দ্বাবিংশ পর্ব
। জুলফিকার নিউটন ।
লোকসাহিত্যের কথা বাদ দিলে এমন কোনো সাহিত্যের ইতিহাস আমি জানিনে যে সাহিত্য বার্গার বা বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির লেখক ও পাঠকদের সহযোগিতায় বিবর্তিত হয়নি। সাহিত্য থেকে এরা রস পেয়েছে, তাই সাহিত্যের দায় বহন করেছে। সবাই যে লাভবান হয়েছে তা নয়। ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে বিস্তর মধ্যবিত্ত। যে সময়টা এরা সাহিত্যের সাধনায় বিনিয়োগ করেছে সেটা বাণিজ্যে বা কৃষিকর্মে বা রাজকর্মে বিনিয়োগ করলে লক্ষ্মীমন্ত হতে পারত। সাহিত্য থেকে ধন সেইসব দেশেই সম্ভব হয়েছে যেসব দেশে শিক্ষাবিস্তার হয়েছে ও সেই সঙ্গে শিল্প-বাণিজ্যের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। তার ফলে বইয়ের বাজারে এসেছে অসংখ্য ক্রেতা। অধিকাংশই নয়া মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত উঠতি শ্রমিক। এদের রুচি অনুসারে বই লেখা হয়েছে। এরা নিজেরাও লিখেছে।
অতি প্রাচীন কালেই মানুষ গুহাচিত্র আঁকত। সংস্কৃতি বলতে চিত্রকলাও বোঝায়। সুতরাং সংস্কৃতির উদ্ভব অতি প্রাচীনকালেই। তেমনি অতি প্রাচীনকালেই মানুষ ঘর বানাতে, আগুন জ্বালাতে ও জমি চাষ করে ফসল ফলাতে শিখেছিল। হাজার সাত-আট বছর আগে দুর্গ নির্মান ও নগর পত্তন করতেও পেরেছিল। সুতরাং সভ্যতার সূচনাও সুপ্রাচীনকালে। সংস্কৃতি ও সভ্যতা ঠিক একার্থক নয়, সংস্কৃতি যত ব্যাপক সভ্যতা তত ব্যাপক নয়। সংস্কৃতি যত গভীর সভ্যতা তত গভীর নয়। যদিও সংস্কৃতি তথা সভ্যতার অস্তিত্ব বহু শতাব্দীর তবু অষ্টাদশ শতাব্দীতেই ‘কালচার’ ও ‘সিভিলাইজেশন’ নামক শব্দ দুটির উৎপত্তি। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই ইংরেজি থেকে দ্বিতীয়টিকে বাংলায় তর্জমা করা হয় ‘সভ্যতা’ বলে। কিন্তু প্রথমটির উপযুক্ত পারিভার্ষিক শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘কালচার’ ও ‘কালটিভেশন’ একই ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। কালচারের ভেতরে কালটিভেশনের ভাব আছে। তাই অনেকেই কালচারের তর্জমা করেন কৃষ্টি বলে। আক্ষরিক অর্থে সেটা ভুল নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের স্পর্শকাতর কানে লাগে ও প্রাণে বাজে। ‘তাসের দেশ’ নৃত্যনাট্যে তিনি কৃষ্টি শব্দটিকে নিয়ে রঙ্গ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে পাওয়া যায় কালচার অর্থে সংস্কৃতি।
রবীন্দ্রনাথ সেটিকেই বাংলায় ব্যবহার করতে শুরু করে দেন। অর্ধ শতাব্দী পরে সংস্কৃতি এখন সর্বত্র প্রচলিত হয়েছে। লোকের ধারণা এটি একটি প্রাচীন সংস্কৃত শব্দ। এটা অর্ধ-সত্য। বৈদিক যুগে সংস্কৃতি বলতে বোঝাত যজ্ঞ প্রভৃতির প্রস্তুতি। নৃত্যগীত, কাব্য ইত্যাদি নয়। ‘ব্রাহ্মণ’ রচনার যুগে সংস্কৃতি বলতে বোঝাত গঠন। ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত সাহিত্যে সংস্কৃতির অর্থ দেবতার কাছে উৎসর্গ। পরবর্তীকালে শব্দটি অপ্রচলিত হয়ে যায়। হঠাৎ এই বিংশ শতাব্দীতেই ইংরেজি কালচার শব্দের পারিভাষিক শব্দ রূপে এর নবজন্ম ঘটে। ক্ষতি কী? ক্ষতি এই যে কৃষি আর কৃষ্টি যেমন একই ধাতু থেকে নিষ্পন্ন কৃষি আর সংস্কৃতি তেমন নয়। এর ভিতরে কর্ষণের ভাব নেই। কর্ষণ করলে তবেই জমিতে ফসল ফলে। মনোরজ্যেও বীজ থেকে গাছ হয়। কিন্তু সংস্কৃত যেমন প্রাকৃতের রূপান্তর সংস্কৃতিও তেমনি প্রকৃতির রূপান্তর। এর মধ্যে আছে রিফাইনমেনটের ভাব। কিংবা জীর্ণ সংস্কারের ভাব। শ্রুতিমধুর কিন্তু যথাযথ নয়। যাই হোক, সংস্কৃতিই এখন চলতি শব্দ। কৃষ্টি সাধারণত অচল। কিন্তু এর ফলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অর্থ দাঁড়িয়েছে নাচ, গান, অভিনয় ও আবৃত্তি। বিজ্ঞানের বা দর্শনের বা উচ্চমানের সাহিত্যের জন্য লোকের আগ্রহ নেই। সেসব হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবদ্ধ। চিত্রকলা ও ভাস্কর্য এখনও প্রতিমার পর্যায় অতিক্রম করতে গেলে বাধা পাচ্ছে।
আধুনিক মানুষের কালচার এক বিরাট ব্যাপার। কত কী তার মধ্যে পড়ে। মধ্যযুগের মতো তা ধর্মের আঁচলধরা নয়। অথচ ধর্মকে বর্জন করতেও বাধ্য নয়। যা কিছু মানবিক তথা প্রাকৃতিক তাই ও তার সবটাই সংস্কৃতির অন্তর্গত। ধর্মও তার বাইরে নয়। তাই বলে একান্ত নয়। অপরিহার্যও নয়। দেবদেবী, স্বর্গ-নরক, ইহলোক-পরলোক, বিশ্বসৃষ্টি প্রভৃতির ধারণা থেকেই ধর্মের উদ্ভব। অতি প্রাচীনকালের গুহাচিত্রের ওপর তার কোনো ছাপ না পড়ায় এমন অনুমান অযথা নয় যে মানুষের ধর্মবোধ জন্মায় শিল্পবোধের পরে। মানুষের ইতিহাসে শিল্পই অগ্রজ, ধর্ম তার অনুজ। ধর্মের আসার আগে প্রকৃতিকে নিয়েই শিল্পীরা অনেকদূর এগিয়েছিল। পরবর্তীকালে ধর্মের প্রভাবে অতিপ্রাকৃতকে অবলম্বন করে আরও অনেক দূর অগ্রসর হয়। বিজ্ঞান এসে অতিপ্রাকৃতকে প্রভাবহীন করেছে। শিল্পের বিষয়বস্তু হয় প্রকৃতি ও মানুষ। কিংবা বিমূর্ত কোনো আইডিয়া। ধর্ম দাবি করেছিল যে জীবনের প্রত্যেকটি বিভাগই ধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে। সে দাবি সংকীর্ণতর হতে হতে এখন কেবল মন্দিরে, মসজিদে ও গির্জাতেই আশ্রয় দিয়েছে। গির্জা একদা শিল্পের মহান পৃষ্ঠপোষক ছিল। এখন আর সে সামর্থ্য নেই। রাজরাজড়ারাও ছিলেন উদার পৃষ্ঠপোষক। তাঁরা আজকাল প্রায় সব দেশেই রাজ্যহারা। যেখানে রাজ্যহারা নন সেখানে ক্ষমতাহীন। শিল্পীদের নির্ভর করতে হচ্ছে কতকটা ধনিকদের ওপরে, অনেকটা মধ্যবিত্তদের ওপরে। শ্রমিক কৃষকদের ওপর সরাসরি নির্ভর করার দিন এখনও আসেনি। তাদের নামে যেসব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের ওপর নির্ভর করে ফল যা হয়েছে তা তেমন উচ্চমানের নয়।
শিল্পকে সমাজের আঁচলধরা করলে শিল্পীর আত্মপ্রকাশের পরিসর খর্ব হয়। তবে সমাজের শিল্পবোধ যখন আরও উন্নত হবে তখন শিল্পীকেও আরও স্বাধীনতা দেওয়া হবে। তখন শিল্পসৃষ্টির মান উচ্চাঙ্গের হবে। শিল্পসৃষ্টির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করলে কেবল যে স্রষ্টার কাছ থেকে তার সেরা সৃষ্টি পাওয়া যায় না তাই নয় ভোক্তাকেও সেরা উপভোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। উভয়ের মাঝখানে ধর্ম বা সমাজ বা রাষ্ট্র যেই দাঁড়াক না কেন সেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অপর পক্ষে সে যা দিতে পারে আর কেউ তা পারে না। একটা বাঁধা আয় সেইদিক থেকেই আসে। স্বাধীনতার মতো সামাজিক নিরাপত্তাও শিল্পীর পক্ষে অত্যাবশ্যক। এর অভাবে বহু প্রতিভার অপচয় বা অপব্যবহার ঘটে। আবার এর জন্য অরসিকের মনস্তুষ্টিও কম ক্ষতিকর নয়। আর সকলের মতো শিল্পীকেও প্রাণধারণ করতে হয়। কিন্তু তার ওপরেও একটা কিছু আছে। সেটা রূপের দায় ও রসের দায়। কতক লোককে এই নিয়ে জীবন ভোর করে দিতে হয়। তবেই সকলে পায় মেঘদূত শকুন্তলা বা বৈষ্ণব পদাবলী বা রবীন্দ্রসংগীত।
সংস্কৃতির প্রত্যেকটি বিভাগই হচ্ছে প্রাণধারণের ঊর্ধ্বতন স্তরের ব্যাপার। যে দেশে বা যে যুগে এই ঊর্ধ্বতন স্তরটির জন্য কেউ নেই বা থাকলেও তার প্রাণধারণের সংস্থান নেই বা তার গুণের আদর নেই সে দেশে বা সে যুগে সংস্কৃতির বিকাশ নেই। তেমন বন্ধ্যা দেশ বা যুগ বৈষয়িক দিক থেকে সমৃদ্ধ হতে পারে। কিন্তু তার বিষয়সম্পত্তি সংস্কৃতির ভার বহন করে না। তার মূল্যই বোঝে না। নিচুদরের গান-বাজনা বা নাচ নিয়েই সে সন্তুষ্ট। অথবা আড়ম্বরকেই সৌন্দর্য বলে ভ্রম করে। গুণীজনের সমস্ত শক্তিই যদি প্রাণধারণের কর্মে ব্যয়িত হয় তবে ঊর্ধ্বতন স্তরের জন্য যা করণীয় তার জন্য শক্তি থাকে না। বারো মাসে তেরো পার্বণও আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্গত। আমার তো মনে হয় ঐইসব পাল-পার্বণের উদ্ভব এমন এক স্মরণাতীত যুগে যখন ধর্মেরও উদ্ভব হয়নি। বসন্তের আগমনে মানুষ বসন্ত উৎসব করে। গোড়ায় ছিল এটা ঋতু উৎসব। নরনারী পাগলের মতো পরস্পরের গায়ে রং মাখায়, নাচে, গায়, হল্লা করে। শালীনতা মানে না, একদিনের জন্য সমাজের বন্ধন শিথিল হয়। প্রাচীন গ্রিসেও এ রকম ছিল, কালক্রমে আমরা আরও সংযত হয়েছি, কিন্তু সর্বত্র নয়। রাজস্থানে হোলিখেলার যে বিবরণ পাওয়া যায় তা চমকপ্রদ। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে যাঁরা জেহাদ ঘোষণা করেছেন তাঁদের জানা উচিত যে এর মূল অনেক গভীরে নিহিত। মানুষ এখনও প্রিমিটিভ। মাঝে মাঝে সে রক্তপাতের নেশায় মাতে। তার নাম যুদ্ধ। তেমনি এক রক্তপাতকে রঙের খেলায় রূপান্তরিত করে হোলিখেলা। আনুষঙ্গিক অশালীনতাও প্রিমিটিভ ধর্ষণের রূপান্তর। একে আরও সংস্কৃত করতে হবে। সেরূপ চেষ্টা করেছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনুষ্ঠিত বসন্ত উৎসবে। বসন্ত উৎসব শ্রীকৃষ্ণের দোল লীলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু এটা হলো পরবর্তীকালের খোদকারী।
খ্রিষ্টানদের বড়দিনও খ্রিষ্টজন্মের পূর্ব থেকেই ছিল। সেটা ছিল এক ঋতু উৎসব। বহুকাল থেকে প্রচলিত। খ্রিষ্টজন্মের পর সেটাকে এক ধর্মীয় রূপ দেওয়া হয়। সেই রূপান্তর তাকে সুসংস্কৃত করেছে। গোড়ায় যা ছিল তা অপসংস্কৃতির পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু পার্বণের আনন্দ হাতেও ষোলো আনা ছিল। আর আনন্দই তো উৎসবের প্রাণ। ধর্মের থেকে সংস্কৃতিকে পৃথক করা শক্ত। সেটা সে সম্ভব তা আগেকার দিনে কেউ ভাবতেই পারতেন না। ইদানীং আমরা ভাবছি। কিন্তু আমাদের সেই ভাবনা জনগণের কাছে পৌঁছচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ নোবেল পুরস্কার পেতে পারে, কিন্তু ‘লক্ষ্মীর পাঁচালী’ ঘরে ঘরে পঠিত বা প্রচারিত। দেশসুদ্ধ মানুষ হয়তো একদিন কমিউনিস্ট বা মার্কসবাদী হবে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কালীপূজাও চলবে। শীতলা পূজা, মনসা পূজাও। জনগণের কবিরা শীতলা মহিমা, মনসার ভাসানও লিখবেন। দেবতা, উপদেবতা, অপদেবতা সকলেরই ভক্ত আছে ও থাকবে। তার ওপর যোগ করতে হবে সাধুদের, যাঁরা কারও না কারও গুরুদেব, অর্থাৎ দেবতা। অতি ভক্তি থেকে অবতার।
পরম ভক্তি থেকে ভগবান। ধর্মপুস্তকের চাহিদাই সব চেয়ে বেশি। কী করে তাকে সাহিত্য থেকে পৃথক করা যায়? না, ধর্মও থাকবে। মানুষের আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মেটাতে। কিন্তু ও ছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনও তো আছে। বিচিত্র কলার প্রয়োজন। বিভিন্ন দর্শনের প্রয়োজন। বিবর্ধনশীল বিজ্ঞানের প্রয়োজন। নৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সমাজনৈতিক তত্ত্বের প্রয়োজন। জ্ঞানবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একে একে রুদ্ধদ্বার খুলে যাচ্ছে। এক একটি বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক একটি হাজারদুয়ারী। লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, অবজারভেটরি প্রভৃতি কত রকম জ্ঞান-বিজ্ঞানের পীঠস্থান হয়েছে। সংস্কৃতির জগৎ যে কত বৃহৎ তার ইয়ত্তা হয় না। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ হবে। মহাকাশ অভিযানের ফলে যেসব নতুন তথ্য আবিষ্কৃত হবে তার প্রভাব পড়বে চিন্তাশীলদের চিন্তার ওপর। যেসব প্রশ্ন নিয়ে মানুষ তিন হাজার বছর আগেও চিন্তিত ছিল সেসব প্রশ্নের সর্বসম্মত উত্তর এখনও মেলেনি। জন্মের পূর্বে সে কোথায় ছিল, মৃত্যুর পরে কোথায় যাবে, স্বর্গ আছে কি না, নরক আছে কি না, জন্মান্তর আছে কি না, অমরত্ব আছে কি না, ঈশ্বর আছেন কি না, তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় কি না, তিনি থাকলে এত দুঃখ কেন, এত অন্যায় কেন, এত পাপ কেন, কোথায় প্রতিকার, কবে প্রতিকার, এই দুঃখতাপের সংসার থেকে মুক্তি সম্ভব কি না, কেমন করে সম্ভব, নির্বাণ কী, মোক্ষ কী, স্যালভেশন কী, পরমাত্মার সঙ্গে চিরমিলন কী, এই জগতেই মানব কি অতিমানব হতে পারে, দেবতা হতে পারে, সর্বশক্তিসম্পন্ন হতে পারে, সর্বাঙ্গসুন্দর হতে পারে, তার সকল বাসনা-কামনা কি পূর্ণ হতে পারে, সে কি জরাব্যাধি মরণের হাত থেকে চিরকাল বাঁচতে পারে। এসব প্রশ্ন যদি বিগত তিন হাজার বছরে অমীমাংসিত থেকে গিয়ে থাকে তবে আগত তিন হাজার বছরেও হওয়ার নয়। মানুষের বাসভূমি এই যে পৃথিবী এ যদি বরফে ঢেকে যায় তো মানুষ কীসের ওপর তার স্বর্গভূমি রচনা করবে? সেটা একটা সুদূর সম্ভাবনা হলেও নিশ্চিত ভবিতব্য। অথচ মানুষ এই পৃথিবীতে যে যার আদর্শ অনুসারে সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই নিয়ে কতরকম মতবাদ উদ্গত হয়েছে। বেশিরভাগই অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকদের সৃষ্টি।
বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকদের এতখানি প্রভাব মধ্যযুগে ছিল না। কতকটা ছিল প্রাচীন গ্রিসে। এই যে অভিনব প্রভাব এটা অহেতুক নয়। মার্কস, ফ্রয়েড ও আইনস্টাইন আধুনিক মানুষের জীবন উল্লেখযোগ্য রূপে বদলে দিয়েছেন। কবিদেরও এতে অংশ আছে। শেলীর কবিতার উদ্ধৃতি বঙ্গবন্ধুকেও দিতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্য বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি জুগিয়েছে। বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে প্রেরণা পেতেন। তাঁর গণভবনের ঘরে ছিল কবির একটি সুদীর্ঘ কবিতার বৃহৎ প্রতিলিপি। আসনে বসলেই নজরে পড়ত। সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর দিলে দিতে পারেন মুনি-ঋষি বা প্রোফেটরাই। দিব্যদৃষ্টি বা অপরোক্ষ অনুভূতির সাহায্যে। এ যুগে তাঁদের অভাব ঘটেছে। তাঁদের পরবর্তীরা মূল গ্রন্থের টীকাভাষ্য লিখতে পারেন, কিন্তু নতুন একখানি উপনিষদ বা গীতা বা বাইবেল বা ত্রিপটক লিখতে পারেন না। নতুন একখানা ইলিয়াড কী অডিসি কী রামায়ণ কী মহাভারতও না। এ তো গেল লেখার কথা। মধ্যযুগের মন্দির, মসজিদ, গথিক, গির্জার মতো মহৎ সৃষ্টিই বা কোথায়? আর একটি তাজমহলও হয়নি। এসব কীর্তি কালক্রমে ধ্বংস হলে এদের স্থান নেওয়ার মতো নতুন কীর্তি কোথায়? একালে যান্ত্রিক নির্মাণ অপূর্ব দক্ষতার পরিচয় দেয়। কিন্তু ময়নামতি বা মহাস্থানগড়ের মতো পরম বিস্ময় নয়। একশ তলা, দুশো তলা ইমারত হবে, কিন্তু সেসব ব্যবহারের জন্য, ব্যবহারের অতীত সৌন্দর্যের জন্য নয়। সেসবের সঙ্গে তুলনীয় মহৎ কিছু না করে মানুষ যা করছে তা বৃহৎ কিংবা ভয়ংকর। যেমন পারমাণবিক মারণাস্ত্র। দেশের বাজেটে তার জন্য শত কোটি টাকা বরাদ্দ। কিন্তু শিল্পসৃষ্টির জন্য ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশও নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার সারস্বতদের তিলোত্তমার সাধনা করতে হচ্ছে। আর্ট হয়ে উঠছে কমার্সিয়াল আর্ট।
সাহিত্য ও বাণিজ্যিক সাহিত্য, সংগীত ও ব্যবসাদারী সংগীত। আগেকার মতো রাজসভা বা জমিদার ভবন আর নেই যার পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পীরা আপন মনে সাধনা করে যেতে পারেন। আগেকার দিনে অনেকের পারিবারিক সম্পত্তি থেকে আয় ছিল। যেমন রবীন্দ্রনাথের। কারও কারও আত্মীয়স্বজন কিছু টাকা রেখে যেতেন। যেমন ইংরেজ ঔপন্যাসিক ফর্স্টারের। চাকরি না নিলেও চলত। চাকরিটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। যা না হলে নভেল লেখা হয় না। কিন্তু দু-দুটো মহাযুদ্ধের পরে লেখকদের প্রাইভেট ইনকাম বলতে বিশেষ কিছু নেই। তাঁদের লিখে খেতে হয়। নয়তো চাকরি নিয়ে অধিকাংশ সময় ও শক্তি নিঃশেষ করতে হয়। স্বাধীনভাবে লিখে এক হাতে যথেষ্ট উপার্জন করা ও অন্য হাতে সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন করা ভাগ্যবানদের জীবনেই ঘটে। তাঁরা আর কয়জন! অধিকাংশের বেলায় স্বাধীনতা থাকে তো স্বচ্ছলতা থাকে না, সচ্ছলতা থাকে তো সাহিত্যিক উৎকর্ষ থাকে না। সমাজতান্ত্রিক দেশে স্বাধীনতার অভাব। সচ্ছলতার অভাব নেই হরেদরে একই কথা। উৎকর্ষ আশানুরূপ নয়। সংস্কৃতির যেকোনো বিভাগ কঠিন সাধনাসাপেক্ষ। সাধনার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতাও চাই। উপরন্তু চাই আর্থিক সচ্ছলতা। যে দেশে ও যে যুগে এই তিনটির সুরাহা হয় সে যুগে ও সে দেশে সংস্কৃতির বাগানে হাজার ফুল ফোটে। মহামান্য মাও সেতুং হাজার ফুলের ফরমাশ দিলেন, কিন্তু স্বাধীনতা দিলেন না। তাই ফুল ফুটল না। কিংবা ফুটলেও অকালে ঝরে গেল। তার পরে এলো সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফরমাশ। সাংস্কৃতিক বিপ্লব চীনদেশের সংস্কৃতির প্রগতি ঘটায়নি। চীনদেশের কমিউনিস্টরা এখন অনুধাবন করতে পেরেছেন। সামনে হাজার হাজার বছর পড়ে রয়েছে। মানবজাতি পারমাণবিক যুদ্ধে নির্বংশ না হলে সংস্কৃতির ত্রিধারা প্রবহমান থাকবে। একটি ধারা ক্লাসিক্যাল অথবা মার্গ সংগীতের মতো মার্গ সাহিত্যের, মার্গ শিল্পের। আর একটি লোকসংগীত তথা লোকসাহিত্য তথা লোকশিল্পের। এ ছাড়া আরও একটি পপুলার বা পপ মিউজিকের মতো পপ সাহিত্যের, পপ শিল্পের। একে অপসংস্কৃতি না বলে পপ সংস্কৃতি বললে কেমন হয়? এ জিনিস আগেও ছিল, পরেও থাকবে। সব দেশেই এই চাহিদা আছে। অধিকাংশ ফিল্ম ও নাটক এই শ্রেণির। সমাজে সাম্য এলেও রুচিতে সাম্য আসবে না। নিম্ন অধিকারীর জন্য উপদেবতা অপদেবতার মতো নিম্ন রুচির সংস্কৃতিও থাকবে। যতদিন না রুচির উন্নতি হয়। একদিনে হবে না। দিনে দিনে হবে।
(পরবর্তী পর্ব ১০ জুলাই, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)
ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার
লেখক:
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক
‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি