বিপ্লবী বিবেকানন্দ । স্বাতী চক্রবর্তী

Comments

বিশ্বনাথ দত্ত কলকাতা উচ্চ আদালতের একজন আইনজীবী। তাঁর বৈঠকখানায় নানা লোকের আনাগোনা লেগেই আছে। নানা জাতের, নানা ধর্মের মানুষ, তাঁদের জন্য সাজানো আছে আলাদা আলাদা হুঁকো। বিলে, বিশ্বনাথ দত্তের মেধাবী ছেলেটি বড়ই দুষ্টু, কারো কথার ধার ধারে না বিশেষ, তার প্রশ্নবাণে সবাই ঝালাপালা। হুঁকোগুলোর দিকে নজর পড়তেই প্রশ্ন এত হুঁকো লাগছে কোন কাজে। উত্তরে জানা গেল, নিচু জাতের জন্য বরাদ্দ হুঁকোয় উঁচু জাতের কেউ তামাক খেলে জাত যাবে উঁচু জাতের সেই লোকটির।  ব্যস, বিলে পরীক্ষায় লেগে গেল, দেখা গেল, সে সব হুঁকোয় মুখ লাগিয়ে সেগুলো সব উল্টেপাল্টে রাখছে। মহা বিপদ, অভিভাবকদের কাছে ধরা আনা হল, কেন সে এমন কাজ করল জানতে চাইলে সপাট উত্তর এল, জাত কেমন করে যায় দেখছিল সে। দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছয় বালক, জাত যাওয়া আসলে একটা সাজানো ব্যাপার। এই ছেলেটিরই জন্মদিন ১২ জানুয়ারী। স্বামী বিবেকানন্দ, যার পিতৃদত্ত নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত, ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে এই দিনটিতে উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে ৩ নম্বর গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

Swami-Vivekananda-01

স্বামী বিবেকানন্দ, যার পিতৃদত্ত নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত

ছেলেবেলায় নরেন্দ্রনাথ পড়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে। পরে জেনেরাল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশনে (অধুনা স্কটিশ চার্চ কলেজ, কলকাতা) পড়েছেন। তাঁর কলেজের প্রিন্সিপাল উইলিয়াম হেস্টি লিখেছেন, “নরেন্দ্র সত্যিকারের মেধাবী। আমি বহু দেশ দেখেছি, কিন্তু তার মতো প্রতিভা ও সম্ভাবনাময় ছাত্র দেখিনি; এমনকি জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দর্শন ছাত্রদের মধ্যেও না।” শোনা যায় তিনি ছিলেন ‘শ্রুতিধর’। ছাত্রজীবনের প্রথমে তিনি ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলেও পরে রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁর ওপরে বিরাট প্রভাব বিস্তার করেন। রামকৃষ্ণের সরল ভক্তি ও লোক জ্ঞান থেকে উঠে আসা উপদেশ তাঁর মনে নাড়া দিয়েছিল। প্রথমদিকে নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকে পরীক্ষা করতেন। রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবও শান্তভাবে তার যুক্তি শুনে বলতেন, “সত্যকে সকল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করবি।” পরে নরেন্দ্রনাথ ঈশ্বর-উপলব্ধির জন্য সংসার ত্যাগ করতে মনস্থ করেন এবং রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকে গুরু বলে মেনে নেন। কাশীপুরে নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য কয়েকজন শিষ্য মিলে প্রথম সন্ন্যাসী সংঘ স্থাপন করেন, উদ্দেশ্য মানব সেবাই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সাধনা, রামকৃষ্ণের এই উপদেশকে বাস্তবায়িত করা। পরে বরাহনগরে রামকৃষ্ণ মঠের প্রথম কাজকর্ম আরম্ভ হয়, বিপুল অর্থাভাবের মধ্যে।

১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে পরিব্রাজকরূপে মঠ ত্যাগ করেন বিবেকানন্দ। একটি কমণ্ডলু, লাঠি এবং প্রিয় দুটি গ্রন্থ সম্বল করে পাঁচ বছর ধরে ভারতের সর্বত্র ভ্রমণ করেন বিবেকানন্দ – প্রত্যেক শিক্ষাকেন্দ্র দর্শন করেন এবং বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় ও সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সুপরিচিত হন। বিভিন্ন পণ্ডিত, দেওয়ান, রাজা, এবং হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, নিম্নবর্গীয় পারিয়া ও সরকারি আধিকারিক নানা শ্রেনীর নানা মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও একত্র বাস করে  তিনি প্রত্যক্ষ জেনেছিলেন ভারতের আত্মাকে। ১৮৯২ সালের বড়দিনের সময় ভারতের শেষ প্রান্তবিন্দু কন্যাকুমারিকায় পৌঁছে তিনি উপলব্ধি করেন, “আমরা এতগুলো সন্ন্যাসী ঘুরে বেড়াচ্ছি এবং মানুষকে অধিবিদ্যা/দর্শনশাস্ত্র শেখাচ্ছি – এ সব কিছুই পাগলামি। আমাদের গুরুদেব কী বলতেন না, ‘খালি পেট ধর্মের জন্য ভালো নয়।’? জাতি হিসেবে আমরা আমাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হারিয়েছি এবং এটাই ভারতের সকল অনিষ্টের কারণ। আমাদের জনসাধারণকে জাগাতে হবে।”

ভারতকে বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠা করার অভিপ্রায় নিয়ে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে শিকাগো ধর্ম সম্মেলনে যোগ দেবার উদ্দেশ্যে বোম্বাই ত্যাগ করেন। পথে জাপান দেখে তাঁর মন কেদে ওঠে ভারতের দুর্দশায়, পরিষ্কার ভাষায় তিনি লিখছেন, “শত শত বছর ধরে তোমাদের মাথার উপর দানা বাঁধা কুসংস্কারের ক্রমবর্ধমান বোঝা নিয়ে বসে আছো, শত শত বছর ধরে এ খাবার সে খাবারের স্পর্শযোগ্যতা বা স্পর্শ-অযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করে তোমাদের সকল শক্তি ক্ষয় করছ, যুগ যুগ ধরে অবিরাম সামাজিক পীড়নের দ্বারা তোমাদের সকল মানবিকতা নিষ্পেষিত – তোমরা কী?”

এরপর ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর শিকাগো সম্মেলনে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা, যেখানে তিনি সব ধর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের সত্যে পৌঁছনোর যে প্রয়াস, তাঁর বিশ্বজনীন চেতনার কথা বলেন, ‘যত মত, তত পথ, রামকৃষ্ণের এই উপদেশেরই প্রতিধ্বনি যেন। ফেরার পথে বিবেকানন্দ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি কলম্বো পৌঁছান, পরে মাদ্রাজ, কলকাতা হয়ে আলমোড়া। এই যাত্রাপথে তিনি তাঁর মতাদর্শের কথা বিভিন্ন বক্তৃতার মাধ্যমে প্রকাশ করেন, এতে আছে জনগণের জন্য নৈতিক অনুপ্রেরণা, বর্ণাশ্রম দূরীকরণ, বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহদান, দেশের শিল্পায়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের জন্য আহ্বান। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মে কলকাতায় বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন সামাজিক কাজের জন্য সংগঠন “রামকৃষ্ণ মিশন”; শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, চিকিৎসা-সংক্রান্ত এবং দাতব্য কাজের মধ্য দিয়ে জনগণকে সাহায্য করার এক সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলন তৈরি করার হাতিয়ার। রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শের ভিত্তি হচ্ছে কর্ম যোগ। বারবার তিনি বলেছেন, সারা সংসারে মানুষ দেবতাই সব করে বেড়াচ্ছে, তাকে বাদ দিয়ে ভগবান খোঁজার চেষ্টা নিরর্থক। আত্মবিশ্বাসই ঈশ্বরবিশ্বাস। বলেছেন, বিশ্বের ইতিহাস হল আত্মবিশ্বাসসম্পন্ন মানুষের ইতিহাস। নিজের উপর বিশ্বাস থাকলেই অন্তরের দেবত্ব জাগরিত হয়। তাঁর মতে “ ধর্ম হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা দেবত্বের প্রকাশ ”

গোঁড়া মতবাদ, বা ধর্মীয় আচার, বা গ্রন্থ, বা মন্দির, বা মূর্তি গৌণ খুঁটিনাটি বিষয় ছাড়া কিছুই নয়। বিবেকানন্দ ভারতের সর্বব্যাপী দারিদ্র্র্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, এই দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যই ভারতে জাতীয় নবজাগরণের প্রয়োজন আছে। তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দেশের একটি কুকুরও ক্ষুধার্ত, আমার সমগ্র ধর্মকে একে খাওয়াতে হবে এবং এর সেবা করতে হবে, তা না করে অন্য যা-ই করা হোক-না-কেন তার সবই অধার্মিক’। বলেছেন, “অন্ন! অন্ন! যে ভগবান এখানে আমাকে অন্ন দিতে পারেন না তিনি যে আমাকে স্বর্গে অনন্ত সুখে রাখিবেন – ইহা আমি বিশ্বাস করি না। ” সেই সময়ের প্রেক্ষিতে কথাগুলি বৈপ্লবিক।

ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে জাতীয়তাবাদী ধারণার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে স্বামী বিবেকানন্দ জাতীয়তাবাদী আদর্শটিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। সমাজ সংস্কারক চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ভাষায়, “স্বামী বিবেকানন্দের নির্ভীক দেশাত্মবোধ সারা ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল”।  তাঁর জাতীয়তাবাদী ধারণা ভারতীয় দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবিত করেছিল। মহাত্মা গান্ধির মতে বিবেকানন্দ ছিলেন সেই অল্প কয়কজন হিন্দু ধর্মসংস্কারকদের একজন “যিনি হিন্দুধর্মের প্রথা ও রীতিনীতির মৃত শাখাপ্রশাখাগুলিকে ছেঁটে ফেলে হিন্দুধর্মের সৌন্দর্য রক্ষা করেছিলেন।” রোম্যা রোলাঁ লিখেছেন, “তার লেখাগুলি মহান সঙ্গীতের মতো এবং পংক্তিগুলি বেটোফেন শৈলীর মতো। চিত্তাকর্ষক ছন্দগুলি হ্যান্ডেল কোরাসের কুচকাওয়াজের মতো। আজ ত্রিশ বছর পরেও তাঁর বাণীগুলিকে স্পর্শ করলে আমার শরীরে বৈদ্যুতিক আঘাতের মতো শিহরণ জাগে। এই মহানায়কের মুখ থেকে যখন এই জ্বলন্ত শব্দগুলি উচ্চারিত হয়েছিল, তখন নিশ্চয় অনেকে এই শিহরণ অনুভব করেছিলেন!” তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র ছিল ‘চরৈবেতি’।

৪ জুলাই ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন।

আজ যখন গোটা উপমহাদেশে নানা ধর্মের নানা গোঁড়ামি ও বুজরুকি মানুষের চিন্তা ও কর্মকে  ঘুলিয়ে তুলে, তার জীবনযাপন বিপর্যস্ত করে তুলেছে, তখন মনে পড়ে ভারতের জাগ্রত  বিবেকের কন্ঠস্বর ছিলেন প্রগতিবাদী এই সন্ন্যাসী বীর।  দুর্ভাগ্যের এবং লজ্জার কথা এই যে আজ সেই ধর্মীয় গোঁড়ারাই যাদের বিরুদ্ধে তিনি খড়্গহস্ত ছিলেন, তারাই তাঁকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন, কলুষিত করছেন তাঁর আদর্শকে।  আর আমরা যারা প্রগতি পন্থী তারাও তাঁকে ভুলতে বসেছি।

লেখক পরিচিতি:
স্বাতী চক্রবর্তী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, যুগ্ম সম্পাদক (কলকাতা), বাঙালীয়ানা
swati chokroborti

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.