বাঙালি সংস্কৃতি – পর্ব ২১

Comments

একবিংশ পর্ব

। জুলফিকার নিউটন ।

বাঙালি সংস্কৃতিকে সমন্বয়ধর্মী সংস্কৃতি বলা যায়। বহুবিধ এবং বিচিত্র উপাদানের সমন্বয়ের ফলে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সৃষ্টি হয়েছে।’ ঐতিহাসিক বঙ্গভূমি বা বাংলাদেশে (বর্তমানে ভারতের পরিশ্চমবঙ্গ প্রদেশ ও স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ) সুপ্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন নরগোষ্ঠী এসে বসবাস করতে শুরু করেছে। এই সকল নরগোষ্ঠী সঙ্গে নিয়ে এসেছে তাদের নিজস্ব বিচিত্র সাংস্কৃতিক উপাদান। এসব বহিরাগত উপাদান বা উপকরণের সঙ্গে দেশজ উপাদানের সংমিশ্রণ ও সমন্বয় হয়েছে এবং এর ফলেই বাংলার সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটেছে যুগে যুগে।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনধারা সংস্কৃতির মধ্যে এমন কতগুলো দিক আছে, যেগুলো আমাদের স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাঙালি চিরদিন ভাবপ্রবণ জাতি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘প্রাণের নামে মানবতার নামে দাবি করলে এখানে সাড়া মিলবে’।’ বাঙালির ধর্ম সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়। বাংলার মানুষের মনকে ধর্মের-তা যে কোনো ধর্ম হোক না কেন, তার বাহ্যিক। আচার-বিচারের চেয়ে ধর্মের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী বেশি আকৃষ্ট করেছে। তাই এ দেশে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা কখনো জনমনে বিস্তার করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, ‘মানবপন্থী বাংলাদেশ প্রাচীনকালেও ভারতের শাস্ত্রপন্থী সমাজনেতাদের কাছে নিন্দনীয় ছিল। তীর্থযাত্রা ছাড়া এখানে এলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। তার মানে, বাংলাদেশ চিরদিনই শাস্ত্রগত সংস্কারমুক্ত। বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি মত এ দেশে বা তার আশেপাশে চিরদিন প্রবল ছিল। তখন মগধও বাংলার সঙ্গেই ছিল এক ঘরে অর্থাৎ স্বাধীন হয়ে”।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে। পাই যে মৌলবাদী রক্ষণশীল মৌলভি-মোল্লাদের প্রচারণার চেয়ে সুফি-সাধক, পীর-দরবেশ, আউল-বাউলদের অবদান ও এদেশে ইসলাম প্রচারে অধিক কার্যকর হয়েছে। এসব মরমি সাধক অনেকে তাঁদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক গুণাবলির জন্যে সব শ্রেণির জনগণের শ্রদ্ধাভাজন হয়েছিলেন। ধর্মক্ষেত্রে তাঁরা যে ঐতিহ্যের সূত্রপাত করেছিলেন, সেটা ছিল আধ্যাত্মিক মানবতাবাদের ঐতিহ্য, পরমসহিষ্ণুতার ঐতিহ্য, যেটা বাংলার মন ও মানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে যে ধারাটি প্রাধান্য পেয়ে এসেছে সেটি সংঘাত বা বিরোধের ধারা নয়, সেটা হলো, বিভিন্ন মতবাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারা এবং সমন্বয়ের ধারা। বস্তুত আমাদের বাঙালিদের জীবন ও সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “বৈচিত্র্যের মধ্যে সুরসঙ্গতি বা যধৎসড়হু”। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের আগে কেবল বাংলাদেশ নয়, সমগ্র ভারত উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক বিরোধের তেমন নজির দেখা যায় না। সাম্প্রদায়িক বিরোধ বা ধর্ম নিয়ে হিংসাত্মক দাঙ্গা-হাঙ্গামা নানাবিধ ঐতিহাসিক কারণে ব্রিটিশ আমলের সৃষ্টি। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা যেন সেই আবহমান ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এই ঢাকা শহরে মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে একটি গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। এর সদস্য ছিলেন আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহর হোসেন প্রমুখ বুদ্ধিজীবী। তাঁরা সাহিত্যচিন্তার ক্ষেত্রে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সকল রকম অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার পরিহার করে যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের দৃঢ় ভিত্তির ওপর ভিত্তি করে গোটা মুসলমান সমাজকে পুনর্গঠন করা। বুদ্ধির মুক্তি ছিল এ আন্দোলনের মূলমন্ত্র। এই আন্দোলনের মুখপাত্র ছিল শিখা। কিন্তু তখনকার ঢাকার মুসলমান সমাজের ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে এই আন্দোলন তেমন অগ্রসর হতে পারেনি। তবে এর রেশ একেবারে মিলিয়েও যায়নি। পরবর্তীকালে বেশ কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবী এটিকে লালন করেছেন এবং আমাদের বাঙালি মুসলিম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আমাদের ঐতিহাসিক ভাষা-আন্দোলন, আমাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং পরিশেষে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এই পটভূমিতেই সংঘটিত হয়েছিল।

‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি

বাংলার সমন্বয়ধর্মী ও মানবতাবাদী ঐতিহ্য সম্পর্কে একটি কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। আঠারো ও উনিশ শতকে বাংলার গ্রাম অঞ্চলে কিছু সংখ্যক আউল-বাউল ও চারণকবির আবির্ভাব দেখা যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মরমী কবি ফকির লালন শাহ। লালনের গান আজও বাঙালির মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। লালনের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে একটা বিতর্ক রয়ে গেছে। হিন্দুরা লালনকে হিন্দু সাধক বলে মনে করতেন; অন্য দিকে মুসলমানদের কাছে তিনি ছিলেন সুফি ফকির। লালন নিজেই জানতেন না তাঁর ধর্ম পরিচয় কি? এই সংকটকে লালন এক সুন্দর গানের মধ্যে প্রকাশ করেছেন:

সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে
সুন্নত দিলে হয় মুসলমান নারীর তবে কী হয় বিধান
বামন চিনি পৈতে প্রমাণ বামনি চিনি কিসে রে

বিশ শতকের প্রথমার্ধে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাঙালির মানবতাবাদী ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। নজরুলের বিদ্রোহ কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ছিল না-যার জন্যে তিনি কারাবরণ পর্যন্ত করেছিলেন, তিনি অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক অবিচার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। নজরুলের অসংখ্য কবিতা ও গান হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল বাঙালির সূক্ষ্ম অনুভূতিকে যে কেবল গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল তা নয়, বাঙালির জাতীয়চেতনাকে জাগ্রত করতেও অনেকখানি সাহায্য করেছে। বস্তুত এ কথা বিনা দ্বিধায় বলা যায় যে, বাংলার মানুষকে যে কোনো ধর্মের বাহ্যিক বিধিবিধান বা আচার-বিচারের চেয়ে তার আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ ও অন্তর্নিহিত মর্মবাণী গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে এবং সমগ্র বাংলা-ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। কাজী নজরুলের এক অসাধারণ কবিতায় তাঁর মানবতাবাদী দর্শন সুন্দরভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে:

গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ, মুসলিম-ক্রীশ্চান
গাহি সাম্যের গান!
কোরান-পুরাণ বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক
জেন্দাবেস্তা গ্রন্থসাহেব পড়ে যাও, যত সখ

সাম্প্রতিককালে ধর্মের নামে কয়েকটি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর হিংসাত্মক কার্যকলাপের ফলে আমাদের মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তথা গোটা মানবসভ্যতা এক বিরাট হুমকির সম্মুখীন। এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ গুরু হওয়ার আগে ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের আগ্রাসন এবং চীনের মাঞ্চুরিয়ায় জাপানি সাম্রাজ্যবাদের আক্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোগশয্যায় সমগ্র বিশ্ববাসীকে আহ্বান করেছিলেন এই সকল মানবতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তাঁর এই অনবদ্য কবিতায়:

নাগিনীরা চারদিকে ফেলিতেছে,
বিষাক্ত নিঃশ্বাস
শান্তির ললিত বাণী শোনাবার ব্যর্থ পরিহাস
বিদায় নেয়ার আগে তাই
ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।

রবীন্দ্রনাথের সেদিনের আহ্বান আজকের দিনে এই মুহূর্তে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, আজ এক নয়া অপশক্তি ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের ছত্রছায়ায় বাঙালির সমন্বয়ধর্মী মানবতাবাদী সংস্কৃতিকে তথা গোটা বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বকে ধ্বংস করতে উদ্যত। এসব অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। একুশের ভাষা শহিদ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে আমরা যেন এই শপথ নিতে পারি যে, আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির সুমহান ঐতিহ্যকে আমরা কোনোক্রমেই ধ্বংস হতে দেব না।

(পরবর্তী পর্ব ২৬ জুন, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)

ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার

লেখক:
Julfikar Newton
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট