বাঙালি সংস্কৃতি – পর্ব ২৮

Comments

অষ্টাবিংশ পর্ব

। জুলফিকার নিউটন ।

বাঙালি সংস্কৃতির ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় রেখে এখন যে সব কথা বলব তাতে আমাদের সংস্কৃতির সামনে যে সব বিপদ দেখা দিয়েছে সেই কথাগুলো হয়তো একটু বেশি স্থান পাবে। কারণ পথ খুঁজে নিতে গেলে বিপদের কথাটাই আগে ভাবতে হয়। বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই তো পথ খুঁজে নেওয়া। সংস্কৃতিকে যদি আমরা সেই ব্যাপক অর্থে নিই যে কথা প্রথমে বলেছিলাম, তা হলে আমি বলব যে বাঙালি সংস্কৃতি একটা দুর্দিনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু কাল যাবৎ। সেই দুর্দৈবের কারণ একটু আলোচনা করা যাক। রাজনীতি দিয়ে শুরু করছি। রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমাদের সকলের চোখে পড়ে। এক কালে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে কিছু মানুষ বিশেষত বাঙালিদের ভেতর চিন্তিত ছিলেন গুরুত্ব দিয়ে, আজ তা নিয়ে কিন্তু আলোচনা খুবই তরল। অথচ রাজনীতির দাপট কিছুমাত্র কমেনি, বরং বেড়েছে। এটা একটু চিন্তা করে দেখার ব্যাপার। মতাদর্শ নিয়ে ভাবনা কমছে আর রাজনীতির দাপট বাড়ছে- কি করে এটা ঘটে? ঘটে এভাবে যে আসলে রাজনীতির লক্ষ্য এখন, যে কোনও প্রকারে ক্ষমতা দখলে রাখা। কোনও মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করা নয়, তার চেয়ে রাজনীতিবিদদের কাছ অনেক বড় জরুরী কথা হল ক্ষমতা দখল করা। ক্ষমতা দখলে রাখা লক্ষ্য এবং সেই কারণে যে দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তাঁরা সাংস্কৃতিক জীবনের যতটা বড় অংশ পারে সেটা দখল করে নিতে চান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে, সে প্রাথমিকস্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দখল এঁরা করে নিতে চাইছেন। ইতিহাসকে নিজেদের মনের মতো করে নতুন করে লিখবার চেষ্টা করছেন। নতুন করে লিখতে গিয়ে এমন ভাবে হচ্ছে যে সেটা বিপদের কারণ হতে পারে। রাজনীতি এই ভাবে সংস্কৃতিকে আক্রান্ত করছে এটা নিশ্চয় দুশ্চিন্তার কথা এর পেছনে আমি কোনও শুভবুদ্ধি দেখিনা। এই যে বলছিলাম যে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবই শাসকদল যথাসম্ভব নিজেদের লোক দিয়ে ভরতি করার চেষ্টা করছেন, আপনারা একবার  চিন্তা করে দেখুন এর পরিণাম। আপনি যখন নিজের ছেলে বা মেয়ের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করতে চান, কোনও শিক্ষক নিযুক্ত করতে চান, তখন কোনও শিক্ষককে নিযুক্ত করবেন দল দেখে নয়, যে শিক্ষক ভাল শিক্ষা দিতে জানেন তাঁকে সেইভাবে নির্বাচন করবেন। রাজনৈতিক দল যখন নির্বাচন করে তখন কোনও শিক্ষককে তার শিক্ষক হিসাবে যোগ্যতা দেখে নয়, তার রাজনৈতিক আনুগত্য দেখে নির্বাচন করে। সংস্কৃতির একটা বড় অংশ শিক্ষা। শিক্ষাকে এই ভাবে গ্রাস করে নিলে সেটা সংস্কৃতির পক্ষে বড়ই দুর্দিনের কথা। 

সংস্কৃতির বিকৃতি ঘটছে আরও একভাবে, বাজার ব্যবস্থার প্রভাবে। কী ভাবে বিকৃতি ঘটেছে? আমি এখানে বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলছি। যদি বাজারের কথাই ভাবেন তা হলে ইংরেজির বাজারটা বাংলার চেয়ে অনেক বড়। বাংলার বাজার অপেক্ষাকৃত ছোট এবং এর ফলে আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি যে অন্তত নগরে এমন একটা প্রজন্ম বেড়ে উঠেছেন যাঁরা বাংলা ভাষা ভাল ভাবে জানেন না, ভাল ভাবে বলতে লিখতে পারেন না। এনিয়ে তাঁদের কোনও দুশ্চিন্তা নেই, কারণ তাঁরা মনে  করেন যে মাতৃভাষা এমন কী কাজে লাগবে? ইংরেজিটা কাজে লাগে, বাংলাটা বাড়িতে একটু বলতে পারলেই তো হল। তো বাজারের এই যে প্রভাব, তার ফলে এই নতুন প্রজন্ম, অন্তত এর একটা বড় অংশ, নিশ্চয় সবাই নয়, নগরের ভাল ভাল বিদ্যালয় থেকে যাঁরা পড়াশুনা করে বেরোচ্ছেন তাঁরা বাংলা ভাষা ভাল করে শিখছেন না। বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে এটাও কি একটা দুশ্চিন্তার কথা নয়? অন্য একটা সমস্যার কথা বলি। সেটি বেকার সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। শহরে ও গ্রামে সর্বত্র বেকার যুবক যুবতীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে গত পঞ্চাশ বছরে, নগরের মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত ছেলে মেয়েদের আশা আকঙক্ষা প্রত্যাশার সঙ্গে এই শিক্ষা ব্যবস্থার যোগ। আর এরই ফলে এই শিক্ষা যখন গ্রামের বিদ্যালয়ে পরিবেশন করা হয়, তখন হয় গ্রামের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে যেহেতু সাংস্কৃতিক ভাবে ওরা এইরকম মধ্যবিত্তমুখী শিক্ষাতে একেবারেই অভ্যস্ত নয়, সেজন্য ব্যর্থ হয় পরীক্ষায় অথবা পড়া ছেড়ে দেয়। এর ফলে যে ওদের শুধু শিক্ষা লাভ হয় না তাই নয়। শিক্ষা লাভ না হওয়া ছাড়াও তাদের নিজের প্রতি আস্থাটা ভেঙে যায়। বিদ্যালয়ে যাওয়ার র্ব্যথতার ভিতর দিয়ে তাদের নিজের প্রতি আস্থা ভেঙে যায়।

গ্রামের ছেলে-মেয়েদের পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে এবং যেসব কাজকর্ম গ্রামে করা আবশ্যক সেইসব কাজকর্মের সঙ্গে যদি ওই শিক্ষার সম্পর্ক থাকত তা হলে এই শিক্ষা এবং তার প্রয়োজন তারা আরও সহজে গ্রহণ করতে পারত। এখন যা ঘটে সেটা হল যে গ্রামের যে ক’টি ছেয়ে মেয়ে শেষ পর্যন্ত পাশ করে বেরোতে পারে, অধিকাংশ তো মাঝ পথে পড়া ছেড়ে দেয়, যারা পাশ করে বেরোতে পারে তারা যত শীঘ্র সম্ভব গ্রাম ত্যাগ করে শহরে চলে আসে। আসলে ওই শিক্ষা তো শহরে কাজ করার জন্যই ছাত্রদের প্রস্তুত করেছে। তাই তারা যে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে সে এমনিতে কোনও দোষ ছিল না। কিন্তু দোষ এসে গেছে একটা অতি মৌল কারণে। সেটা হল এই যে শহরেও বেকারের সংখ্যা প্রচুর। তার উপর যখন গ্রামে যারা শিক্ষালাভ করেছে, তারা কাজের সন্ধানে শহরে এসে বেকারের সংখ্যা বাড়াতে থাকে, তার কী ফল দাঁড়ায়? তাদের ভিতর অল্প কয়েকজন জীবিকা অর্জনের উপায় বা সুযোগ খুঁজে পায়। আর অধিকাংশকে, অন্তত অনেক ওই ধরনের জীবিকা সন্ধানী যুবক যুবতীদের, শেষ পর্যন্ত সমাজবিরোদীদের দলে ভিড়তে হয়। তা ছাড়া রাজনীতিবিদদের ভাষায় কী যেন ‘ক্যাডার’ বলে একটা শব্দ আছে সেই ক্যাডারে যোগ দিলেও একরকম জীবিকা লাভ হয়। তো এই ভাবে যে শিক্ষা গ্রামের উপযোগী নয়, যে শিক্ষা আমরা গড়ে তুলেছি মধ্যবিত্ত শ্রেণী মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছেলে-মেয়েদের আশা আকাক্সক্ষার ভবিষ্যতের কথা ভেবে, সেই শিক্ষা গ্রামকে আরও অসুস্থ করে তুলেছে এবং শুধু গ্রামকে নয় শহরকেও। গ্রাম থেকে অসুস্থ মানুষেরা শহরে অসুস্থতা ছড়াচ্ছে। গ্রাম ও শহর পরস্পরকে অসুস্থ, আরও অসুস্থ করে তুলছে। শিক্ষার প্রয়োজন সম্বন্ধে তো কোনও দ্বিমত থাকতে পারে না। শিক্ষা যে অতি প্রয়োজনীয় কথাটা এতই সহজ সত্য যে এনিয়ে কোনও তর্কই থাকতে পারে না। কিন্তু কোন শিক্ষা? এ চিন্তা সম্পূর্ণ ভুল যে সারা জাতির জন্য, সারা দেশের জন্য, সারা রাষ্ট্রের জন্য একই রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা একই রকমের পাঠক্রম হওয়া ভাল। এটা এক ধরনের বিশ্ববাজার সম্পর্কিত চিন্তার ভ্রান্ত ফল হিসাবেই স্থান পায়। আমরা এদেশে শিক্ষা চাই। কিন্তু সেই শিক্ষা বিভিন্ন স্তিরে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাবে প্রস্তুত হবে এটাই প্রয়োজন। 

আসলে কথাটা হল এই দেশে একটা বড় কাজ, যদিও এটা একমাত্র কাজ নয়, একটা বড় কাজ হতে হবে বঙ্গবন্ধু যাকে বলেছেন পল্লী সংগঠন। পল্লীতে পল্লীতে যে শিক্ষার আয়োজন তার সঙ্গে এই পল্লী সংগঠনের যোগ থাকা দরকার। পল্লীতে এমন অনেক প্রয়োজন আছে যে, সব প্রয়োজন মেটানোর জন্যে পল্লীর মানুষকে স্বাবলম্বনের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া আবশ্যক; তাদের সমবেত শ্রম ও বুদ্ধি দিয়েই সেই সব প্রয়োজন অনেকদূর পর্যন্ত পূর্ণ করা যায়। আমরা যদি পল্লী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করে পল্লীতে শিক্ষার ব্যবস্থা করি তা হলে সেই শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের দলে দলে শহরে এসে ভিড় করতে হয় না। তাঁরা  তা হলে পল্লীকে উন্নত করার কাজে নিজেদের নিযুক্ত করতে পারেন এবং তর ভিতর একটা গৌরব আছে, সেই গৌরব তাঁরা লাভ করতে পারেন। তা হলে শিক্ষার আয়োজন নিজের প্রতি মানুষের আস্থাকে ভেঙে ফেলবে না, বরং নিজের প্রতি আস্থাকে বাড়িয়ে তুলবে। উচ্চশিক্ষার জন্যে বা যেটাকে আমি বলছিলাম বিশ্ববিজ্ঞানের প্রান্তে দাঁড়িয়ে কাজ করার জন্যে সবাই যোগ্য নয়। যাঁরা যোগ্য তাঁদের জন্যে যেন ব্যবস্থা থাকে আমাদের দেশে। আবার সেই সঙ্গে আমরা যদি আমাদের পল্লীগুলোকে সুসংগঠিত করতে চাই তা হলে পল্লী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করে শিক্ষার আয়োজন করা অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে পল্লী এবং নগর উভয়েরই উন্নতি হবে। খানিকক্ষণ আগে আমি বলছিলাম কীভাবে অসুস্থ পল্লী নগরকে আরও অসুস্থ করে এবং সেই নগর কীভাবে অসুস্থ পল্লীর সংস্কৃতিকে আরও অসুস্থ করে তোলে। যদি আমরা বাঙালি সংস্কৃতির আশাপ্রদ ভবিষ্যৎ চাই তা হলে সেই ব্যবস্থাই করতে হবে যাতে সুস্থ পল্লী নগরকে সুস্থ হতে সাহায্য করে আর সুস্থ নগর পল্লীকে আরও সুস্থ হতে সাহায্য করে। 

সংস্কৃতিতে একটা বিশেষ ভূমিকা আছে নগরের এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমরা যাকে যুক্তিবাদ বলি নগরেই প্রথম তার বিশেষ বিকাশ ঘটে। পল্লীতে পল্লীতে যে কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে, সেইসব কুসংস্কার দুর করার জন্যে যুক্তিবাদের প্রসার প্রয়োজন। অবশ্য নগরেও কুসংস্কারের অভাব নেই। তবু যুক্তিবাদ নগরেই প্রথমে বিশেষ ভাবে দেখা দিয়েছিল। তাকে ক্রমে গ্রামে প্রসারিত করতে হবে। ব্যক্তির মূল্য বিষয়ে যে বোধ তারও উন্মেষ নগরেই প্রথম হয়েছিল। সারা বিশ্বের নানা প্রান্তে যে চিন্তা তার সঙ্গে যদি আমরা পরিচিত হতে চাই তা হলে নগরেই এসে কান পাততে হয়। তারপর তাকে গ্রামে নিয়ে যেতে হয়। গ্রামের সঙ্গে বিশ্বের অনতিক্রম্য কোনও বিরোধ নেই। সেকথা রবীন্দ্রনাথ সুন্দরভাবে জানিয়ে গেছেন। এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যেখানে বিশ্ব যেন পল্লীতে তার স্বগৃহ খুঁজে পায়। বিশ্বের সঙ্গে পল্লীর অনিবার্য কোনও বিরোধ নেই। কিন্তু সংস্কৃতির এমন বিকার সম্ভব যে বিরোধ দেখা দেয় এবং যদি দেখা দেয় তবে দেশের পক্ষে সেটা বড়ই দুর্দিন। একুশ শতক যেন আমাদের সংস্কৃতিকে, বাঙালিসংস্কৃতিকে, সেই পথে নিয়ে যেতে পারে যে পথে পল্লীর সঙ্গে বিশ্বের বিরোধ থাকবে না। স্বদেশের সংস্কৃতি বিশ্ব সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ রেখে চলবে। এটা হবে কি না আমরা  জানি না। শুধু জানি যে যদি না হয় তবে তার পরিণাম হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। সমন্বয়বুদ্ধির অভাবে সংঘবদ্ধ অসহিষ্ণুতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এরই অভাবে দেশ আজ এক প্রচ্ছন্ন গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গৃহযুদ্ধ এই শতকে সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে। আর এ থেকে যদি আমরা মুক্তির পথ খুঁজে নিতে পারি তবে আমরা এমন এক নতুন ভবিষ্যতে উত্তীর্ণ হব, পুরনো সব অতীত সংস্কৃতির চেয়ে যেটা নানা দিক থেকে উচ্চতর, অতএব বাঞ্ছনীয়। সেই ভবিষ্যৎ তৈরি হোক এই ইচ্ছা প্রকাশ করেই আমার বক্তব্য শেষ করছি।

* সমাপ্ত *

ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার

লেখক:
Julfikar Newton
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

‘বাঙালি সংস্কৃতি’ -র অন্যান্য পর্বগুলো পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
বাঙালি সংস্কৃতি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট