি ঠিক একটা ব্যবস্থা করব।

এমনিতেই ডাকুবুকো বলে পরিচিত বুলবুলি। কিন্তু বখতিয়ারের ব্যাপারে সে এত দুর্বল, কাছে গেলেই নেতিয়ে পড়ে নিজেকে ছাড়খার হতে দেয়।

অপুর ফোনও সে ধরে না। কেবল নিজে নিজে বিড়বিড় করে–এই আমি আগের বখতিয়ার নই, তার সাথে আমার কোন পরিচয়ই নেই, এই আমি অন্য কেউ। 

এটা বেডরুম না হলে এটা মেহজাবিনের কোন রুম? পর্দা আজ একটু বেশি খোলা থাকায় শূন্য ঘরে গলা বাড়ায় সে। ওহ! ওপাশে চেয়ার টেবিল আছে। তার ওপরের সেলফে তাক তাক করে সাজানো বই।

ওহ! স্টাডিরুম! এত ভালো কবিতা লেখে বখতিয়ার, তারপরও ভাইবোনের সাথে ঠাসাঠাসি করে যেন শূন্যে লটকে তার লেখালেখি করতে হয়। বানরগুলো উশখুশ করে, মেহজাবিনের সাথে সাথে তার ঈর্ষাতুর জীবনটাও বখতিয়ারের চাই। বখতিয়ার যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়।

একদিন দেয়ালের ওপর ওঠার সাথে সাথে ঝাঁঝালো আলো চোখ ঠিকরে দেয়।

সে একেবারে কুকুরের মতো নিজের মাথা পারলে দু পায়ের ফাঁকে ঢুকিয়ে ফেলে। অতঃপর শব্দহীন। 

ধীরে ধীরে গলা বাড়িয়ে সে স্তব্ধ হয়ে যায়, গুনগুন শেষ করে বিছানায় হেলান দিয়ে মেহজাবিন মুখের সামনে মেলে ধরেছে বখতিয়ারের স্যাটায়ারধর্মী কবিতার বই।

বখতিয়ারের বানরগুলি।

কিছুক্ষণ পরে থরথর কম্পিত অবয়ব নিয়ে  উল্টোমুখি হামাগুড়ি দিতে দিতে সে শোনে, মেহজাবিন শব্দ করে বখতিয়ার কবিতা পাঠ করছে!

আর দেরি করে না, সে বুঝে যায়, এ নারীকে জীবনের জন্য পাওয়া আর কঠিন কোন বিষয় নয়। সে একেবারে দ্বিধাহীন চিত্তে সোজা বুলবুলির বাসায় চলে যায়। বেশ কদিন ধরে বুলবুলির বাবা মা বাড়িতে। ডিভোর্সী বড়োবোন তাকে দেখে হামলে পড়ে, দেখো, দিনরাত না খায়াদায়া আমার বোনের কী অবস্থা হইছে। তুমি এদ্দিন কই আছিলা?

এরমধ্যেই নিজের জীবন থেকে বুলবুলিকে তাড়ানোর সব প্ল্যান করা হয়ে গেছে। 

আলো কমে যাওয়া বাল্বের জন্ডিস আলোয় ডাকুবুকো সাহসী বুলবুলিকে চেনা যাচ্ছে না, কী রুক্ষ আর মলিন হয়ে গেছে! 

ধীরে ধীরে তার মাথাটা বুকে নিয়ে একেবারে দ্বিধাহীনভাবে সে মেহজাবিনের সাথে তার প্রেম কাহিনি রসালোভাবে বয়ান করে। 

কেনাকাটা করতে বড়োবোন বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু এতসব কথা শুনেও বুলবুলির প্রতিক্রিয়া নেই যে? ঈর্ষা, যন্ত্রণা প্রকাশের বদলে বুলবুলি নিষ্প্রভ! 

বখতিয়ারের উলটো ক্রোধ বেড়ে যায়। সে বুলবুলির মধ্যে তার প্রতি ঘৃণার দাউদাউ জ্বালাতে আগের সব শারিরীক সম্পর্কের কথা জান্তব বর্ণনায় বয়ান করে যেতে থাকে। পরমুহূর্তেই তার মনে হয়, আগের বখতিয়ার এসব কথা বুলবুলিকে এত বিকারহীনভাবে বলার কথা কল্পনাও করতে পারত? 

একসময় বুলবুলির মধ্যে প্রচণ্ড বেগে বমি ঠেলে ওঠে। সে একহাতে মুখ চেপে একেবারে অন্যহাতে ঠেলে বখতিয়ারকে ঘর থেকে বের করে দিতে গিয়ে পিঠের মধ্যে একটা লাত্থি মারে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, কুত্তার বাচ্চা দেখ আমি তোর কী করি?

হুমড়ি খেয়ে বাইরে পড়তেই বানরগুলো যেন চারপাশে তাকিয়ে তাকে সোজা করে আঁচড়ে দেয়।

সে যখন ফিনফিনে বাতাসে উড়তে উড়তে অনেকদূর চলে এসেছে, তাদের দুজনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিজান যে নিজেও বুলবুলির প্রতি খুব দুর্বল, সে বখতিয়ারকে ফোন দেয়, তুই নাকি বুলবুলিকে ছুরি দিয়া খুন করতে চাইছস?

কী? বখতিয়ার মাথায় গিঠঠু লেগে যায় যেন!

তোর মাথা খারাপ হইছে? ছুরি দিয়া? আমি? 

তুই এক্ষণ বুলবুলির কাছে যা, আমার কিছু ঠিক লাগতেছে না।

বখতিয়ার স্থবির পা কিছুক্ষণ রাস্তায় ঠেসে থাকে। এরপর যখন মাথার কোষ সব আলগা হয়ে যাচ্ছে, সে ছুটে বুলবুলির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

এরপর ভেতরের দৃশ্যের সাথে ক্রমাগত নিজেকে গেঁথে ফেলে। 

এই এলাকায় পালিয়ে আসার পরে এই প্রথম যেন বখতিয়ার নিজের সামনে নিজেকে দাঁড় করাতে পারে।

এদ্দিন সে স্বপ্ন আর বাস্তবতার বিভ্রমের মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখছিল।  

ক্রমশ ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে যেন এই প্রথম তার হুঁশ হয়।

নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে ছটফট করতে থাকা বুলবুলি তার হাতের মধ্যেই নিথর হয়ে গিয়েছিল। ওহ! রক্ত! সিনেমার দৃশ্যের মতো ঘরে ঢুকে বড়ো বোনের চিৎকারের রেশ যতদূর যায়, ততদূর বুলবুলির বুক থেকে অসতর্ক হাতে ছুরি তুলে সে ছুটতে ছুটতে ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়া আলো অন্ধকারময় এলাকা পেরিয়ে লেকের সামনে এসে হাঁপ ছাড়ে। এই পাশটা নির্জন। প্রথমেই নিজেকে জলে ডুবিয়ে সে সারা শরীরের ভয়াবহ রক্ত থেকে মুক্তি পেতে চায়। জলের ভেতর পা বাড়াতেই যেন তার চেতনা ফেরে, সমস্ত দেহে যেন ইলেক্ট্রিকের শক দিচ্ছে কেউ, এমন অবস্থাতেই দুবাইয়ে থাকা শৈশব বন্ধুকে ফোন দেয়। 

তক্ষুণি ফের বখতিয়ারেত বানরগুলি তাকে উস্কাতে থাকে। সে আর সরল থাকে না। পারফেক্ট খুনির মতো প্রমাণ লোপাট করতে সে চাকু আর মোবাইল জলে ভাসিয়ে দেয়।

বখতিয়ার কোনোদিন একটা তেলাপোকাও মারেনি। সে মুরগী জবাই সহ্য করতে পারে না। রক্তের ভয়ে।

তাকে এইভাবে ফাঁসিয়ে দিল বুলবুলি? মিজানকে ফোন দিয়ে কী বলল, আর সে নিজে কী করল?

এইভাবে শোধ নিল?

নিজের প্রাণ নিয়ে,

প্রেমিককে লটকে দিয়ে? 

মাথার মধ্যে এইসব হাবিজাবি নিয়ে এরপর সে ভিখিরির মতো একটা মালগাড়িতে গিয়ে উঠেছিল। 

একটা ভাঙাচূরা পুরোনো মোবাইলে নিজের সর্বনাশ যত দেখে, যত শোনে মিজানের চিৎকার, আমি সাক্ষী, আমার কাছে প্রমাণ আছে, ততোই তার চোখের চশমা অন্ধ হয়ে যেতে থাকে যেন।

বখতিয়ার ক্রমশ শিশিরে কেঁপে উঠতে থাকে, ক্রমশ এগিয়ে আসে রক্তস্রোত ভীত, হতবিহ্বল বখতিয়ারের কণ্ঠ থেকে গোঁ গোঁ শব্দ হতে থাকে। সে চিৎকার করে কাঁদতে চায়। সান্ধ্য কার্নিশ থেকে মেহজাবিনের ছায়া মহাদূরের অনন্তে বিলীন হয়ে যায়।

বুলবুলি পরীর মতো চারপাশে ওড়ে। কখনো শাদা শাড়ি পরে পেত্নীর মতো চক্কর খেতে খেতে গান গায়।

বখতিয়ার এইসব অবস্থা থেকে লুকাতে মেঝেতে হামাগুড়ি দেয়। বানরগুওলি এইবার সামনে লাফাতে থাকে। সে স্যান্ডেল হাতে তাদের পেছনে ছুটতে থাকে।

এই করে করে বখতিয়ার টেরও পায় না, কখন কপাট খুলে গেছে,

কখন পুলিশ তাকে হাতকড়া পরিয়েছে। চারপাশে এত ভিড় কেন? দম আটকে আসতে থাকা বখতিয়ার হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে, কাঁদে, বুলবুলিরে আমি না, তুই অন্তত বিশ্বাস কর, আসলে আমার বান্দরগুলি…

লেখক:
Nasrin Jahan
নাসরীন জাহান, কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট