সপ্তবিংশ পর্ব
। জুলফিকার নিউটন ।
বাঙালীয়ানা একটি বিস্তৃত ধারণা যা বাঙালি জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনযাত্রার একটি সম্মিলিত পরিচয় বহন করে। এটি শুধুমাত্র ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়, বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ও বিবর্তনের ফসল।
বাংলা ভাষাই হলো বাঙালীয়ানার প্রধান ভিত্তি। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির যে আত্মত্মপরিচয় দৃঢ় হয়েছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের প্রতীক। বাঙালি সংস্কৃতি বহু পুরনো এবং সমৃদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে: উৎসব দুর্গাপূজা, ঈদুল ফিতর, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যিকদের বিশাল অবদান। লোকসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, আধুনিক গান, বাউল গান। মাছ-ভাত, পিঠা-পুলি, মিষ্টি, ভর্তা ইত্যাদি খাদ্যরীতি বাঙালীয়ানার অপরিহার্য অংশ। ইতিহাস ও বিবর্তন, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, তুর্কি, মোঙ্গলসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে বাঙালি জাতি একটি সংকর জাতি হিসেবে গড়ে উঠেছে, যা এর সংস্কৃতিতে বৈচিত্র এনেছে। বাঙালীয়ানা মানে মাটির ঘ্রাণে গর্ব, ভাষায় ভালোবাসা, মানুষে মানুষে মমতা ও সহমর্মিতা। এটি কেবল পোশাকে নয়, মনোভাবে নিহিত।
পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বাঙালী হতে চায়। উচ্চচিত্তরাও কেউ কেউ উদ্দীপ্ত হয়। এমনকি সানকিতে করে পান্তা ভাত পর্যন্ত খেতে প্রস্তুত থাকে। অনেকে আছেন যাঁরা বলেন এটি একটি ঠাট্টা, সেই বাঙালীর সঙ্গে সানকি ছাড়া যার উপায় নেই, পাস্তা আনতে যার লবণ যায় ফুরিয়ে। কথাটা মিথ্যে নয়। সানকিতে করে পান্তা ভাত কেউ সখ করে খায় না। খায় বাধ্য হয়ে। পেলে গরম ভাত খেতো। কাচের বাসনে, মাছ ও মাংস সহযোগে। তবে ওই যে বাঙালী হবার চেষ্টা বিত্তবানদের তাতে যে আন্তরিকতা নেই এমন তো বলা যাবে না। আছে। বাঙালী হবার আগ্রহটা আছে। কিন্তু বাঙালী হবার উপায় নেই; গরীব মানুষ যেমন গরীব হয় নিরুপায় হয়ে, ধনীও তেমনি অবাঙালী হয় বাধ্য হয়ে। আমরা তো সেই দিন চাইবো, স্কুল, যেদিন কাউকেই সানকিতে করে পান্তা ভাত খেতে হবে না, এবং বিপরীতে বাঙালী হবার জন্য কারো পক্ষে সানকি ও পাস্তা ভাতের খোঁজ করার আবশ্যকতা দেখা দেবে না। একেবারে অভিন্ন না হোক, কাছাকাছি থাকবে সবাই। সর্বোপরি, এই ভূমিতে উদ্বাস্তু হবে না কেউই, এখন যেমন হচ্ছে।
বাঙালী মনে করে অন্যেরাও খায় বটে, কিন্তু খেতে জানে না। বাঙালী জানে। অন্য দেশের কেউ ঝাল খায় না, কেউ তেল নয়, কেউ নয় দুধ। চীনারা যদিও এর কোনোটাই খায় না, তবু চাইনিজ খাদ্য হালের বাঙালীর খুব পছন্দ। এই স্ববিরোধিতা বড় ঘটনা নয়। বড় ঘটনা হলো বাঙালী মনে করে অনেক ব্যাপারেই সে সেরা- এই খাবার ব্যাপারেও। বাঙালী খুব ভাত খায়। ভাত আরো অনেকেই খায়, কিন্তু এতো ভাত মনে হয় পৃথিবীর অন্যকেউ খায় না। আমাদের একজন প্রবীণ কবি তাঁর ছোট্ট একটি বই ‘খাদ্যভূবনে’ তার চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। হ্যাঁ, সেখানেও ভাত দেখেছেন। তবে তার পরিমাণ অন্যরকম। আস্ত একটা ডিনার টেবিলে যতটা ভাত সরবরাহ করা হয়েছে একজন বাঙালী এক বসাতেই তার বন্দোবস্ত করে দিতে পারে। তবু বাঙালী নিজেকে হাভাতে মনে করে না। কখনো নয়। খাওয়াতে তার উৎসাহ আছে। খাওয়াতে প্রতিযোগিতা আছে। কোন ভোজে কেমন খাবার দেওয়া হয়েছে তার কথা ওঠে। প্রতিযোগিতাও রয়েছে- যেমন দেওয়াতে, তেমনি খাওয়াতেও। আর এটা তো খুবই সত্য কথা যে, বাঙালী যতই থাক নিজেকে পেটুক ভাবে না, ভাবে রসিক। ভোজনরসিক। আর সত্য এও যে, বাঙালী সমস্ত কিছুকেই ভোজের উৎসবে পরিণত করে। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যত ঘটনা আছে, শোকের কিম্বা আনন্দের, পারলে সবকিছুতেই সে খেতে চায়। ডায়েবেটিক রোগীও হাঁক পাড়ে, কই মিষ্টি কোথায়। বড় দুঃখে গেল মুজিব বলেছিল, সামলাতে পারছেন না, যাই আনে চাটার দল সব চেটে শেষ করে দেয়। আমরা বিশ্বাস করতে পছন্দ করেছি যে, তিনি তাঁর নিজের দল সম্পর্কে বলেছেন ওই কথা; কিন্তু কেবল তাঁর নিজের দলে কি, সব দলেই কি ওইরকমের লোক নেই, নেই কি দলের বাইরেও? বাঙালী কি ওই কাজে আগ্রহী নয়, বিশেষভাবে? অন্য সবকিছু তো রয়েছেই, এমনকি পা-ও চাটে, বাদ দেয় না। বাঙালী সবকিছুই খায়, হাওয়া ও পানিসহ; যা পছন্দ করে তা খায়, যা অপছন্দ করে তা-ও, যেমন ধমক।
কিন্তু বাঙালীকে আলাদা করে দোষ দিই কোন লজ্জায়? পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ আছে, জাতি আছে যারা খেতে চায় না? প্রাচীন গ্রীকরা খেতো। রোমানরা তো অতিভোজনের জন্য বিখ্যাতই ছিল। চীনারা দেড় শ’পদ দিয়ে টেবিল সাজাতো, এবং ঘন্টার পর ঘণ্টা ধরে তাদের সেবা করতো। ফরাসীরা রন্ধন দক্ষতার জন্য প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল; এবং ইংরেজরা সেই তুলনায় পশ্চাদপদ বলে হীনমন্যতায় ভুগতো। খাবার ছাড়া কার চলে? খাবার জন্য না বাঁচুক, না-খেয়ে কে বেঁচেছে কবে?
সবাই খায়। সকল পক্ষীই মৎস্যভক্ষী, দোষ কেবল মাছরাঙার। তবে, হ্যাঁ, মাছরাঙারা একটু বেশী উৎসাহী- মাছের ব্যাপারে। বাঙালীও তাই কেবল মাছ নয়, ডাল, শাকসজি, মাংস যে কোনো খাদ্যের ব্যাপারেই তার খাই-খাইটা একটু অধিক। সম্প্রতি “পদ্মা নদীর মাঝি” উপন্যাসটি চিত্রায়িত হয়েছে, সেখানে কুবেরকে দেখা যাচ্ছে ঘন ঘন খাচ্ছে। “পথের পাঁচালী’র চলচ্চিত্র রূপেও তাই, খাবার-দাবারের কথা আসে বারে বারে। এসব ঘটনা তুলনায় সাম্প্রতিক, প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালীর খাদ্যোৎসাহ যেমন প্রবল, তেমনি গভীর। চর্যাপদের কবি যেমন “হাঁড়িতে ভাত নাহি” বলে আক্ষেপ করেন, তেমনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুকান্ত ভট্টাচার্য, পূর্ণিমার চাঁদ দেখে ঝলসানো রুটির কথা মনে পড়ে যাওয়ায়।
ঈশ্বর গুপ্তকে যে খাঁটি বাঙালী কবি বলা হয়েছে তার একমাত্র কারণ খাদ্যের ব্যাপারে তার উৎসাহ এমন দাবি অবশ্যই অসঙ্গত হবে; কিন্তু ওটি যে তার একটি অত্যন্ত বড় কারণ তাতে কেউই সন্দেহ প্রকাশ করবেন না, আশা করি। সেই তুলনায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত কম বাঙালী। তবে তাঁর সময়ের ইয়ং বেঙ্গল যে বিদ্রোহ করেছিল অনেক ক্ষেত্রেই তা গরুর মাংস ও মদ খাওয়া অতিক্রম করে আর এগুতে পারে নি। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে খাদ্যের আয়োজন অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও আকর্ষণীয়। বুদ্ধদেব বসুর বর্ণনা তো প্রায়ই জিভে জল এনে দেয়। এমন কি রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও যে খাবার-দাবার নেই তা নয়। রামায়ণের অনুবাদ করেছেন কৃত্তিবাস, তাতেও দেখা যাচ্ছে বাঙালীর খাদ্য চমৎকার ভাবে প্রবেশ করেছে। যেমন, “প্রথমত শাক দিয়ে ভোজন আরম্ভ।” তারপর, “ঝোল আদি করি পঞ্চাশ ব্যঞ্জন/ক্রমে ক্রমে সবাকারে কৈল বিতরণ।/শেষে অম্বলান্তে হইল ব্যঞ্জন সমাপ্ত/দধি পারে পরমান্ন পিষ্টকাদি যত।”
পাশাপাশি লোকজ যে সাহিত্য- “ময়মনসিংহ গীতিকা” সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে “নিমপাতা কাসন্দির ঝোল, তেলের উপর দিয়া তোল/পলতা শাক রুহি মাছ। বলে ডাক ব্যঞ্জন সাঁচ। মদগুর মৎস্যদা’য়ে কাটিয়া। হিং আদা লবণ দিয়া পোনা মাছ জামিরের রসে। কাসন্দি দিয়া সজনে পরশে। ছৈলা তৈলে ভাজিয়া। পাতি দেবু তাহাতে দিয়া।/পোড়ামাছ লবণ প্রচুর। আর ব্যঞ্জন পেলাহ দূর।” সোনার বাংলার কথা আমরা বলি, সে বাংলা কেমন ছিল; কে জানে, হয়তো গোলাভরা ধান ছিল, পুকুরভরা মাছ। কিন্তু সকলের যে গোলা ছিল না, ছিল না পুকুর তা জানি; তবে যার ছিল না তারও স্বপ্ন ছিল- এটা মানি। “ময়মনসিংহ গীতিকা”তেই রয়েছে, “সোনার বাটিতে রাখে দধি দুগ্ধ ক্ষীর/ঘরে মজা সবরি কলা কইরা দিল চির।” দধি দুগ্ধ ক্ষীর, ঘরে জমা সবরি কলা ঠিক আছে; কিন্তু সোনার বাটি- সেটি এলো কোত্থেকে? উৎস একটাই (বলা বাহুল্য)- সে হচ্ছে কল্পনা। স্বর্ণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বকপোলকল্পিত; তবে খাদ্য নয়। সোনার বাংলাকে কল্পিত বলে উড়িয়ে দিতে পারবেন, কিন্তু খাদ্যের বাংলাকে উড়িয়ে দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। খাবার পরে পানও আছে, যেমন থাকে। ওই গীতিকাই বলছে, “তাম্বুলে সাজায় কন্যা সোনার বাটাখানি।”
“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”- বাঙালীর প্রার্থনা কদাচিৎ এর চেয়ে দূরে গেছে। তাই না? তবে থাকে না। দুধে ভাতে থাকে না। দুধ পায় না, ভাতও পায় না। “প্রথমত শাক দিয়া ভোজন আরম্ভ”- ‘ময়মনসিংহ গীতিক’র এই প্রথা আজও বিদ্যমান। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাকই প্রধান হয়ে ওঠে। সব্জি পেলে তো বর্তে যায়। যে মাছের কথা অতো বলেছি আমরা; ১৯৮৩ সালেও জাতিসংঘর খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) তার রিপোর্টে বলেছে “অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে প্রাপ্য মাছের দিক থেকে বাংলাদেশ সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ধনী দেশ।” কিন্তু হায়, সে-মাছ আজ কোথায়?
বাঙালী ডাল-ভাতের কথা বলে। বলে, আমার বাড়িতে চাট্টে ডাল-ভাত খাবেন। রাজনীতিকরাও প্রতিশ্রুতি দেন। বলেন, জনগণের জন্য আর কিছু না পারেন অন্তত ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সোনার বাংলায় সোনা তো পরে হবে ডালও তো পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আজকে বলে নয়, প্রাচীনকালেও ডাল পাওয়া কষ্ট ছিল। ওই যে প্রবীণ কবি যিনি বই লিখেছেন (খাদ্য ভুবন নামে) অনেকটা বিস্ময়ের সঙ্গেই লক্ষ্য করেছেন, “প্রাচীন বাঙালীর খাদ্যসূচিতে ডালের উল্লেখ দেখা যায় না। এর আসল কারণ তখনকার দিনে বাংলা বিহার উড়িষ্যায় ডালের উৎপাদন ছিল স্বল্প।” তিনি বলছেন, হয়তো একালও এই অঞ্চলে যত ডাল ব্যবহৃত হয় তার বেশীর ভাগ বহির্জাত। অসচ্ছল গরীব সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে এখনও ডালের ব্যবহার সীমিত। ওদের কথায়, “যে পয়সা দিয়ে ডাল কিনবো সে পয়সায় শাক শুটকি মরিচ-পেঁয়াজ ঝাল-রস খেতে পারি।” ঠিক কথা, সন্দেহ কি। হালের কৃষি বিশেষজ্ঞরাও লক্ষ্য করেছেন যে, বাংলাদেশে গমের চাষ যে পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ঠিক সেই পরিমাণেই ডাল ও সর্ষের চাষ কমেছে। অথচ ডাল ও সর্ষে দুই-ই বাঙালীর অতিশয় প্রিয়সামগ্রী। বাঙালী তার বাঙালিত্ব রক্ষা করে কি করে? বিপদ যে চতুর্দিকে।
না মূল প্রশ্ন এটাই যে, ঠিক বাঙালীয়ানা কাকে বলব। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাঙালি আজ কি একটা খিচুড়ি মার্কা সংস্কৃতি আনতে চাইছে? এখনকার প্রজন্মের শতকরা নিরানব্বই জন বঙ্গ যুবক ধুতি পরতে জানে না। চায় না কি? হ্যাঁ, চায়। উৎসব অনুষ্ঠানে বা বিয়ের আসরে আজকাল খুব ধুতির চল হয়েছে- কিন্তু সে ধুতি বিচিত্র নক্সা পাড়ের বা বহুমূল্য রঙিন সিল্কের। হয়তো কটকটে লাল সিল্কের পাঞ্জাবি আর ওই রঙেরই ধৃতি- পাঞ্জাবিতে তৎসহ সোনালি সুতোর কাঁথা কাজ বা চোখ ধাঁধানো এপ্লিকের কারুকৃতি। ব্যাপারটা ঠিক বাঙালীয়ানা নয়, বরং দেখনদারি। অর্থের, সচ্ছলতার, কাণ্ডজ্ঞানহীনতার দেখনদারি। অন্তত এক দশক আগেও এর আভাস পাওয়া যায়নি। দেশের গড়পড়তা মানুষের অবস্থা এত শোচনীয়, এত যে ক্ষুৎকাতর, এতটাই যে তারা বিবেশ-আমাদের উৎসবে তার কোনো রেশ নেই।
উৎসবের চেহারাটাও পালটে গেছে। শোকের চেহারাও। এখন কারওর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে যাঁরা ছুটে যান তাঁরা ফুলের গুচ্ছ নিতে ভোলেন না। পরে ব্যাপার-স্যাপার দেখে মনে হয় শবদেহ না ফুলের পাহাড়? এও তো দেখনদারি। দেখেশুনে কবি সুভাষ মুখোপ্যাধায় লিখেছিলেন, ‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও/ আমার লাগছে।’ আমি একজন বিখ্যাত ব্যক্তির মৃতদেহের সঙ্গে একবার হাঁটছিলাম। লরিতে তাঁর শবদেহ, পিছনে আর একটি লরিতে ফুলের বিপুল সম্ভার। হিন্দি সিরিয়ালে মৃত্যু মানেই বিশাল হলের মাঝখানে শায়িত মৃতদেহ আর নিখুঁত সাদা পোশাকে সমবেত আত্মজন ও রবাহতদের নীরব অবস্থান। একজনও চকিত মৃত্যুর আকস্মিকতায় এমন দিশাহারা নন যে যা পরেছিলেন খবরটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে সেই উলটোপালটা পোশাকে উশকোখুশকো চুলে চলে এসেছেন। খবরটা শুনে ধীরে-সুস্থে আলমারি খুলে সযত্নে রাখা শ্বেতশুভ্র কুর্তা পাজামা এবং সাদা শাড়ির ব্লাউজ পরে তবে আসবেন- ড্রেস কালচার লঙ্ঘন করা কি ঠিক হবে? ভয়ানক বিপর্যয়কর আকস্মিক ও অভাবিত অকাল মৃত্যু- তাতে কি দেখনদারি টাল খেতে পারে?
দেখনদারির এই বাড়াবাড়ির কারণ হল দুনিয়াদারির সংকট। সেই কবে যেন লালনশাহ ফকির লিখে গিয়েছিলেন দ্যাখো কি ঝকমারি। এই দুনিয়াদারি।
এখানে দুনিয়াদারি মানে পার্থিবতা। পার্থিব জীবন মানুষের বরাবরই ছিল- কিন্তু তার এক নির্জন একক বিবেচনার জগৎও তো ছিল। ছিল স্বাতন্ত্র্য আর নিজস্ব ধ্যানের পরিপার্শ্ব। সকলেরই এক খাদ্য, এক পোশাক, এক রকম শোকাবেগের প্রকাশ, একই রকম নিষ্প্রাণ হাততালি, একই রকম করমর্দনের চাপ, একই ঠোঁট চাপা মাপা হাসি, একই ঢঙে সমজদারির প্রকাশ- কি রকম একঘেযে কৃত্রিম লাগে না? একই ভাবে রবীন্দ্রজয়ন্তী আর রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য।
বাঙালীয়ানার সত্যিকারের সূতিকাগার তো বাঙালি পারিবারিকতার মধ্যেই বরাবর ছিল। সে স্বদেশেই হোক বা প্রতিবেশী দেশেই হোক। ভাগলপুরের বনফুল, পূর্ণিয়ার সতীনাথ ভাদুড়ি, ঢেঙ্কানলের অন্নদাশঙ্কর কলকাতার সত্যজিৎ রায় কিংবা দ্বারভাঙার বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় কি অশনে-বসনে কিছু কম বাঙালি ছিলেন? ঢাকার শওকত ওসমান, কবীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মুস্তফা নুর উল ইসলাম, আলাউদ্দিন আল আজাদ, কামাল লোহানী, আনিসুজ্জামান, চট্টগ্রামের আবুল ফজল, মাহবুবুল আলম, জামাল নজরুল ইসলাম, রাজশাহীর হাসান আজিজুল হক, কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অজিত গুহ প্রমুখ কি অবাঙালি ভেবেছেন কেউ? অথচ তাঁদের অনেকেই যাকে বলে ‘আন্তর্জাতিক মানুষ’ তা-ই তো ছিলেন। বহুভাষাভাষী, খাটি বাংলা তো বটেই ইংরেজিতে রীতিমতো দড়ো-কিন্তু ইংরেজিআনা ছিল না কোথাও। খোদ লন্ডন শহরে বাস করে ‘আত্মঘাতী বাঙালি’র লেখক, যাঁর আদ্যন্ত ছিল সাহেবিয়ানায় জবরদস্ত, তিনিও বাড়িতে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে থাকতেন। বাঙালীয়ানার মূল সংকট এখন এটাই যে দেশের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য-ভাষা বা লোকাচার সম্পর্কে আগ্রহ কমে আসছে নতুন কালের বাঙালি ছেলেমেয়েদের আমরা উদ্বুদ্ধ করতে পারছি না তেমন করে। তাদের সামনে আরও অনেক উত্তেজনাপ্রদ আকর্ষণীয় বিষয় এসে গেছে প্রযুক্তিবাহিত হয়ে। বিশ্বায়নের নামে সেসব অনর্থ দিব্যি পার পেয়ে যাচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করো নি। জননীকে বলেছিল ও কথা। বাঙালী মানুষ হয়েছে কি গত একশ’ বছরে? কতটা? নি। হিন্দু হয়েছে, মুসলমান হয়েছে, ধনী হয়েছে, দরিদ্র হয়েছে কিন্তু মানুষ তেমন হয় মানুষ হবার প্রথম শর্তই হচ্ছে বাঙালী হওয়া। বাঙালী হলেই যে মানুষ হবে তা নয়, “রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি”- এ-তো রবীন্দ্রনাথেরই কথা, কিন্তু বাঙালী না হলে কিছুতেই সে মানুষ হতে পারবে না। বাঙালী হওয়ার অর্থ কি?
না, কেবল বাংলা ভাষা বলা বা ব্যবহার করা নয়। সেটা বিদেশীরাও পারে, যদি তারা ইচ্ছা করে। বাঙালী হওয়ার অর্থ হচ্ছে একদিকে যেমন বাংলা ভাষা ব্যবহার করা অন্যদিকে তেমনি বাঙালীর জন্য সহানুভূতি থাকা। অন্য বাঙালীর দুর্দশায় যে বিপন্ন বোধ করে এবং তাকে সাহায্য করতে চায় সেই বাংলাভাষীকেই বাঙালী বলা চলে। বাঙালী সম্পন্ন হবে, কিন্তু সংলগ্নও হবে, পরস্পরের। আপনি শ্রেষ্ঠ বাঙালী, কেননা একদিকে আপনি বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি, অন্যদিকে বাংলার দুঃখে সর্বাধিক পরিমাণে কাতর একজন মানুষ।
কিন্তু এই যে, একাধারে সম্পন্ন ও সংলগ্ন হওয়া এ নেই আজ বাঙালীর মধ্যে। সম্পন্নরা তো বটেই, দরিদ্ররাও পরস্পর-বিচ্ছিন্ন। রবীন্দ্রনাথ এলে উন্নতির অনেক হাম্বড়াই দেখতে পেতের চতুর্দিকে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা দেখতেন সঙ্গে সঙ্গে; এবং পীড়িত হতেন।
রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেন বাঙালি সন্তানেরা সবাই গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া হোক। তারা ঘরকুণো থাকবে না, বেরিয়ে পড়বে, জয় করবে সারা বিশ্ব। গৃহছাড়া সে-ই হতে পারে যার গৃহ আছে- নইলে ছাড়বে কি? কেমন করে? অধিকাংশ বাঙালীর আজ গৃহ নেই। মন্বন্তর, বঙ্গভঙ্গ, স্বাধীনতা যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িকতার নীরব লড়াই- সবকিছুই গৃহহীন করেছে বিপুল সংখ্য বাঙালীকে। ভূমিহীন উপেনের সংখ্যা আজ একটি দু’টি নয়, লক্ষ কোটি, তাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভেদ নেই, দলে দলে তারা গৃহহীন হচ্ছে, চলেছে শহরে, সেখানে বাসিন্দা হচ্ছে বস্তির। এই স্রোতধারা দেখলে বড় পীড়িত হতেন আপনি।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, তার গান বাঙালীকে গাইতে হবে। তা গায় বৈকি। তাঁর গানই তো জাতীয় সঙ্গীত-বাংলাদেশ ও ভারতের রাষ্ট্রের । কিন্তু তাঁর গান আজ কতভাবে যে বিপদগ্রস্ত তার তো কোনো ইয়ত্তা নেই। ব্যান্ড মিইজিকের জঙ্গী আওয়াজ তাকে চাপা দিতে চাচ্ছে। পদে পদে, দ্রুতগামী ট্রাক যেমন করে চাপা দেয় নিরীহ পথযাত্রীকে ঠিক তেমনিভাবে। বাঙালী সংস্কৃতির নিজস্বতা আজ নানাভাবে আক্রান্ত। লোকে আন্তর্জাতিক হচ্ছে, যার অর্থ দাঁড়ায় নিজের ঘরেই সে পরবাসী হয়ে পড়েছে।
বাঙালীর জন্য বড়াই করবার একটা বিষয় ছিল তার সাহিত্য। ঈশ্বর গুপ্তের যুগ পার হয়ে বাংলা সাহিত্য এগিয়েছিল অনেকটা দূর। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে হাত ধরে পার করে নিয়ে এসেছিল একটা লম্বা পথ। কিন্তু সেই সাহিত্য আজ আবার পিছু হটা শুরু করেছে, ঈশ্বর গুপ্তের সময়ের অভিমুখে।
আজকের বাঙালীয়ানা এক নতুন সংজ্ঞা দাবি করছে- নতুনতর অভিনিবেশ দাবি করছে, দোল-দুর্গোৎসব-রবীন্দ্রজয়ন্তী নববর্ষ -ভাইফোঁটা-বইমেলা এত সব কিছু নিয়ে পায়জামা-পাঞ্জাবি-ধুতি-পাঞ্জাবি (নক্সা আর ঝুল বেড়ে যাবে), কাঁথাফোঁড় শাড়ি, রবীন্দ্রসংগীত, বঙ্গসম্মেলন, কবিতার আসর, লিটল ম্যাগাজিন, গ্রুপ থিয়েটার, আবৃত্তি, ঈদ সংখ্যা আর চড়ুইভাতি নিয়ে চলবে নিত্য নতুন বাঙালীয়ানার পথ চলা। তার বাইরের চেহারা হবে বেশ ঝকমকে, পেশাদারি ঔজ্জ্বল্যে শাণিত, দেখনদারিতে প্রতিবেশীর ঈর্ষা জাগানো কিন্তু তা অন্তরের সম্পদেও হতে হবে সমৃদ্ধ ও উদাহরণীয়, তাতে দুনিয়াদারির ছোপ লাগা যে অনিবার্য তা কি এই ইন্টারনেটের যুগে নতুন করে বলে দিতে হবে?
আধুনিক যুগে বিশ্বায়নের প্রভাবে বাঙালীয়ানা কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কিছু চিন্তাবিদের মতে, আমরা নিজেদের সংস্কৃতি ভুলে পরচর্চা ও পরসংস্কৃতির নেশায় চুর হচ্ছি। যেমন: যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া এবং বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি। নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে অন্য ভাষার প্রতি আকর্ষণ। বাঙালীয়ানাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সমাজের সর্বস্তরের সচেতনতা প্রয়োজন: ভাষা চর্চা: বাংলা সাহিত্য, কবিতা ও গানকে গর্বের সাথে প্রচার করা। সাংস্কৃতিক লালন: লোকসংস্কৃতির চর্চা বাড়ানো এবং শিশুদের শিকড়ের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করানো (যেমন: গ্রামে নিয়ে যাওয়া)। গণমাধ্যম ও শিক্ষকের ভূমিকা: স্কুল-কলেজে বাংলা সংস্কৃতি সপ্তাহ পালন করা এবং গণমাধ্যমে সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটকের প্রসার ঘটানো। বাঙালীয়ানা কোনো সংকীর্ণ ধারণা নয়, এটি এক জীবনদর্শন যেখানে মানুষ, মাটি আর মমতা একসূত্রে বাঁধা। এর পুনর্জাগরণ সম্ভব যদি আমরা সকলে মিলে আবার ভালোবাসার, মমতার ও সংস্কৃতির সেই ডাক দিতে পারি।
(পরবর্তী পর্ব ২১ আগস্ট, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)
ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার
লেখক:
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক
‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি