বিএমএ: পরের ছিদ্রান্বেষণেই ব্যস্ত! । ডা. নাজমুল হাসান

Comments

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) সমগ্র বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্বকারী পেশাজীবী সংগঠন। কাগজে-কলমে অন্তত তাই, বাস্তবে “ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর”।

বাংলাদেশের সমগ্র ডাক্তারদের প্রতিনিধিত্ব করার কথা থাকলেও সংগঠনটির মূল ফোকাস সরকারি চাকরীরত ডাক্তারদের দিকে। আর‌ও সুনির্দিষ্ট করে বললে- বড় বড় শহরে অবস্থিত বড় বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ডাক্তারদের দিকে, তারচেয়েও সুনির্দিষ্ট করে বললে- নেতাদের পদসেবায় যে ডাক্তাররা নিজেদের উৎসর্গ করে দিচ্ছে তাদের দিকে। এ কারণে বেসরকারি ডাক্তারদের জন্য “বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল প্রাকটিশনারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমপিএ)” নামক ভিন্ন আরেকটি পেশাজীবি সংগঠন আছে। এটার অবস্থাও তথৈবচ। নির্বাচনের সময় ছাড়া এর আর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

দুই

পেশাজীবী সংগঠনের অস্তিত্ব নির্ভর করে সংগঠনটি তার পেশাজীবীদের প্রতি কতোটা সহযোগী ভূমিকা পালন করছে তার উপরে। সংগঠনের একজন সদস্য তার প্রয়োজনে নিজের পেশাজীবী সংগঠন থেকে কতোটা সহযোগিতা পাচ্ছে তার উপরে। সংগঠনের উপরে একজন পেশাজীবীর আস্থা নির্ভর করে সংগঠনটি তার পেশাগত দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করার জন্য পরিকল্পনা, দূরদৃষ্টি, কৌশলগত দিক দিয়ে কতোটা সহযোগী ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে তার উপরে।

ভেঙে ভেঙে বা কেস-টু-কেস এডহক ভিত্তিতে পেশাজীবীদের জন্য কিছু করা আর স্থায়ীভাবে পেশাজীবীদের সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান করা এক বিষয় নয়। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা জনবান্ধব করার স্বার্থে পেশাজীবীদের যৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা পেশাজীবী সংগঠনের দায়িত্ব। এগুলি নিশ্চিত করার জন্য জনগণ ও পেশাজীবীদের পক্ষে সরকারের প্রেশার গ্রুপ হিসাবে কাজ করা বিএমএ’র দায়িত্ব। এজন্য মূলত যে কাজটি করা দরকার তা হলো দেশের স্বাস্থ্যনীতি প্রবর্তনের জন্য সংগঠন থেকে শ্যাডো পলিসি করে তা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রেশার গ্রুপ হিসাবে কাজ করা।

সংগঠন হিসেবে বিএমএ এডহক ভিত্তিতে তার পেশাজীবীদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করতে ব্যর্থ, শ্যাডো পলিসি তৈরির ব্যাপারে মহাব্যর্থ- জীবনে এই পথে হাঁটেইনি।

তিন

দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে প্রতিটি মানুষ আতঙ্কিত। আমরা সরকারের সমালোচনা করছি, ঠিক আছে। সরকার ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে না। কিন্তু একটা পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে বিএমএ কী তার দায়িত্ব ঠিকমত পালন করছে? সে তো তার পেশাজীবীদের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট! সরকারের পক্ষ থেকে যখন বলা হয়েছিল- করোনা প্রতিরোধে সরকারের সকল ব্যবস্থা করা আছে, তখন কী বিএমএ পেশাজীবীদের পক্ষে, জনগণের পক্ষে সরকারকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল কোথায় কোথায় সরকারের ব্যর্থতা আছে?

পিপিই’র মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যেটি ছাড়া পেশাজীবীদের পক্ষে এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া অসম্ভব, সে কথাটাও তখন বিএমএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়নি। আমার জানামতে আমারমতো ক্ষুদ্র একজন ব্যক্তি ফেসবুক স্ট্যাটাসে সর্বপ্রথম পিপিই’র বিষয়টিকে তুলে ধরি।

আমার সেই স্ট্যাটাস দেখে সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী একটি দপ্তর সেইদিন‌ই রাত ৯টার দিকে আমাকে ফোন দেয়। আমার কথা শোনার পরে সেই রাত্রেই তারা অফিসিয়াল চিঠি রেডি করে। পরদিন সকাল সাড়ে দশটার দিকে সেই দপ্তরের একদম উচ্চপর্যায় থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করে জানায়- প্রাইম মিনিস্টারের দপ্তর থেকে সেই চিঠিটি পাস করা হয়েছে এবং সরকারিভাবে পিপিই সরঞ্জাম আনার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমার সেই লেখাটির জন্য তারা বার বার আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছে, আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এমন কথাও বলেছে- জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আপনার এই লেখাটা যে কী উপকার করল সে কথা কেউ কোনোদিন জানবে না কিন্তু আমরা জানি আপনার এই লেখার কারণেই জাতি আজ উপকারটা পেল। আপনার মতো বিবেক-সচেতন মানুষদের এই দেশে বড় প্রয়োজন।

অথচ আমার ফ্রেন্ডলিস্টে বিএমএ’র প্রায় সব নেতাই আছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনেকেই আছে; তারা আমার সে লেখাটাকে ভ্রূক্ষেপ‌ই করেনি। তারা বড় বড় নেতা, বড় বড় পদে চাকরি করে, আমি তো গণনার মধ্যেই পড়ি না। বেসরকারি চাকরি করি, আমাকে গণনার মধ্যে ফেললেও তাদের ইজ্জত যায়। উচিত কথা বলি, উপর-নিচ দেখি না, সেই ভয়েও আমাকে সব এড়িয়ে চলে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি- আমি যখন পিপিই নিয়ে লিখি তখন পেশাজীবী মানুষদের বাইরে এই শব্দটি সাধারণ মানুষের অজানা ছিল। আজ এটি একটি জনবান্ধব শব্দ।

চার

ব্যাংকের কর্মকর্তারা পিপিই পরে তাদের ছবি প্রচার করেছে, সেটি দেখে ডাক্তারদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন- ডাক্তারদের পিপিই না দিয়ে কেন ব্যাংকারদের দেওয়া হলো। আপনারা কি জানেন- ওই পিপিই ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন নিজের টাকায় কিনে তার সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করেছে? একটি পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে বিএমএ কেন সংগঠনের পক্ষ থেকে তার সদস্যের জন্য ন্যূনতম সংখ্যক পিপিই সরবরাহ করতে পারেনি? বিএমএ ভবনের আটতলা রেস্ট হাউজের ভাড়া, বিএমএ অডিটোরিয়ামের ভাড়া, ওখানকার একগাদা দোকান থেকে ওঠা ভাড়ার টাকা কোথায় যায়? ঔষধ কোম্পানিকে বললে তারাও তো কিছু পিপিই সরবরাহ করতো, কার্যকরভাবে সে উদ্যোগ‌ও নেওয়া হয়নি। ঔষধ কোম্পানির টাকায় তো দেশ-বিদেশ ঘুরতে, গিফট পেতে খারাপ লাগে না!

অনেক ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকারি কর্মকর্তাদের পিপি‌ই পরা ছবি দেখে একই প্রতিক্রিয়া হয়েছে। অথচ তার অধিকাংশ পিপিই-ই তারা নিজেরা সংগ্রহ করেছে অথবা তাদের সংগঠন থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।

ব্যতিক্রম ছাড়া পুলিশের ব্যবহৃত পিপিইগুলি তারা ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহ করেছে।

গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিকদের পিপিই তাদের সংগঠন এবং তাদের মালিকরা সরবরাহ করেছে। হকাররা গরিব মানুষ, তাদের টাকা পয়সা নাই, তার পরেও হকার্স অ্যাসোসিয়েশন কম দামে পলিথিনের জামা তাদের সদস্যদের মধ্যে সরবরাহ করেছে। নিজের সদস্যদের জন্য কী করেছে বিএমএ?

ডাক্তাররা অনেক পরিশ্রম করে, অনেক সেবা দেয়, অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, অনেক সমস্যার মধ্যে কাজ করে, আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে কাজ করে, অনেক ক্যাডার ও পেশাজীবীদের থেকে অনেক বেশি কাজ করে, তারপরেও কেন ডাক্তাররা মানুষের মনের ভেতরে অবস্থান নিতে পারে না! কেন ডাক্তারদের মানুষ দেখতে পারে না, কেন অন্যান্য ক্যাডারদের সাথে ডাক্তারি ক্যাডারের পার্থক্য- বিএমএ নামক এই সংগঠনটির অথর্ব হয়ে থাকা এর জন্য বেশ খানিকটা দায়ী। বিএমএ’র ভূমিকা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার দরকার আছে।

লেখক:
Nazmul Hassan
ডা. নাজমুল হাসান, লেখক, গল্পকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

*এই লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.