বিদ্যাসাগর-আজকের মেয়ের চোখে

Comments

।। দ্বীপান্বিতা ঘোষ ।।

‘বিধবাবিবাহ প্রবর্তন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম। … এ বিষয়ের জন্য সর্বস্বান্ত হইয়াছি এবং আবশ্যক হইলে প্রাণান্ত স্বীকারেও পরাঙ্মুখ নহি। … আমি দেশাচারের দাস নহি; নিজের বা সমাজের মঙ্গলের নিমিত্ত যাহা উচিত বা আবশ্যক বোধ হইবে, তাহা করিব, লোকের  বা কুটুম্বের ভয়ে কদাচ সংকুচিত হইব না।‘

বলাই বাহুল্য এমন বোধ, সঙ্কল্প ও দৃঢ়তাপূর্ণ বাক্যবন্ধ উচ্চারণ বিদ্যাসাগরেই সম্ভব, যিনি নিজের ব্যক্তিত্বের অখন্ড মানবতার জোরে সমাজের বিধিব্যবস্থা যে স্থাণু নয়, বরং চলিষ্ণু তা উপলব্ধি শুধু করেন নি,  সমাজের গতিপথকে রুদ্ধ করে আবর্জনার বোঝা হারকিউলিয়ান প্রচেষ্টায় তাকে মুক্ত করার দায় তুলে নিয়েছেন নিজের চওড়া কাঁধে।  এ কথা আমরা সবাই জানি,  বাংলায় সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষা মূলত স্ত্রী শিক্ষা বিষয়ে যিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি আমাদের নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। অগাধ জ্ঞান এর পরিচয় দিয়ে তিনি সংস্কৃত কলেজ থেকে “বিদ্যাসাগর” উপাধিতে  ভূষিত হন। বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালীন সমস্ত সমাজে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। তিনি সংস্কৃত কলেজের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন, ধর্ম জাতি নির্বিশেষে। সেইসময়ের প্রেক্ষিতে এ এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

তিনি মনে করতেন শিক্ষা বিষয়ে নারী পুরুষ উভয়েই সমান অধিকারী। মেয়েদের শিক্ষার জন্য শুধু কলকাতায় বেথুন কলেজ নয়, জেলায় জেলায় বালিকাদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন বিদ্যাসাগর। ব্রিটিশ সরকার পরে অনেক স্কুলের অর্থসাহায্য বন্ধ করে দিলে তিনি নিজে সেগুলি চালানোর দায় নেন।

আবার আসা যাক বিদ্যাসাগরের উল্লিখিত ‘সৎকর্মের’ প্রসঙ্গে। তিনি বন্ধু ও হিতৈষীদের সহযোগিতায় সংস্কার আন্দোলনের লক্ষে স্থাপন করেন “সর্ব শুভকরী সভা”। যে সভার পত্রিকায় বাল্যবিবাহের দোষ (১৮৫০) নামে তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত  হয়। এমন কিন্তু নয় যে তাঁর আগে বাল্যবিবাহ, বিধবাবিবাহ ও বহুবিবাহের মতো সামাজিক কুপ্রথাগুলো দূর করার কথা আর কেউ ভাবেন নি। ইয়ং বেঙ্গলদের যুগ থেকেই এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা চলেছে, কিন্তু বিদ্যাসাগরের মত সর্বশক্তি পণ করে একাজে কেউ ব্রতী হন নি।

১৮৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদবিষয়ক প্রস্তাব’ প্রথম ছোট একটি পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। এরপর টানা ১৮৮০ সাল অবধি তিনি এ বিষয়ে লিখে চলেছেন, একদিকে শাস্ত্র থেকে তুলে আনা অকাট্য যুক্তির গাঁথুনি, অন্যদিকে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ, উইট ও স্যাটায়ারের অলংকার সমৃদ্ধ সে সব লেখা। কিন্তু শাস্ত্র তো ছিল তাঁর অস্ত্র মাত্র, তিনি জানতেন শাস্ত্রমতে প্রতিপন্ন না করলে বিধবাবিবাহ (মনে রাখতে হবে এই বিধবাদের এক বড় অংশই বালিকা, আর সেই যুগে হিন্দু বিধবার যাবজ্জীবন অশনে, বসনে, শয়নে প্রতি মুহূর্ত নরকযন্ত্রণা ভোগই একমাত্র প্রাপ্য) কেউ মেনে নেবে না। কারণ তিনি নিজেই বলেছেন, ‘ধন্য রে দেশাচার! তোর কি অনির্বচনীয় মহিমা!’ আসল কথাটি তিনি বলেছেন তাঁর এই বিষয়ে দ্বিতীয় পুস্তকের শেষে এসে – ‘তোমরা মনে কর, পতিবিয়োগ হইলেই, স্ত্রীজাতির শরীর পাষাণময় হইয়া যায়; দুঃখ আর দুঃখ বলিয়া বোধ হয় না; যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা বলিয়া বোধ হয় না; দুর্জয় রিপু বর্গ এক কালে নির্মূল হইয়া যায়;’ । আজকে আমরা বুঝি এই প্রথম ভারতীয় নারীর ‘শরীর’ (না, মনের দুঃখের কথা তিনি এখানে বলেন নি, তা নিয়ে আগেই বলা হয়েছে) ও যৌনতার চাহিদা সৎ স্বীকৃতি পেল কোন পুরুষের কলমে। এখানে ই তাঁর আধুনিকতা, তাঁর চিন্তার সুদূরগামিতা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, তাঁর জীবনধারার মিলন ছিল বহমান কাল গঙ্গার সঙ্গে, তাই তিনি আধুনিক।

১৮৫৬ সালের ১৬ই জুলাই বিধবা বিবাহ আইন সম্মত হয়। ওই বছরই ৭ই ডিসেম্বর প্রথম কলকাতায় শ্রীশ্চন্দ্র বিদ্যারত্ন বিধবা বিবাহ করেন, পাত্রী বালিকা কালীমতি দেবী।  বিদ্যাসাগর আইনকে কাজে পরিণত করে দেখালেন, আগামী  যুগের মেয়েদের জন্য নতুন ভোরের বার্তা পৌঁছে দিলেন, শিক্ষা ও সম্মানের রাজপথ বেয়ে যারা এগিয়ে চলবে, গড়ে তুলবে নতুন সমাজ।

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.