বিতর্ক: শাড়ী । লুৎফুল হোসেন

Comments

আম্মুকে আম্মু বলিও না আন্টি বলিও

মা’কে দেখেছি শাড়িতে। বুদ্ধি হবার পর থেকে জানি ওটা মায়ের পোষাক। ঘরে বাইরে সর্বত্রই। ঘর বলতে তো ঘর। বাবার চাকুরিস্থল ব্যাংক বাউণ্ডারির ভিতর পিছনের দিকে একখানা চৌচালা ছোটো বাংলো টাইপ বেড়ার ঘর। ওই ঘর থেকেই ভৈরবে থাকার শুরু। তার ভিতর কামরা বলতে তিনখান। বাইরের ঘর, ভিতরের ঘর মানে মা-বাবার শোবার ঘর। আর একখানা খাবার ঘর। তার সাথে লাগোয়া রান্না ঘর।

আর বাইরে বলতে মায়ের স্কুল। ভৈরব গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষয়িত্রী তখন মা। সাদা শাড়ি কালো পাড় – এমন প্রচলন খুউব থাকলেও মায়ের বড় বড় ফুলছাপ শাড়িগুলোর কথাই আমার শুধু মনে পড়ে। অমন শাড়িই বেশি পরতেন। সুতি শাড়ি, কোটা টাইপ শাড়ি। কোমল একটা স্পর্শ পেতাম সেই কাপড়ের, মা’কে ধরলেই।

এর মধ্যে ছোট ভাই হাটতে শিখেছে। একটা তিন চাকার সাইকেল (রিকশার মিনি আদলের) আমার আছে। তখনকার দিনে কমন একটা খেলনা। আজকের মতো জায়গার অভাব তখন কোনো বাড়িতেই তেমন ছিলো না। তাই ঘরের ভিতর বা বাইরে ওটা চালাবার জায়গার অভাব হতো না।

ছোটো ভাইকে সাইকেলের পেছনের যাত্রী সিটে বসিয়ে আমি হতাম চালক। আর রোজ মা’কে জিজ্ঞেস করতাম ও কবে আরেকটু বড় হবে! সব খেলাগুলো আমার সাথে দৌড়-ঝাঁপ করে খেলতে পারবে! আমাকেও কোনো দিন পিছনের সিটে বসিয়ে নিজেই চালাতে পারবে।

সেই সময়টায়, আসলে ছোটো ভাই হবার কিছুদিন আগে থেকেই পালা করে বেড়াতে আসতেন আমার তিন খালা। পরেও সেই আসা অব্যাহত ছিলো অনেক দিন। মায়ের ছোটো এই তিনজন। তাদের পোষাক সেলোয়ার-কামিজ-ওড়না। মাঝে মধ্যে মায়ের শাড়ি পরতেন তারা শখ করে।

একদিন হলো উল্টোটাই৷ আম্মা পরলেন কোনো এক খালার সেলোয়ার-কামিজ-ওড়না। সেদিন বাসায় মেহমান আসার কথা সন্ধ্যায়। আম্মা দিনের বেলায় খালাদের মতো এক পোষাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ঘরের কাজ রান্নার কাজ, এসব করছেন। প্রথমবার আমি মা’কে অমন পোষাকে দেখে চমকে চমকে তাকাচ্ছি। কেমন যেনো অচেনা অচেনা লাগে।

তার কিছুদিন আগে থেকেই আমরা ব্যাংক বাউণ্ডারির ভিতরের বাসা ছেড়ে তার উল্টা দিকে গায়ে গায়ে লাগোয়া বাসাগুলোর একটায় থাকতে শুরু করেছি, দোতালায়। আমি মাঝে মধ্যেই সামনের বারান্দায় গিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসি, সামনের রাস্তায়। কেউ আসলো কিনা! মা’কে যদি কেউ এসে দেখে ফেলে অমন পোষাকে! সময়ের হিসাব বুঝতে তখনও ঠিক শিখে উঠিনি। কখন বিকেল গড়াবে। মেহমান আসবে।

বিকেল ঘনিয়ে আসছে আর আমার উৎকণ্ঠা বাড়ছে। মা-খালারাও এক সময় টের পেয়ে হাসছিলেন খুব। আমি ভিতরে ভিতরে রাগছি, আমাকে নিয়ে হাসার জন্যে ঠিক নয়। এমন একটা সিরিয়াস বিষয়কে ঠাট্টার চোখে দেখছেন বলে।

শেষমেষ নিজেই সমস্যার সাঁকো পার হবার বুদ্ধি খুঁজে বের করলাম। ছোটো ভাইকে নিয়ে বসলাম তাকে বুঝাতে। বললাম মেহমান আসলে কিন্তু তাদের সামনে আম্মাকে আম্মা বলে ডেকো না, ভুল করে। ও তখন চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে। তাই বার বার করে আউড়ে দিলাম একটা লাইন। মেহমান চলে আসলে তাদের সামনে, ‘আম্মুকে আম্মু বলিও না, আন্টি বলিও’।

ছোটো ভাই দ্বিমত করেনি৷ কিন্তু সেই পাঠশালা আয়োজন মা-খালাদের নজর এড়ালো না। তারা দল বেঁধে মুখ টিপে হাসছিলেন কাজের ব্যাস্ততার মাঝখানেই। তখন আমার চিন্তাগুলো ওইটুকুতে থেমে থাকলেও আম্মা কাপড় পাল্টাতে গেলে শাড়ি পরায় বাদ সেধে গেলেন খালারা। মা শাড়িই পড়লেন শেষে। কিন্তু সেদিনের ওই কথা সারা জীবন আমার পিছু লেগেই থাকলো।

সব সময়, সব খালারা আমাকে ক্ষ্যাপাতেন, ‘আম্মুকে আম্মু বলিও না, আন্টি বলিও’ কথাটা বারবার রিপিট করতেন। অনেক বছর এটা তাদের হাসি আর আমার ক্ষোভ-দুঃখ-কান্নার হেতু হয়ে রইলো।

দেখতে দেখতে সেইসব রাগ ক্ষোভ আর খালাদের ঠাট্টা অপমানের অতীত এক সময় যোগ হলো আমার মধুর শৈশব স্মৃতির খাতায়।

লেখক:
লুৎফুল হোসেন,কবি ও কথাকার

Lutful Hossain

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.