বাংলাদেশের প্রথম ফিলাটেলিক পরিচয় । সাগর লোহানী

Comments
একটি দেশের প্রাথমিক পরিচয় তার পতাকায়। আর দেশের প্রাথমিক প্রচার তার ডাক টিকিটে। ১৯৭১ সালে যখন গোটা জাতি তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে জীবন বিসর্জনের প্রতিযোগিতায় রত যখন বিশ্বের জনগণের কাছে দেশের নাম প্রচার ছিল সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তখনই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের বিচক্ষণ সিদ্ধান্তে ব্রিটিশ লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য জন স্টোনহাউসের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত আগ্রহে ১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই উন্মোচিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের ৮টি ডাক টিকিট। ২৯ জুলাই ৮টি ডাক টিকিটের আন্তর্জাতিক ভাবে প্রচার শুরু হয়।

Stamps_Bangladesh

তাজউদ্দিন আহমদের সম্মতিতে জন স্টোনহাউস তাঁর পূর্ব পরিচিত লন্ডন প্রবাসী ভারতীয় বাঙালী গ্রাফিক্স শিল্পী বিমান মল্লিকের শরণাপন্ন হলেন ২৯ এপ্রিল। বিমান মল্লিক সানন্দে এই ডাক টিকিটের নকশা করে দিতে সম্মত হলেন। এরপর বিমান ৩ মে হাউস অফ কমন্সে বিমান মিলিত হলেন স্টোনহাউসের সঙ্গে, এই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

দেড় মাসের চেষ্টায় বিমান মল্লিক তৈরী করলেন বাংলাদেশের প্রথম ৮টি ডাক টিকিটের নকশা। কাজটা খুব সহজ ছিল না কারণ বাংলাদেশ সরকারের কোন নির্দেশনা বা concept বা ধারণাপত্র না থাকায় গবেষণার কাজটিও করতে হয় বিমান মল্লিককেই। যাই হোক নকশা তো হল এবারে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন পেতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে ব্রিটিশ সাহায্য সংস্থা ‘War on Want’ এর প্রধান ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ কলকাতায় এলেন। একটিতে বাংলাদেশের পতাকা, দুটিতে মানচিত্র, একটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ত ঝরার প্রতীক, একটিতে ব্যালট বাক্স, একটিতে ছেড়া শেকল, একটিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং একটিতে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর প্রতীক সম্বলিত ৮টি ডাক টিকিটের মূল নকশার অনুমোদন দিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ। লন্ডনের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রেস থেকে টিকিট ছাপা হল স্টোনহাউসের সহায়তায়।

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ২৬ জুলাই House of Commons এর হারকোর্ট রুমে সাংবাদিকদের সামনে উন্মোচন করলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাক টিকিট আর ফার্স্ট ডে কভার।

Stamps_Bangladesh03

২৯ জুলাই, ১৯৭১ এ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পেল স্বাধীন বাংলাদেশের ডাকটিকিট। আটটি ডাক টিকিটের সেটটির মূল্য ছিল এক পাউন্ড নয় পেন্স। ডাকটিকিটের মূল্যমান এক পাউন্ডের সমমান ২১ রুপি ৮০ পয়সা রাখা হয়। একেকটি টিকিটের মূল্যমান নির্ধারণ করা হয় ১০ পয়সা, ২০ পয়সা, ৫০ পয়সা, ১ রুপি, ২ রুপি, ৩ রুপি, ৫ রুপি ও ১০ রুপি।

ইন্টারন্যাশনাল পোস্টাল ইউনিয়নের সদর দপ্তরে অভিযোগপত্র দিল পাকিস্তান, বলল  যে এই টিকিটগুলো বেআইনি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অযোগ্য। কিন্তু অভিযোগ ধোপে টিকলো না।

Stamps_Bangladesh05১৯৭১ সালের ১ আগস্ট ব্রিটেনের ট্রাফালগার স্কয়ারে বিমান মল্লিক বাংলাদেশের আটটি ডাকটিকিট জনসমক্ষে হাত উঁচিয়ে তুলে ধরেন। এ অনুষ্ঠানে জন স্টোনহাউসসহ অনেক গণ্যমান্য অতিথি, প্রবাসী বাঙালী ও ব্রিটিশ নাগরিকেরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য এই আটটি ডাকটিকিট বড় ভূমিকা পালন করেছিল সেদিন।

 

 

কে এই মল্লিক? বাংলাদেশের মুক্তি পাগল মানুষের জন্যে কেন তিনি এগিয়ে এলেন এ কাজে? বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিটের নকশা প্রণয়নকারী বিমান মল্লিক ছিলেন একাধারে গ্রাফিক্স ডিজাইনার, চিত্রকর, সমাজসচেতন মানুষ ও একজন ম্যারাথন দৌড়বিদ।

Stamps_Biman Mullick

বিমানচাঁদ মল্লিক

১৯৩৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের হাওড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বিমানচাঁদ মল্লিক।। একান্নবর্তী পরিবার ছিল তাঁদের। অজিত কুমার মল্লিক ও সারদা দেবীর এগারো সন্তানের মধ্যে বিমানের স্থান ছিল দশম। ছেলেবেলা থেকেই পড়াশোনার চেয়ে আঁকাআঁকির নেশাই তাঁকে বেশি টানত। কিশোর মল্লিকের নকশা ছাপা হয় কলকাতার বিভিন্ন নামী পত্রিকায়। বিমান মল্লিক বলছিলেন, ‘১৯৬০ সাল, খুবই ইচ্ছে লন্ডনে পড়তে যাব। লুকিয়ে পাসপোর্ট করা, কলেজের সঙ্গে যোগাযোগ ইত্যাদি নানা ঝক্কি-ঝামেলার পর একটা বৃত্তি জোগাড় করতে সমর্থ হই। বিদেশ যাওয়ার কাগজ হাতে এল। এবার বাড়িতে বলে যদি আটকে যাই, সেই ভয়ে এক রকম না বলেই বিলেতের উদ্দেশে রওনা হই।’ সেন্ট মার্টিন স্কুল অব আর্টে চার বছর মেয়াদি ডিজাইনের কোর্সে ভর্তি হন মল্লিক। পরীক্ষায় ভালো ফলের পাশাপাশি নান্দনিক কাজের অভিজ্ঞতায় বিমান মল্লিক কাজ পেয়ে যান নামকরা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে।

১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। আর এই ডাকটিকিটের নকশা করে আলোচনায় আসেন বিমান মল্লিক। তিনিই প্রথম এবং একমাত্র ভিনদেশী, যিনি ব্রিটিশ ডাকটিকিটের নকশা করেছেন। সে কাজ করতে গিয়ে তাঁর সাথে পরিচয় হয় জন স্টোনহাউসের।

Stamps_John Stonehouse

জন স্টোনহাউজ

বাংলাদেশের ডাক টিকিট প্রকাশ প্রসঙ্গে বিমান বললেন, “একাত্তরের ২৯ এপ্রিল সাবেক ব্রিটিশ ডাক যোগাযোগ মন্ত্রী জন স্টোনহাউস আমার বাসায় ফোন করে আমার স্ত্রীকে বলেছিলেন, আমাকে খুবই জরুরী প্রয়োজন। সেই সন্ধ্যায় ফোনে আলাপ হয় স্টোন হাউসের সঙ্গে। বললেন, বাংলাদেশের ডাকটিকিট করে দিতে হবে, হাতে সময় কম।” 

৩ মে প্রথম বৈঠকের কাজ শুরু করলেন বিমান মল্লিক।

বিমান মল্লিক বলেন, “টানা ছয় সপ্তাহ কখনো ট্রেনে, খাবার টেবিলে, কলেজে পড়ানোর ফাঁকে আটটি টিকিটের নকশার কাজ শেষ করি। টিকিটে ব্যবহৃত তথ্য ও প্রতীক সম্পর্কে লিখিত কোনো প্রস্তাবনা কিংবা ধারণাপত্র না থাকায় গবেষণার কাজটিও নিজেকেই করতে হয়। সে জন্য বিষয়টি আরও কঠিনতর হয়ে ওঠে। তবে, চৌধুরী ও স্টোনহাউসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মধ্য দিয়ে আটটি ডাকটিকিটে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপ ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করি।”

এবার প্রকাশনার পালা। ২৬ জুলাই ১৯৭১, হাউস অব কমন্সে আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ডাকটিকিটগুলো ও ফার্স্ট ডে কাভার প্রদর্শন করেন। তার পরদিন যুক্তরাজ্যের প্রায় সবকটি সংবাদমাধ্যমে এ খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হল। ২৯ জুলাই বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলসহ কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইজরায়েল, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের ডাকটিকিট।

ডাকটিকিটগুলোয় দেশের নাম ও মুদ্রার ক্ষেত্রে রুপি  ব্যবহারের কারণ বর্ণনায় বিমান মল্লিক বলেন, “দেশের নাম আলাদা দুটি বাংলা শব্দে ‘বাংলা’ ও ‘দেশ’ এবং ইংরেজিতে ‘Bangla Desh’ আর মুদ্রার নাম রুপি লেখা হয়। তখনো আসলে ধারণা ছিল না দেশের নাম কীভাবে লেখা হবে, মুদ্রার নাম কী হবে। আমি জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাংলা ভাষার অভিধান-এ ‘বাঙ্গালা দেশ’-এর অনুসরণে দেশের নামে দুটি আলাদা শব্দ ব্যবহার করি এবং পাক-ভারত উপমহাদেশের অনুসরণে মুদ্রার নাম রুপি লিখি। ডাকটিকিটগুলো এভাবেই অনুমোদন করা হয়েছিল।”

Stamps_Bangladesh02

বিমান বিজয়ের খবর প্রসঙ্গে বলছেন, “১৯৭১ এর ১৭ ডিসেম্বর সকালবেলা জন স্টোনহাউস টেলিফোনে জানালেন, ‘জানো, গতকাল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। সংবাদটি আমার ৩৮তম জন্মদিনের সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে মনে হলো। তিনি আরও বললেন, ঘটনাটিকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে উদযাপন করা দরকার। সুতরাং ‘বাংলাদেশ লিবারেটেড’ ওভারপ্রিন্ট করে অবিলম্বে কিছু স্ট্যাম্প প্রকাশ করতে চাই। ‘বাংলাদেশ লিবারেটেড’ কথাটার বাংলাও থাকা দরকার। ‘বাংলাদেশ মুক্ত’, ‘মুক্ত বাংলাদেশ’ নাকি ‘বাংলাদেশের মুক্তি’—কোনটা যে উপযুক্ত বাংলা হবে, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তবে ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ কথাটার মধ্যে ব্যঞ্জনা বেশি। তবে এ বিষয়ে মনে হয় দ্বিতীয় একটি মত নিতে পারলে ভালো হয়। হঠাৎ মনে হলো, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করা যায়। তখন বাংলা বিভাগের প্রধান তারাপদ মুখ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ ঠিক আছে। এরপর ২০ ডিসেম্বর আমার নকশা করা আটটি ডাকটিকিটের মধ্যে ১০ পয়সা, ৫ রুপি ও ১০ রুপি মূল্যমানের তিনটিতে ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ কথাটি ওভারপ্রিন্ট করে প্রকাশ করা হয়। ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ কথাটি আমার হাতের লেখা দিয়েই করা হয়। এ এক অসাধারণ ঘটনা।”

টিকিট বিক্রির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ‘বাংলাদেশ ফিলাটেলিক এজেন্সি’ নামের প্রতিষ্ঠানকে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে স্বাধীন বাংলার ডাকটিকিট। বিভিন্ন দেশে সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে টিকিটগুলো পৌঁছায় আলোচনার ঝড় ওঠেছিল।

২৭ মার্চ ২০১২ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখায় বিমান মল্লিককে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রদান করে।

দুই বিদেশী জন স্টোনহাউস ও বিমান মল্লিকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সেদিন বাংলাদেশ পেলো তার প্রথম ফিলাটেলিক পরিচয়, ৮টি ডাক টিকিট।

লেখক পরিচিতি:
সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.