বাঙালি সংস্কৃতি – পর্ব ২৬

Comments

ষট্‌বিংশ পর্ব

। জুলফিকার নিউটন ।

বাঙালি মন সমন্বয়ধর্মী, আর্য-অনার্য,  মুসলিম-হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিষ্টান, সংস্কৃতির সমন্বয়ে গঠিত। বাঙালি মন একান্তই সনাতন পন্থি এ ধারণা, নিতান্ত ভ্রান্ত, নতুনকে গ্রহণ করবার ক্ষমতা তার অপরীসিম। বাংলাদেশ নরম মাটির দেশ, ওর মনও নরম। সেই মনকে সে প্রয়োজন-মতো নেড়ে চেড়ে, মুচড়ে দুমড়ে, ভেঙে গড়ে বারংবার ঢেলে সাজিয়েছে। দ্রাবিড় মোঙ্গল, কোল-এইসব অনার্যদের নিয়ে সেই কোন যুগে সে তার ঘর বেঁধেছিল। পরে এসেছে আর্য, আরো পরে পাঠান মোগল, সব শেষে ইংরেজ। লড়নেওয়ালা জাত নয়, কাউকেই ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সবাইকেই ঘরে স্থান দিয়েছে। অনার্য ভূমি বলে আর্যরা বরাবর অবজ্ঞা করেছে। যার কৌলীন্যের গুমোর আছে সে নিজের সব কিছুকে আঁকড়ে ধরে থাকে, নিজেরটাকে সহজে ছাড়তে চায় না। বাঙালি গোড়া থেকেই জেনে নিয়েছে যে, সে কুলীন নয়। কাজেই নতুনকে নিতে তার আটকায়নি। কিন্তু একটি জিনিস সে কিছুতেই ছাড়েনি-সে তার বাঙালিত্ব। নতুনকে যখন নিয়েছে তখনও তাকে গঙ্গা জলে ধুয়ে বাঙালি পরিচ্ছদ পরিয়ে তবে ঘরে ঢুকিয়েছে, নিজস্ব কিছু তাতে আরোপ করেছে। প্রবল পরাক্রান্ত আর্য দেবতারাও একেবারে নিষ্কন্টক হয়ে বাঙালির গৃহে প্রবেশ করতে পারেনি। বাঙালির চাতুর্য চতুরান ব্রহ্মাকেও হার মানিয়েছে। অনার্য দেবতা শিবকে সে ব্রহ্মার উপরে স্থান দিয়েছে। পরবর্তীকালে আর্যরাও শিবকে দেবাদিদেব মহাদেব হিসাবে গ্রহণ করেছে। এছাড়া  আর্যদের যত সব পুরুষ-দেবতা বাঙালির ঠিক মনে ধরেনি। সে দেবতাকে রমণীরূপে দেখতে ভালোবেসেছে। বাঙালিকে ভালো করে বুঝতে হলে তার জাতীয় চরিত্রের এইসব প্রবণতার প্রতি লক্ষ রাখা প্রয়োজন। বাঙালির বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বহুস্থানে এসব কথার উল্লেখ করেছেন। দেশজ সংস্কৃতি সম্পর্কে তিনি যে সম্পূর্ণ সজ্ঞান দিলেন এইখানেই তার প্রমাণ। 

এসব কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে বাংলাদেশ সমন্বয়ের দেশ। বিদেশিকে বিধর্মীকে, ভাবগত বিপরীতকেও সে নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেবার চেষ্টা করেছে। চন্ডীদাস চৈতন্য থেকে শুরু রামমোহন রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকল চিন্তানায়ক কাব্যে ধর্মে শিল্পে সমাজসেবায় ওই সমন্বয়ের বাণীই প্রচার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি শিক্ষাপ্রাপ্ত একান্ত আধুনিক যুগের মানুষ হলেও বাংলাদেশের চিরন্তন মনের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ যোগ লক্ষা করেছেন। পাশ্চাত্য শিক্ষা যে তাঁর মনকে অনেকখানি গড়েছে একথা কেউ অস্বীকার করবে না। গাছ যেখানে ডালপালা ছড়িয়ে দেয় সেখান থেকে সে আলো হাওয়া বৃষ্টি জল সূর্যতাপ গ্রহণ করে, কিন্তু মাটির তলায় থাকে তার শিকড়, সেখান থেকে সে রস সংগ্রহ করে। শিকড় উপড়ে নিলে বায়ু জল সূর্যতাপ তাকে রক্ষা করতে পারে না। মনের পরিপুষ্টির পক্ষে দেশজ সংস্কৃতি মাটির রসের ন্যায় কাজ করে। বিদেশিদের মুখে এমন কথা শোনা গিয়েছে যে, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের জন্ম একটা ভৎবধশ- সৃষ্টিকর্তার কৌতুকবিশেষ। তাঁদের মতে এরূপ ব্যক্তির জন্ম ইউরোপে হওয়া উচিত ছিল। 

পাশ্চাত্য বিজ্ঞানকে যেমন সাগ্রহে তিনি অভ্যর্থনা করেছেন, দেশজ সংস্কৃতির প্রতি আবার তেমনি শ্রদ্ধাপরায়ণ ছিলেন। বাংলা ভাষার প্রতি তিনি যে শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন খুব কম লোকেই তা করেছেন। বাংলা ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষার কথা এদেশে তিনিই সর্বপ্রথম বলেছিলেন। পাশ্চাত্য শিক্ষার অন্তরঙ্গ রূপটিকেই তিনি গ্রহণ করেছেন, বহিরঙ্গকে আমল দেননি। বাস্তবিক পক্ষে বাংলাদেশ বাইরে থেকে যখনি কিছু গ্রহণ করেছে আপন বিশিষ্টতায় তাকে বিশিষ্ট করে নিয়েছে। বাঙালি তথা বঙ্গজ সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্য শিক্ষার মিলনে যে আধুনিকতার সৃষ্টি হল- জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেই তার জন্ম হয়েছে- তাঁকে বলা যেতে পারে আধুনিকতার গৌড়ীয় সংস্করণ। 

যৌবনের প্রারম্ভে জমিদারি পরিচালনা ভার পড়েছে রবীন্দ্রনাথের হাতে। এটি তাঁর জীবনের অন্যতম বৃহত্তম ঘটনা। জমিদারি পরিচালনার সূত্রে এই প্রথম সত্যিকারের দেশকে, দেশের মানুষকে প্রত্যক্ষ করলেন। বাংলা দেশের শস্যশ্যামল মুর্তি, তার দিগন্ত বি¯তৃত মাঠ, পদ্মা ভাগীরথীর তীরবর্তী ছোটো ছোটো গ্রাম আর গ্রামে গ্রামে অগণিত অসহায় মানুষকে দেখলেন। তাদের জীবনযাত্রা, আচার ব্যবহার, রীতি নীতি; তাদের গ্রাম্য ভাষা, সংস্কার বিশ্বাস, তাদের দেব-দেবী, পালা-পার্বন-সব কিছুর প্রতি তাঁর কৌতুহলী দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। বঙ্গলক্ষ্মীর যে কল্যাণমূতি সেদিন তাঁর নয়ন মনকে মুগ্ধ করেছিল- তার মাঠের মাঝে, নদীতীরে, আম্রবনঘেরা সহস্র কুটিরে, দোহন- মুখর গোষ্ঠে, ছায়াবট মুলে, গঙ্গার পাষাণ ঘাটে, দ্বাদশ দেউলে- তাঁর পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং পশ্চিম পর্যটনও সেই মুর্তিকে কোনোকালে স্লান করতে পারেনি। অথচ শিক্ষায় দীক্ষায় আচারে রুচিতে বঙ্গজননীর অগণিত সন্তানের সঙ্গে কোথাও তাঁর মিল ছিল না। প্রকৃত ভালোবাসা সর্বজয়ী। মা যেমন তাঁর কানা খোড়া পঙ্গু ছেলেকেও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন, দেশকে ভালোবাসলেও তার সমস্ত অসম্পূর্ণতা নিয়েই তাকে ভালোবাসতে হয়। ছিন্নপত্রের পাতায় পাতায় সেই ভালোবাসা বিচিত্র রং-এ রঙিন হয়ে ফুটে উঠেছে। ছিন্নপত্র এবং গল্পগুচ্ছ দুই-এ মিলে বাংলাদেশের এক অতি বিশ্বস্ত ইতিহাস রচনা করেছে। গল্পগুচ্ছের গল্পে বাংলাদেশের অন্তরঙ্গ চিত্র তিনি এঁকেছেন, কোনো ইতিহাস গ্রন্থে তা পাওয়া সম্ভব নয়। ছিদাম রুই-এর বই চন্দরার কাহিনি-কোন্ ঐতিহাসিক আমাদের শোনাতেন! মুক কন্যা সুভার কাহিনি না জানলে বাংলাদেশের মৌনী প্রকৃতির বেদনা কী করে আমরা জানতাম? 

কোনো দেশেরই সংস্কৃতি কেবলমাত্র নগরজাত কিংবা নগরবাসীর নয়। রক্ত যেমন শিরায় উপশিরায় সর্বাঙ্গে প্রবাহিত, দেশের সংস্কৃতিও শহরে বন্দরে গ্রামে গ্রামে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সঞ্চারিত। লোকচার, লোকসংগীত, লোকসাহিত্যে তার প্রকাশ। বিংশ শতাব্দির প্রারম্ভে রবীন্দ্রনাথই প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন যে, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বাৎসরিক সম্মেলন কেবল ঢাকায় না হয়ে যেন পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। এবং ওই উপলক্ষে সেই জেলার ‘ধর্মকর্ম, ভাষা সাহিত্য বাণিজ্য লোক- ব্যবহার ইতিহাস জনশ্রুতির বিবরণ’ সাধ্যমত আহ্ররণ করবার প্রস্তাবও তিনি করেছিলেন। এছাড়া প্রাচীন পুথি, পুরালিপি, প্রাচীন মুদ্রা সংগ্রহের প্রদর্শনী এবং স্থানীয় লোকপ্রচলিত যাত্রাগান প্রভৃতির আয়োজন তিনি অবশ্যকর্তব্য বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্বদেশের স্বরূপকে পরিপূর্ণরূপে জানবার জন্যে যাত্রা, কবিগান, কীর্তন, কথকতা, ব্যায়াম এমনকী ভোজবাজির উল্লেখ করতেও ভোলেননি। গ্রাম-প্রচলিত ছেলেভুলানো ছড়া পরম আদরে সংগ্রহ করেছেন এবং পরম সমাদরে তার আলোচনা করেছেন। এ সমস্তই দেশজ সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার নিদর্শন। 

দেশের মনকে স্পর্শ করতে হলে সেই মনের প্রবণতার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা প্রয়োজন। স্বদেশি আন্দোলনের যুগে তিনি যে এমন করে দেশকে মাতিয়ে তুলতে পেরেছিলেন তার কারণ তাঁর অধিকাংশ স্বদেশি সংগীতে তিনি বাংলার লোক-সংগীতের সুর যোজনা করেছিলেন-কোথাও বাউল কোথাও কীর্তন কোথাও রামপ্রসাদি সুর বাংলাদেশ সেদিন যেমনভাবে নিজে পেয়েছিল এমন আর কোনোদিন পায়নি। তার কারণ তার মনের কথা তার আপন ভাষায় আপন সুরে সে শুনতে পেয়েছিল। সেদিন কবি যে গান গেয়েছিলেন সে গান বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু থেকে অতি সহজে  উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। বি¯তৃত আলোচনার মধ্যে না গিয়েও সংক্ষেপে এ কথা বলা যেতে পারে যে, রবীন্দ্রসংগীতের মূল প্রকৃতি লোকসংগীত-জাত। লোকসংগীত সর্বত্রই কথাপ্রধান; শাস্ত্রীয়-সংগীত সুরপ্রধান, কতার সেখানে প্রাধান্য নেই। রবীন্দ্রসংগীতে কথা এবং সুর সমান প্রাধান্য লাভ করেছে। বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের যে গভীর আস্থা এবং শ্রদ্ধা তার সুষ্পষ্ট প্রকাশ ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে। নিঃসন্দেহে আধুনিক ভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ মোহমুক্ত মন নিয়ে দেখতে পেরেছেন বলেই বাঙালি সমাজের শক্তির উৎসটি তিনি অতি সহজে আবিস্কার করতে পেরেছেন। 

রবীন্দ্রনাথ যে যুগের মানুষ সে যুগে অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষার প্রথম প্রহরে দেশের অতীতকে উপহাস করা যত সহজ ছিল, শ্রদ্ধা করা তত সহজ ছিল না। সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহাওয়ায় লালিত হয়েও তিনি যে দেশজ সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবান হতে পেরেছেন সেটা গতানুগতিক দেশপ্রেমের নির্বিচার আনুগত্য নয়। এটি কবিমনের স্বাভাবিক প্রবণতা! দেশের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা না করে কোনো দেশের কোনো কবি মহাকবি আখ্যা লাভ করেননি। এমন যে অত্যুগ্র মধুসুদন তাঁকেও শেষ পর্যন্ত হোমার ভার্জিল দান্তে মিল্টনকে ছেড়ে বাল্মীকির শরণাপন্ন হতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের জীবনের পথভ্রমের দুর্বিপাক কখনো ঘটেনি। বাংলার শ্যামল প্রকৃতি এবং বাঙালির সজীব মন প্রথমাবধিই তাঁর মনকে হরণ করেছে। লক্ষ করবার বিষয় যে, বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে- পালরাজা সেনরাজাদের আমল থেকে রামমোহনের আমল পর্যন্ত- শৌর্যে বীর্যে কীর্তিতে এমন বৃহৎ কিছু ছিল না যা তাঁকে প্রেরণা জোগাতে পারত। অবশ্য প্রেরণার জন্য সব সময়ে বৃহৎ ঘটনার প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের মন ঘটনাবিলাসী নয়। প্রেরণা যদি পেয়ে থাকেন তো বাংলদেশের সর্বাঙ্গীণ জীবন থেকেই পেয়েছেন। সেখানে বৃহৎ কিছু না থাকলেও মহৎ কিছু ছিল। তার প্রমাণ ইতিহাসে খুঁজবার প্রয়োজন হয় না, প্রমাণ তার ভাষায়। শুন্যগর্ভ জাতির ভাষায় কোনো সমৃদ্ধি থাকে না। বাঙালির যেএমন সুন্দর ভাষা সৃষ্টি করতে পেরেছিল তার কারণ সে ভাবতে শিখেছিল। 

ভাবপ্রবণতা এবং সৌন্দর্যপ্রীতি বাঙালি-চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই দুই-এ মিলে এমন সুন্দর ভাষার সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাষাকে শতগুণে সমৃদ্ধ করেছেন কিন্তু তিনি এই ভাষার স্রষ্টা নন। কোনো দেশেই কোনোএক ব্যক্তি ভাষা সৃষ্টি করেন না। ভাষা গোষ্ঠীজীবনের সম্পত্তি। বাংলা ভাষা সমাজের সৃষ্টি। সে গৌরব তার। রবীন্দ্রনাথ গান্ডিবধন্বা, কিন্তু সে গান্ডিব বাঙালি সমাজের দান। বৈষ্ণবপদাবলির দেশ-যেদিন প্রথম পদাবলি-সাহিত্য রচিত হয়েছিল। সেই দিনই এ দেশে রবীন্দ্রনাথের জন্ম সুচিত হয়েছে।চসারের দেশে যেমন শেকসপিয়রের জন্ম অস্বাভাবিক নয়, বৈষ্ণবপদাবলির দেশে তেমনি রবীন্দ্রনাথের জন্মও অস্বাভাবিক নয়। বাঙালিমনের গীতধর্মী উচ্ছলতা বৈষ্ণব-কাব্যে যেমনভাবে প্রকাশ পেয়েছে এমন আর কোথাও নয়। বৈষ্ণবপদাবলি যে রবীন্দ্রনাথের লিরিক প্রতিভাকে উঞ্জিবিত করেছে এ বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। বোধ করি এ-জন্মের ঋণ পরিশোধ করবার জন্যেই কবি পরজন্মে ব্রজের রাখাল-বালক হবার সাধ প্রকাশ করেছিলেন। 

এ পর্যন্ত অনেকটা একতরফা কথাই বলে এসেছি অর্থাৎ বাঙালিসংস্কৃতির জয়গান করেছি। এখানে বলে নেওয়া ভালো যে, কোনো দেশেরই সংস্কৃতিতে সকল জিনিস সংস্কৃত নয়। অনেক অসংস্কৃত এবং অসংগত জিনিসও এর মধ্যে স্থান পায়। এ কথা নিশ্চিত যে, বাঙলি সংস্কৃতির কোনো কোনো জিনিসকে রবীন্দ্রনাথ সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করতে পারেননি। বাংলাদেশের শাক্তসাধনা এবং তৎসংশ্লিষ্ট মঙ্গলকাব্য আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে কিন্তু সে জিনিস খুব যে তাঁর মনে ধরেছিল, এমন মনে হয় না। মঙ্গলকাব্যে শক্তির খামখেয়ালিপনার কাছে মানুষের নতিস্বীকার তাঁরকাছে মানবচরিত্রের অবমাননা বলে মনে হয়েছে। সেই যুগে নানাবিধ রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের ফলে জীবনে অনিশ্চয়তার ভাব এসে গিয়েছিল- আজ যে রাজা কাল সে ফকির। শক্তিমানের শক্তির আস্ফালন এবং দুর্বলের অসহায়তা এমন উৎকট হয়ে দেখা দিয়েছিল যে, সাধারণ মানুষ আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। সমস্তই এক খামখেয়ালি শক্তির ক্রিয়াকলাপ, এই বিশ্বাসে তার কৃপালাভের লোভে তার কাছে পূজা মানত করেছে। এর মধ্যে তিনি কোনো মহৎ আদর্শের পরিচয় পাননি। তবে এক কালের বাঙালিসমাজ- বাঙালির নানা বিশ্বাস, নানা সংস্কারের চিত্র হিসাবে এর যে বিশেষ মূল্য আছে, সে কথা কেউ অস্বীকার করবে না। রবীন্দ্রনাথও এ-জাতীয় কাব্যের একটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে এ সব কাব্য একেবারে পল্লির প্রাণ থেকে উৎসারিত। পুরাণে নাই, রামায়ণে নাই, মহাভারতেই নাই এমন অনেক কাহিনিও ‘দেশের সাধারণ লোকের মধ্যে ঝাঁক বাঁধিয়া বেড়ায়। তারপরে একজন কবি সেই টুকরো কাব্যগুলিকে একটা বড়ো কাব্যের সূত্রে এক করিয়া…… মার্জিত ছন্দে গম্ভীর ভাষায় বড়ো করিয়া দাঁড় করাইয়া দেন।’ চন্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসার ভাসান এই জাতীয় কাব্য। এই সব কাব্য আর কিছু না করুক অজ্ঞাতনামা গ্রাম্যকবির ভাঙা ছন্দের গ্রাম্য ভাষার কাব্যকে পল্লির আঙিনা থেকে এনে সাহিত্যের দরবারে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। এই সত্যটি রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেছেন। 

আমাদের মহাকবি হিসাবে রবীন্দ্রনাথ যেমন আমাদের সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক তেমনি তিনি তার কঠোর সমালোচক। এই সূত্রে আরেকটি কথা উল্লেখযোগ্য। বহু শতাব্দীর সংস্কৃতি যিনিনিজের মধ্যে সম্পুর্ণরূপে গ্রহণ করতে পারেন তিনিই জাতীয় কবির সম্মান লাভ করেন। কিন্তু প্রত্যেক মহাকবির বেলায় একথা প্রমাণিত হবে যে, তাঁর আবির্ভাবকালে তিনি দেশের সংস্কৃতিকে যে অবস্থায়লাভ করেছিলেন তিরোধানকালে তাকে তিনি ঠিক সেই অবস্থায় রেখে যান না। তাঁর আপন সম্পদে তিনি তার সৌষ্ঠব অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েযান। রবীন্দ্রনাথের যখন আবির্ভাব তখন আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি সবে মধ্যযুগের চৌকাঠ পার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আকাশচারী মিতাটির মতো সাত ঘোড়ার রথ চালিয়ে আমাদেরকে একেবারে ঊর্ধ্বশ্বাসে বিংশ শতাব্দীতে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রসম্ভারে পুষ্ট বাঙালিমন আজ বিশ্ব সংস্কৃতির খাঁটি সমজদার। বাঙালি সংস্কৃতি বিশ্বসংস্কৃতির অংশীদার, কারণ বিশ্বের ভান্ডারে সে অনেকখানি দিয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির কাছে রবীন্দ্রনাথ যতখানি ঋণী, আজকের বাঙালিসংস্কৃতি আবার রবীন্দ্রনাথের কাছে ঠিক ততখানিই ঋণী।

(পরবর্তী পর্ব ১৪ আগস্ট, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)

ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার

লেখক:
Julfikar Newton
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট