বাংলার চিরায়ত কথাসাহিত্যের অমর শিল্পী তারাশঙ্কর

Comments

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বাঙালী কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে্র ২৩ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের  বীরভূম জেলায় লাভপুরের জমিদার পরিবারে বাবা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা প্রভাবতী দেবীর ঘরে। তাঁরা দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ এবং সততা, ধর্মভাব, ভক্তি ও বিশ্বাস তিনি পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকে। যদিও পরবর্তী জীবনে এ সব বিশ্বাস নিয়ে অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব ও জিজ্ঞাসা তার মনকে আলোড়িত করেছিল। প্রগতিশীল চিন্তায় শরিক হয়েছিলেন। তারাশঙ্করের বাল্যজীবন কাটে গ্রামের পরিবেশেই, পড়াশোনা শুরু গ্রামের স্কুল থেকে।

তারাশঙ্কর লাভপুরের যাদবলাল হাই স্কুল থেকে ১৯১৬ সালে এন্ট্রান্স (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এবং পরে সাউথ সুবার্বন কলেজে (এখনকার আশুতোষ কলেজ) ভর্তি হন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে  ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। স্বাস্থ্যভঙ্গ এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপের কারণে তাঁর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।

ব্রিটিশ উপনিবেশের খপ্পর থেকে দেশ উদ্ধারের লক্ষ্যে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে গ্রেপ্তার হন তারাশঙ্কর। ১৯৩২ সালে তিনি প্রথমবার শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করেন। এই সালেই প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম উপন্যাস “চৈতালী ঘূর্ণি”।

তারাশঙ্কর ১৯৪২-এর বীরভূম জেলা সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন এবং পরে ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংগঠনের সভাপতি হন। তিনি ১৯৭০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ।

তিনি কংগ্রেসের কর্মী হয়ে সমাজসেবামূলক কাজ করেন এবং কিছুদিন জেল খাটেন। একবার তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার সদস্য হন ।

জানা যায় যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সমগ্র সাহিত্য জীবনে রচনা করেছেন ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী এবং ১টি কাব্যগ্রন্থ।

কাব্যগ্রন্থ

ত্রিপত্র (১৯২৬)

উপন্যাস

চৈতালি ঘূর্ণি (১৯৩২)
পাষাণপুরী (১৯৩৩)
নীলকণ্ঠ (১৯৩৩)
রাইকমল (১৯৩৫)
প্রেম ও প্রয়োজন (১৯৩৬)
আগুন (১৯৩৮)
ধাত্রীদেবতা (১৯৩৯)
কালিন্দী (১৯৪০)
গণদেবতা (১৯৪৩)
মন্বন্তর (১৯৪৪)
পঞ্চগ্রাম (১৯৪৪)
কবি (১৯৪৪)
সন্দীপন পাঠশালা (১৯৪৬)
ঝড় ও ঝরাপাতা (১৯৪৬)
অভিযান (১৯৪৬)
সন্দীপন পাঠশালা (কিশোরপাঠ্য সংস্করণ) (১৯৪৮)
পদচিহ্ন (১৯৫০)
উত্তরায়ণ (১৯৫০)
হাঁসুলীবাঁকের উপকথা (১৯৫১)
তামস তপস্যা (১৯৫২)
নাগিনী কন্যার কাহিনী (১৯৫২)
আরোগ্য নিকেতন (১৯৫৩)
চাঁপাডাঙার বৌ (১৯৫৪)
পঞ্চপুত্তলি (১৯৫৬)
বিচারক (১৯৫৭)
সপ্তপদী (১৯৫৮)
বিপাশা (১৯৫৯)
রাধা (১৯৫৯)
মানুষের মন (১৯৫৯)
ডাকহরকরা (১৯৫৯)
মহাশ্বেতা (১৯৬১)
যোগভ্রষ্ট (১৯৬১)
না (১৯৬১)
নাগরিক (১৯৬১)
নিশিপদ্ম (১৯৬২)
যতিভঙ্গ (১৯৬২)
কান্না (১৯৬২)
কালবৈশাখী (১৯৬৩)
একটি চড়ুইপাখি ও কালো মেয়ে (১৯৬৩)
জঙ্গলগড় (১৯৬৪)
মঞ্জরী অপেরা (১৯৬৪)
সংকেত (১৯৬৪)
ভুবনপুরের হাট (১৯৬৪)
বসন্তরাগ (১৯৬৪)
স্বর্গমর্ত্য (১৯৬৫)
বিচিত্রা (১৯৬৫)
গন্না বেগম (১৯৬৫)
অরণ্যবহ্নি (১৯৬৬)
হীরাপান্না (১৯৬৬)
মহানগরী (১৯৬৬)
গুরুদক্ষিণা (১৯৬৬)
শুকসারী কথা (১৯৬৭)
শক্করবাঈ (১৯৬৭)
মণিবৌদি (১৯৬৯)
ছায়াপথ (১৯৬৯)
কালরাত্রি (১৯৭০)
রূপসী বিহঙ্গিনী (১৯৭০)
অভিনেত্রী (১৯৭০)
ফরিয়াদ (১৯৭১)
শতাব্দীর মৃত্যু (১৯৭১)
কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড
(কিশোর উপন্যাস) (১৯৭২)

ছোটগল্প-সংকলন

ছলনাময়ী (১৯৩৭)
জলসাঘর (১৯৩৮)
রসকলি (১৯৩৯)
তিন শূন্য (১৯৪২)
প্রতিধ্বনি (১৯৪৩)
বেদেনী (১৯৪৩)
দিল্লী কা লাড্ডু (১৯৪৩)
যাদুকরী (১৯৪৪)
স্থলপদ্ম (১৯৪৪)
তেরশো পঞ্চাশ (১৯৪৪)
প্রসাদমালা (১৯৪৫)
হারানো সুর (১৯৪৫)
ইমারত (১৯৪৭)
রামধনু (১৯৪৭)
শ্রীপঞ্চমী
কামধেনু (১৯৪৯)
মাটি (১৯৫০)
শিলাস্থান (১৯৫২)
বিস্ফোরণ (১৯৫৫)
কালান্তর (১৯৫৬)
বিষপাথর (১৯৫৭)
রবিবারের আসর (১৯৫৯)
পৌষলক্ষ্মী (১৯৬১)
আলোকাভিসার
চিরন্তনী (১৯৬২)
অ্যাক্সিডেন্ট (১৯৬২)
তমসা (১৯৬৩)
আয়না (১৯৬৩)
চিন্ময়ী (১৯৬৪)
একটি প্রেমের গল্প (১৯৬৫)
তপোভঙ্গ
দীপার প্রেম (১৯৬৬)
নারী রহস্যময়ী (১৯৬৭)
পঞ্চকন্যা (১৯৬৭)
শিবানীর অদৃষ্ট (১৯৬৭)
গোবিন সিংয়ের ঘোড়া (১৯৬৮)
জয়া (১৯৬৮)
এক পশলা বৃষ্টি (১৯৬৯)
মিছিল (১৯৬৯)
উনিশশো একাত্তর (১৯৭১)

নাটক

কালিন্দী (১৯৪২)
দুইপুরুষ (১৯৪৩)
পথের ডাক (১৯৪৩)
বিংশ শতাব্দী (১৯৪৫)
দ্বীপান্তর (১৯৪৫)
যুগবিপ্লব (১৯৫১)
কবি (১৯৫৭)
কালরাত্রি (১৯৫৭)
সংঘাত (১৯৬২)
আরোগ্য নিকেতন (১৯৬৮)

প্রহসন

চকমকি (১৯৪৫)

প্রবন্ধ–সংকলন

সাহিত্যের সত্য (১৯৬১)
ভারতবর্ষ ও চীন (১৯৬৩)
রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার পল্লী (১৯৭১)

 

স্মৃতিকথা
আমার কালের কথা (১৯৫১)
বিচিত্র স্মৃতিকাহিনী (১৯৫৩)
আমার সাহিত্য জীবন, প্রথম খণ্ড (১৯৫৩)
কৈশোরস্মৃতি (১৯৫৬)
আমার সাহিত্য জীবন, দ্বিতীয় খণ্ড (১৯৬২)

ভ্রমণসাহিত্য

মস্কোতে কয়েক দিন (১৯৫৯)

রচনা-সংকলন

তারাশঙ্করের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৪৭)
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৫০)
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয় গল্প (১৯৫৩)
স্বনির্বাচিত গল্প (১৯৫৪)
গল্প-সঞ্চয়ন (১৯৫৫)
ছোটদের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৫৬)
রচনাসমগ্র – প্রথম খণ্ড (১৯৫৯)
প্রেমের গল্প (১৯৬১)
ছোটদের ভালো ভালো গল্প (১৯৬২)
গল্প-পঞ্চাশৎ (১৯৬৩)
কিশোর সঞ্চয়ন (১৯৬৬)
ছোটদের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৬৯)

*তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়।

তাঁর লেখায় বিশেষ ভাবে পাওয়া যায় বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের সাঁওতাল, বাগদি, বোষ্টম, বাউরি, ডোম, গ্রাম্য কবিয়াল সম্প্রদায়ের কথা। এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবনচিত্র, স্বাধীনতা আন্দোলন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যক্তির মহিমা ও বিদ্রোহ, সামন্ততন্ত্র-ধনতন্ত্রের দ্বন্দ্বে ধনতন্ত্রের বিজয় ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তু। প্রথম জীবনে কিছু কবিতা লিখলেও কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তারাশঙ্করের প্রধান খ্যাতি। শরৎচন্দ্রের পরে কথাসাহিত্যে যাঁরা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, তারাশঙ্কর ছিলেন তাঁদের একজন।

ছোট বা বড় যে ধরনের মানুষই হোক না কেন, তারাশঙ্কর তাঁর সব লেখায় মানুষের মনস্তত্বের  নানা বিচিত্র রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় গুন। সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন চিত্র তাঁর অনেক গল্প ও উপন্যাসের বিষয়। সেখানে আরও আছে গ্রাম জীবনের ভাঙনের কথা, নগর জীবনের বিকাশের কথা, পরিবর্তনের অভিঘাতে মানবিক মূল্যবোধ বদলের কথা। মানবচরিত্রের নানা জটিলতা ও নিগূঢ় রহস্য তাঁর উপন্যাসে জীবন্তভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

তিনি নিজে জমিদারবংশের সন্তান হয়ে কাছ থেকে দেখেছেন কীভাবে জমিদারি ক্রমশ বিলুপ্ত হয়; পাশাপাশি নব্য ধনিক শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে এবং দিকে দিকে কল-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তখন একদিকে চলছিল গ্রাম্য সমাজের ভাঙন, অন্যদিকে শহরজীবনের বিকাশ। সমাজের এ নীরব পরিবর্তন তাঁর রচনায় নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

তারাশঙ্কর প্রায় দুশ গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলির মধ্যে চৈতালী ঘূর্ণি (১৯৩২), জলসাঘর (১৯৩৮), ধাত্রীদেবতা (১৯৩৯), কালিন্দী (১৯৪০), গণদেবতা (১৯৪৩), পঞ্চগ্রাম (১৯৪৪), কবি (১৯৪৪), হাঁসুলি বাঁকের উপকথা (১৯৪৭), আরোগ্য নিকেতন (১৯৫৩) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

তাঁর ছোটগল্পগুলি গভীর ও মর্মস্পর্শী।  বেদে, পটুয়া, মালাকার, লাঠিয়াল, চৌকিদার, বাগদী, বোষ্টম, ডোম ইত্যাদি সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র তাঁর গল্পে দক্ষতার সঙ্গে অঙ্কিত হয়েছে। ‘রসকলি’, ‘বেদেনী’, ‘ডাকহরকরা ’ প্রভৃতি তাঁর প্রসিদ্ধ  ছোটগল্প।

তারাশঙ্করের রচনা নিয়ে চল্লিশটিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। চলচ্চিত্রে রূপায়িত  উপন্যাস, গল্প ও নাটকগুলির মধ্যে আছে:

সত্যজিৎ রায় পরিচালিত

জলসাঘর
অভিযান

পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায পরিচালিত়

অগ্রদানী

বিজয় বসু পরিচালিত

আগুন
আরোগ্য নিকেতন

নরেশ মিত্র পরিচালিত

উত্তরায়ণ
কবি
কান্না
কালিন্দী

তরুণ মজুমদার পরিচালিত

গণদেবতা

কালীপ্রসাদ ঘোষ পরিচালিত

চাঁপাডাঙার বউ
জয়া
ডাকহরকরা
দুই পুরুষ
ধাত্রীদেবতা

সুশীল মজুমদার পরিচালিত

ফরিয়াদ
বিচারক
বিপাশা
মঞ্জরী অপেরা
রাইকমল
শুকসারী
হারানো সুর

অজয় কর পরিচালিত

সপ্তপদী

সলিল সেন পরিচালিত

হার মানা হার (মহাশ্বেতা উপন্যাস অবলম্বনে)

তপন সিংহ পরিচালিত

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা

১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তারাশঙ্কর ভারত সরকারের পদ্মশ্রী ও ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে পদ্মভূষণ  উপাধিতে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন শরৎস্মৃতি পুরস্কার (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), জগত্তারিণী স্মৃতিপদক (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), রবীন্দ্র পুরস্কার ও  সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার (আরোগ্য নিকেতনের জন্য), এবং জ্ঞানপীঠ পুরস্কার গণদেবতার জন্য। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি চীন সরকারের আমন্ত্রণে চীন ভ্রমণে যান। এরপরের বছর তিনি অ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সঙ্ঘের কমিটি গঠনের প্রস্ততিমূলক সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন গমন করেন। তিনি তাসখন্দে অনুষ্ঠিত অ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

এই জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক কলকাতায় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বরে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.