বাংলার মুক্তির পথ নির্মাতা “ডাকসু”

Comments

এ ভূখন্ডের উচ্চশিক্ষার প্রাচীনতম বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তির সংখ্যা সর্বোচ্চ। শুধু কি তাই! বাংলাদেশের শিক্ষার অধিকার, সংস্কৃতির সংগ্রাম, মুক্তিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মুক্তিযুদ্ধে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে এই বিদ্যায়তন। পাকিস্তানী বর্বর হানাদার ও তার এদেশীয় দালাল রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে জীবন দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) দেশের আন্দোলন সংগ্রামের আঁতুঘর নামেই পরিচিত। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯২২ সালের ১ ডিসেম্বর কার্জন হলে অনুষ্ঠিত শিক্ষকদের একটি সভায় ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ (ডুসু) নামে একটি ছাত্র সংসদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯২৩ সালের ১৯ জানুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নির্বাহী পরিষদ পূর্বোল্লিখিত শিক্ষক সভার সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেয়। ১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সংসদের সাধারণ সভায় খসড়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিষদ অনুমোদন করলে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ (ডুসু) কার্যকর হয়।

১৯২২-২৩ (মতান্তরে ১৯২৩-২৪) শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডুসু)-র প্রথম ভিপি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনিত হন যথাক্রমে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার পর এক বছর মেয়াদকালের জন্য নির্বাচিত (মনোনিত) কমিটিগুলোর সিংহভাগই নির্ধারিত সময়সীমার বেশী সময় দায়িত্ব পালন করে।

সম্ভবত দ্বিতীয় ডাকসু কমিটি গঠিত হয় ১৯২৮-২৯ সালে। এ সেশনে ভিপি ও জিএস হিসেবে নির্বাচিত হন এ এম আজহারুল ইসলাম ও এস চক্রবর্তী। পরে বিভিন্ন সময়কালে রমণী কান্ত ভট্টাচার্য, কাজী রহমত আলী, আতাউর রহমান, অরবিন্দ বোস, গোলাম আযম ডুসুর ভিপি এবং জিএস হিসেবে মনোনিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৩ সালে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ (ডুসু)-র গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করা হয় প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখে এর নতুন নাম করণ করা হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ (ডাকসু)।

১৯৫৩-৫৪ সালের কমিটিতে ভিপি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের এস এ বারী এটি, জিএস পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের জুলমত আলী খান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত মোটামুটিভাবে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে ডাকসুর দায়িত্বে আসেন ফরিদ আহমেদ, নিরোদ বিহারী নাগ, আব্দুর রব চৌধুরী, একরামুল হক, শাহ আলী হোসেন, বদরুল আলম, মো. ফজলী হোসেন, আবুল হোসেন, এটিএম মেহেদী, আমিনুল ইসলাম তুলা, আশরাফ উদ্দিন মকবুল, বেগম জাহানারা আখতার, অমূল্য কুমার, এস এম রফিকুল হক, এনায়েতুর রহমান, শ্যামা প্রসাদ ঘোষ, কে এম ওবায়েদুর রহমান, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী, বোরহান উদ্দিন, আসাফুদ্দৌলা, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, শফি আহমেদ, মাহফুজা খানম, মোরশেদ আলী, তোফায়েল আহমেদ, নাজিম কামরান চৌধুরী, আসম আব্দুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন।

সাল

সহসভাপতি

ছাত্র সংগঠন

সাধারণ সম্পাদক

ছাত্র সংগঠন

১৯২২-২৩ বা ১৯২৩-২৪ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ তথ্য নেই যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত তথ্য নেই
১৯২৮-২৯ এ এম আজহারুল ইসলাম তথ্য নেই এস চক্রবর্তী তথ্য নেই
১৯২৯-৩২ রমণী কান্ত ভট্টাচার্য তথ্য নেই কাজী রহমত আলী ও আতাউর রহমান তথ্য নেই
১৯৪৭-৪৮ অরবিন্দ বোস তথ্য নেই গোলাম আযম তথ্য নেই
১৯৫৩-৫৪ এস. এ. বারী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন জুলমত আলী খান ও ফরিদ আহমেদ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ
তথ্য নেই নিরোদ বিহারী নাগ তথ্য নেই আব্দুর রব চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ
তথ্য নেই একরামুল হক তথ্য নেই শাহ আলী হোসেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ
তথ্য নেই বদরুল আলম পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ মো. ফজলী হোসেন তথ্য নেই
তথ্য নেই আবুল হোসেন তথ্য নেই এটিএম মেহেদী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ
১৯৫৭-৫৮ আমিনুল ইসলাম তুলা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আশরাফ উদ্দিন মকবুল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন
তথ্য নেই বেগম জাহানারা আখতার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন অমূল্য কুমার তথ্য নেই
তথ্য নেই এস এম রফিকুল হক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন এনায়েতুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ
১৯৬২-৬৩ শ্যামা প্রসাদ ঘোষ তথ্য নেই কে এম ওবায়েদুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ
১৯৬৩-৬৪ রাশেদ খান মেনন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন
তথ্য নেই বোরহান উদ্দিন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আসাফুদ্দৌলা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন
তথ্য নেই ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ শফি আহমেদ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন
১৯৬৬-৬৭ মাহফুজা খানম পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মোরশেদ আলী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন
১৯৬৮-৬৯ তোফায়েল আহমেদ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নাজিম কামরান চৌধুরী তথ্য নেই
১৯৭০-৭১ আ স ম আব্দুর রব পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ আব্দুল কুদ্দুস মাখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ
১৯৭২-৭৩ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মাহবুবুর জামান বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন
১৯৭৯-৮০ মাহমুদুর রহমান মান্না ছাত্রলীগ (জাসদ) আখতারুজ্জামান ছাত্রলীগ (জাসদ)
১৯৮০-৮১ মাহমুদুর রহমান মান্না ছাত্রলীগ (বাসদ) আখতারুজ্জামান ছাত্রলীগ (বাসদ)
১৯৮২-৮৩ আখতারুজ্জামান ছাত্রলীগ (বাসদ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল
১৯৮৯-৯০ সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ছাত্রলীগ (আওয়ামী) মুশতাক হোসেন ছাত্রলীগ (জাসদ)
১৯৯০-৯১ আমান উল্লাহ আমান জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল খায়রুল কবির খোকন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ চিত্র অসম্পূর্ণ। সকলের সহযোগিতায় পরবর্তীতে চিত্রটি পূর্ণাংগ করবার প্রয়াস থাকবে। – সম্পাদক)

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৩ সময়কালে ডাকসুতে নির্বাচিত হয়ে সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে দায়িত্ব পালন করেন ছাত্র ইউনিয়নের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও মাহবুব জামান। ১৯৭৩ সালে ব্যাপক কারচুপি ও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠায় ডাকসু নির্বাচন বাতিল করা হয়। এর দীর্ঘদিন পরে ১৯৭৯-৮০ সালে ছাত্রলীগ (জাসদ) এর প্রার্থী হয়ে সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে জিতেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান। পরে ছাত্রলীগ (জাসদ) ভেঙ্গে দুটি ছাত্রলীগের সৃষ্টি হয় এবং ১৯৮০-৮১ সালে ছাত্রলীগ (বাসদ) এর প্রার্থী হয়ে সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে আবারও জয় লাভ করেন মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান।

১৯৮২-৮৩ সালের নির্বাচনে ভিপি ও জিএস পদে জয় লাভ করে দায়িত্ব পালন করেন ছাত্রলীগ (বাসদ) এর আখতারুজ্জামান ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। এরপরে ১৯৮৯-৯০ সালের নির্বাচনে ভিপি ও জিএস পদে জয় লাভ করে দায়িত্ব পালন করেন ছাত্রলীগ (আওয়ামী) এর সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং ছাত্রলীগ (জাসদ) এর মুশতাক হোসেন। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৯০-৯১ সেশনের জন্য ভিপি ও জিএস পদে নির্বাচিত হন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন।

ডাকসুর নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতারাই পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ৭৫ পরবর্তি সময়ে যখন বাংলাদেশ এক নবযাত্রা শুরু করলো স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক আবহ তৈরির লক্ষ্যে তখন থেকে কি এক অদৃশ্য কারণে কোন সরকারই আর ডাকসুসহ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখালো না। ফলে ১৯৯০ সালের ৬ জুন নির্বাচনের পর বিভিন্ন সময়ে ছাত্র সংগঠনগুলো ডাকসুসহ ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনের দাবী উত্থাপন করলেও দীর্ঘ ২৮ বছরে হয়নি কোন ছাত্র সংসদ  নির্বাচন।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.