অষ্টাদশ পর্ব
। জুলফিকার নিউটন ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর দেশীয় শাসকশ্রেণী জাতীয় মুক্তির সম্পদ আত্মসাৎ করে। সে কারণেই সিভিল সমাজ এবং সামরিক সমাজের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই দ্বন্দ্বে সামরিক সমাজ ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং সিভিল সমাজ অবদমিত হয়ে যায়। সামরিক সমাজ সাংস্কৃতিক শক্তি ধার করে পাকিস্তাানী মূল্যবোধ ও মৌলবাদী মূল্যবোধ এবং একরৈখিক ধর্মজ সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ থেকে। কামরুল হাসান এই পর্যায়ে কাজ করেছেন বিদ্যমান লোকবাদী সম্পদের মধ্যে। এই সম্পদের ভিত্তি বাঙালি কৃষক শ্রমিকের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা, তাদের উপকথা, কিংবদন্তী, রূপকথা ও তাদের অনুভূতি নিসর্গ। দ্বন্দ্বের এই দুই স্বতন্ত্র ইতিহাসের মধ্যে তিনি সাংস্কৃতিক রাজনীতির অন্তঃসার খুঁজেছেন গ্রামাঞ্চলে। যেক্ষেত্রে শহরাঞ্চলে ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছে সামরিক সমাজের সংস্কৃতি: জাকজমক, কুচকাওয়াজ, জৌলুস, সেক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলে ঘনীভূত থেকেছে কৃষক জনসাধারণের আবহমানতা। এই আবহমানতায় প্রবিষ্ট লোকসাধারণের কথাহীন বোধ, কৃষক মানুষদের কাহিনী প্রাণতা, এক ধরনের গ্রামীণ সমাজতন্ত্র । কামরুল হাসান এই বোধটিকে ধরেছেন; মানুষ এবং নিসর্গ, রং এবং রেখা, মানুষ এবং মানুষীর শরীর ও এসবের পটভূমিতে ক্রিয়াশীল লোকে সাধারণের কথাহীন ক্রোধ, কৃষক মানুষদের কাহিনীপ্রাণতা, এক ধরনের গ্রামীণ সমাজতন্ত্র এবং এসব থেকে উথিত শরীর। এই শরীর অনির্বাণ এবং অপ্রতিরোধ্য। মৌলবাদী বোধ শরীরের বিরুদ্ধে বলে তিনি রমণীর শরীরের বিভিন্ন আদলের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতা খুঁজেছেন। মৌলবাদীবোধে সমাজ যেক্ষেত্রে সম্প্রদায়ের নামান্তর (বঙ্গীয় মুসলমান সমাজ, এই সমাজের মধ্যে অধস্তান হিন্দু সমাজ, বৌদ্ধ সমাজ, খৃষ্টান সমাজ, পাহাড়ি সমাজ) সেক্ষেত্রে বহুমাত্রিক বোধে সমাজ হচ্ছে এক কর্পোরেট বোধ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত জনসমষ্টির বহুমাত্রিক জীবনযাত্রা। মৌলবাদী ধূসরতার বিরুদ্ধে তাঁর দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ডালপালা মেলে দিয়েছে, তাঁর রমণী শরীর ক্রমাগত লাবণ্যময়, নয়নমণি এবং বহুরঙ্গা হয়েছে।
‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি
বাংলাদেশের সামরিক সমাজ মৌলবাদী রাজনীতি এবং পাকিস্তাানী মূল্যবোধ শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। সেই চেষ্টার বিরুদ্ধে কামরুল হাসান লড়াই করেছেন শিল্পের সাহায্যে, শিল্পের বোধ থেকে তিনি আক্রমণ করেছেন মৌলবাদী রাজনীতি, পাকিস্তাানী মূল্যবোধ এবং সামরিক সংস্কৃতি। এ সবই তাঁর সাংস্কৃতিকবাদের ভিত্তি, কেন্দ্র, মূল। তিনি জোর দিয়েছেন অর্থের উৎপাদন এবং নির্দিষ্ট বাঙালি সমাজ গঠনের ওপর, শিল্প ও শিল্পভাষার এবং শিল্পভাষার সংজ্ঞাপনের ওপর, এ সবই তৈরি করেছে সমাজ সম্পর্কের বিভিন্ন ফর্ম, প্রতিষ্ঠান। এই হচ্ছে কামরুল হাসানের সংস্কৃতিবাদ, তিনি এভাবে পৌছেছেন সংস্কৃতির এক তত্ত্বে ও অর্থের উৎপাদন এবং র্প্যাকটিস (তার শিল্প), উৎপাদনের সামাজিক ব্যবহার (তার পাষ্টোর শিল্প ও শিল্পের ক্যাপসন)। তার শিল্পের তত্ত্ব হচ্ছে সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার সমাজ সম্পর্কের র্যাডিক্যাল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া / সাড়া ও তার কল্পনাকুশল প্রকাশ ও তাঁর রমণীরা মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধ পক্ষ, তার গ্রামীণ রমণীরা জাঁকজমকের সামরিক সংস্কৃতির বিপরীত, তাঁর বিচিত্র রমণীরা বহুমাত্রিক আখ্যান পাকিস্তাানী একরৈখিক মূল্যবোধের প্রতিপক্ষ।
কামরুল হাসান তার চোখ দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি তদন্ত করেছেন। এই সংস্কৃতির ভিত্তি লালসা এবং নির্যাতন, মানুষ অধিকাংশ মানুষ বঞ্চিত জীবন থেকে। এই নির্যাতনকারী সংস্কৃতি মানুষের শক্তি বুঝতে অক্ষম, মানুষের অভিজ্ঞতার বহুতলতা অস্বীকারে প্রয়াসী। মন এবং শরীর, পুরুষের শরীর এবং নারীর শরীরের বহুতল অভিজ্ঞতা তিনি উদ্বোধন করতে চেয়েছেন। সে কারণে তিনি আবেগ উন্মুক্ত করতে এবং যৌনতা মেলে ধরতে চেয়েছেন। আবেগের বন্ধ্যাত্ব এবং অবদমিত যৌনতার পুনরুদ্ধার একটি বৈপ্লবিক কাজ, কামরুল হাসান এ কাজটি করেছেন। যে-সংস্কৃতিতে শরীর অনুপস্থিত সেক্ষেত্রে শরীরে অনুভূতির প্রবেশই রাজনৈতিক ও অনুভূতির রাজনৈতিকতাই কামরুল হাসানকে খানখান করে দিয়েছে, শরীর পতাকার মতো তুলে তিনি ঝগড়া করেছেন বাংলাদেশের সঙ্গে।
কামরুল হাসানের কাজের প্রধান কেন্দ্র ও শরীর, মানুষী শরীর। এই শরীর (পুরুষ কিংবা নারী) স্বভাবতই বিকৃত। মুখ কিংবা শরীরের বিকৃতির কারণ: অন্যরা । সমাজ এই মুখ কিংবা এই শরীর দেখছে। অন্যদের । সমাজের দেখার চাপে ব্যক্তিটির মুখ/ শরীর বিকৃত হয়ে যায়। অন্য- উদ্ভূত বিকৃতিই কামরুল হাসানের ফিগারেটিভ কাজের বিষয়। সেজন্য তিনি মানুষী শরীর তুলে ধরতে চান, দেখাতে চান অন্য কিংবা সমাজ কিভাবে শরীর বিকৃত করে দেয়। প্রতিভাসের পরপারে তিনি মুখ/শরীর বিকৃত করেন এবং বিকৃতির মধ্য দিয়ে মুখে শরীরে প্রতিভাসের ভিন্ন উপস্থাপনা তৈরি করেন। এভাবে শরীর/মুখ একটি প্রক্রিয়া হয়, এই প্রক্রিয়া তৈরি হয় সমাজে সংস্কৃতির ঢাল থেকে। এই ঢাল কি সংস্কৃতির সুস্থতা? ব্যক্তির সুস্থতা?
ঢালহীন সংস্কৃতি তার অন্বিষ্ট। কিন্তু তাঁর সময়ের সংস্কৃতি ঢালভিত্তিক। এই ঢাল তৈরি হয়েছে প্রথা থেকে, ধর্ম থেকে, লোকাচার থেকে, শাসকশ্রেণীর মতাদর্শ থেকে। সেজন্য এই বিবিধ ঢাল মুখে। শরীরে তৈরি করেছে শারীরিক যন্ত্রণার মুহূর্ত। এই যন্ত্রণার মূহূর্ত কামরুল হাসানকে কবজা করেছে। তার ফিগর প্রায়ই একা, কিন্তু ব্যক্তিকতা বাদ দিয়ে কিংবা অন্যদের থেকে বিযুক্ত নয়। তাঁর ফিগর, ফিগরের মূখ, শরীর যন্ত্রণাবিদ্ধ, সেজন্য মুখাবয়ব কিংবা শরীরের আদল বিকৃত, অতিরঞ্জিত, অস্বাভাবিক, তাদের চোখে আর্তি, ভয়, উৎকণ্ঠা, কখনো বা দূরাভা। তারা দেখে তাদের চারপাশ? সার্বিক নিঃসঙ্গতায় তারা মগ্ন। তার পোট্রেটের প্রধান কেন্দ্র: চোখ, চোখের ভঙ্গিমা। এই ভঙ্গিমা পাঠ করার জন্য, আমরা পাঠ করি চোখের বিভিন্ন বার্তা। মুখ শরীর অন্যের চাপে, সংস্কৃতির চাপে বিকৃত কিন্তু চোখ দেখে এই অন্য-উৎসারিত বিকৃতি এবং নালিশ করে কিংবা প্রতিবাদ করে। সেজন্য এসব পোট্রেটের চোখ হানা দেয়, হানা দিয়ে ফেরে। তাঁর সময়ের সংস্কৃতি মানুষকে, জ্যান্ত মানুষকে এমন করে তুলেছে। সেজন্য এই সংস্কৃতির সমাজের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই। কামরুল হাসানের কাজের একটা প্রধান দিক ও তাঁর কনফেশন। তিনি কাজের মধ্য দিয়ে, তার ক্রোধ এবং তাঁর পাপ মুক্ত করেছেন। এই মুক্ত করার প্রবণতা আমাদের মধ্যে তৈরি করে শক্তি; তিনি কখনো প্রেমিক, কখনো রাজনৈতিক, কখনো সৈনিক। তিনি সর্বত্র এবং সতত এক সততা। তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেন নি। আমাদের সমাজে যারা সার্থক তারা সার্থকতা অর্জন করার জন্য অল্পবিস্তার আপাশে, অল্পবিস্তার বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এই আপোস সময়ের গতানুগতিকতার সঙ্গে, এই বিশ্বাসঘাতকতা স্টাবলিশমেন্টের কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার জন্য। তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে বিশ্বস্ত থেকেছেন। এই বিশ্বস্ততা, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, মানুষ / জনসাধারণের কাছে। গরীব দেশে সততা, ন্যয়বোধ যা বিকোলে জীবনে জয়ী হওয়া যায়, সেখানে কামরুল হাসান জয় করেছেন মানুষ এবং মানুষকে যারা কবজা করে রাখে সেই স্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে তিনি করেছেন লড়াই। কামরুল হাসান তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হয়েছেন এবং আমিও তার কাজের মধ্যে দিয়ে সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হতে থাকি। এভাবে তার কাজ সম্বন্ধে একটি অর্ন্তদৃষ্টি তৈরি হয় তার কাজ হচ্ছে আমার কাছে বাস্তাবিক/যথার্থ উপস্থিতি। স্থায়ী শিল্প এই যথার্থ উপস্থিতি তৈরি করে এবং আমি নামক ব্যক্তির সঙ্গে এভাবে শিল্পের সম্মুখীনতা তৈরি হয়। কামরুল হাসান তাঁর কাজের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির সম্মুখীন হয়েছেন, সম্মুখীনতার মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি উন্মোচন করেছেন, উন্মোচনের মধ্য দিয়ে মানুষের স্থায়ী স্বভাবে পৌঁছেছেন এবং পেছনের মধ্য দিয়ে শিল্পের সময়-উত্তীর্ণতা তৈরি করেছেন। তার কাজের ভিত্তি, মূল, কেন্দ্র হচ্ছে? বাঙালি সংস্কৃতি, তার বলবার প্রয়াস হচ্ছে যে-ক্ষেত্রে বাঙালি সংস্কৃতির উপস্থিতি নেই এবং যেক্ষেত্রে বাঙালি সংস্কৃতি অনুভব করা যায় না সেক্ষেত্রে তাঁর কাজের ওজন, তার চিন্তার কতক দিক এবং তার সৃষ্টিশীলতার সিদ্ধি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তার কাজকে বুঝতে হবে বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে এবং পরিসরে।
(পরবর্তী পর্ব ৫ জুন, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)
ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার
লেখক:
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক
‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি