বাঙালি সংস্কৃতি – পর্ব ১১

Comments

একাদশ পর্ব

। জুলফিকার নিউটন ।

জীবিকা সম্পৃক্ত জীবনের সার্বক্ষণিক ও বহুধা অভিব্যক্তিই সংস্কৃতি। জীবন জীবিকাগত নয় কেবল, স্থান, কাল এবং গোষ্ঠীগতও। মানব সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য বিভিন্নতা, বিবর্তন এবং বৈষম্য ঘটে একারণেই। বিভিন্ন প্রতিবেশে জীবন-জীবিকার নিরাপদ নিরুপদ্রব রক্ষণ-লালন লক্ষ্যেই মানুষের মানস সংস্কৃতি ও তজ্জাত ব্যবহারিক উপকরণ এবং বৈষয়িক আচরণ নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। অনুভূতি ও মননের অভিব্যক্তি এবং আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজন-চেতনার বাহ্যরূপই সংস্কৃতির সাক্ষ্য। সংস্কৃতির আবর্তন-নিবর্তন-উদবর্তন কিংবা বিকাশ-বিবর্তন তাই শাস্ত্রিক, আর্থিক, সামাজিক, নৈতিক, শৈক্ষিক ও প্রশাসনিক সাবলীলতা-স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা দৌর্বল্য-দুর্দশায় উপর নির্ভরশীল। যেখানে আত্মবিকাশ ও আত্ম প্রসারের অনুকূল পরিবেশ, সেখানে সংস্কৃতি জীবনের সর্বাঙ্গীন ও সর্বাত্মক বিকাশের এবং জীবিকার স্বচ্ছন্দ প্রসারের লাবণ্যে বর্ধিষ্ণু, যেখানে পরিবেষ্টনী প্রতিকূল, সেখানে সংস্কৃতি জড়তায়, জীর্ণতায় ও চিরন্তনতায় বিকৃত, প্রথাগত নিষ্প্রাণ আচার ও আচরণ মাত্র। কারণ বেঁচেবর্তে থাকার পদ্ধতিই জন্ম দিয়েছে শাস্ত্রের, সমাজের, সংস্কৃতির, সভ্যতার ও রাষ্ট্রের। সেই বাঁচার প্রয়াস যখন কোনো বিরুদ্ধ বিরূপ শক্তি রোধ করে দাঁড়ায়, তখন জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে ভাব-চিন্তা-কর্ম-প্রায়াস ও আচরণ আবর্তনধর্মী হয়েই জীবন, সমাজ এবং সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে।

বাঙালি সংস্কৃতির উৎস ও ভিত্তি ছিলো অষ্ট্রিক-দ্রাবিড়-মঙ্গোলীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান তত্ত্ব ও মনন। বাঙালির মননে এবং অধ্যাত্ম বুদ্ধিতে সাংখ্য, যোগ ও তন্ত্রের প্রভাব বরাবর প্রবল রয়েছে। সর্বপ্রাণবাদে তথা জড়বাদে এবং জাদুতে তার আস্থাও অবচেতন ও নিঃসঙ্গ মনে ক্রিয়াশীল থেকেছে চিরকাল। বৃক্ষ দেবতা, নারী দেবতা, পশু-পাখি দেবতা, দেহচর্যা ও জন্মান্তরে বিশ্বাস তাদেরই সৃষ্টি। তুক-তাক-জাদু-টোনা, ঝাড়-ফুঁক, বাণ-উচাটন, কবচ-মাদুলি এবং বশীকরণে আস্থা তাদের আজো অবিচল। সভ্য বাঙালির অষ্ট্রিক-মঙ্গোলীয় জ্ঞাতি পার্বত্য আরণ্য কৌম-কোল, সাঁওতাল, ওঁরাও, রাজবংশী, গারো, হাজঙ, খাসিয়া, মণিপুরী, লওসাই, নাগা, মিজো খুমি, তিপ্রা, মুরং, কুকী, কোচ প্রভৃতির মধ্যে যেসব নিয়ম নীতি, রীতি রেওয়াজ চালু রয়েছে, তাদের অনেকগুলোই ভিন্নাকারে বা সামান্য রূপান্তরে সভ্য বাঙালির প্রথাসিদ্ধ আচারে রয়ে গেছে। আমাদের ঘরোয়া ও সামাজিক অনেক আচার- অনুষ্ঠানে, প্রথায়-পার্বণে, মৃতের সৎকারে, শ্রাদ্ধে, বিশ্বাসে-সংস্কারে আদিম রীতি-নীতির ছিটেফোঁটা এখনো মেলে।

জৈন-বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ্য-খ্রিষ্ট ধর্ম এবং ইসলাম গ্রহণ করেও বাঙালি তার আদিম ঐতিহ্য কখনো সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে পারে নি। তাই গাছের মধ্যে বট, অশ্বত্থ, তাল, তেঁতুল, তুলসী প্রভৃতি; পাখির মধ্যে কাক, পেচক, শকুন, শালিক, প্রভৃতি; পশুর মধ্যে গাভী, শেয়াল, সরীসৃপের মধ্যে সা, টিকাটিকি, নৈসর্গিক তিথি-নক্ষত্র-দিন-ক্ষণ-মাস, অশরীরী ভূত প্রেত পিশাচ (জিন-পরি) ডাইনি প্রভৃতি বাঙালির চেতনায় রোগের চিকিৎসায়, শুভাশুভ চিন্তায় এবং সিদ্ধি-সাফল্য কামনায় আজো উপযোগ হারায়নি।

আচরিক জীবনে ধান, দূর্বা, হলুদ, আমপাতা, কলাগাছ, কলসি, ঘট, কুলো, দীপ, ধূপ, মাছ, দই আজো মনোজীবনে বাঞ্ছাসিদ্ধির ভরসা জাগায়। ওলা-শীতলা-ষষ্ঠী কিংবা সাপ, হাতি, বাঘ, কুমির আজো সভয় শ্রদ্ধা পায়। নৈতিক সামজিক জীবনে গোত্রে বিবাহ, বহু বিবাহ, অগ্রোত্রীয় বিবাহ, বাল্য বিবাহ, অসবর্ণ বিবাহ, বিধবা বিবাহ, ত্যাগ, তালাক, প্রভৃতি বিধি নিষেধও আদিম। গোত্রপতি, সমাজপতি এবং গৃহপতির দাপট ও নেতৃত্বে আজো নিন্মতর সমাজে অবিলুপ্ত। গুরুবাদ এবং মন্ত্রগুপ্তি সর্বসমাজে আজো প্রবল। হাতিয়ারের মধ্যে লাঙ্গল, যোয়াল, ফাল, ঈষ, দা, দড়ি, মই, কোদাল, বর্শা, বাঁটুল, ঝুড়ি, চুপড়ি, চেঙাড়ি, ডিঙ্গি, ডোঙ্গো, তৈজস; আসবাবের মধ্যে হাঁড়ি, সরা, পাতিল, ঝিনুক, ডাবা (নারিকেলের মালা), মাচা, নল, পেটি, ঘটি, চাটাই, চাটি, ঝাঁটা, বাখারি প্রভৃতি; নেশার মধ্যে গাঁজা, ধেনো মদ, চরস, সিদ্ধি, প্রভৃতি; ফলমূলের মধ্যে ধান, বেগুন, ঝিঙা, কলা, তাম্বুল, গুবাক, গাণ্ডারী, জাম্বুরা, শিমুল, তেঁতুল প্রভৃতি; অষ্ট্রিক- দ্রাবিড়-মঙ্গোলীয় বাঙালির আবিস্কৃত। ধানের জিজিরা, ককচি, করা, তুতীয়া, বাদল শুকই, লেম্বরু, গেলঙ, মইদল প্রভৃতি এবং মাছের পুটি, টেঙরা, শিঙ্গি, গজার, কই, মাণ্ডর, টাকি, পাঙ্গাস, প্রভৃতি; অষ্ট্রিক-দ্রাবির-মঙ্গোলীয় নাম।

খাদ্যবস্তুর মধ্যে গুড়, ভাত, মাড়, খই, চিড়া, মুড়ি, চচ্চড়ি, ভর্তা, আচার প্রভৃতিও অষ্ট্রিক হওয়ার কথা। কড়া, পণ, গণ্ডা, কুড়ি, কাহন, গণনা, পদ্ধতি, অষ্ট্রিক। এমনকি কয়েকশত শব্দ ঢিল, ঢাক, ঢোল, ডাঙর, ডাঁশাল, ডাহা, চোয়াল, খাড়ু, টোপা, খোকাখুকি, খাড়ি, খোটা, খামার, খড়, আড্ডা লাড্ডু, প্রভৃতি অষ্ট্রিক সংস্কৃতিক স্মারক।

বাঙালি ভাবপ্রবণ ও কল্পনাপ্রিয়। উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনাতেই এর প্রকাশ। তাই বাঙালি যখন কাঁদে, তখন কেঁদে ভাসায়। আর যখন হাসে, তখন সে দাঁত বের করেই হাসে। যখন উত্তেজিত হয়, তখন আগুন জ্বালায়। তার সবকিছুই মাত্রাতিরিক্ত। তার অনুভূতি-ফলে অভিভূতি- গভীর। কেঁদে ভাসানো, হেসে লুটানো আর আগুন জ্বালানো আছে বটে, কিন্তু কোনোটাই দীর্ঘস্থায়ী নয়- যেহেতু উচ্ছ্বাস-উত্তেজনা মাত্রেই তাৎক্ষণিক ও ক্ষণজীবী। বাঙালির গীতিপ্রাণতার উৎস এখানেই।

দু’হাজার বছর ধরে নির্জিত-শোষিত বাঙালি কালো পিঁপড়ের মতো অতিচালাক ও নিঃসঙ্গ স্ব-নির্ভর। তাই সে ধূর্ততা যত জানে বুদ্ধির সুপ্রয়োগ তত জানে না, ফলে আত্মরক্ষার ও স্বার্থপরতার হীন প্রয়োগে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি কলুষিত হয়, আত্মপ্রতিষ্ঠার মহৎ প্রয়াসে প্রযুক্ত হয় না। তাই তার সঙ্ঘশক্তি নেই, অভাবপীড়িত বাঙালি ব্যবহারিক জীবনের উন্নয়নে বুদ্ধির ও অধ্যবসায়ের অবদান গ্রহণে অক্ষম।

ভাবপ্রবণ বলেই বাঙালি মুখে আদর্শবাদী ও বৈরাগ্যধর্মী। কিন্তু প্রবৃত্তিতে সে একান্তভাবে আধ্যাত্মবাদীর ভাষায় ‘বস্তুবাদী’ গণভাষায় ‘জীবনবাদী’ এবং নীতিবিদের ভাষায় ‘ভোগবাদী’। এজন্যে বাংলাদেশে জীবনবাদ বা ভোগবাদ আধ্যাত্মচিন্তার ওপর বারবার জয়ী হয়েছে।’

বাংলার ও বাঙালির যা গৌরব-গর্বের অবদান, তা সব সময়েই ছিল ব্যক্তিক অবদান, সামগ্রিক জীবনে তা কুচিৎ ফলপ্রসূ হয়েছে। তাই বাঙালির মহৎ পুরুষদের মহা অবদানের ফলভোগে ধন্য হতে পারেনি তারা। এই বাংলাদেশেই চিরকাল নতুন চিন্তা জন্ম নিয়েছে। কিন্তু লালন পেয়েছে সামান্য। তবু যখন আমরা স্মরণ করি এই মাটির বুকেই- এই মানুষের মনোভূমেই উপ্ত হয়েছিল বজ্রযান, সহজযান, কালচক্রযান, কায়াবাদ, নব্যন্যায়, নব্যস্মৃতি, নবপ্রেমবাদ, ওহাবী-ফরায়েজী মতবাদ কিংবা ব্রাহ্মদর্শন, তখন গর্বে আমাদের বুক ফুলে ওঠে। আবার যখন স্মরণ করি, মীননাথ, গোরক্ষনাথ, দীপঙ্কর, শীলভদ্র, জীমূতবাহন, রামনাথ, রঘুনাথ, চৈতন্যদেব, রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র, তিতুমীর, শরীয়তুল্লাহ, দুদু মিয়া, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সূভাষচন্দ্র, বঙ্গবন্ধু, জগদীশচন্দ্র, বিবেককানন্দ, শেরে বাংলা, ভাসানী, শহীদুল্লাহ, সত্যজিৎ, রবিশঙ্কর, অমর্ত্য সেন, এদেশেরই সন্তান, তখনো নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই।

বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে লক্ষ্য করা যাবে যে, সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, অভিনয়, পোশাক ইত্যাদিতে বাইরের সংস্কৃতির সঙ্গে যথেষ্ট আদান-প্রদান হয়েছে। বস্তুত, দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে বাইরের প্রভাব মিলেমিশে একটা নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু এ সংস্কৃতির কোনো কোনো দিক আছে, যা এ অঞ্চলের একেবারে নিজস্ব। এই একান্তভাবে নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যে একটি হলো বাংলার কুটীরশিল্প। শীতলপাটি, নকশি কাঁথা, নকশি পাখা, বালিশের ওয়াড়, বেতের কাজ, বাঁশের কাজ, শিকা, মাটির পুতুল, মৃৎশিল্প, পট, চিত্রিত মাটির ঘট, কারুশিল্প ইত্যাদিতে বাঙালিদের যে-উন্নত ঐহিত্য রয়েছে, তা গড়ে উঠেছে বহু শতাব্দী ধরে। এর অনেকগুলো পুরোপুরি নারীদেরই তৈরি। বিশেষ করে নকশি কাঁথা, নকশি পাখা, নকশি বালিশের ওয়াড়-সহ নানা রকমের সেলাইয়ের কাজ, আলপনা, দেওয়াল চিত্র, শীতলপাটি, বেতের কাজ, বাঁশের কাজ, শিকা, মাটির পুতুল, আঁকানো ঘট ইত্যাদি তাঁদেরই সৃষ্টি। মৃৎশিল্প, পট, কারুশিল্প, জাল বোনা ইত্যাদিতেও তাঁরা পুরুষদের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন।

বাঙালির আর একটি প্রধান শিল্প রন্ধন শিল্প। নানা রকমের পিঠাপুলি, বিচিত্র ধরনের আচার, মিষ্টান্ন, শাক-শুক্তানি, কাসুন্দি, মুড়ি-মুড়কি একান্তভাবে বাঙালির – অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা। এগুলো মহিলাদের হাতেই বর্তমান রূপ নিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে মহিলারাই একে উৎকর্ষ দিয়েছেন। বাংলার কয়েকটি অঞ্চলে সুতি এবং রেশমের কাপড়চোপড় বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। এসব কাজেও মহিলারা পুরুষদের পাশাপাশি অংশ নিয়েছেন। ঢাকার মসলিনের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলো সুইয়ের কাজ করা চিকন। তা তৈরি করতেন মহিলারাই। সুতো তৈরি, সুতোয় রঙ করা, রেশম তৈরি, কাপড় বোনানো ইত্যাদি প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের অবদান অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।

ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় উভয়ই বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এদের ইতিবাচক দিক এই যে, এর ফলে বাংলার বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং এই ভাষার প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। বাঙালিয়ানাও জোরদার হয়। তা ছাড়া, বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়।

(পরবর্তী পর্ব ১০ এপ্রিল, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)

ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার

লেখক:
Julfikar Newton
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট