বঞ্চিত । রিংকু সারথি

Comments

বিচারক বললেন, যে ভাবে মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পোষ্টার পড়ে, সে ভাবে রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করল মেয়েটি।ওকে আমার এতই বোকা আর অজ্ঞ বলে মনে হল যে, রবীন্দ্রনাথ নামে এই পৃথিবীতে একজন ভূবনমোহী কবি আছেন, তা-ই যেন ও জানে না। বিচারকের মন্তব্য শুনে অর্ডিয়েন্সে বসা শত শত দর্শক নিরব গুঞ্জনে আহাজারী গেয়ে উঠল। কারণ যে মেয়েটি কবিতা পাঠ করল, সে আর কেউ না। সে হল, রংপুর শহরের সফল প্রকৌশলী-মেধাবী কবি এবং ধনাঢ্য ব্যাক্তি সিদ্ধার্থ চৌধুরীর মেয়ে বাণী চৌধুরী। এত মেধাবী একজন মানুষের সন্তান, এভাবে মেধাহীনতার প্রমাণ দেবে, এ যেন কারো কল্পনারও অতীত।

হৃদয়গ্রাহী সৌন্দর্য্য আর ব্যক্তিত্ব কিন্তু তার সাথে কবিতা পাঠের আসরের পরজায়ের গ্লানি মাখা মুখটি দেখে, রবিনের বার বার মনে হচ্ছিল, বাণী যেন বাগান থেকে ফুল সমেত তুলে নেয়া একটি বিষন্ন জবা গাছ।

স্নেহ-সহানুভূতি আর ভালোলাগার কারণে, অনেক খোঁজ-খবর করে একদিন বাণীর সাকিন-ঠিকানা আর পারিবারিক ইতিহাসও কিছুটা উদ্ধার ফেলল রবিন। বাণী থাকে জাহাজ কোম্পানীর মোড়ে -ওর মায়ের সাথে। ওর জন্মের আগেই ওর বাবা মায়ের সেপারেশান হয়ে গেছে। তারপরও বাণী-বাবা হিসাবে সিদ্ধার্থ চৌধুরীর মত একটি বিখ্যাত মানুষের নাম ব্যাবহার করে। তা করতেই পারে। কারণ এমনও হতে পারে, যখন বাণীর বাবা মায়ের সেপারেশান হয়েছিল, তখন হয়ত বাণী ওর মায়ের পেটে ছিল।

একদিন মুন্সিপাড়ায় হঠাৎ করে বাণীর সাথে দেখা হয়ে গেল রবিনের। ওর মিষ্টি মুখ আর নজর কাড়া ব্যাক্তিত্বের কারণে ততদিনেও রবীন ওকে এতটুকুও ভুলতে পারেনি। আরো বেশী করে মনে রেখেছে রবিন ,নিজের স্মৃতির জমিনে সযত্নে রাখা বানীর পরাজয়ের গ্লানিমাখা সুন্দর কিন্তু বিষন্ন মুখখানার কারণে।

রবিন নিজেকে একজন অ্যামেচার রাইটারের পরিচয় দিয়ে, বাণীকে দু’মিনিট সময় দেয়ার অনুরোধ করলে, বাণী খুব সহজেই রাজী হয়ে গেল। ও বাণীকে নিয়ে ধারে কাছের একটা কফি হাউজে বসল। পরস্পর পরিচয় আদান প্রদান করল। যদিও বাণীর প্রায় সব রকমের পরিচয় আগে থেকেই জেনে গিয়েছিল রবিন।

বাণীকে রবিন জিজ্ঞেস করল, তুমি কি আবৃত্তি করতে খুব ভালবাস?
বাণী বলল, বাসি। কিন্তু আবৃত্তি যে ঠিকমত করতে পারি না।
রবিন বলল, আবৃত্তি শেখার মধ্যেই তোমার খোঁট রয়ে গেছে। আমার এক পরিচিত বন্ধু আছে, শান্তিনিকেতন হতে আবৃত্তি শিখেছে। আমি তার কাছে তোমাকে নিয়ে যাব একদিন।
রবিনের এ কথা শুনে, বাণী খুব খুশী হল।

এরপর একদিন রবিন ওর বন্ধু কাজলের কাছে নিয়ে গেল বাণীকে। কাজল হাতে ধরিয়ে ধরিয়ে আবৃত্তির প্রথম পাঠ দিল বাণীকে । কাজলের প্রশিক্ষণের স্টাইলে বাণী খুব খুশী হল। কিন্তু কতটা ধরতে পারল কাজলের ডেমোনস্ট্রেসান, ঠিক বুঝতে পারল না রবিন।

এরপর আর একদিন বাণীর সাথে দেখা হয়ে গেল রবিনের মুন্সিপাড়ায়। সেদিন আর বাইরে দাঁড়িয়ে কথা না বাড়িয়ে, রবিনকে সোজা ঘরে নিয়ে গেল বাণী-ওর মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। বাণী ওর মাকে ডাকল। বাণীর মাকে দেখে বিস্তর অবাক হল রবিন। আগুনের সৌন্দর্য্যরে যেমন কোন তুলনা হয় না- রবিনের মনে হল বাণীর মাও যেন তেমনি অতুলনীয়া। রঙে-রূপে-বিভায়-দর্শনে-অনুভবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী যেন বাণীর মা। ওর উপস্থিতি থেকে এক ধরনের বর্ণচ্ছ্বটা বেরিয়ে এসে আশে পাশের সব কিছুকে কেমন মলিণ-বিবর্ণ ও অসহায় করে দিচ্ছিল। ঘরের পরিবেশ -আসবাব এমন কি বাণীকেও। আর রবিনকে তো অবশ্যই। বাণীর মা পরেছে একটা মিডনাইট ব্লুশিফন শাড়ি। শাড়ির জমিনে ক্ষুদে ক্ষুদে রূপালী বাদলার কাজগুলো তারার মতো ঝিক্-মিক্ করছিল। কানে ছিল ওর সরু লম্বা হীরের দুল। গলায় ম্যাচ করা পেন্ডেন্ট। ঘাড়ের কাছে নতজানু আলতো খোপা। বয়েসের ঘরটাও বাণীর মায়ের মিষ্টিরিয়াস। কাউকে ও আঠাশ বললে যেমন বিশ্বাস করবে, তেমনি চুয়াল্লিশ বললেও অবাক হবে, কিন্তু অবিশ্বাস করতে পারবে না।

ওর দিকে দেখতে দেখতে রবিনের কিছুদিন আগে পড়া একটা গল্পের নায়িকার কথা মনে পড়ছিল। গল্পের লেখক তার নায়িকার বর্ণনা দিয়েছিলেন, এ ভাবে।
’তখনও ভোর , রাতের সাদাটে -বেগুনী ছিলকা দিয়ে মোড়ানো। একটু পরে পূবাকাশে সূর্য উঠবে-সূর্যের হালকা মাজেন্টা আলো পরিবেশের খোসা ভেঙে দেবে। সীম ফুলের পাপড়ির মতো এক ধরনের অদ্ভুত সুন্দর রঙের ক্যানভাসের ওপর যেন দাঁড়িয়ে আছে কুহু, জামালের তাই মনে হলো। ওর মাথার অজস্র কালো চুল সেই ক্যানভাসে যেন একটা পশ্চাদপট তৈরী করেছে। গাছ পাকা কামরাঙার মতো হলদেটে ফর্সা-কুহুর মুখের রং। এই রঙই যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রঙ। ও যদি পাকা কামরাঙা না হয়ে, অন্য যে কোন আহামরী রঙের হত, তবে যেন এই পৃথিবীর ভীষণ কোন ক্ষতি হয়ে যেতো। কুহুর রূপের আভায়, দিগন্তের বলয় পর্যন্ত যেন আলাকিত হয়ে গেছে। কুহু একটু নড়াচড়া করলেই সেই আলো যেন টালমাটাল আনন্দে চাপা উল্লাস করে উঠছে। কুহুর নিটোল মুখের সাথে সঙ্গতি রেখে, কেউ যেন অনুপম যত্নে ওর বুক, গলা, হাত, সব গড়ে দিয়েছে। স্বতন্ত্র প্রবৃত্তির নিজস্ব সম্পদে এতটাই পূর্ণ এই মেয়ে যে, বুক থেকে খুবলে হৃদয় বের করে দেয়া যায় ওর সম্মতি কেনার জন্য।’

গল্পের নায়িকার সাথে বাণীর মায়ের তুলনার মাঝেই, রবিনদের সামনে সমুখমুখী হয়ে একটা সোফায় বসল বাণীর মা। বড় মিষ্টি করে গোলাপী রঙের আভায় একটুখানি হেসে বলল, আপনাকে অনেক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যে, আপনি বাণীর কমতিগুলো শুধরে দেবার চেষ্টা করছেন।

রবিন সলাজ হেসে বলল, না না ঠিক আছে। আসলে অত বড় একজন মানুষের সন্তান বাণী-কিন্তু প্রতিযোগিতার মঞ্চে বার বার ও হেরে যাচ্ছে দেখে, আমার খুব খারপা লাগছিল। তাই ওকে সাহায্য করার ইচ্ছে হয়েছিল।
– বিনা স্বার্থে এমন ইচ্ছে ক’জনেরই বা হয় বলুন?
– বিনা স্বার্থে! এখনও তো কোন স্বার্থ চাইনি। হয়তো পরে চাইতেও পারি!
– সেটা যখন চাইবেন, দেখা যাবে।

বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটাল রবিন বাণীদের ঘরে। ও জানল, বাণী প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে, ওদের থাকার ঘরটি ভাড়া ফ্ল্যাট, বাণীদের মাতুলালয়ের দিক থেকে এমনও কেউ নেই যে, ওদের কিছু সহায়তা করতে পারে। সেপারেশান এর পর হতে বাণীর বাবার তরফ থেকে কোন সাহায্য আসে না, অন্যপক্ষ থেকেও কোন সহায়তা নেয়ার মানসিকতা নেই বাণীর মায়ের। রবিন এও জানল, বানীর মায়ের এমন কোন অ্যাকাডেমিক বা টেকনিক্যাল যোগ্যতা বা জ্ঞাতী-কানেকশান ও নেই যে, তার বদৌলতে কোন কাজ কর্ম জোগাড় করতে পারে সে ।

অর্থাৎ বহু অ্যাঙ্গেল থেকে ইনিয়ে বিনিয়ে বহুভাবে প্রশ্ন করেও জানতে পারল না রবিন, বাণীর মা কী ভাবে এত সুন্দর সাজানো-গোছানো একটি সংসারের ব্যয় নির্বাহ করছে।

এক সময় বানীর মা বাহারী রঙ ও ঢঙের নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করল রবিনকে। তারপর জানাল, বাণীর কবিতা লেখারও বাতিক আছে। শুনে রবিন বলল, বাবা শহরের নাম করা কবি, তা মেয়ে তো একটু-আধটু কবি হতেই পারে।
রবিনের এই কথাটি শুনে বাণীর মা এমন ভাবে একটু চমকে উঠল, মনে হল ও যেন সাংঘাতিক একটা কিছু অন্যায় করে ধরা পড়ে গেছে। পর মুহুর্তেই আবার নিজেকে সামলে নিল বাণীর মা। তারপর বলল, ও বাণী-তোর আঙ্কেলকে একটু কবিতা-টবিতা পড়ে শোনা!

মায়ের আহ্বানে বাণী কবিতার ডাইরী নিয়ে এল। এই সময় ঠিকে ঝি এল। বাণীর মা তাকে রাঁধা-কোটা দেখানোর বাহানায় উঠে চলে গেল। বাণী কবিতার ডাইরী নিয়ে এসে বলল, আঙ্কেল আমি কিন্তু কবিতা আবৃত্তির মতন কবিতা লেখায়ও আনাড়ি। ভুল-ত্রুটি হলে ধরিয়ে দেবেন কিন্তু নিন্দামন্দ করবেন না প্লিজ। রবিন ঘাড় নেড়ে আশ্বাস দিলে, বাণী কবিতা পড়ল। প্রথম কবিতার নাম-‘উদ্দেশ্যবিহীন’-

“প্যান্টের পকেটে হাত
কোথাও ফেরার তাড়া নেই,
খরশ্রোতা নদীটির সঙ্গ ছাড়া
এই মুহুর্তে চাইবারও কিছু নেই-

বিকেলকে একটু বসতে বলেছি
শুধুমাত্র সে কারণেই।”

রবিনের খুব ভাল লাগল বাণীর কবিতাটি। আর একটা পড়ার জন্য রিকোয়েষ্ট করল বাণীকে ও।
বাণী আর একটা পড়ল-নাম ‘অপেক্ষা’-

“অপেক্ষা করতে করতে
কেটে যায় সারা জীবন
কিন্তু কার জন্য অপেক্ষা
তা অনেকেই মনে রাখতে পারে না-
আর তাই মনে হয়
শুধু শুধু অপেক্ষা মানেই জীবন।”

বানীর এই কবিতাটাও ভাল লাগল রবিনের।
এরপর বাণীর কাছে অনুমতি চাইল রবিন।
বিরাট একটা প্রশ্নচিহ্ন ভ্রুতে সেঁটে, ঐ দিন বাণীদের ঘর হতে বিদায় নিল রবিন। প্রশ্নটি হল, বাণীর মা এমন কী কাজ-টাজ করে যে, তা দিয়ে ওদের মা-বেটির সংসারাটা চলছে এবং অতি মসৃণ গতিতেই চলছে।

একটা মানুষের সাথে দু’চারটা কথা বললেই বোঝা যায়, তার ভেতরে কতটুকু পদার্থ আছে বা তার সাথে স্বরস্বতী দেবীর কোন ফৌজদারী মামলা চলছে কিনা। বাণীর ময়ের সাথে কথা বলে, রবিনের মনে হয়েছিল, কোন ফৌজদারী মামলার বাদী যদিও সে নয়, কিন্তু সে এমন কোন রবীন্দ্রনাথ/সুকান্তও নয় যে, আন্ডার মেট্রিক কবি হয়েও ডিগ্রী ক্লাশের কবিতা লিখতে পারে। তাহলে মহিলা তাদের মা-মেয়ের ওয়েল মেইনটেইন্ড্ সংসারটা চালাচ্ছে কী করে ? প্রশ্নটা আড়ে-বহরে ছোট হলেও, উত্তরটা কিন্তু এক বিশাল আটলান্টিক। রবিন ভাবল, এই আটলান্টিকের নিচে ওকে পৌঁছুতেই হবে।

রবিন ভেবেছিল, বাণীর সাথে আর কোনদিন দেখা-টেখা নাও হতে পারে। কিন্তু বিধাতার মর্জি বোধহয় ছিল অন্যরকম। হঠাৎ করে আবার একদিন বাণীর সাথে ওর দেখা হয়ে গেল, কারমাইকেল কলেজে- রঙধনু সাহিত্য গোষ্ঠীর একটা কবিতা পাঠের আসরে। সেখানে বাণী আজও কবিতা পাঠ করল এবং যথারীতি কুলিয়েও উঠতে পারল না। বাণীর কবিতা পড়ার শৈলী ভালই ছিল, কিন্তু অন্যদের তুলনায় তা ছিল নিতান্তই আকিঞ্চন। বিশেষ করে দুয়েকজনের বাকভঙ্গী-স্বরগ্রাম-শৈলী, কোন কিছুর সাথেই টেক্কা দিয়ে উঠতে পারল না বাণী। স্বভাবতই এবারও কোন স্বীকৃতির তকমা জুটল না ওর কপালে। অনুষ্ঠান শেষে মুখ ভার করে চলে যাচ্ছিল বাণী। রবিন ওকে ধরল মেইন গেইটের বাইরে, প্রধান রাস্তার ওপর। ওকে দেখে রবিনের মনে সেই পুরোনো প্রশ্নটাই আর একবার উদয় হল-বাণীদের সংসারটা কী ভাবে চালাচ্ছে বানীর মা- যখন সে তেমন কোন কাজ কর্ম কিছুই করে না বা করার মত তেমন কোন যোগ্যতাও তার নেই। শহরের বিত্তশালী-মেধাবী এবং দামী মানুষ সিদ্ধার্থ চৌধুরীর প্রাক্তন স্ত্রী এবং রূপবতী সেই নারী কি তাহলে ….? না না, তা কী করে হয়? ওর প্রিয় মুখ বাণী-তার মা, অমন ম্লেচ্ছকাজ করতেই পারে না। কিন্তু তারপরও রবিনকে জানতে হবে, বাণীদের সংসারটা কী ভাবে চলছে।

রবিন বাণীকে ওর সাথে বসে এক কাপ কফি খাওয়ার অনুরোধ জানল। বাণী বিষন্নমুখে, একটুখানি হালকা পারপেল রঙের হাসি ফুটিয়ে রাজী হল। পাশেই একটা রেস্তোরাঁ ছিল, সেখানে বাণীকে নিয়ে বসল রবিন। আজ ভাল করে লক্ষ্য করল রবিন- বাণী সুন্দর- তবে যেন একটি বিষন্ন প্রতিমা। কফি শেষ করে, বুকে অনেক হিম্মত জুটিয়ে রবিন বলল, তোমাকে আমি ভাবনার মণিকোঠায়, নিজের মেয়ের পাশা-পাশি বসিয়েছি-সেই প্রথম দিন থেকেই।

বাণী বলল, সে তো আমার সৌভাগ্য আঙ্কেল!
– সেটা তো বুঝলাম, তা তুমি আবৃত্তি করতে গিয়ে, বার বার এমন করে হোঁচট খাচ্ছ কেন? তোমাকে তো কাজল ঠিক-ঠাক সব ধরিয়ে দিয়েছিল ।
– হয়তো আমার বুদ্ধির ঘাটতি বা আয়ত্ব ক্ষমতার অভাব।
– অভাব হবে কেন? তুমি এই শহরের সবচে’ মেধাবী কবির সন্তান।

এবার বাণী সহসাই আর কিছু বলে না। এক সময় ধীরে ধীরে ওর ঠোটের চকচকে ভাবটা শুকিয়ে মরা নদী হয়ে গেল। আর তারপর হল শীর্ণ শ্বাসে নীল। নিপাট দৈন্য ছড়িয়ে পড়লো ওর সারা মুখে। এতোদিন ওর ভুরুতে যে আত্মবিশ্বাস আর চিবুকে যে অহংকার ছিলো, তা যেন অপমানের আগুনে পুড়ে, বাদামী হয়ে গেল। ওকে দেখে রবিনের মনে হলো, ওর জীবনে যেন অনেকগুলো দুঃখ ছিলো। ওগুলো যেন একটা থেকে আরেকটা বিচ্ছিন্ন ছিলো না। একটা যেন আরেকটাকে এতদিন শক্তি যুগিয়েছে এবং চক্রবৃদ্ধি হারে তা বাড়তে বাড়তে এখন এই পরাজয়ের দিন পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। অপমান আর দ্বিখন্ডিত চৈতন্যের বিড়ম্বনায় ফালা ফালা হতে থাকলো বাণী। বাণীর বা পাশের দেয়ালে একটা আড়াআড়ি লাগানো ফ্যান চলছিল, আর তার পাশে একটা নিচু পাওয়ারের বাল্ব জ্বলচিল। তার গোপন আলোতে বাণীর মুখের জমিনে ফ্যানটির ছায়া বিশ্রামহীন ভাবে নৃত্য করে যাচ্ছিলো। বাণীর অসহায়ত্ব দেখতে দেথতে নিজের বুকের ভেতর রক্তক্ষরণের প্রাবল্য টের পাচ্ছিল রবিন। এক সময় ধীরে ধীরে বাণী বলল, আমি ঐ মেধাবী এবং বিত্তশালী মানুৃষটির সন্তান কি-না, সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই আঙ্কেল।

প্রচন্ড বিস্ময়ে চমকে উঠে রবিন বলল, এ কী বলছ তুমি বাণী!
– হ্যা আঙ্কেল। আমার বাবা মায়ের সেপারেশান এর পরই আমার জন্ম হয়েছে। তবে আমার মা কোনদিনও এটা পরিষ্কার করেনি যে, আমার জন্মটা কি তার সেপারেশান এর দশ মাস দশ দিন নিয়মে হয়েছিল, না-কি আরো পরে হয়েছিল।
– মাই গুডনেস! তার মানে তুমি সন্দেহ করছ যে, তুমি অন্য কারো ঔরসের সন্তান!
– হতেও পারে আঙ্কেল, তবে সেটা জানার জন্য আমি মাকে কোনদিনও চাপ দিইনি। মা এমনিতেই অনেক কষ্ট করে আমাকে মানুষ করার চেষ্টা করছে এবং অমানুষিক পরিশ্রম করে সংসারটা চালাচ্ছে, তাও আবার যথেষ্ট স্ট্যান্ডার্ড মেনটেন করে, তার মাঝে ও সব প্রশ্ন করে মাকে আমি দুঃখী বানাতে চাইনি।

এবার রবিন নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। ফস্ করে ও বলেই ফেলল, তাহলে এবার বল, কোন উপার্জন থেকে তোমার মা তোমাদের সংসারটা চালাচ্ছে? তার শিক্ষাগত বা অন্যান্য যোগ্যতা কী?
– মায়ের তেমন কোন অ্যাকাডেমিক বা টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। আমার মায়ের যোগ্যতা যে টুকু আছে তা হল তার ভুবনমোহিনী রূপ।
– শুধু সৌন্দর্য্য দিয়ে একটা সংসারের উচ্চ নির্বাহ বজায় রাখা যায়? সৌন্দর্য্যকে টাকায় কনভার্ট হতে হবে না?
– হয়ত হয়, আমি জানি না।

বলে বেশ উষ্মা-নিসৃত কন্ঠে এবার কেঁদে ওঠে বাণী। রবিন হতভম্ভ হয়ে পকেট থেকে টিস্যু বের করে, বাণীর চোখ মুছিয়ে দেবার চেষ্টা করে। তারপর বলে, থাক আর বলতে হবে না। আর কিছু বলে আমাকে লজ্জায় ফেল না -আর নিজেও লজ্জায় পড় না। আচ্ছা, তা হলে এবার বলো, তুমি যদি তোমার বাবার সন্তান নাও হয়ে থাকো, তবুও তো এই পৃথিবীতে স্বাভাবিক ভাবেই বেড়ে উঠেছ। তারপর সুন্দরী এবং এবং আপাত মেধাবী মায়ের সন্তান, ছোটবেলা থেকে সঠিক পরিচর্যাই পেয়েছ। তবে তোমার পরিপূর্ণ বুদ্ধি খুলছে না কেন? জীবন চলার পথের পরীক্ষা গুলোতে, বার বার এমন করে অকৃতকার্য্য হচ্ছো কেন?

এবার বাণী একটু থমকে গিয়ে, অতি ধীরে ধীরে বলল, আংকেল আমি জীবনে কোনদিনও মায়ের বুকে মুখ দেয়ার সুজোগ পাইনি।
– কেন?
– কারণ মা মনে করে, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ালে, নারীদের ফিগার ঠিক থাকে না।
– বুঝেছি, বুঝেছি আর বলতে হবে না! যাক ও নিয়ে আর দু:খ করো না।

রবিন উঠে দাঁড়াল। বাণীও উঠে রবিনকে প্রণাম করল। রবিন পরম মমতায় বাণীর চুল ঘেঁটে দিল।

লেখক:
Photo_Rinku Sarothi
রিংকু সারথি, গল্পকার

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট