পঞ্চবিংশ পর্ব
। জুলফিকার নিউটন ।
প্রথমেই যেটা বলি সেটা হলো, এ দেশে যাঁরা অপসংস্কৃতির কথা বলছেন, সরকারী বেসরকারী ভাবে-তাদের চিন্তা সংস্কৃতি নিয়ে নয়, তাদের চিন্তা মুখ্যত শ্লীলতা অশ্লীলতা নিয়ে, এবং তাদের একটা ভিক্টোরিয়ান পিউরিটানিক্যাল বাই আছে, যার ফলে তারা এক ধরনের নাচে, এক ধরনের নাটকে মনে করেন যে বেশি যৌন আভাস-ইঙ্গিত আছে, সুতরাং সেটা অশ্লীল। আমার মনে হয় এর সঙ্গে সংস্কৃতি সংক্রান্ত যে আলোচনা তার সম্পর্ক খুব কম। সংস্কৃতি কথাটা যখন ব্যবহার করা হয়, এ নিয়ে সমাজতাত্ত্বিকরা যাঁরা কাজকর্ম করেছেন, তাঁরা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেন যে কালচার কথাটার মূল অর্থটা ছিল কৃষি। চাষের থেকেই কথাটা এসেছিল। তারই উপমা হিসেবে মনকে ধরা হয়েছিল, মনও যেন একটা কৃষিক্ষেত্র। যেখানে চাষ করলে পরে ফসল ফলে। যদি চাষ না করে আমরা ফেলে রাখি তাহলে সে জমি পতিত জমি হয়ে যায়। সুতরাং সংস্কৃতি বললে বোঝাত, মনের চাষ করলে যে ফসল ফলে সেই ফসলের নাম সংস্কৃতি।
এখন এই আলোচনার মধ্যে অনেক সময় ধরে নেওয়া হয় যে এই সমাজটা যেন একটা সমসত্ত্ব সমাজ। সকলেই যেন একই অবস্থায় আছে, সকলের মনই যেন একইভাবে কর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সমাজই তা নয়। হয়ত আদিম যুগে ছিল, হয়ত কোনো আদিম সমাজে এখনো আছে এই সমসত্ত্ব ভাব। কিন্তু যে সমাজকে আমরা বলি সভ্য সমাজ, সেখানে নানা রকমভাবে শ্রমের বিভাগ হয়েছে, একটা সমাজের মধ্যে নানা শ্রেণী গোষ্ঠী-স্বার্থ কাজ করছে, এবং তাদের মনের কর্ষণ একভাবে হচ্ছে না। সুতরাং একটা সমাজের মধ্যেই যাকে আমরা সংস্কৃতি বলি, তার রকমফের আছে। আজকের দিনে কী ঘটছে সেটা বলবার আগে একটু বলি আগে কী ছিল। আগে ছিল সমাজের বিভিন্ন স্তর বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য, স্বীকৃত ভাবে একটা স্তরকে বলা হত উচ্চস্তর-তাঁরা আশরাফ হোন, আতরাফ হোন, অধ্যাপকই হোন। এঁদের মনের যে কর্ষণের ফল, মূলত তাকেই সংস্কৃতি বলা হত। আর যে চাষীরা বসে সন্ধ্যেবেলা শোনে, বা দোল বা হোলির সময় নাচগান করে সেটাকে বলা হত সংস্কৃতি নয়। এই জায়গাতে আমাদের চিন্তায় বড় একটা রূপান্তর ঘটেছে এই শতাব্দীতে। মুখ্যত নৃতাত্ত্বিকদের চেষ্টার ফলে। তারা বলা যায় যে প্রায় উইথ ভেনজেস বলছেন, যে আসল সংস্কৃতিটা হচ্ছে ঐ যে নিম্নবর্গের জনগোষ্ঠী ওদের যে জীবনযাত্রা, ধ্যান ধারণা, যা ওদের ঐক্যকে বজায় রেখেছে, সেইটাই আসল সংস্কৃতি, আর আমরা যারা এই শহরে বসে ছবি আঁকি, কবিতা লেখি, স্কুল কলেজে পড়া, তাদের ভিতরে সত্যি সত্যি এমন কিছুই নেই আমাদের সামূহিক ঐক্য দিতে পারে। তাদের মতে সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায়, যার ফলে অনেকগুলি মানুষের মন থেকে একটা সমূহগতভাবে ঐতিহ্য গড়ে ওঠে, ফসল গড়ে ওঠে, সেটা উচ্চস্তরের মানুষদের মধ্যে আজকে নেই। যদি থাকে তবে এই নীচের দিকেই আছে। এবং তারা এই দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমার মনে হয় এটা স্বাস্থ্যকর। কারণ এটা অনেকদিন ধরে অবহেলিত। কিন্তু আগে এই দুটোর মধ্যে একটা সুপ্রতিষ্ঠিত স্তরভেদ ছিল।
আমাদের যুগে এই যে নতুনপর্বের যন্ত্র বিপ্লব ঘটছে এবং পুঁজিবাদী সমাজে যে মনোপলি দেখা দিয়েছে, মাল্টি ন্যাশনাল দেখা দিয়েছে, ফিনান্স ক্যাপিটাল জোরদার হয়ে উঠেছে, আন্তর্জাতিক ভাবে অল্প কিছু লোকের হাতে অপরিসীম ক্ষমতা দেখা দিয়েছে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার ফলাফল। এদের কবলে এখন বিভিন্ন শক্তিশালী মিডিয়া, এবং এই মিডিয়া পারে জনসাধারণকে গণপিণ্ডে পর্যবসিত করতে। এই মিডিয়ার মালিকরা ব্যক্তিমনের বিকাশকে ভয় পায়। তারা চায় সমস্ত সমাজের চেতনা, বুদ্ধিবিবেক, রচিকে লোয়েস্ট কমন ডিনোমিনেটরে নামিয়ে আনতে। “মস্তিষ্ক ধোলাইর” কাজে বিভিন্ন মিডিয়ার সব চাইতে ব্যাপক প্রয়াগে দেখেছি আমেরিকায়। আমেরিকাতে এই সমস্যাটা ভয়ঙ্কর প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। সে দেশে অল্পবয়েসী ছেলে-মেয়েরা বই পড়ে না, টি.ভি.এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা দেয় তাই দেখে, তাই শোনে আর সেটা কন্ট্রোল করে কতকগুলো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। তারা ঠিক করে দেয় কী যাবে টি.ভি.তে। লোকেরা কী পছন্দ করে। আমাদের দেশেও এসে পৌঁছেছে সেই হাওয়া। অর্থাৎ আমাদের রচির চিন্তার রেজিমেন্টেশন করছে অল্প কয়েকজন লোক, যাদের হাতে ফাইনান্স আছে, এই মিডিয়ার কন্ট্রোল আছে। যাদের একমাত্র কনসিডারেসন হচ্ছে গিয়ে, সব চাইতে লোয়েস্ট কমন ডিনোমিনেটারে আবেদন করলে পরে তাদের মাল কাটতি হবে। তার ফলে যে সংকটটা হয়েছে, তার কারণটা কী ? একটা কারণ ওপরতলার সংস্কৃতির যারা তথাকথিত কর্তাব্যক্তি তাদের চারিত্রশক্তি বা ইনটেগ্রিটির অভাব। অন্যদিকে টি.ভি.র প্রবল বিস্তার এবং আগ্রাসনের সামনে নীচের তলার সংস্কৃতিও আত্মরক্ষায় অসমর্থ।
আজকে আমরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চেয়ে বলতে পারব না যে এটা হচ্ছে হাই কালচারের জায়গা। সেখান থেকে কতকগুলি ম্যাস প্রোডিউসড ছেলেপুলে বেরোচ্ছে ডিগ্রি নিয়ে। এই যে প্রবল প্রভাবশালী মালটিমিডিয়ার দ্বারা আত্মরক্ষায় অসমর্থ মানুষদের মস্তিষ্ক ধোলাই করে তাদের গণপিণ্ডে পরিণত করবার ব্যাপক চেষ্টা চলেছে তার বিরুদ্ধেপ্রতিরোধ গড়বার মতো প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগ কি আমাদের আছে? আমার তো মনে হচ্ছে না কিছু আমাদের আছে। যেগুলো আমরা এক সময় গড়ে তুলেছিলাম, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, যেমন সাহিত্য পরিষদ কি এসিয়াটিক সোসাইটি-এমনকি আমার যৌবনকালেও কিছু উদ্যোগী শিক্ষিত স্ত্রী-পুরুষ যে একটা সুন্দর অনুষ্ঠান এবং আন্দোলন গড়েছিলেন বাঙালি সংস্কৃতি” বলে, যেখানে এই ধরনের একটা রচি তৈরির চেষ্টা হত-সেগুলি সবই প্রায় ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। আমি তো কোথাও কোনো দিকে সচেতন সৃজনশীল উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না। আমি নিজে পত্রিকা বার করছি, আমি তো জানি, যে আমার উচ্চাভিলাষ হয়তো এক হাজারের জায়গায় দু’হাজার পাঠক। এবং দু’হাজার পাঠক দিয়ে একটা পত্রিকা চালানো যায় না। তার ছাপার খরচা ওঠে না। যথেষ্ট সংখ্যক বিদগ্ধ ভোক্তার অভাবে, প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অভাবে, নির্বিবেক ব্যবসায়ীরা লোয়েস্ট কমন ডিনোমিনেটরের অপসংস্কৃতি দিয়ে বাজার ভরে দিচ্ছে। আমাদের তথাকথিত নেতাদের এই সব সমস্যা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। তাদের অন্য ধরনের মাথা ব্যথা। কোমর নাচিয়েছিল কিনা এটা তারা ভাবছেন। কিন্তু আসলে তো সেই ভাবনাটা ভাবনা নয়। মনের চর্চার ফলে, অনুশীলনের ফলে মানুষের যে আত্মপ্রকাশের ক্ষমতা বাড়ে, মানুষের উত্তরাধিকার সম্বন্ধে চেতনা বাড়ে, সেই উত্তরাধিকার থেকে গ্রহণ করে নিজেকে সম্পন্ন করবার সামর্থ্য বাড়ে, সেই হচ্ছে সংস্কৃতির মূল কথা। সেইগুলো নষ্ট হতে আরম্ভ করেছে। সেইগুলো নষ্ট হলে সমাজের কোনো গতি থাকে না, সমাজ স্থবির হয়ে যায়, তার মন দুর্বল হয়ে আসে। আমরা সবাই তাই দেখতে পাচ্ছি।
সেই সঙ্গে অন্য আর একটা দিকের কথা বলি, যে দিকটা আজ খুব জোর দিয়ে বলা দরকার এই জন্য যে সে দিকটা অবহেলিত। ফস কনসাসনেসের সঙ্গে যুক্ত আছে একটা সাধারণত স্বীকৃতি। কিন্তু অন্যটার স্বীকৃতিও নেই, কনসাসনেসও নেই। সেটা হল, কোনো সমাজ, কোনো ব্যক্তি বা কোনো ভাষা-তার একটা বিকাশ আছে। এই বিকাশের একটা সূত্র, কাজকর্ম, অভিজ্ঞতা, বস্তুত যাকে মার্কস খুব সঠিকভাবে বলেছেন প্রাকৃসিস। প্রাসিসের ভেতর দিয়ে ছাড়া কোনো থিয়োরি দাঁড়ায় না। কিন্তু আর একটা দিক যেটা আমার মনে হয় প্রথম দিকে মার্কস লক্ষ্য করেছিলেন, পরে চিঠিপত্রে স্বীকারও করেছেন কিন্তু সেই চেতনা কী সীমারের ভিত্তিতে তার তাত্ত্বিক কাঠামো পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেন নি, সেটা হল চিন্তারও নিজের কতগুলো নিয়ম আছে। আমরা যখন যা বলি, যখন যা ভাবি, সবসময় তাতে সংলগ্ন থাকি না। এমনকি অনেক সময়ই মনের ভিতর ভাবনা বাসনা অনুভব তালগোল পাকানো অবস্থায় থাকে, আমরা হাতড়াই ঠিক শব্দটির জন্য, ঠিক গঠনের জন্য যাতে ঠিক যে কথাটা ভেবেছি সেটা আর একজনের কাছে পৌঁছতে পারে। এবং তার উপর ভিত্তি করে আর এক ধাপ উপরে উঠতে পারি চিন্তার। সেইখানে কিন্তু খালি এই মুখের কথায়, চলতি ভাষায় আমাদের চলল না। তখন আমাকে তৈরি করতে হচ্ছে আলাদা শব্দ। সেইখানে আমার মনে হয় কিছুটা ব্যাকরণের প্রশ্ন এসে যায়, বানানের এবং শব্দকোষের প্রশ্ন এসে যায়। এই নিয়মগুলো খুব অবহেলিত হয়েছে সম্প্রতিকালে। আমি বিদেশে যেটা দেখলাম, বাইরে পড়াবার সময়, আজকাল ইংল্যান্ড, আমেরিকা বেশির ভাগ দেশে ছেলেমেয়েরা ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে এসে ইংরেজি শব্দের বানান লিখতে পারে না। এমনটি একটা পুরো বোক্যর সিনট্যাক্স বজায় রাখতে পারে না। প্রথম মনে হয়েছিল ভাল, ব্যাকরণের বন্ধন থেকে এ একটা স্বাধীনতা। কিন্তু পরে দেখলাম এ স্বাধীনতা সুফলপ্রদ নয়। অল্প কয়েকটি শব্দে বা বোক্য দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটে, কিন্তু সূক্ষ¥ অনুভূতি, জটিল তত্ত্বচিন্তা, নবোদ্ভাবিত ধ্যানধারণাকে রূপ দেবার জন্য শব্দের অভিধা, ব্যঞ্জনা, বাক্যগঠনের বিচিত্র সম্ভাবনাকে সযত্নে চর্চা করতে হয়, এবং তার জন্য মনীষা এবং অধ্যাবসায় দুই-ই লাগে। সাধারণ স্ত্রীপুরষের মুখের ভাষাকেই যদি একমাত্র সমর্থনীয় ভাষা বলে মেনে নিই, তাহলে মনের বিকাশ ব্যাহত হবে, ফলে সমাজ এবং সংস্কৃতি দুই-ই অপুষ্ট থেকে যাবে।
কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার যারা সুযোগ পেয়েছে জ্ঞানের মননের, ভাবনার বিকাশও তাদের দায়িত্ব। দুটো দিক থেকে এই সমস্ত সমস্যাকে দেখা দরকার। একটা হল প্রাণের দিক, সাম্যের দিক, সমাজের সামূহিক ঐক্যের দিক-সমাজের প্রতিটি স্ত্রীপুরুষ যাতে সক্রিয় ভাবে যুক্ত হয় সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপে, যেন সংস্কৃতি কোনো প্রিভিলেজড গ্রপের জিনিস না হয়। এবং এ দেশে তার জন্য বিশেষ কিছুই করা হচ্ছে না। আর একটা দিক হচ্ছে সংস্কৃতি মানে এই রকম একটা জিনিস যেন না হয়, যার কোনো গতি নেই, বিকাশ নেই, যা ছিল তাই রয়ে গেল। তার জন্য দরকার হচ্ছে এই ধরনের ডিসিপ্লিন্ড হাই পয়েন্ট। যদি আমার হাতে এ দেশের শিক্ষার কোনে দায়িত্ব থাকত, আমি বলতাম যে একদিকে অবিলম্বে দরকার একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। যে ছেলেমেয়ে ইকুলে পড়েছে, ম্যাট্রিক পাশ করেছে, তাদের প্রত্যেককে দুই বছর শিক্ষকতার কাজ করতে হবে যাতে করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা বলতে পারি দেশে একজনও নিরক্ষর থাকবে না। এটা সম্ভব যদি সংগঠিত ভাবে সারা দেশে একটি ভাবোন্দালন গড়ে তালো যায় এবং তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাদি করা যায়। এ প্রচেষ্টা সফল হলে তার কনসিকোয়েন্স যে কী বিরাট- ভাবা যায় না। এটা একটা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। আর একদিকে আমি বলছি, শত শত ইউনিভার্সিটি আমাদের দরকার নেই। কয়েকটা সত্যিকারের সেন্টার অব একসেলেন্স দরকার। সেই সেন্টারে যারা যাবে, বিশেষ ব্যবস্থা করে সমাজ যাদের সামূহিক উৎকর্ষের জন্য পোষণ করবে, তাদের প্রমাণ দিতে হবে যে তাদের সেই সুবিধে পাবার যোগ্যতা আছে। তারা আমাদের জ্ঞানে ক্রমাগত নতুন তত্ত্ব এবং তথ্য যোগ করবে, এবং তার জন্য যে হার্ড ডিসিপ্লিন দরকার সেখানে কোনো ফাঁকিবাজি চলবে না। খুব পপুলার হবে না, কিন্তু আমার মনে হয় এর খুব প্রয়াজেন আছে। এটাকে বাদ দেওয়া যাবে না।
আমি মনে করছি, সত্য সত্য কিনা, জ্ঞান জ্ঞান কিনা, রূপ রূপ কিনা, শিল্প শিল্প কিনা-এটা নির্ভর করে না আমি কোন শ্রেণীতে কোথায় বাস করি। এর একটা নিজস্ব অবজেকটিভিটি আছে। সমস্ত সমাজেরই স্বার্থ, তার বিকাশ নির্ভর করছে এই সমস্ত জিনিসের চর্চার উপর। অর্থাৎ, পৃথিবীটা গোল কি পৃথিবীটা চ্যাপ্টা, এটা শ্রেণী-স্বার্থের ব্যাপার নয়। ময়নামতি শালবন বিহারের ছবি যে মহৎ শিল্প ও প্রস্তাবের স্বীকৃতি কোনো বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থের উপর নির্ভর করে না। মানুষের মনের বিকাশের জন্য সব সমাজেই দরকার পড়ে অনুশীলনের ব্যবস্থার। আজকের বাংলাদেশের সব চাইতে যা আশঙ্কার, যা নিয়ে আমি দেশে ফিরে পর্যন্ত চিন্তিত, তা হলো এই-এক, যথার্থ যে সব জিনিস দরকার, শিল্পের চর্চা, জ্ঞানের চর্চা এবং তার জন্য যে সব কেন্দ্র দরকার, এ দেশে সেগুলো প্রায় বিলুপ্ত। যারা বড় শিল্পী, বড় পণ্ডিত, বড় গাইয়ে তারা সকলে প্রায় ভাড়াটে হতে শুরু করেছে। তাদের স্বতন্ত্র কোনো কেন্দ্র নেই, জায়গা নেই। অপসংস্কৃতি বলে কোনো সমস্যা নেই। সমাজের একটা সংখ্যালঘিষ্ঠ গোষ্ঠী, যারা বিত্তবান এবং সংগঠিত, কিন্তু বিবেকবুদ্ধিহীন, যাদের মনন অনুভূতি, কল্পনা, নীতিবোধ সবই নিতান্ত স্থূল প্রকৃতির, যারা ক্ষমতা এবং বিত্ত ছাড়া আর কিছুকেই মূল্য দেয় না, তারা সারা দেশের স্ত্রীপুরুষকে চিরকাল নাবালক এবং অপরিণত রাখতে চায়। এর বিরুদ্ধেআমার যদি কোনো প্রোগ্রাম থাকে, তা হচ্ছে এক-প্রায়রিটিগতভাবে বলছি না, দুটোই টপ প্রায়রিটি-আমার দেশের সমস্ত লোক যাতে শিক্ষা পায়, তাদের ডিসক্রিমিনেশন তৈরি হয়, তারা যাতে আমাদের দেশের ঐতিহ্যে কি আছে জানতে পারে, জানার ফলে ভাল মন্দ বুঝতে পারে, তারা ক্লাসিকাল সঙ্গীতও শুনুক-এই সমস্ত তাদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য একটা ব্যাপক শিক্ষার প্রোগ্রাম। আর তেমনি, অনেক নয়, অল্প কয়েকটা সেন্টার হবে অব একসেলেন্স। যেখানে খুব রিগরাস ডিসিপ্লিন। নাচতে গেলে রিগরাস ডিসিপ্লিন লাগে, দর্শন শিখতে গেলে, ইতিহাস লিখতে গেলে রিগরাস ডিসিপ্লিন লাগে। সেই ডিসিপ্লিন থাকার ফলে, যারা ডিসিপ্লিন্ড হয়ে বেরোবে তারাই শুধু বেনিফিট করবে না, সমস্ত সমাজ বেনিফিট করবে। আমার মনে হয় আমাদের টু ফোলড এই যে প্রোগ্রাম, এ রকম না হলে সমস্যার কোনো সমাধান নেই।
আমার ধারণা যে আজকে দেশ স্বাধীন হবার পরে গত ৫০ বছরে যারা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সমাজের দ্বারা এলিট হিসেবে স্বীকৃত, তারা তাদের দায়িত্ব একেবোরই পালন করেনি। এলিটদের মধ্যে সকলের স্রষ্টা হবার সামর্থ্য থাকে না, কিন্তু সমাজের বৌদ্ধিক, নৈতিক, রচিগত মান উঁচু রাখার দায়িত্ব তাদের প্রত্যেকেরই থাকে। এলিটের কাজ হলো যদি ভালো নাচ হয়, যদি ভালো ছবি হয়, যদি ভালো সাহিত্য হয়, সাধারণ মানুষের মনে তার প্রতি অনুরাগ, রচি সৃষ্টি করা; যা খারাপ তাকে খারাপ বলা; যা অন্যায়, যা অপচার তার প্রতিবাদ করা। এই দায়িত্ব এড়ানোর অর্থ নিজের কাছে, সমাজের কাছে বিশ্বাসঘাতক হওয়া। এ দেশে তাই ঘটেছে। ফলে যারা এলিট তারা নিজেদের বাজারের কমোডিটিতে পরিণত করছে। সামান্যতম সুযোগ সুবিধের জন্য তারা শক্তিমান এবং বিত্তবানদের কাছে নিজেদের বিক্রি করতে রাজি। সুতরাং তাদের দিয়ে পত্রিকারা যা খুশি লেখাতে পারে, টেলিভিশন যা খুশি বলাতে পারে।
আসলে আমাদের জ্ঞানের ক্ষেত্রেই বলুন, শিল্পের ক্ষেত্রেই বলুন, জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই দরকার ছিল, এখনও আছে, কিছু লোক যারা সমাজের সামূহিক উন্নতির জন্য এই পারস্যুট অ একসেলেন্সকে গুরত্ব দেবেন। আমার বিশ্বাস যে পশ্চিমে তেমন কিছু এলিট গোষ্ঠী আছে, আমাদের নেই। ধরন আমাদের হাতে একটা শক্তিশালী যন্ত্র টেলিভিশন এসে গেল-তারপর রঙিন টেলিভিশন এসে গেছে। কিন্তু তাকে কী ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
আমরা যখন বিদেশে ছিলাম তখন দেখতাম টেলিভিশনে সপ্তাহের পর সপ্তাহ এ্যাসেন্ট অব ম্যান দেখাচ্ছে, সিভিলাইজেশন দেখাচ্ছে হিস্ট্রি দেখাচ্ছে এবং তার রেটিং খুবই হাই। বিলেতে থাকার সময়ে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে দেখেছিলাম তারা প্রতি সপ্তাহে ব্যালে দেখায়-ক্লাসিক্যল ব্যালে দেখায় এবং সেই ক্লাসিকাল ব্যালের রেটিং তারা বলেছে হাইয়েস্ট। অথচ এখানে টেলিভিশনে এ দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাধারণ স্ত্রী পুরুষের পরিচয় ঘটানোর কোনো চেষ্টা নেই, সমকালের নানা জটিল সমস্যার সঙ্গে বৌদ্ধিক পরিচয় ঘটানারে কোনো উদ্যোগ নেই। আছে প্রচুর ন্যাকামি ভাড়ামির ছবি, নানা ভোগবিলাস উন্মাদনার চিত্রায়ন। এ দেশের টেলিভিশন যথার্থই ইডিয়ট বক্স-সেখানে নির্বুদ্ধিতার জয়জয়কার। অথচ এসব প্রোগ্রাম যারা করছে তারা কিন্তু অনেকেই কোয়ালিফায়েড, তার ভেতরে এমন দু-একজনকে আমি জানি যারা আমার পরিচিত, কেউ বিলেত গিয়ে পড়াশানো করে ফিরে এসেছে-ভালমন্দের পার্থক্য জানে না এমন অজ্ঞ লোক নয়।
কিন্তু তাদের ধারণা হয়েছে যে এই মিডিয়ামটা হয়েছে এনটারটেইন করানোর জন্য। এর যে একটা অন্য রোল আছে এটা তারা বোঝে না। আমাদের কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জ্ঞানের চর্চা স্তিমিত। বহুক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে অযোগ্য লোকেরাই সেগুলিতে এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। আমার ধারণা আমাদের সংকটটা সেখান থেকেই শুরু। তাদের নিজেদের (এলিটদের) ভূমিকা কিছু নেই। এবং তারা নিজেদের সম্পূর্ণ বাজারের মাল হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে। আমি এলিট বলতে ইনটেলেকচুয়াল এলিটদের কথা বলছি। আসলে যে পদ্ধতি-প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এলিট হবার যোগ্যতা অর্জিত হয়, সেটিই এ দেশে দ্রত বিলীয়মান। আগে আমরা মনে করতাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছে, এম.এ করেছে, পিএইচ. ডি. করেছে, বুঝি যথার্থ শিক্ষিত ব্যক্তি। এখন দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই বেহুদা পণ্ডিত। না শিখেছে নিজের মতো করে ভাবতে, না লিখতে। সুতরাং আজকে ডিগ্রী দিয়ে বলতে পারবো না যে এ লোকটা উচ্চশিক্ষিত, অন্তত নিজের বিষয়টি ভাল ভাবে জানে। এই কোল্যান্স-টা সাংঘাতিক। এবং এটা সর্বক্ষেত্রে। অপসংস্কৃতি নয়, মননের নিম্নগামিতাই সংকটের প্রধান সূত্র।
(পরবর্তী পর্ব ৭ আগস্ট, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)
ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার
লেখক:
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক
‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি