বিতর্ক: শাড়ী । রাহমান চৌধুরী

Comments

শা‌ড়ি নি‌য়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ী‌দের লেখা প্রস‌ঙ্গে:

মানুষ যখন সমাজ‌বিজ্ঞা‌নের চেতনা আর ই‌তিহাস‌বো‌ধের বাই‌রে গি‌য়ে কিছু আলোচনা কর‌তে চান, কথার পর কথা সা‌জি‌য়ে তি‌নি অ‌নেক সময় তাঁর মূল বক্ত‌ব্যে পৌঁছা‌তে পা‌রেন না। ম‌স্তি‌স্কের ম‌ধ্যে থে‌কে যাওয়া পূর্ব ধারণা, নানারকম আদর্শবাদ আর ধার ক‌রে পাওয়া নান্দ‌নিক বোধ দি‌য়ে ঘটনা‌কে ব্যাখ্যা কর‌তে চান। জন‌প্রিয়তার জো‌রে অ‌নেক সময়, বল‌তে গে‌লে বে‌শির ভাগ সম‌য়ে বিভ্রা‌ন্তিকর বক্তব্য দি‌য়ে পার পে‌য়ে গে‌লেও, কখ‌নো কখ‌নো সঙ্ক‌টের জা‌লে জ‌ড়ি‌য়ে প‌ড়েন। দ্বা‌ন্দ্বিক বস্তুবা‌দের বাই‌রে গি‌য়ে বা নৈর্ব্যক্তিক ই‌তিহাস বোধ‌কে বা‌তিল ক‌রে, যখন কেউ নি‌জের বিদগ্ধ চিন্তার প্রকাশ ঘটা‌তে চান, কখ‌নো কখ‌নো তা খুব বিব্রতকর প‌রি‌স্থি‌তি তৈ‌রি ক‌রেন সেটা যেমন তার নি‌জের জন্য; চা‌রি‌দি‌কের মানু‌ষের জন্যও তা মঅস্ব‌স্তিকর।

কথাটা হ‌লো চো‌রের দশ‌দিন আর গৃহ‌স্থের এক‌দিন। ব্য‌ক্তি‌ত্বের জৌলুস দি‌য়ে, বড় বড় কর্ম দি‌য়ে অ‌নেককাল নি‌জের ভুল চিন্তা‌কে চার‌দি‌কের মানু‌ষের কা‌ছে মহৎ চিন্তা ব‌লে প্র‌তিপাদন করা যায়, কিন্তু ক‌ঠিন স‌ত্যের মু‌খোমু‌খি দাঁড়া‌লে ‌চিন্তারা দিশা হারায়। ক‌ঠিন সত্য বাদ দিলাম, নি‌জের আকাঙ্ক্ষা‌কে বি‌শ্বের বা নি‌জে দে‌শের সব মানু‌ষের আকাঙ্ক্ষা হি‌সেবে প্রচার করার দা‌বিও বিপ‌দে ফেল‌তে পা‌রে আদর্শবাদী মানুষ‌কে। বাস্ত‌বের ভূ‌মি‌তে দাঁড়ি‌য়ে কথা বল‌তে না পার‌লে, নি‌জের আকাঙ্ক্ষা নতুন বাস্তব সৃ‌ষ্টির ঘোষণা দেয় মাত্র, কিন্তু যথাযথ পর্য‌বেক্ষণ সেখা‌নে থা‌কে না। প্র‌তি‌টি বস্তুর বিকা‌শের দ্বা‌ন্দ্বিক বস্তুবাদী নিয়মটা বুঝ‌তে না পারা, বা তার প‌রিমাণগত আর গুণগত বিকা‌শের ধারণা মাথায় না রাখা কখ‌নো কখ‌নো বিপদ ডে‌কে আনে। তখন চিন্তার সীমাবদ্ধ দৃ‌ষ্টি নি‌য়ে একটা “জু‌তো” নি‌য়ে আলোচনা করার ক্ষে‌ত্রেও তি‌নি সব কিছু গু‌লি‌য়ে ফে‌লতে পা‌রেন; ‌নি‌জের বক্তব্য‌কে স্পষ্ট করার জন্য শ‌ব্দের পর শব্দ সাজা‌তে থা‌কেন কিন্তু তি‌নি তার বিকা‌শের নিয়মটা‌কে বা তার প্র‌য়োজনটা‌কে আর ব্যাখ্যা কর‌তে পা‌রেন না। কারণ যে চিন্তা দ্বা‌ন্দ্বিক নয়, লক্ষ্য একমু‌খি তা মূল স‌ত্যের কা‌ছে পৌঁছা‌তে পা‌রে না।

মানু‌ষের শ্রম বাদ দি‌য়ে আস‌লে সমাজ‌বিজ্ঞা‌নের বা ই‌তিহা‌সের কো‌নো আলোচনাই আগা‌তে পা‌রে না। শ্রম কো‌নো তামাশা নয়, মানু‌ষের পু‌রো সভ্যতাটা দাঁড়ি‌য়ে আছে তার উপর। ফ‌লে মানু‌ষের শ্রম এবং ই‌তিহাস অার সমাজ বিকা‌শে তার ভূ‌মিকা বুঝ‌তে না পার‌লে, ফলপ্রসু কো‌নো আলোচনা সম্ভব নয়। বিপ্লব তো দূ‌রের কথা একটা শা‌ড়ি নি‌য়ে গভীর আলোচনা আরম্ভ করা বা শেষ করা সম্ভব হয় না। মানু‌ষের সভ্যতার যে ই‌তিহাস তা হ‌চ্ছে মানবজা‌তির শ্র‌মের ফসল। নারী বা পুরুষ আলাদা ক‌রে নয়, মানব জা‌তির শ্র‌মে তা গ‌ঠিত। ই‌তিহা‌সের এ সামান্য সত্যটা গোড়ায় মাথায় রাখ‌তে না পার‌লে ইতিহাস‌কে ব্যাখ্যা করা ক‌ঠিন তো ব‌টেই, সম্ভব নয়। নারী পুরু‌ষের শ্র‌মে যে বিশ্বটা গ‌ড়ে উ‌ঠে‌ছে এ চিন্তাটা জিহ্বার আগায় থাক‌লে হ‌বে না, থাক‌তে হ‌বে মান‌সিকতায়, থাক‌তে হ‌বে ম‌স্তি‌স্কের ভিত‌রে অব‌চেত‌নে। মানুষ শ্র‌মের ভিতর দি‌য়ে সৃ‌ষ্টি ক‌রে‌ছে ভাষা, ভাষা মানুষের চিন্তাকে গ‌তি দি‌য়ে‌ছে, চিন্তা মানুষ‌কে দি‌য়ে‌ছে বৃহত্তর এক সভ্যতা। মানব সভ্যতার বিকা‌শের প‌থে প‌থে মানু‌ষের ম‌ধ্যে সমাজ, ধর্ম, শ্রেণী ভেদ, নারী পুরুষ প্রশ্ন, অবাধ যৌনতার জায়গায় বিবাহ আবার বিবা‌হের না‌মে নারীর বন্ধন সব কিছুর ধারাব‌হিকতা আছে। মানুষ‌কে বিভক্ত করার ভিতর দি‌য়ে মানু‌ষের আদিম সমা‌জের পোষা‌কের ম‌ধ্যে ভিন্নতা এ‌সে‌ছে। সমাজের সকল শ্রেণীর পোষাক, ধনী দ‌রি‌দ্রের পোষাক এক থা‌কে‌নি। বর্তমান সম‌য়ে এ‌সেও এক থাক‌তে পার‌ছে না।

ফ‌লে “শা‌ড়ি” ব‌লে এক কথায় সরলভা‌বে কিছুই আলোচনা করা যা‌য় না। প্রথমত এক কথায় একখণ্ড বস্ত্র‌কে বোঝাবে, কিন্তু তারপর স্থান কাল পাত্র ভে‌দে শা‌ড়ি পরবার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা হ‌য়ে যা‌বে। সহজ কথাটা হ‌লো শ্রেণী বিভক্ত সমা‌জে সকল শ্রেণীর জন্য বি‌শেষ কো‌নো সংস্কৃ‌তি বা পোষাক নেই। য‌দি এটা মাথায় না থা‌কে “শা‌ড়ি” নি‌য়ে প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করা বৃথা, অব‌শে‌ষে তা রম্য রচনা হ‌লে হ‌তে পা‌রে। বাংলার নারীরা একখণ্ড শা‌ড়ি পড়‌তেন আমরা জা‌নি, কিন্তু শাসকরা কি তাই পড়‌তেন? ব্লাউজ বা অন্তর্বাস পরবার ব্যাপারটা অ‌নেক প‌রে চালু হয়, ব্লাউজ সম্প‌র্কে বলা হয় বাংলায় তা চালু ক‌রেন জ্ঞানদানন্দিনী। ই‌তিহা‌সে জানা যায়, রবীন্দ্রনা‌থের জ‌ন্মের সময় বা তার আগে বাংলার ভদ্র প‌রিবা‌রে পুরুষরা দি‌নের বেলায় অন্দরমহ‌লে প্র‌বেশ কর‌তে পার‌তেন না, কারণ নারী‌দের একখণ্ড শা‌ড়ি শরী‌রের কা‌জের সময় কোথায় কীভা‌বে থাক‌বে, শরী‌রের কো‌নো অঙ্গ উন্মুক্ত হ‌য়ে পড়‌বে তার ঠিক‌ঠিকানা নেই, সে কার‌ণে দি‌নের বেলায় পুরুষ‌দের স্থান ছি‌লো ব‌হির্বাটি‌তে বা বৈঠক খানায়। ই‌তিহাস এরকম তথ্য দেয়। কিন্তু তখন কি গরীব‌দের জীব‌নে বৈঠকখানা ছি‌লো? ফ‌লে গরীব আর ধনীর সংস্কৃ‌তি চিন্তা চেতনা আলাদা। স্বভাবতই শা‌ড়ি পরার কো‌নো বি‌শেষ নিয়ম সবার জন্য একভা‌বে ছি‌লো না, চিরকাল তা একরকম ছি‌লো না। মুসলমান‌দের ভারতব‌র্ষে আগম‌নের আগে জানা যায় সেলাই করা পোষাক প‌রিধা‌নের চল ছি‌লো না। রবীন্দ্রনা‌থের যু‌গে হিন্দু ভদ্রম‌হিলা‌দের কড়াক‌ড়ি পর্দার ম‌ধ্যে থাক‌তে হ‌তো। ‌কিন্তু হিন্দু আর মুসলমান গরীব নারীরা পর্দায় থাক‌লে খা‌বে কি? গরীব ঘ‌রের নারী‌দের শা‌ড়ি‌তে তার শরী‌রের কোন অংশ ঢাকা পড়‌লো না, সে‌দি‌কে নজর দেয়ার তার সময় ছি‌লো না, দরকার হয়‌নি। বাবুরা য‌দি তার শরী‌রের দি‌কে নজর দি‌য়ে থা‌কে সেটা তখন বাবু‌দের অ‌ধিকার ব‌লে গণ্য হ‌তো। কিন্তু নিম্নব‌র্গের মানু‌ষের কা‌ছে তার মা‌য়ের শরী‌রে, বো‌নের শরী‌রে, বা স্ত্রীর শরী‌রে ঠিকভা‌বে কাপড় না থাকাট‌া বিকার তৈ‌রি ক‌রে‌নি, কারণ জন্ম থে‌কে সে তা দে‌খে বড় হ‌য়ে‌ছে। নি‌জের অভাব‌কে, দৈন্যদশা‌কে নি‌জের জীব‌নের স্বাভা‌বিকভা‌বে মা‌নি‌য়ে নি‌য়ে‌ছি‌লো।

ফ‌লে শা‌ড়ি নি‌য়ে যে আলোচনা বিতর্ক সৃষ্টি ক‌রে‌ছে সেটা কার শা‌ড়ি পরা, বুঝ‌তে প‌ারা যায়‌নি। শা‌ড়ির দাম দুই‌শো থে‌কে দুলাখ টাকা পর্যন্ত আছে। সব শা‌ড়ির মূল্যায়ন কী একভা‌বে হ‌বে? শা‌ড়ি‌কে যে যৌনতা প্রদর্শ‌নের জন্য ব্যবহার কর‌বে, সে যে‌কো‌নো পোষা‌কের ক্ষে‌ত্রেই তা কর‌তে পা‌রে। সঙ্কটটা পোষা‌কের নয় ততটা, য‌তোটা ব্য‌ক্তির ম‌নোজগ‌তের। সমাজ যা‌কে প্র‌মোদবালা বা‌নি‌য়ে‌ছে, সমা‌জের নিয়‌মেই তা‌কে অ‌নেক কিছু কর‌তে হয়। বাংলার প্র‌মোদবালা য‌দি বি‌শেষ লক্ষ্য নি‌য়ে বি‌শেষ ভ‌ঙ্গি‌তে শ‌া‌ড়ি প‌রে, পাশ্চাত্যের প্র‌মোদবালা তার পোষাকটা সে ল‌ক্ষেই সেভাবেই প্রদর্শন কর‌বে। সব শা‌ড়ি পরার লক্ষ্য তাই এক নয়, ফলাফলও এক নয়। বর্তমান বি‌শ্বে দাঁড়ি‌য়ে কাউ‌কে পোষাক পরার নিদান দেয়াটা কী ঠিক? মানুষ বি‌ভিন্ন রকম মতাদর্শ গ্রহণ কর‌ছে, সেভা‌বে নি‌জের পছ‌ন্দের ‌পোষাক পর‌বে সেটাই ঠিক। কিন্তু ব্যাপারটা আবার তত সহজ নয়। বর্তমান বি‌শ্বে নি‌জের স‌খে কজন পোষাক প‌রে? আস‌লে আমার অজা‌ন্তে আমার খাওয়া দাওয়া, পোষাক প‌রিধান জীবন যাপন অন্যরা ঠিক ক‌রে দেয়। নি‌জে আমি চল‌তি ফ্যাসন ব‌লে সেটাই গ্রহণ ক‌রি। না কর‌তে পার‌লে লজ্জাও পাই। স‌ত্যি বল‌তে অ‌ন্যের নিদা‌নে আগে চি‌কিৎসা চল‌তো, এখন প্রায় সবই চ‌লে অ‌ন্যের নিদা‌নে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বাঙালী‌কে শা‌ড়ি পরার জন্য প্রলুব্ধ ক‌রে‌ছেন, নিদান দি‌য়ে‌ছেন সেটা অ‌নে‌কে পছন্দ ক‌রেন‌নি। তি‌নি কেন বাঙালী‌ নারী‌কে শা‌ড়ি পরাবার জন্য একটা প্রবন্ধ লিখলেন আমি নি‌জে ভা‌লো বুঝ‌তে প‌া‌রি‌নি। য‌দিও তার শা‌ড়ি পরার নিদান বা শা‌ড়ি সম্প‌র্কে অ‌নেক মন্ত‌ব্যের স‌ঙ্গে একমত নই, ত‌বে তার বলার ভঙ্গিটা আমার কা‌ছে নি‌র্দোষ ম‌নে হ‌য়ে‌ছে। অ‌নেককাল ধ‌রে তা‌কে চি‌নি ব‌লেই আমি ব্যক্তিগতভা‌বে সেটা বিশ্বাস ক‌রি। কাউ‌কে আমি আমার স‌ঙ্গে একমত হ‌তে বল‌ছি না। ফ‌লে তার ওপর আক্রম‌ণের অ‌নেকটা হ‌য়ে‌ছে তাঁকে ভুল বু‌ঝে, খুব উগ্রভা‌বে। অ‌নেকটা হ‌য়ে‌ছে স‌ঠিকভা‌বেই।

সায়ীদ স্যার আমার শিক্ষক ছি‌লেন না, ওনার চিন্তার স‌ঙ্গে অামার চিন্তার চিরকালই ভয়াবহ অ‌মিল ছি‌লো। ‌বিপ্লব নি‌য়ে, মানু‌ষের বিপ্লবী চিন্তা নি‌য়ে তি‌নি সামান্য ভূ‌মিকা রা‌খেন‌নি। তি‌নি সমাজ সংস্কারক হ‌তে চে‌য়ে‌ছেন। সর্বদা আলো‌কিত মানুষ তৈ‌রি কর‌তে চে‌য়ে‌ছেন, কিন্তু চ‌ল্লিশ বছ‌রে ক‌তোজন তৈ‌রি কর‌তে পে‌রে‌ছেন জা‌নি না। তি‌নি যেভা‌বে আলো‌কিত মানুষ তৈ‌রি কর‌তে চে‌য়ে‌ছেন, যে পাঠক্রম দি‌য়ে, তার স‌ঙ্গে কখ‌নো আমি একমত ছিলাম না। কিন্তু তারপ‌রেও আমা‌দের ম‌নের একটা মিল ছি‌লো, ম‌তের মিল না থাক‌লেও। বর্ষীয়ান এই মানুষটার যেমন আমি একজন সমা‌লোচক, তেম‌নি আবার তাঁকে পছন্দ ক‌রি নানা কার‌ণে। বহু‌দি‌নের সখ্যতা ওনার স‌ঙ্গে, য‌দিও আজকাল দেখা হয় কম। তি‌নি আমার বন্ধুর ম‌তো ছি‌লেন, কিন্তু আমার বন্ধুরা যারা ওনার ছাত্র ছি‌লেন, ওনা‌কে পরম শ্রদ্ধায় স্যার বল‌তেন ব‌লে আমি ওনা‌কে “স্যার” বল‌তে শুরু ক‌রি। কিন্তু ছাত্র শিক্ষক ছিলাম না কখ‌নো, নানা বি‌রো‌ধিতার ম‌ধ্যে আমা‌দের সুন্দর একটা সম্পর্ক ছি‌লো, যা আমি উপ‌ভোগ করতাম। সবার স‌ঙ্গে আমার ম‌তের মিল হ‌তেই হ‌বে বা কেন? তি‌নি শা‌ড়ি নি‌য়ে যা বল‌ছেন তা হ‌লো আদর্শবাদী কথাবার্তা। ব্যাপারটা সেটুকু থাক‌লে সমস্যা হ‌তো না। বহু মে‌য়ে বন্ধু অা‌ছে আমার যারা ব‌লে শা‌ড়ি পরা উ‌চিৎ বাঙালী মে‌য়ে‌দের। খুব তর্ক হ‌য়ে‌ছে তা‌দের স‌ঙ্গে, তা‌দের যু‌ক্তি বাঙালীর সংস্কৃ‌তি রক্ষা কর‌তে হ‌বে। বাঙালীর সংস্কৃ‌তি কি শা‌ড়ি পরা? বাঙালীর সংস্কৃ‌তি যে কী সেটা আমি আজও বুঝ‌তে পা‌রি‌নি। বন্ধু‌দের শেষ পর্যন্ত বললাম, মে‌য়েরা না হয় শা‌ড়ি পর‌বে বাঙালীর সংস্কৃ‌তি রক্ষা করবার জন্য, পুরুষরা তাহলে কী প‌রিধান কর‌বে? বন্ধুরা তখন চুপ। কিন্তু সায়‌ীদ স্যা‌রের ব্যাপারটা ‌ভিন্ন। তি‌নি সারাটা জীবন একটা আদর্শ নি‌য়ে পাজামা পাঞ্জাবী প‌রিধান ক‌রে কা‌টি‌য়ে দি‌লেন। য‌দিও তার আদ‌র্শের স‌ঙ্গে আমি একমত না, কিন্তু তাঁর বহু আদ‌র্শের প্র‌তি ‌দ্বিমত নি‌য়েও আমি শ্রদ্ধাশীল। তি‌নি শা‌ড়ি পরাটা‌কে দেখেন বাঙালীর সংস্কৃ‌তি হি‌সে‌বে। কিম্বা তি‌নি যা বলে‌ছেন, ‌তি‌নি দে‌খেন সৌন্দর্য হি‌সে‌বে। যৌন আবেদ‌নের যে কথাটা তি‌নি ব‌লে‌ছেন, সেটা তি‌নি বারবার ব্যবহার কর‌লেও এটা মধ্যযু‌গের সা‌হি‌ত্যের ভাষা। তি‌নি খুব কদর্য মন নি‌য়ে তা ব্যবহার ক‌রে‌ছেন ব‌লে ম‌নে ক‌রি না। য‌দি ব্যবহার করাটা ঠিক হয়‌নি। সকল শ‌ব্দের প্র‌য়োগ সবসময় একই অর্থ বহন ক‌রে না। তি‌নি সেরকম রু‌চির লোক নন, যি‌নি শব্দ প্র‌য়ো‌গে নারী‌কে পণ্য হি‌সে‌বে দেখ‌বেন। কিন্তু তার ব্যবহৃত শব্দ অ‌নেক‌কে আহত ক‌রে‌ছে, অ‌নেকে সেজন্য তাঁকে আক্রমণ ক‌রে‌ছেন। ‌কিন্তু কা‌রো কা‌রো আক্রম‌ণের ভাষাটা ওনার লেখার ভাষার তুলনায় কখ‌নো কখ‌নো বে‌শি আক্রমণাত্মক ছি‌লো। সায়ীদ স্যা‌রের ভাষা আক্রমণাত্মক ছি‌লো না, বরং নৈর্ব্য‌ক্তিক ছি‌লো। সমা‌জের জন্য, তরুণ‌দের জন্য তি‌নি যা ক‌রে‌ছেন, সেটা ক‌তোটা সাফল্য পে‌য়ে‌ছে সে নি‌য়ে বিতর্ক করার প‌রেও, এটা সত্য তি‌নি আলো‌কিত একটা সমা‌জের জন্য তারম‌তো চ‌ল্লিশটা বছর সংগ্রাম করে গে‌ছেন। য‌দি তাঁর ম‌তো একজন ব্য‌ক্তির স‌ঙ্গে অামার মত পার্থক্য হয়, সেটার স‌ঙ্গে অবশ্যই অা‌মি ‌দ্বিমত কর‌বো। কিন্তু সে‌ক্ষে‌ত্রে এটাও বি‌বেচনায় রাখ‌তে হ‌বে, সে দ্বিমত পোষণ করার শিক্ষাটা আমি ঠিকম‌তো পে‌য়ে‌ছি কি না। দ্বিমত পোষণ করা মা‌নে হ‌চ্ছে, কাউ‌কে চরম অসম্মান করা নয়। অভব্য ভাষায় মন্তব্য করা নয়। সম্ভবত বিতর্ক করবার, দ্বিমত পোষণ করবার ভাষাটা আমরা রপ্ত কর‌তে পা‌রি‌নি, জাতীয় সংস‌দের দি‌কে তাকা‌লে, টে‌লি‌ভিশ‌নের মত‌বি‌নিময় অনুষ্ঠানের দি‌কে তাকা‌লে সেটা প্রমা‌ণিত হয়। দ্বিমত পোষণ করবার ভাষাটা অন্তত আবদুল্লাহ আবু সায়ী‌দের কা‌ছে শেখা যে‌তে পা‌রে। প্র‌তিপ‌ক্ষের স‌ঙ্গে কীভা‌বে ধীরে, ঠাণ্ডাভা‌বে কথা বল‌তে হয়, মু‌খে হা‌সি নি‌য়ে প্র‌তিপ‌ক্ষের স‌ঙ্গে ল‌ড়ে যে‌তে হয় সেটা তি‌নি জা‌নেন । খুব কম বয়স্করা অ‌নে‌কে তাঁকে যেভা‌বে আক্রমণ ক‌রে‌ছেন, য‌দি তাঁরা তাঁর সাম‌নে গি‌য়ে কথাগু‌লো বল‌তে পার‌তেন, দেখ‌তে পে‌তেন, যে অসম্মান তাঁরা তাঁকে নি‌র্দ্বিধায় ক‌রে‌ছেন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁ‌দের স‌ঙ্গে তা কর‌তেন না। প্র‌তিবাদ করা নি‌য়ে আমার আপ‌ত্তি নেই, আপ‌ত্তিটা ভ‌ঙ্গি‌তে। শুধু ওনার ক্ষে‌ত্রে নয়, প্রায় ক্ষে‌ত্রে সেটা এভা‌বেই ঘ‌টে। যেন অন্য‌কে অসম্মান কর‌তে পার‌লে, খা‌টো কর‌তে পার‌লে আমা‌দের সুখ। আমরা মা‌নে তথাক‌থিত শিক্ষিত আমরা।

প্রথ‌মে ব‌লে‌ছি, এখনো বল‌ছি, তার লেখাটা আমা‌কে হতাশ ক‌রে‌ছে। বিষয়বস্তুর ম‌ধ্যে নানা অসঙ্গ‌তি আবার স্ব‌বি‌রোা‌ধিতা আছে। বি‌শেষ ক‌রে নারী‌দের নি‌য়ে তি‌নি এমন কিছু মন্তব্য ক‌রে‌ছেন, তা‌তে কা‌রো কা‌রো ক্রো‌ধের কারণ থাকতেই পা‌রে। কিন্তু মত প্রকা‌শের স্বাধীনতায় তো আমরা বিশ্বাস কর‌বো, কা‌রো ম‌তের স‌ঙ্গে এক মত হই আর না হই। ফ‌লে আমরা এক মত না হ‌লেও ধ‌রে নেই যে, এটা ওনার মত প্রকা‌শের স্বাধীনতা। বিতর্ক তাহ‌লে আরম্ভ ক‌রি মতাদ‌র্শের জায়গা থে‌কে। কিন্তু ম‌তের জায়গা বাদ দি‌য়ে ব্য‌ক্তি‌কে আক্রমণ করা কেন? বহুজন বলে‌ছেন, তি‌নি নারীর প্র‌তি শ্রদ্ধাশীল নন, নারী‌কে দে‌খেন ভো‌গের বস্তু হি‌সে‌বে। সে কথাটার স‌ঙ্গে আমি একমত হ‌তে পার‌বো না। সমা‌জে আমরা কেউ প‌রিপূর্ণ মানুষ নই, তি‌নিও নন। কিন্তু নারী‌কে তি‌নি অ‌নে‌কে বে‌শি মর্যাদা দেন অ‌নে‌কের চেয়ে। সেটা অ‌নে‌কেই স্বীকার কর‌বেন যাঁরা তা‌কে চে‌নেন। অ‌নে‌কে ভাব‌বেন, আমি তার প‌ক্ষে কলম ধরলাম কেন? কিন্তু আমি তার প‌ক্ষে কলম ধ‌রে‌ছি, এটা য‌দি স‌ত্যি হয় তার বিপ‌ক্ষেও ধ‌রে‌ছি। কারণ আমি পু‌রো মানুষটার একটা মূল্যায়ন ক‌র‌তে চে‌য়ে‌ছি খুব সং‌ক্ষিপ্ত পরিস‌রে। প্রথ‌মে ভে‌বে‌ছিলাম কিছু লিখ‌বো না। ‌লিখ‌লেই, প‌ক্ষে বিপ‌ক্ষে নানা কথা শুন‌তে হ‌বে। প‌রে ম‌নে হ‌লো, না গা বাঁচা‌নোটা অন্যায় হ‌বে। কেন হঠাৎ তা ভাব‌তে গেলাম? প্রায় আজকাল নিহত তস‌লিমার কথা ভা‌বি। মিথ্যা ছে‌লেধরা হি‌সে‌বে প্রাণ দি‌য়ে‌ছি‌লেন, মানু‌ষের ভুল বুঝাবু‌ঝির শিকার হ‌য়ে‌ছি‌লেন। বর্তমান এ সমা‌জে প্রায় দে‌খি, মানুষ নানাভা‌বে ভুল বুঝাবু‌ঝির শিকার হন, সক‌লে হয়‌তো তস‌লিমার ম‌তো প্রাণ দেন না। কিন্তু বিব্রতকর অবস্থায় প‌ড়েন। বর্তমান এ সমা‌জে মানুষ‌কে ভুল বু‌ঝে হত্যা করা, ভুল ধারণা নি‌য়ে অপবাদ দেয়া, অকার‌ণে যা নয় তাই ব‌লে অসম্মান করা নিয়ম হ‌য়ে দাঁড়ি‌য়ে‌ছে। ফ‌লে সায়ীদ স্যা‌রের স‌ঙ্গে আমার দীর্ঘ সম্প‌র্কের কার‌ণে তি‌নি যা‌তে ভুল বুঝাবু‌ঝির শিকার না হন, সেজন্য সায়ীদ স্যা‌রের লেখাটা সম্পূর্ণ পড়লাম। বুঝলাম সমাজ‌কে বি‌শ্লেষণ না কর‌তে পারার যে সঙ্কট, ব্য‌ক্তি‌কে সমা‌জের নি‌ক্তি‌তে না দে‌খে মনগড়া আদর্শ রূপ দি‌য়ে গ‌ড়ে তুল‌তে চাওয়ার যে ইচ্ছা, সেটাই লেখাটায় প্রকট। তি‌নি হয়‌তো আমার স‌ঙ্গে একমত হ‌বে না। না হবার স্বাধীনতা তাঁর আছে। কিন্তু তি‌নি শা‌ড়ি নি‌য়ে লিখ‌তে গি‌য়ে এমন সব প্রস‌ঙ্গের অবতারণা ক‌রে‌ছেন, তা‌তে তাঁ‌কে ভুল বুঝবার কারণ আছে, যথেষ্টই সে কারণ আছে। কিন্তু তি‌নি আস‌লে যা ক‌রে‌ছেন, আদি বাংলা সা‌হি‌ত্যের এবং সংস্কৃ‌ত সা‌হি‌ত্যের নানান নান্দ‌নিক বোধ দ্বারা প্রভা‌বিত হ‌য়ে‌ছেন, নারী‌কে তা‌দের চোখ দি‌য়ে দে‌খে‌ছেন। তি‌নি যেটা‌কে ম‌নে ক‌রে‌ছেন, সা‌হি‌ত্যের চো‌খে দেখা, সেটা তিন‌শো বছর বা তার আগের ঘটনা। বর্তমা‌নে নারীর ভূ‌মিকা ই‌তিহা‌সের গ‌তিপ‌থের স‌ঙ্গে পা‌ল্টে গে‌ছে, নারী‌কে এখন আর আগের নী‌তি‌বোধ দি‌য়ে দেখা যা‌বে না, আগের সা‌হিত্য দি‌য়ে মূল্যায়ন করা যা‌বে না। নারীর জন্য এখন নতুন সা‌হিত্য রচনা কর‌তে হ‌বে। প্রথম তা‌কে মানু‌ষের মর্যাদা দি‌য়ে প‌রে নারীর ভূ‌মিকা‌কে বিচার কর‌তে হ‌বে, সে হ‌বে প্রকৃ‌তির নারী। পুরুষশা‌সিত সমা‌জের পুরু‌ষের চোখ দি‌য়ে নারী‌কে দেখা নয়। সে শা‌ড়ির আলোচনা হোক আর অন্য কোন প্রস‌ঙ্গ হোক।

সব‌শে‌ষে বল‌বো, বর্তমান সমা‌জে নারী নারীর পূর্ণ সম্মান দি‌তে পার‌ছে না বহু ক্ষে‌ত্রে। শূদ্ররা নি‌জেরা তার চে‌য়ে নীচু শূ‌দ্রের স‌ঙ্গে ব‌সে খে‌তে চাই‌ছে না। এটা রা‌তিরা‌তি পা‌ল্টে যাবার ব্যাপার নয়। পাল্টা‌নো ধারা শুরু হ‌য়ে‌ছে, বহু পথ পার হওয়া গে‌ছে, সময় লাগ‌বে। ফ‌লে আবদুল্লাহ আবু সায়‌ীদের স‌ঙ্গে বিতর্ক চল‌তে পা‌রে। সেটা যেন হয় বিত‌র্কের ম‌তোই, ‌যেন মত‌বি‌নিময়‌কে মারামা‌রি বা আক্রমণ ম‌নে না হয়।

সম্পূর্ণ আমার ব্য‌ক্তিগত মত প্রকাশ করলাম। সামান্য বি‌বেচনায় যা ম‌নে হ‌লো লিখলাম। কা‌রো আমার স‌ঙ্গে একমত হ‌তেই হ‌বে এমন নয়, যা‌দের দ্বিমত থাকার থাক‌বে। খুব দ্রুত লিখ‌তে গিয়ে লেখাটা স‌ঠিকভা‌বে গু‌ছি‌য়ে লেখা সম্ভব হ‌লো না।

লেখক:
রাহমান চৌধুরী, লেখক, শিল্প সমালোচক
Raahman Chowdhury

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.